কালের খেয়া

কালের খেয়া

পোস্ট-আইসোলেশন

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০

বর্ণালী সাহা

মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ভেতর সুজয়ের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হলো সপ্তাহ দুয়েক আগে। পুরোনো সায়েন্স বিল্ডিংয়ের পাশে, ইঞ্জিনিয়ারিং লেনের ধার ঘেঁষে অনেকগুলো ক্যাবেজ ট্রি গজিয়েছে- বেঁটে কিন্তু বিস্তৃত ডালপালার; অনেকটা ঝোপের মতো দেখতে- এমনই একটা গাছের পাশে কফি কার্ট চালাচ্ছে মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরা এক পূর্ব-এশিয়ান দম্পতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ইয়ার তো এই সময়ে মধ্যগগনে থাকার কথা; তবু ক্যাম্পাস এত খালি কেন? প্রায় জিজ্ঞেস করে ফেলছিলাম সুজয়কে- সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ায় চুপ করে গেলাম। অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় এই বছর জানুয়ারি সেশন পিছিয়ে দিয়েছে- চীনে যে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি, তাতে অস্ট্রেলিয়ায় এখন ক্লাস শুরু করার মানে হয় না; ৩৫ শতাংশই তো চাইনিজ ছাত্রছাত্রী।

সুজয়ের সঙ্গে এর আগের বার দেখা হয়েছিল হিউয়ের বাড়ির বুধবারের নিয়মিত ডিনারে। হিউয়ের বয়স ষাটের কাছাকাছি। হিউ অকৃতদার, ককেশিয়ান, জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ান, যদিও ওর বাপ-দাদা ছিলেন স্কটিশ জমিদার। জীবনে চাকরি করেনি হিউ; ব্যবসাও না। বাড়ি ভাড়ার টাকায় জীবন চালিয়েছে এবং তাতে দিব্যি চলেছে ওর। রিচমন্ডে ওর তিনতলা বাড়ির নিচতলা আর দোতলা ভাড়া নিয়েছে এক বড়সড় অস্ট্রেলিয়ান কসমেটিক কোম্পানি- ওদের হেড অফিস ওইখানেই। তিনতলায় হিউ নিজে থাকে, আর থাকে মাত্র কিছুদিন আগে দত্তক নেওয়া কুকুরছানা 'যুট'। হিউয়ের আত্মীয়-পরিজন বেশিরভাগই বিগত। একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে সদ্ভাব নেই, যদিও ক্রিসমাসে দাওয়াত ঠিকই দেয়। তাই ওর পরিবার বলতে আমরাই- তিন-চারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমারও তাই, কারণ আমি পরিবারহীন অভিবাসী।

প্রতি বুধবার হিউ আমাদের জন্য রান্না করে। আমরা যার যার অফিস শেষ করে চলে যাই বিফ ওয়েলিংটন বা স্টেক বা পার্সিয়ান কাবাব বা মরোক্কান ক্লেপট সবজি খেতে আর ডিনার-টেবিলে রাজনৈতিক বিতর্ক করতে। মাঝে মাঝে ওর রান্নায় দেরি হয়ে যায়, তাই কিচেনের কাজ আমরাই হাতে হাতে সেরে ফেলি। জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্নে হিউ নাকি ডানঘেঁষা মধ্যপন্থি, সুজয় নাকি আরেকটু বেশি ডানঘেঁষা- কিন্তু ওরা আদতে উদারপন্থি, তাই অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সব সেবা প্রাইভেট করে দেওয়া উচিত কিনা, সেই প্রশ্নে ওদের সঙ্গে আমার যেমন লেগে যায়, বহিরাগত পুঁজি আর অভিবাসীদের কাঁধের ওপরই যে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, সেই সত্যও ওরা মেনে নেয়। আরেকটা ব্যাপারে আমরা অবিকল এক- আমরা ভালো খাবার খুব ভালোবাসি। নতুন নতুন খাবার নিয়েও আমাদের ফ্যান্টাসির শেষ নেই। ঈদের কি পহেলা বৈশাখের খানাপিনার আয়োজনও আমরা ওই বাড়িতেই করে থাকি। ওই দিনগুলোতে হয় সরষে ইলিশ, বেগুন পোড়ার ভর্তা, ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানি- এমনকি মালপোয়া আর উচ্ছে ভাজাও হয়েছিল একবার। আমাদের মেক্সিকান বন্ধু অ্যানার উদ্যোগে প্রতি বছর 'ডে অব দ্য ডেড'ও সেলিব্রেট করা হয় ওখানে- মুখে ভূতের মতো কালিঝুলি এঁকে মোহিতো গেলা হয়, আর মোলে খাওয়া হয় কবজি ডুবিয়ে।

সেদিন ক্যাম্পাসে কফি অর্ডার দিয়ে সুজয় খুকখুক করে খানিক কাশল। আমাকে বলল- দু'দিন ধরে ওর জ্বর-জ্বর ভাব, কাজে যায়নি। এখন ভাবতে গিয়ে অসম্ভবই মনে হচ্ছে যে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও প্রায়-জনবিরল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমি ওর কাশি দেখে সরে বসিনি, ওর হাত থেকে আমার কফির কাপ নিয়েছি, দেখা হওয়ার মুহূর্তে আর বিদায় নেওয়ার ঠিক আগে-আগে যথাবিহিত হাগ দিয়েছি, বলেছি- 'সামনের বুধবার হিউয়ের বাসায় আবার দেখা হবে দোস্ত!'

সুজয়কে বিদায় দিয়ে বিশ সেকেন্ডে রাস্তা পার হয়ে গেলাম কার্লটন- মানে লাইগন স্ট্রিট- আদি ইতালিয়ান পাড়া কিন্তু আসলে অস্ট্রেলিয়ায় আমার 'আজিজ মার্কেট'। এখানকার সবচেয়ে নামি বইয়ের দোকান ওই পাড়ায়। সঙ্গে সার-সার ইতালিয়ান রেস্টুরে?ন্ট, জেলাটেরিয়া, কিউরিও শপ, ছোটকাগজ আর ইনডিপেনডেন্ট সিনেমার আখড়া, বুটিক দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচার রাস্তা ক্রস করে এখানেও উপচে পড়েছে- একটা উচ্ছ্বাসের প্রাচুর্য আছে- প্রগতিশীল, কিন্তু বিলাসী নয়। লাইগন স্ট্রিটের সঙ্গে আমার চর্চিত সম্পর্কের কেন্দ্রে মনে হয় এই অনুষঙ্গগুলোই। কখনও আলাদা করে মনে হয়নি যে, এটা ইতালিয়ানপাড়া। সেদিন কিন্তু মনে হলো। এত খালি আমি কবে দেখেছি এই পাড়া? আইরিস মার্ডকের একটা বই, যেটা আগে পড়িনি, কিনব কি কিনব না ভাবতে ভাবতে বইয়ের দোকানের লাগোয়া রেস্টুরেন্টে পাস্তা খেতে ঢুকলাম। আশ্চর্য! অন্যদিন এখানে টেবিল পেতে হলে লাইন ধরতে হয়, অথচ সেদিন আমি একমাত্র খদ্দের। এখানে মালিক-কর্মচারী সবাই ইতালিয়ান। তাহলে কি সংক্রমণের ভয়ে কেউ আসছে না? কোথায় গেল আমার শহর মেলবোর্ন আর তার সেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের স্পিরিট? রেস্টুরেন্টের ভেতর কোনো একটা গানের ধ্বনি নিটোল গোল হয়ে কানে বাজছিল, যেন একটা কাচের বোতলের মধ্যে সুরটা অন্তরীণ হয়ে আছে। কাউন্টারের মেয়েটা- বেচারি আর কাউকে না পেয়ে আমাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মনোযোগ দিল, কিন্তু একবারও হাসল না। ওর চিবুক-কপাল-নাক চকচকে, মনে হচ্ছিল শরীরের প্রতিটা লোমকূপ ঘাম-তেল-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা উগরে দিচ্ছে। ওর অ্যাক্সেন্ট শুনেই বুঝলাম ও এই শহরে নবাগতা। বেচারির বাপ-মা-ভাই-বোনের না জানি কী হাল! মেয়েটা আমাকে বসিয়ে মেন্যু দিয়ে গেল, আবার ফিরে এলো লম্বা গলার পানির বোতল আর তার ওপর কাচের গল্গাস চড়িয়ে গোপ-ললনার মতো হেলেদুলে। টিপটপ করে টেবিল মুছে দিল, তারপর প্লেট-গ্লাস-ন্যাপকিন-কাটলারি সেট করে দিল। আমি সন্তর্পণে হাতে স্যানিটাইজার মেখে নিলাম, চুমুক না দিয়ে গ্লাস থেকে পানি খাওয়ার চেষ্টা করলাম, টেবিলে কনুই না ঠেকিয়ে মেন্যু দেখলাম। মেয়েটা দেখে ফেললে না জানি কী ভাববে। (আজ থেকে দুই সপ্তাহ আগে আমরা অনেকেই হয়তো নিশ্চিত ছিলাম না শুচিবাইগ্রস্তের মতো ধোয়া-মোছা করাটাই সামাজিকভাবে গ্রাহ্য দস্তুর কিনা। আজ যদিও আর কারও মনে সেই সন্দেহ নেই)।

গত রাতে ওয়াসির বাসার উল্টাদিকের ক্লাব থেকে 'ডুফ-ডুফ' শব্দ আর মাতাল তরুণ-তরুণীদের হল্লা ভেসে এসেছে। সোশ্যাল আইসোলেশন না মানার মূর্খামি আর মাতলামোর ঘোর কাটলে এরাই আবার সকাল ৭টায় সুপারমার্কেটের বাইরে লাইন ধরে দাঁড়াবে যুদ্ধকালীন রেশন কার্ড নিয়ে অপেক্ষা করার মতো করে- একগাদা টয়লেট পেপার রোল কিনবে, আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত রোল দিয়ে বাড়ি বোঝাই করবে। আগামী চার-পাঁচ দিন আমি ওয়াসির বাসাতেই থাকব- ওর লিভিং রুমের সোফায় থানা গাড়ব, যথাযথ সামাজিক দূরত্ব সহকারে। আমার ফ্ল্যাটে যে মেয়েটার সঙ্গে শেয়ার করি, দু'দিন আগে সেই মেয়েটা টেক্সট মেসেজে জানিয়েছে ওর ধুম জ্বর আর কাশি- ডাক্তার নাকি বলেছে সম্ভবত করোনা নয়, ফ্লু। তবু এ অবস্থায় নিজের বাড়ি থেকে দূরে থাকাই ঠিক হবে। আমার নিজের কোনোরকম উপসর্গ নেই, যদিও জানি না ফ্ল্যাটের শিবানী মেয়েটা অজান্তে আমাকে সংক্রমিত করেছে কিনা। বিশ্বাস কী? এর মাঝে গৃহহীনতার একটা অনুভূতি যে হয়নি, তা নয়, বন্ধুর বাসা হলেও অন্যের বাসা। এই বাসায় জীবাণু না ছড়িয়ে দিই! এইসব ভাবি আর দিনে দশ-বারোবার করে মহাসমারোহে টেবিল, কিচেন কাউন্টার, দরজার হাতল আর সুইচ বোর্ড মুছি ব্যাকটেরিয়ানাশক স্প্রে দিয়ে। ঢাকায় আমার বাবা-মাকে জানাইনি যে, আমি বাড়ির বাইরে আইসোলেশনে আছি। অযথা দুশ্চিন্তা করবে। আমি তো ঠিক আছি। ভালো আছি তো।

কাল থেকে আমাদের শহরে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, যদিও স্কুল খোলা থাকবে- আর খোলা থাকবে ফার্মাসি, মুদি দোকান ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন জাতির উদ্দেশে তাঁর দ্বিতীয় কি তৃতীয় ভাষণ দিলেন; মহামারির সময়ে সিডনির সমুদ্রসৈকত ভর্তি করে মাস্তি করতে থাকা জনতার কথা ভেবেই নাকি কে জানে, সোশ্যাল আইসোলেশন নিয়ে জাতিকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। আমি ভাবলাম, বেশ হয়েছে, ওই বিচ সর্বসাধারণের জন্য অগম্য করে দেওয়া হোক। ওয়াসি বলল, তাই নাকি করা হয়েছে। টিভিতে দেখাল কোথায় যেন দেয়ালে গ্রাফিতি করা হয়েছে, 'ওয়াশ ইউর হ্যান্ডস লাইক লেডি ম্যাকবেথ'। কী বুদ্ধিদীপ্ত আর লাগসই কথা! গত দেড় সপ্তাহ ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে আমাদের (সকলের নয়)। যারা রেস্টুরেন্ট বা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে অর্থাৎ ক্যাজুয়াল বা খণ্ডকালীন। কাস্টমার কম হওয়া, অর্ডার ক্যানসেল হওয়া ইত্যাদি কারণে তাদের অনেকেরই শিফট কমতে কমতে প্রায় নেই হয়ে গেছে।

'ইউকে যেইটা করছে, সেইটা কিন্তু খুব ভালো পদক্ষেপ, বুঝলা ভাতিজা?' হিউ বলল, আমাদের কনফারেন্স কলে। এই বুধবার এবং সামনে আরও আরও অনেক বুধবার, আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ, খাওয়া-দাওয়া, বাকবিতণ্ডা হবে না- শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন হাগ দেওয়ার বদলে কনুইয়ে কনুই ছুঁইয়েছি একে অন্যের- তাই রিচার্ডের বুদ্ধিতে আমরা প্রতি সপ্তাহে আধা ঘণ্টামতো ভিডিও কল করব বলে ঠিক করেছি।

'হ, তা ঠিক। কোম্পানিগুলারে বরিস জনসন বলছে, সামনে যেই অর্থনৈতিক মন্দা আসতেছে- তোমরা যদি লোক-ছাঁটাই না কর, তাইলে ইনসেনটিভ হিসাবে মোট বেতনের ৮০% সরকার দিয়া দিবে। ব্যাপারটা কিন্তু ভালো।'

'আমাদের অস্ট্রেলিয়ার স্টিমুলাস প্যাকেজও মন্দ কী? কেউ বেকার হয়ে গেলে রেগুলার বেকার ভাতার দ্বিগুণ টাকা পাবে। তাও আবার নিঃশর্ত। কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া ঠেকানোর জন্যও ভর্তুকি দেওয়া হবে। ছিষট্টি বিলিয়ন ডলার আলাদা করে রাখা হইছে সরকারি কোষাগার থেকে।' রিচার্ড বলল মনে হয়; নাকি সুজয় বলল?

'আহারে, অবস্থা যে কী ভয়াবহ হইতে যাইতেছে। এক এয়ারলাইন কোম্পানিই বিশ হাজার লোকরে খালি হাতে বাড়িতে পাঠাইছে গতকালকে'; বলছে 'ক্রাইসিস শেষ হইলে আবার ডাকব তুমাদেরকে'। এইটা একটা কথা হইল? যেইখানে সিইও একাই বছরে সাত মিলিয়ন ডলার কামায়!', আমি বললাম। আমার বলতে ইচ্ছা করল না আমার দেশে কতগুলো মানুষ পথে বসবে, কতজন খেতে না পেয়ে মরবে, কতগুলো পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে আর্থিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখবে, আর তার আগে রোগ-নিয়ন্ত্রণের লাগাতার অব্যবস্থাপনা আর সরকারের ব্যর্থতায় কতগুলো জীবন বিনা চিকিৎসায় মরণসাগরে হারিয়ে যাবে। (আমি তো মনেপ্রাণে কসমোপলিটান- মানবিক ক্ষতি আর বেদনার জায়গায় কি জাতে-জাতে তুলনা চলে?)

'এতগুলা লোকরে বিদায় করল- এইটা খারাপই হইছে। আমার অবশ্য খুব ভাল্লাগছে এই লকডাউনে ক্যাসিনোগুলা বন্ধ হইছে ফাইনালি, ঐজন্য। আশ্চর্য- শ'খানেক লোক একত্রে জড়ো হইতেছে জুয়া খেলতে- আর এইটা বন্ধ করতে এতদিন লাগল সরকারের? মানে, এই ক্যাসিনোর মালিক মাফিয়াগুলা যে কী চাপের উপ্রে রাখে গভমেন্টরে, বুঝা যায়। জেমস্‌ প্যাকার (ক্রাউন ক্যাসিনোর মালিক) তো মনে হয় অ্যাডমিনিস্ট্রেশনরে ওর চাকর বানায়া রাখছে।'

'তোমার বাপ-মা-ভাইয়ের কী খবর বর্ণালী? সবাই বাসায় বসে আছে তো? ওদের কি লকডাউন দিছে? ঐদিন দেখলাম বাংলাদেশে কোন্‌ জায়গায় জানি লাখ-লাখ মানুষ অ্যান্টি-করোনাভাইরাস প্রেয়ারের জন্য জমায়েত হইছে। প্লিজ বলো যে ঐটা তোমার শহর না।'

'আরে বইলো না। আমাদের দেশের হালুয়া-টাইট অবস্থা। কোথা থেকে শুরু করে কোথায় শেষ করব জানি না।'

'ডেথ তো দেখলাম এখনও বেশি না ঐখানে। নাকি ঐটা সরকারি হিসাব? এমনও হইতে পারে যে টেস্ট করা হয় না, তাই কেউ মরলেও ধরে নেওয়া হবে স্বাভাবিক মৃত্যু। ব্যাপারটা কি এমন?'

আমি কিছু বললাম না। গত সপ্তাহ থেকে একটা ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে দিন কাটিয়েছি। আমার ভালোবাসার মানুষগুলো সব দেশে থাকে। ওদের জন্য ভয়ে, উদ্বেগে, আশঙ্কায়- আর এত দূর থেকে সঠিক তথ্যের অপ্রতুলতার অনিশ্চয়তায়- জীবন বিষময় হয়ে উঠেছে। গৃহবন্দি অবস্থায় প্রায় প্রতিদিন সময় দিতাম মেলবোর্ন টু ঢাকা বিরতিহীন মেসেজিং এবং ফোনকলে। সেলফ-কোয়ারেন্টান নিয়ে আমার দড়ি ছেঁড়া গরুর মতো অবোধ বন্ধুবান্ধব আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দরকষাকষি করতে করতে আমি ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত- আগের দিন বিকালের দিকে এমনকি শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করছিলাম। ফেসবুকজুড়ে শুধু রেকলেস জনসমাগমের চিত্র, রোগ থেকে বাঁচার জন্য খতম-এ-শেফার ছবি, নগরপিতার নেতৃত্বে কয়েকশ' জনতার জন্য হাত ধোয়ার বিশেষ প্রদর্শনী; অফিস-আদালতে বিজনেস অ্যাজ ইউজ্যুয়াল, জনমনে ছুটির আমেজ, আতশবাজি কিংবা নদীতীরে সূর্যাস্ত ও তার সঙ্গে সেলফি। এদিকে আমার বাড়ির সামনের রাস্তা অ্যালবিয়ন স্ট্রিট, যেখানে ভোর থেকে রাত বারটা-একটা পর্যন্ত জমজমাট ভিড় থাকে, এখন প্রতিদিনই দিনদুপুরে সুনসান। দোকানপাটে কবরের নীরবতা। পিক-আওয়ারে হাইওয়েতে যতদূর চোখ যায়, একটাও গাড়ি নেই। প্রবাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত কত রকম নিঃসঙ্গতা, বৈষয়িক ভোগান্তি আর বিচ্ছেদবেদনার সঙ্গেই না আমি পরিচিত- কিন্তু ঐসবের মাঝে এই গা-ছমছমে ডিজোন্যান্সের স্মৃতি সম্ভবত বিশেষ জায়গা পাবে।

'এই সোশ্যাল আইসোলেশনের সময়ে তোমাদের কার কী পল্গ্যান? আমি ভাবতেছি ডেরেন ব্রাউনের বইটা শেষ করব। এরকম সময়ে স্টইসিজমের ওপরে কথা নাই, বুঝলা? সবচাইতে প্র্যাকটিকাল ফিলসফি। মনরে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, মনরে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে', আমাদের সবার মধ্যে হিউ'ই বছরে সর্বাধিকবার মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। আমরা হাসলাম।

'আমার কাশি আর জ্বর কোনোভাবেই কমতেছে না। ভাবতেছি উইকএন্ডে একা একা ড্রাইভ করে ক্যাম্পিংয়ে যাব। তাঁবু খাটায়া নদীতীরে শুইয়া থাকব। এইটাই আমার প্ল্যান। জানোই তো আমি বাসা শেয়ার করি আরও চারজনের সঙ্গে- ওদেরকে আর ঝুঁকিতে ফেলা ঠিক হবে না', সুজয় বলল। এ রকম শহরে আমাদের মতো যাদের পরিবার-পরিজন নেই এবং পয়সা বাঁচানোর চাপ আছে, তাদের বাসসংস্থানের জন্য হাউসশেয়ার একটা জনপ্রিয় চল। একটা ভাড়াবাড়ি, তাতে মাথাপিছু একটা করে কয়েকজনের বেডরুম- যদিও রান্নাঘর, লিভিং রুম আর বাথরুম কমনই হয় বেশিরভাগ সময়- সকলে ভাগাভাগি করে ভাড়া মেটায়। অনেক প্রগতিশীল, পরিবেশসচেতন তরুণ-তরুণীরও এই ব্যবস্থাই পছন্দ- কারণ এতে অপচয় আর কার্বন ফুটপ্রিন্ট যেমন কমে, কমিউনিটি-লিভিং আর মানবিক সংস্পর্শ-সাহচর্যের চর্চাটাও প্রাত্যহিক জীবনাচরণের ভেতর চলে আসে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আইসোলেটেড সমাজব্যবস্থায় এই কমিউনিটির অনুভব অনেকের জন্যই একটা সর্বজনীনতার দুয়ার খুলে দেয়।

'কোন্‌দিকে ক্যাম্পিং করতে যাবা? ছবি পাঠায়ো। শারীরিক অবস্থার আপডেট দিও', আমি বললাম।

'যাব হইতেছে ডিচফিল্ড বা মুগওয়াম্পের দিকে। আচ্ছা দিবো নে'।

'আমার বাপ-মা গেছে ওয়াগা-ওয়াগা খালার বাড়ি বেড়াইতে। একটু চিন্তায় ছিলাম। একটু আগে আম্মা জানাইল তারা ভালোই আছে। খালাদের বাড়ি যেইখানে, ঐ জায়গাটা প্রায় পাণ্ডব-বর্জিত- গড-ফরসেকেন। ইনফেকশনের ভয় নাই। আব্বা নাকি চান্সে ডেইলি সাইকেল চালায়া পাহাড়ে উঠতেছে এই আশি বছর বয়সে। বুঝ! ওহ, আরও মজার কথা- ঐ এলাকার সুপারমার্কেটে টয়লেট পেপারের নাকি কোনো অভাব নাই', নিক বলল। ও আমাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। নিউজিল্যান্ডের ছেলে- ওর বাবার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। ওর বাবা আর ওর মধ্যে বয়সের ফারাক প্রায় পঞ্চাশ বছর। ও হাসতে হাসতে আমাদের বলে যে, ওর বাবা যখন ছোটবেলায় ওকে স্কুল থেকে আনতে যেত, ও ওর বন্ধুদেরকে বলত 'এইটা আমার দাদা'। ভদ্রলোকের জীবনে অভিজ্ঞতার অন্ত নাই- শুনেছি নিকের বাপ-চাচা ভিয়েতনাম যুদ্ধেও গিয়েছিলেন- যদিও এখন কিডনি আর আর্থরাইটিসের সমস্যায়, বয়সের ভারেও, স্বাস্থ্য ভগ্নপ্রায়। এই সময়ে ভাইরাস থেকে উনাকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে হবে।

'তো বাড়িত বাপ-মা নাই- তুমি তো স্বাধীন। কী করতেছ?'

'কালকে আমার পাড়ার দোস্তদের সঙ্গে শেষ মোলাকাতটা সারব। আবার কবে দেখা হয় কে জানে! ড্রেস কোড ঠিক হইছে হাওয়াইয়ান শার্ট, ফরমাল স্যুটের জ্যাকেট আর ফকিন্নি-টাইপ শর্টস। আমরা এইরকম সিলি কাজকাম করি। ছোটবেলার বন্ধু তো! তো আগামীকাল এই হাস্যকর পোশাকে করোনা বিয়ার সহযোগে শেষ ডিনার হবে আর কী।'

'হাত-টাত ধুইও, আর দূরে দূরে বইসো, নাকি ভাতিজা? আচ্ছা, ভালো কথা। আমারও টয়লেট পেপার কিনতে হবে। তোমরা কি জান সপ্তাহে কয়দিন স্টক নতুন কইরা আসে দোকানে?'

'আমার বাসার নিচের দোকানে প্রতি বুধ কি বিষ্যুদবার আসে শুনছি। তুমি বয়স্ক মানুষ- তুমি প্রায়োরিটি পাবা। এমনকি কিছু দোকানে তো প্রতিদিন সকালে এক ঘণ্টা শুধু বয়স্ক আর প্রতিবন্ধীদের ছাড়া কারও কেনাকাটা করার অনুমতিই নাই।'

'আরে, আমি এতও বয়স্ক না!', হিউ অযথাই বলে।



*

ÒWhat floor do you live on, On the third, you cannot imagine how grateful I am, Don’t thank me, today it’s you, Yes, you’re right, tomorrow it might be you. The elevator came to a halt, they stepped out on to the landing, Would you like me to help you open the door, Thanks, that’s something I think I can do for myself. He took from his pocket a small bunch of keys, felt them one by one along the serrated edge, and said, It must be this one, and feeling for the keyhole with the fingertips of his left hand, he tried to open the door. It isn’t this one, Let me have a look, I’ll help you. The door opened at the third attempt.Ó


করোনাভাইরাসের আক্রমণের পর হোসে সারামাগোর লেখা উপন্যাস 'ব্লাইন্ডনেস' নাকি আজকাল অনেকেই পড়ছেন। আমি পড়েছিলাম বছর চারেক আগে (হক ভাই- সিদ্ধার্থ হক- দিয়েছিলেন)- ইংরেজিতে লেখা উপরের প্যারাগ্রাফটা পর্তুগিজ নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের সেই উপন্যাসেরই একদম শুরুর দিকের অংশ। গল্পটা এমন : একটা জনপদে অন্ধত্ব একটা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকশ সংক্রমিত লোক চোখের সামনে একটা শাদা পর্দা ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না। এদের সবাইকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। সেই দলে থাকে এক ডাক্তার এবং তার বউ- ডাক্তার ভদ্রলোক অন্ধ হয়ে গেলেও কোনো এক রহস্যময় কারণে উনার বউয়ের দৃষ্টিশক্তি ঠিকই অক্ষুণ্ণ থাকে। কোয়ারেন্টাইনে থাকাকালীন যখন অভাব আর দুর্বিপাক নেমে আসে, তখন এই মানুষগুলো নিজ নিজ (এবং একে-অন্যের) অন্ধকার রূপের সঙ্গে পরিচিত হওয়া শুরু করে। ইতিপূর্বে তাদের রেখে আসা পরিবারগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে আপনজন, বাড়িঘর, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। অবশেষে এই সদ্য কোয়ারেন্টাইনমুক্ত কমিউনিটিটা ডাক্তারের বউয়ের নেতৃত্বে একটা নতুন পরিবার গড়ে তোলে। এদের নতুন ঠিকানা হয় ডাক্তারের বাড়ি। যেমন আচমকা এরা অন্ধ হয়ে গেছিল, তেমন অকস্মাৎই একদিন তারা তাদের দৃষ্টি ফিরে পায়। অন্ধত্বের সময়টা পেরিয়ে যায়। রয়ে যায় তাদের নবলব্ধ বোধ, মনুষ্যপ্রজাতির বিষয়ে তাদের নতুন অভিজ্ঞান এবং অন্ধত্বের সময়ে বিস্তার করা নতুন মানবিক কন্ট্রাক্টের নেটওয়ার্কগুলো- রূপান্তরিত, অস্থানিক মূলের মতো যা গজিয়েছে, আর বীভৎস সময়ের স্মৃতিতে দৃঢ়তর হয়েছে।

আমার বন্ধুরা- সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা আমার বন্ধুরা- গত কয়েকদিনে আর কী কী লিখেছে? মনে করতে চেষ্টা করি।

আমেরিকা থেকে (শবনম) নাদিয়া আপুর মেসেজ : 'বর্ণালী, লকডাউনের জন্য ট্যাম্পন আর স্যানিটারি প্যাড কিনছ? ভুইলো না। আমরা মেয়েরা কিন্তু এইসব জরুরি জিনিস ভুইলা যাই।'

মেলবোর্নের সবুজ ভাইয়ের মেসেজ : 'শুনেন, অন্য সব জায়গার স্টক খালি। স্প্রিংভেইল যান। ভিয়েতনামিজ মার্কেট। ওইখানের ফার্মেসিতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাবেন। লিটার বোতল।'

ঢাকা থেকে রাইসুর মেসেজ : 'শিগগির একটা ভ্যাক্সিন আইসা পড়বে দেইখেন।'

আজ সকালে ফ্ল্যাটমেট শিবানী জানিয়েছে ওর জ্বর পড়ে গেছে। ডাক্তার তবু বলেছে, সাতদিন মতো বাড়িতে বিশ্রাম নিতে। ভাবছি কাল বা পরশু বাড়ি ফিরে যাব। ওয়াসির ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে মূল শহরের প্যানারমিক ভিউ দেখলাম। এই বাড়ির ঠিক এক ব্লক পরেই প্রাহরান টাউন হলের সনাতনী দালান, আর তার মার্কা মারা হলুদ ফাসাড, আর তার চূড়ায় সবুজ হয়ে যাওয়া কপারের ডোম। দালানের গায়ে বড় বড় হরফে লেখা, 'স্থাপিত : ১৮৬১'। া
 
মেলবোর্ন থেকে