কালের খেয়া

কালের খেয়া

এইসব নিরর্থক কথাবার্তা

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০

মুজিব ইরম

"সালাম জানিয়ে লেখা শুরু করিলাম। আদাবে প্রণামে গীত সুর ধরিলামবন্দনা করিতে চাই কী করিবো হায়। দেখিয়া মানব ঘৃণা কালিও শুকায়স্মরণে রাখিতে চাই আল্লা ভগবান। আরো আরো বহু নামে গাই জয়গানভিন্ন ভাষা ভিন্ন ডাক ভিন্ন তার রীতি। মূলত উদ্দেশ্য এক মানব পীরিতিএই ধরা মানবের মানবতা সার। মানবের মন ভজি ধর্ম যারতারমানবের নামে পালা শুরু করিলাম। ভালোবেসে মানুষের হাত ধরিলামআইসো আইসো সবে ভাইবন্ধুগণ। এই পদে হোক তবে মানুষ ভজনপৃথিবীর কতো রঙ কতো তার রূপ। সকলে বাসোরে ভালো মানব স্বরূপযে কথা লিখিয়া গেছে আমাদের কবি। উপরে মানুষ সত্য আর মিছে সবিপীর আউলিয়া আর সন্ন্যাসী বাউল। যে কথা গিয়াছে বলে কেনো করি ভুলএই পদ রচে যাই সহজ সরল। মানুষ ত্যাগুক নিজে মনের গরলএই পদ নয়া বলে করিও না ভুল। মানুষ ভুলেছে প্রেম ফুটিয়েছে হুলতাই এই পালা রচি পড়ি যথাতথা। কমুক কমুক দিলে জমে থাকা ব্যথা

পৃথিবীতে মারামারি কাটাকাটি দেখে। ইরমে মনের ব্যথা দুঃখ ক্ষোভ লেখেধর্মবর্ণ করে যারা মানু হত্যা করে। শত ঘৃণা শত ধিক তাহাদের তরে" (মানবের পালা/পয়ারপুস্তক)

'কালের খেয়া'র জন্যে করোনার দিনগুলি নিয়ে একটি লেখা লিখতে হবে। আজকেই। কিন্তু এই লেখাটি কিছুতেই আমি লিখতে পারছি না। শুরু করতে পারছি না। চার দিন থেকে চেষ্টা করছি। কিন্তু কী লিখবো, কী করে লিখবো! যেন আমি ভুলে গেছি কী করে লিখতে হয়। আমার হাত কাঁপছে, বুক কাঁপছে। মানুষের সমবেত কান্না কানে বাজছে সারাক্ষণ। এই লেখার প্রতিটি শব্দ যেন হয়ে উঠছে ভয়ার্ত মানুষের অসহায় মুখ। অথচ এই সেদিনও কী ঘোরের ভিতর ছিলাম, কী শব্দাক্রান্ত ছিলাম! বইমেলায় নতুন বই বের হলো। পয়ারপুস্তক। কী এক স্বপ্নের ভিতর কেটে গেলো দিন। মেলা শেষ হলো। মনে হলো বই বই করে কেটে গেছে আস্ত একটি মাস। এবার না হয় কবিতায় ফিরি। লেখালেখিতে ফিরি। লিখতে শুরু করি নতুন কবিতা। 'দেশি কবিতা'। অথচ সব ইচ্ছে অল্পতেই ভয়ে পরিণত হয়ে গেলো। মানুষের এই কান্নার দিনে, দমবন্ধ এই রোগগ্রস্ত দিনে কী করে লিখতে পারি নির্ভুল চরণ! সুখপাঠ্য রচনা! পুঁথি ও পয়ার! পৃথিবীর জন্যে ভয় হচ্ছে, মানুষের জন্যে ভয় হচ্ছে। ভয় হচ্ছে নিজের জন্যে, স্বজন পরিজনদের জন্যে। যেভাবে এক বিষণ্ণ ভোরে, বেদনা ও রাগের দিনে উপরের পয়ারটি লিখেছিলাম, মনটা সাময়িক শান্ত হয়েছিলো; সেভাবে যদি আরেকটি পয়ার লিখে মনটা আজ শান্ত করা যেতো! ভয় তাড়ানো যেতো! মানুষকে সাহস জোগানো যেতো! কিন্তু আমি তো জানি, এই অসহ্য কান্নার দিনে কবিতা কিছুই করতে পারবে না। আজ কী করে, কী দিয়ে লিখতে পারি মানুষের শুশ্রূষা? কী করে দিতে পারি ভয়ের দাওয়াই? তাই সুর কেটে যাচ্ছে। শব্দ-বাক্য ভুল হচ্ছে। অগোছালো হচ্ছে গদ্যের সুরত। তবু লিখছি এই লেখা। একদিন মানুষের জয় হবে। মানুষ আবার রোগশোক কাটিয়ে উঠবে। আর এই লেখাটি এই অস্থির সময়ের ভয় ও বেদনার দাগ নিয়ে 'কালের খেয়া'য় মুদ্রিত হয়ে থাকবে। সমস্ত ভয় ভুলে মানুষ আবার মানুষকে জড়িয়ে ধরবে। প্রেমে-কামে, আনন্দ-বেদনায়, শোকে-দুঃখে, জয়ে-পরাজয়ে। আমিও হয়তো লিখবো আবার নতুন পয়ার। আগের মতোই জপতে পারবো :

"ইরমের দিন যায় শব্দ শব্দ জপে। তুমি তারে তরায়িও তপে আর গপেসরলে গরল আর না যেন মিশাই। সহজিয়া রূপে যেন তোমারে সাজাইমূর্ত রূপে যেন আমি হাত ধরে থাকি। বিমূর্ত রূপের টান কেনো তবে আঁকিআমি তো পুরান লোক আবুতা বেবুতা। আমি তো তোমারে ভাবি জলের দেবতাআমি তো বেসরা লোক ঘিনপিত নাই। লোক মুখে কালি দিয়ে তুমি নাম গাইকলঙ্ক হয়েছে হোক মনে দুঃখ নাই। আমি যেন তুমি রঙ্গে পয়ার সাজাইমায়া করিও তুমি নিদানের কালে। খরস্রোতে পাড়ি দিতে পড়ি যদি জালেসাদাসিধা যেন থাকি যা বলুক লোকে। আলাভোলা মায়ামুখ থাকে যেন বুকে



ইরমে ধরেছে ভাব তোমারে চিনিয়া। বিনামূল্যে দিন শেষে নিও গো কিনিয়া" (পয়ার প্রণয়/পয়ারপুস্তক)



এই পর্যন্ত লিখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বিলাতের এই মধ্যভূমিতে বড়ো রোদ উঠেছে। পরদেশি রোদ। ফর্সা দিন। কেটে যাচ্ছে শীত। বৃষ্টি বাদলা নেই। অথচ আমি বসে আছি ঘরে। এরকম দিনে দলে দলে বাইরে বেরিয়ে যাবার কথা। রাস্তাঘাট, পার্ক, রেস্টুরেন্ট, পাব, নাইট ক্লাবগুলো মানুষের উচ্ছ্বাসে গমগম করার কথা। অথচ মানুষ গৃহবন্দি। মানুষ যুদ্ধবন্দি। ভয়বন্দি। অদৃশ্য শত্রুকে দেখা যাচ্ছে না। তবু সে ধেয়ে আসছে। ঘোষণা করছে যুদ্ধ। মানুষ ভয় পাচ্ছে। কেউ কাউকে সাহস দিতে পারছে না। কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরছে না। স্পর্শ করছে না। মানুষ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। মানুষ পালাচ্ছে। চারপাশ মানুষশূন্য আজ। এই বিলাতে সব কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি অবস্থা চলছে। দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। মহামারি। ছড়িয়ে পড়ছে ভয়। মৃত্যু। অথচ বাইরে রোদ। বাইরে ফর্সা আকাশ। পাতাশূন্য গাছগুলো জেগে উঠছে। সবুজ হয়ে উঠছে চারপাশ। দেখতে না দেখতে ফুলে ফলে ভরে উঠছে। প্রকৃতি খুলে দিচ্ছে তার রূপের শরীর। এই রোদ আমাকে জানান দিচ্ছে, মানুষের ভয় নাই। এই মহামারির দিন শেষ হবে একদিন। জয় হবে মানুষের। মানবতার। বিজ্ঞানের। তবু আমি লিখতে পারি না কিছুই। লিখতে পারি না কবিতা। 'পয়ারপুস্তক' থেকে আমি তাই পড়তে থাকি :

"পয়ারে কি নিতে পারে বাদ প্রতিবাদ। পয়ারে কি দেয় মুছে বেদনা অগাধপয়ারে কি ধরে রাখে ভাতের বলক। পয়ারে কি দিতে পারে অন্নের ঝলকনিরন্নরে অন্ন দেয় শিশুমুখে দুধ। অভাবের ঘরে সে কি ফিরে আনে রোদএতো যুদ্ধ এতো ছল এতো যে দহন। তবুও তো আছে প্রেম ফুলে ভরা বনপয়ারে পারে না কিছু ভালোবাসা পারে। প্রেম দাও প্রেম দাও বলে যারেতারেআমিও তোমার কথা লিখে রাখি তাই। তোমারে লিখিলে ভাবি যুদ্ধটুদ্ধ নাইতোমারে লিখিলে দেখি শিশুমুখে হাসি। তোমারে রচিলে বুঝি আজো বেঁচে আছি

এ-মিনতি রাখো তুমি এ-মিনতি রাখো। রোগগ্রস্ত পৃথিবীতে শুশ্রূষা মাখোনিদানের কালে তুমি ইরমেরে দেখো। শত দুখে শত শোকে হাসিটুকু রেখো" (মিনতি পয়ার/পয়ারপুস্তক)

করোনার দিনগুলি নিয়ে আমি আর লিখতে পারি না। তাই নিজের পয়ার নিজেই পড়ি। নিজেকে নিজে অভয় দিই। ফেসবুক থেকে, টিভির সামনে থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখি। মঙ্গল কামনা করি। ভাবি, পৃথিবীতে কিছুই হচ্ছে না। হবে না। মানুষ অতীতেও সফল হয়েছে। এবারও হবে। তবু আমাকে একের পর এক দুঃসংবাদ শুনতে হয়, পড়তে হয়। প্রিয়জন মাহবুব আজীজ ইনবক্সে তাগাদা দেন। নিজেকে আমি জোর করে টেবিলে নিয়ে যাই। 'কালের খেয়া'র জন্যে লেখাটি জোর করে আজ শেষ করতে চাই। তবুও লেখাটি কিছুতেই এগিয়ে নিতে পারি না। কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো ধরা দেয় না। তবু আমি লেগে থাকি। অনেক দিন পর অন্তত জোর করে হলেও এই লেখাটি আমি শেষ করতে চাই। লেখাটির প্রতিটি শব্দ-বাক্যে নির্বাসনের দিনগুলি আমি ধরে রাখতে চাই। প্রতিটি সাদা স্থানে ভয় ও বেদনা রেখে দিতে চাই। লিখি আর 'পয়ারপুস্তক' পড়তে থাকি। কবিতাকে বলি, তুমি আসো। কান্না মুছে দাও। তাড়িয়ে দাও মারি ও মরক। বারবার অভয় দিই। তবুও কান্না বাড়ে। রোগ বাড়ে। অসহায়ত্ব বাড়ে। চারপাশে মৃত্যু আসে। আমি তাকে তাড়াতে চাই। কামনা করি মানুষের মঙ্গল হোক। মানুষের জয় হোক। দূর হোক ভয়। মারি ও মড়ক। ঘরে ঘরে ফিরে আসুক হাসি। ফিরে আসুক জড়াজড়ির দিন। মানুষে মানুষে গলাগলির দিন। প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের দিন। আর আমি নিজের পয়ার নিজেই পড়ি। মৃত্যুকে তাড়াই।

"আর আমি পাবো নি রে তার দরিশন। আর আমি পাবো নি রে বন্ধুয়া আপনতুমি নি আইবায় গো বাসনা থাকিতে। আমি নি বিকাবো বন্ধু নগদে বাকিতেআসিও আসিও বন্ধু থাকিতে পরান। শোনাবো বাসনা তাই বাঁধিয়াছি গানচরণ ফেলিতে বন্ধু যদি কষ্ট হয়। এ-দেহ বিছাই দিমু জানিও নিশ্চয়কী কহিবো দুঃখ আর কহন না যায়। যদি বন্ধু করো দয়া মনে শান্তি পায়কী বলিবো নয়া কথা কী বলিবো সত্য। রচিতে বন্ধুর গীত প্রেমে রই মত্তডাকাডাকি করি রোজ আধভাঙ্গা গীতে। আর নি আমারে দেখা দিবা আচম্বিতেবন্ধু নি আমারে নিবা প্রশান্ত নিবাসে। বন্ধু নি আমারে নিবা শান্ত দীর্ঘশ্বাসেদিবা দেখা মনে আশা সময় কাটাই। বেলাজ বেসুরা দোঁহা বন্ধুরে পাঠাইলিখে যাই পাঁচ বেলা দয়ামায়া কাম। পাবো বলে মনে লয় বন্ধুয়া-মোকাম

ইরমে বন্ধুরে ডাকে আদরে দরদে। বন্ধু নি আমার হৈবা নিদয়া জগতে" (গীতচিন্তামণি/পয়ারপুস্তক)

ইতি

মানবমঙ্গল

করোনার দিনগুলিতে এই সব নিরর্থক কথাবার্তা। া
 
লন্ডন থেকে