কালের খেয়া

কালের খেয়া


প্রথম ঢেউ

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০     আপডেট: ২৬ জুন ২০২০      

বর্ণালী সাহা

শামীম হারামজাদার চোখ দুইটা নিরেট। তাতে দশ মিনিট আগেও কোনোরকম অনুশোচনা ছিল না। গ্রিন রোডে ওর খালার বাসা থেকে প্রায় ঘাড় ধরে ওকে গাড়িতে উঠিয়েছি। ওর দুঃসাহস কী! সিঁড়িঘর থেকে সাদা লুঙ্গিতে পেঁচিয়ে কী যেন একটা নিয়ে এসে বলে, গাড়ির ডিকিতে তোল! কী ওইটা? করাত। অ্যাঁ? করাত। করাত চিনস না? কাঁঠালবাগান হইয়া যাইতে হইব একটু; এইটা ফিরত দিতে হইব। না, ওইসব হবে না। শহরের এই অবস্থায়... আরে, তোল তোল। কিছু হইব না। শামীম, এইটা দিয়া কী করছস? ব্যারিকেড; ব্যারিকেড দিছি। মানে করাত দিয়া না। গাছ দিয়া। শামীম হাসে নাই; আমার গতানুগতিক উদাসীনতা ও স্বার্থপরতা নিয়ে বরাবরের মতো 'পোকার-ফেস' বানিয়ে বিদ্রুপ করেছে-পরিস্কার। আমিও আজকে ছাড়লাম না; হারামজাদাকে খুঁজতে সারাদিন কম নাকাল হতে হয় নাই। আর কিছু উঠাইবি না গাড়িতে? স্টেনগান কিংবা গ্রেনেড? বাঁশ কিংবা টেঁটা? এক কাম করি! আওলাদ হোসেন মার্কেট থেইকা কয়টা ঠেলাগাড়ি উঠাইয়া লইয়া যাই ডিকিতে, আরও কয়টা ব্যারিকেড দিতে পারবি। শামীম কিছু বলল না; ওর চোখও কখনও কিছু বলে না। কিন্তু ফার্মগেটের কাছ থেকে লোক দুইটা গাড়িতে ওঠার পর ওর চোখে প্রথমবারের মতো আমি মৃত্যুভয় দেখলাম। ও-ও কি তেমন কিছু দেখেছে আমার চোখে? আমি যদিও কারও দিকেই তাকাচ্ছি না; ওদের কথামতো গাড়ি চালাচ্ছি। আমার চোখ সামনের দিকে।

আলিয়া মাদ্রাসা? ক্যালকাটা? গায়ে কেরোসিনের গন্ধওয়ালা লোকটা পেছনের সিট থেকে পশ্চিমা টানে জিজ্ঞেস করল।

নো নো। আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি। ইউপি। ইন্ডিয়া। আমি অমায়িক গলা করে বললাম। আমার আব্বা আলিগড়ের ছাত্র ছিল, তাই শুনে লোকটার মুখে কেমন একটা কিন্তু-কিন্তু লেগে রইল। হয়তো ইন্ডিয়াতে কোনো মুসলিম ইউনিভার্সিটি আছে, সেই তথ্যটাই তার মগজে সইছিল না। যদিও লোকটা যথাবিহিত পেশাদার। ভোক্সওয়াগন দেখে শুরুতেই বুঝেছে আমলার গাড়ি। জানতে চাইল আমার আব্বা বনানীতে কবে প্লট পেয়েছেন। জানতে চাইল আজিমপুরের সরকারি আবাসন ছেড়ে নতুন বাসায় আমরা কোন মাসের কত তারিখে উঠেছি। কেরোসিনের গন্ধওয়ালা লোকটা তারপর আব্বার ব্যাপারে বিশেষ কিছু আর জিজ্ঞেস করল না। জানতে চাইল শামীমের আব্বা কী করেন। আমি ইংরেজিতে বললাম, উনি আর্মিতে মেজর ছিলেন। আর্মস অ্যামিউনিশন। চৌষট্টি সনে রিটায়ারমেন্টে গেছেন। ক্যান্টনমেন্টে, মানে কচুক্ষেতে বাসা। সেই বাসায় শামীমকে নামিয়ে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরব তেমন পরিকল্পনা ছিল আমাদের, বললাম।

আই অ্যাম শিওর দিস আর্মি ম্যান ওয়জ নট এজুকেটেড ইন কলকাত্তা! ত-য় ত-য় সংযুক্ত অক্ষরটা বড় করে উচ্চারণ করল অন্য লোকটা। তারপর দুইজনই হাসতে লাগল। এরা গোয়েন্দা না হয়ে যায়ই না। আর্মড ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স। অন্য লোকটা মনে হয় পাঞ্জাবি। সেদ্ধ টমেটোর মতো মুখ। এর জামায়ও কেরোসিনের গন্ধ। কেন? সহিংসতার আগুনে সৈনিক জ্বালানির মতো নিজেকে অর্পণ করে, সেইজন্য?

গাড়িতে ওঠার পর ফার্মগেট ইস্তক শামীমের সাথে গজগজ করছিলাম আমি। কিসের কাঁঠালবাগান? ওর বাপ না-হয় ঠান্ডা ইংরেজিতে দুই বাক্যে সারবে, কিন্তু আমার কী হবে? এত রাত করে কচুক্ষেত গিয়ে- বিপদের তো হাত-পা নাই- শামীমকে বাসায় নামিয়ে তারপর আমার বাড়ি ফিরতে রাত কত হবে ওর হিসাব আছে? আর রাতটা কেমন গা ছমছমে সেটা কি সে একবার দেখবে না? খেঁকিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম- এমন সময় রিয়ারভিউ মিররে দেখলাম আমাদেরকে একটা জিপ ফলো করছে। শেষে ফার্মগেট পুলিশ বক্সের কাছে আমাদের থামানো হলো।

'কলকাত্তা' নিয়ে এদের রগড় থামল না। জাস্ট ইম্যাজিন, বেহ্‌রুজ। ক্লোজ ইয়োর আইজ, অ্যান্ড ইম্যাজিন, সেদ্ধ টমেটোকে বলল কেরোসিনের চুলা। বলল চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে যে ভারত আর ইস্ট পাকিস্তান সীমান্তের আকাশে বিমান। গোলাগুলি চলছে। বোমা পড়ছে। কলকাত্তার দুবলা বাঙ্গালিলোগ একে একে আমাদের তাবাহ্‌ করে দিচ্ছে। হেসো না দোস্ত। হেসো না বেহ্‌রুজ। হি হি। স্যরি।

আমি জোর করে জোরে জোরে হাসলাম। তাতে পেছনের সিটে বসা ওরা আশ্বস্ত হলো। ওদের হাসির রেশ কোমল হয়ে ধীরে মিলিয়ে গেল। 'আহ্‌, বেহ্‌রুজ', নরম করে বলল কেরোসিনের চুলা, তারপর আলগোছে হাসি সামলে নিল।

বেহ্‌রুজ নামটা শুনে মনে পড়ল শিরিনের ভাইয়ের নামও ছিল বেহ্‌রুজ। জিন্নাহ অ্যাভিনিউতে ছিল শিরিনের ভাইয়ের অফিস। সেই ব্যবসা এখনও টিকে আছে কিনা কে জানে? শিরিনও যে এখন কেমন আছে আল্লাহ্‌ জানেন। কার খবর কে রাখে? কলেজে বুড়াভাইয়ের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে শেষদিকে বাধ্য হয়ে নেকাব ধরেছিল শিরিন; তাতেও শেষরক্ষা হয় নাই। বুড়াভাই তো লিডারের ছেলে- সহিংস না হয়েও প্রতিহিংস্র কীভাবে হতে হয়, তার ভালোই জানা। শিরিনরা থাকত বেলালাবাদ কলোনি। শিরিনের বাবার দিকের আত্মীয়রা বংশপরম্পরায় গুজরাটের খানদানি ব্যবসায়ী, আর শিরিনের মা সিলেটি। উনি আবার ওর বাপের দ্বিতীয় বউ। শিরিন সিলেটি বলতে- হয়তো লিখতেও- পারতো। সাতষট্টির পর থেকে ওদের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসায় মন্দা লাগে। বছর দুয়েক আগে কলেজে শিরিনের জীবনে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ানক ঘটনার পর আমরা সবাই যখন ওদের বাড়িতে গেছিলাম- সাথে বুড়াভাইও গেছিল মাফ চাইতে- সেই সময় শিরিনের ভাইকে শেষবার দেখি আমরা। মাজাভাঙা অসুস্থ ঘোড়াকে যেমন মশা ঘিরে ধরে- একবার দেখেছিলাম তেমন ঘোড়া, রেসকোর্সের রাস্তায়- সেইরকম দেখতে লাগছিল উনাকে উনাদের বাড়ির বসার ঘরে। সন্ধ্যা নামি-নামি করছিল; বসার ঘরে বাতি ছিল না। একটা জানালার পাল্লায় লাগানো মশার নেট মাঝবরাবর গোলমতনভাবে ছিঁড়ে গিয়েছিল, আর জানালার হাঁ-করা মুখের ভেতর দিয়ে মশা ঢুকে যাচ্ছিল ঝাঁকে ঝাঁকে।

সেদ্ধ টমেটো আমার কাছে পানি খেতে চাইল। তারপর বলল গতকাল সন্ধ্যায় আরেক বাঙালি মেজরের ছেলের সাথে নাকি তাদের 'এনকাউন্টার' হয়েছে। সেই ছেলের নাম নাকি সুলতান। তেজগাঁও কলেজে পড়ত। 'বাগাওয়াটি' কাজকর্মের সাথে জড়িত ছিল। এর আগেও হাতাহাতি আর টুকরো-টাকরা সংঘর্ষে অভিযুক্তদের খাতায় ওর নাম উঠেছে। ওর বাবা 'আন্ডারটেকিং' দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে বহুবার। লিডারের ছেলের সাথেও এই সুলতানের দারুণ মাখামাখি ছিল নাকি। যদিও লিডারের ছেলে এখন পলাতক।

আমি আড়চোখে শামীমকে দেখলাম। শামীমের ট্র্যাক- রেকর্ডও তো ভালো নয়। ইলেকশনের সময় আদমজী কলেজ কেন্দ্রেই না ভোট দেওয়া নিয়ে মিলিটারির কার সাথে হাতাহাতি করল? সিপাহি থেকে হাবিলদার- কচুক্ষেত বাজারে কে ওর হাতে নাজেহাল হয় নাই? ওরা নাকি খেয়ে পয়সা দিত না। মাংস-মুরগি-ডিম উঠিয়ে নিয়ে চলে যেত। কলেজপাড়ায় বাঙালি মেয়েদের সাথে ওদের ভাষায় 'ছেড়খানি' করত। শামীমের রক্ত গরম।

সেদ্ধ টমেটো মোলায়েম কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে জানতে চাইল শামীম কেন কথা বলে না।

কথা যেহেতু বলে না, 'ইয়েহ্‌ জনাব' তাহলে নিশ্চয়ই গান গাইবে!- বলল কেরোসিনের চুলা। আমি নীরবে ড্রাইভ করতে করতে অর্থাৎ পূর্বনির্দেশিত সার্কিটে চক্কর কাটতে থাকলাম। পিআইএর নতুন বিল্ডিং পাঁচবার পেরিয়ে গেল। সুলতান নামের ছেলেটাকে কি শামীম চেনে? বুড়াভাইয়েরও কি খোঁজ করছে এরা? আমি তো জানি বুড়াভাই কোথায়। আমি তো জানি। দুপুর থেকে শামীমকে খুঁজতে খুঁজতে তার খবরও তো পেয়েছি। আমাদেরকে ওরা কী করবে? ধরে নিয়ে যাবে? তারপর টর্চার? ডিকি খুললেই তো আমরা ধরা পড়ে যাব। এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো হয় কী করলে? পালিয়ে যাব? গাড়ি রেখে জীবন নিয়ে ভাগব? রমনা পার হওয়ার সময় পালানোর কথা ভাবা উচিত ছিল কি? ওরা তো সশস্ত্র। গাড়ির দরজা খুলে আমি লাফিয়ে পড়ি যদি? তাহলে তো শামীমকে ওরা শেষ করে ফেলবে। মাথার ভেতর তখন আমার একটা ঠান্ডা কালো মেঝে- অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত- আর তার ওপর অজস্র মানুষের মাথার বাদামি খুলি নারকেলের মতো ফেটে পড়ছে, আর তার ভেতরকার জমাটবাঁধা ঘিলু আর জেলির মতো কালো রক্ত প্রথমে দিজ্ঞ্বিদিক ছড়িয়ে যাচ্ছে, তারপর কালো মেঝের সাথে কিলবিল করে একাঙ্গী হয়ে শেষে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কারা যেন বুড়িগঙ্গার পানি বড় বড় হোসপাইপ দিয়ে টেনে আনছে, আর মেঝেতে ঢালছে। সেই পানির রংও কালো।

কেরোসিনের চুলা আবারও গান শোনানোর আবদার করল। এইবার আদেশই করল আসলে। সাথে নিজেও খানিক গুনগুন করল। আমি শামীমের দিকে তাকালাম। শামীম আমাকে দেখল না। ওদের কথার উত্তরে বলল যে ও আলবত গান জানে। কী গান জানে শামীম? ঐ তো ছায়ানটে যেসব শেখায়? প্রভাত হিল্লোলে ভুলে, দিয়েছিলেম পাল তুলে? নাকি ঐটা? ভেসেছিলেম স্রোতের ভরে, একা ছিলেম কর্ণ ধরে? দুইটার মধ্যে কোনো একটা কি অতুলপ্রসাদের লেখা? হবে! পথের ধারে শিশুগাছে একদল বাদুড়, গাছের একটা কেন্দ্র থেকে হঠাৎ ছিটকে উড়ে গেল, যেন একটা বিস্টেম্ফারক ফুটল আর একটা মানুষের দেহ তাতে খণ্ডবিখণ্ড হলো, আর অংশগুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল ঊর্ধ্বাকাশে।

মেহেদি হাসান সাহেব নিজে গেয়েছেন এমন কিছু শোনাতে পারলে ভালো হয়, বলল কেরোসিনের চুলা। শামীম কিছুক্ষণ হাসিহাসি মুখে চুপ করে রইল। দশ সেকেন্ডে কেমন প্রস্তুতির চেহারা করে নিয়ে তারপর বলল, ও বাহাদুর শাহ জাফরের লেখা একটা কিছু গাইবে। পেছনের সিটে হর্ষধ্বনি উঠল।

শামীম গাইল, বাত করনি মুঝে মুশকিল কভি অ্যায়সি তো না থি। জ্যায়সি অব হ্যায় তেরি মেহফিল, কভি অ্যায়সি তো না থি। চশম-এ-কাতিল মেরি দুশমন থি হামেশা, লেকিন জ্যায়সে অব হো গয়ি কাতিল কভি অ্যায়সি তো না থি। প্রেয়সীর চোখ তো খুনে চোখ আর সেই চোখ তো আমার আজন্ম-শত্রু, কিন্তু আজ সেই চোখে যে খুন চেপেছে, তেমন তো আগে চাপে নাই! প্রেমের জোয়ারে ভাসালে দোঁহারে, বাঁধন খুলে দিলে, কিন্তু যে তীরে ভেড়ার তৃষ্ণা আজীবনের, সেই তীরের সন্ধান পাওয়া এত কঠিন, তা তো আগে জানা ছিল না!

এই গান আমার জানা নাই। শিরিন নিশ্চয়ই জানত। পেছনের সিটের ওরা বলল শরিক-এ-হায়াত ছবির গান। তিন বছর আগে নাকি রিলিজ পেয়েছে। ঐ ছবিতে নূর জেহানের গাওয়া একটা গানও নাকি ছিল। সেদ্ধ টমেটো এবার গুনগুন করল। তেরে লিয়ে, ও জানে-জাঁ, লাখোঁ সিতম উঠায়েঙ্গে। লোকটার গলা দরাজ না, কিন্তু সুর কায়েম করতে সচেষ্ট ছিল। গান শেষ হলো একটা গুনগুনে সুরে, তাই ঠিক কখন শেষ হলো বোঝা গেল না। যানহীন, জনহীন রাস্তা আর অস্ম্ফুট সুরের রসায়নে একটা প্রশান্ত ক্লান্তির মেঘ পেছনের সিটে থিতু হচ্ছিল কি? আমরা কি মুক্তি পাব?

পাব, না-চাইতেই জানাল সেদ্ধ টমেটো। তবে সেটা নিঃশর্ত নয়, বুঝলাম।

কেরোসিনের চুলা বলল গাড়ি ঘোরাতে। ক্যান্টনমেন্ট। তারপর আমাদের যার যার বাড়ি। তার গলা শুনে মনে হলো ঘুম পেয়েছে। 'ইওর ডিকশন...ইওর ডিকশন' শামীমের উর্দুর গালভরা তারিফ করল কেরোসিন চুলা।

এবার বল। সেদ্ধ টমেটোর কণ্ঠে বেসুর, সমাপনী প্রত্যয়।

ইকবাল হল। আমি নিচুগলায় বললাম।

সেখানে কে?

লিডারের ছেলে। যদি এতক্ষণে বুড়িগঙ্গার ওপারে চলে না-গিয়ে থাকে।

আচ্ছা।

শামীমের দিকে তাকানোর সাহস হলো না আমার। সেদ্ধ টমেটো আমার পরিত্রাণে এগিয়ে এল। শামীমকে বারবার বলতে লাগল, আর্মি অফিসার নেওয়ার সার্কুলার হবে সামনেই। ও যেন অবশ্যই অ্যাপ্লাই করে। একবার কমিশনড্‌ হয়ে গেলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। ফৌজি পরিবারে জন্ম নেওয়া মানে মহাজাগতিক জ্যাকপট হিট করা। এমন ব্রাইট নওজওয়ানকেই তো চায় পাকিস্তান! এই সুযোগ হেলায় হারানো ঠিক হবে না।

'ম্যাডনেস ইজ সামথিং রেয়ার ইন ইন্ডিভিজুয়ালস' সেদ্ধ টমেটো বলল। অর্থাৎ ব্যক্তি - মানে আমরা- নির্দোষ। ব্যক্তি নয় উন্মাদনার একক। উন্মাদনার আর উচ্ছৃঙ্খলতার অপরাধ করে গোষ্ঠী, দল, জাতি। এমনকি সময়। তাই সময়ের দোষে, গ্রহ-নক্ষত্রের দোষে, সঙ্গদোষে ব্যক্তিকে ভুগতে হয়। 'সাম ওয়েস্টার্ন ফিলোসফার' নাকি এই কথা বলেছেন। আমি ম্যাকিয়াভেলি পড়েছি কিনা, জানতে চাইল সেদ্ধ টমেটো।

ক্যান্টনমেন্টের আর্মি ব্যারিকেড পেরিয়ে কচুক্ষেত যাওয়া পর্যন্ত পথে কেউ কোনো কথা বলল না। রাস্তা ঝকঝকে। প্রত্যেকটা স্ট্রিট-লাইট জ্বলছে- অমঙ্গলের দিনে এ কেমন ষড়যন্ত্র- এরা কি আগেও এত কাছাকাছি জ্বলত?

পথে একটা কুকুর মরে পড়ে আছে- গাড়ির চাকায় পিষ্ট, কিন্তু অণ্ডথলিটা অক্ষত। চেষ্টা করেও মড়া কুকুরটাকে গাড়িচাপা দেওয়া এড়াতে পারলাম না। পেছনের চাকায় থেঁতলে গেল কুকুরটা। মাঝরাস্তা দখল করে পড়ে থাকা লাশটা এবার কেউ দেখলে কুকুর বলেই হয়তো চিনতে পারবে না। কচুক্ষেতে শামীমের বাসা চিনে নিল ওরা। ওদের জংলা সবুজ জিপ হাজির হলো। ওরা আমাদের গাড়ির ডিকি খুলল না। ওরা চলে গেল।

আমরা দুইজন গাড়ি থেকে নামলাম। শামীম রাস্তায় বসে পড়ল। ক্যান? ক্যান? শামীম করুণভাবে অদৃশ্য মাটি অদৃশ্য ঘাস খাবলে ধরল, আর চাষার মতো চাপাস্বরে আর্তনাদ করতে লাগল যাতে গৃহস্থবাড়ির কেউ না জাগে। বুড়াভাই... বুড়াভাই- শামীম কেমন ঘড়ঘড় করতে লাগল। শামীমের এই কুকুরের মতো প্রভুভক্তি দেখে আমার ঘেন্নায় চোখ সরিয়ে রাখতে হলো। কুকুরের লাশটা থেঁতলে গেছিল সেই দৃশ্যটা মনে পড়ল আর কেমন বমি উঠে আসতে লাগল। হারামজাদা, শিরিনরে তুই ভালোবাসিস নাই? তাইলে বুড়াভাইয়ের চেলাচামুণ্ডারা যেইদিন শিরিনরে উঠায়া নিয়া গিয়া ওর চুল কাইটা দিল- কই আছিলি তুই? শিরিন... শিরিন আমার বোনের মতো ছিল। হাঁটু পর্যন্ত চুল ছিল শিরিনের!

শিরিন? তোর বোন? মানে বুড়াভাই শিরিনের দখল নেওয়ার পরে তোর মতো বিচিছাড়া হিজড়াগুলা যেমন সবতে ডরে হ্যার ভাই হইয়া গেছিল, তেমন?- শামীম রাস্তায় থুথু ফেলল।

আমি গাড়ির চাকার পাশ থেকে একটা আধলা তুললাম। উবু থেকে আমার উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে এমন কিছু ছিল- শামীম আমার ওপর এক মুহূর্তে হামলে পড়ল। আমাকে মারতে নয়- থামাতে। শরীরের সমস্ত ওজন নিয়ে গাড়ির বনেটের ওপর হেলে পড়লাম আমরা। না-থামালে বুঝি মেরেই ফেলতাম শামীমকে আমি।

দোতলার বাতি জ্বলে উঠল। কান্নার বেগে আমি অবিবর্তিত বানরের মতো ঝুঁকে পড়ছিলাম। আমার খোলা কিন্তু বোবা মুখ থেকে লালা ঝরছিল।

শামীম আমার হাত থেকে আধলাটা প্রায় খামচে নিল। তারপর স্ট্রিটলাইটের দিকে সই করে মারল। কাচ ভাঙার শব্দে- অন্ধকারে নয়- পুরো পাড়া জেগে উঠল। া