কালের খেয়া

কালের খেয়া

আম্মার আন্দাজ, আব্বার আনা জিনিস

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২০

শামীম আজাদ

কে ছিলেন তিনি? যিনি আমাদের কাঁচাবাজারের পাশে বেজারমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন? থুতনিতে গুচ্ছদাড়িওলা ছোট্টখাটো মানুষ মনা ভাই না ভীষণ ফর্সা আফগানিদের মতো গাত্রবর্ণ কিন্তু ঢ্যাঙ্গা মন্তাজ ভাই? মনে করতে পারছি না। তবে যে গল্পটা করতে যাচ্ছি তা নারায়ণগঞ্জের হলে তিনি মনা ভাই হবেন। আর জামালপুরের হলে, মন্তাজ ভাই হবেন। কিন্তু ফেনীতে আমাদের কাঁচাবাজার যে কে করতেন তা একেবারেই মনে নেই। আব্বার বদলির চাকরি বিধায় বাংলাদেশের বেশ ক'টি মহকুমা শহরে থাকার কারণে বিভিন্নজন বিভিন্ন সময়ে আমাদের বাজার করেছেন। সেসব শহরে মেয়েরা বাজারে যেতেন না।

কিন্তু বাজার নিয়ে কম-বেশি একই কথা একই দৃশ্য দেখেছি। আজ লিখতে বসে মনে হচ্ছে তখন আমার বয়স যদি ১৩ বা ১৪ হয়, তবে আমরা এক রাস্তার ছোট্ট শহর জলিষুষ্ণ জামালপুরেই ছিলাম। আব্বা ঈদের বাজার আর কাঁচাবাজার করতেন আর্দালি ভাই। তবে কেবল ছুটির দিনেই আর্দালি ভাইদের পাওয়া যেত। বাকি ক'দিন ওরা আব্বার সঙ্গেই অফিস করতেন। অন্যান্য দিনে আব্বার পাঙ্খাপুলার, আমাদের গ্রামের ছেলে হরই যে আমাদের কাছেই থাকে সে অথবা আমার বড় ভাই শিবলী আম্মার দরকার মাত্র একদৌড়ে বাসার সীমানা-বেড়ার বাইরে হিমসাগর আমগাছের নিচের নান্নু ভাইর দোকান থেকে তা নিয়ে আসতো। বাজেট চার আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। ভাইয়া দোকানে গেলে কী করে যেন একটা কাঠি লজেন্স, স্বচ্ছ তালমিছরির টুকরো বা তিলের খাজা ম্যানেজ করতো! আল্লাহ মালুম।

তবে ঢাকার কথা ভিন্ন। কারণ আব্বা যখন সব শেষে ঢাকা সচিবালয়ে ফিরে এলেন আর আমরা ঢাকা সোবহানবাগে থাকতে শুরু করলাম, তখন মামাদের জন্য খাবার কিনে বিলেতে পাঠাতে হলে বা বাসায় ভোজ হলে রিকশা করে ঘরের সহকারীকে নিয়ে আম্মা বাজারে যেতেন। তিনি যেমন ভালো রান্না করতেন, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় রান্না রেসিপি লিখতেন, তেমনি তার ভালো বাজারের কিছু বিশেষ টিপসও ছিল।

এদিকে আমরা ছুটির দিন সকালে নিমের মাজনে দাঁত মেজে মুড়িমাখা ও চা বা দুধ খেয়ে পড়তে বসলে তিন মাইল প্যাডেল মেরে আসতেন আর্দালি মন্তাজ ভাই। তারপর আম্মার দেওয়া ফর্দ বুঝে নিয়ে নিয়ে বাজারে যেতেন। আম্মা বসে যেতেন আমাদের জন্য স্পেশাল রান্নায়।

বাজার নিয়ে যে দৃশ্যটি মনে পড়ছে তাতে মন্তাজ ভাই বাজার শেষে ফিরে এসেছেন। আম্মা হাতে বাজারের ফর্দের সঙ্গে বাজার মিলিয়ে নিচ্ছেন। জলিল কন্ট্রাক্টর চাচার ভাড়া বাড়ি, আমাদের টিনশেড রান্নাঘর। মাটির মেঝেতে বাঁশের কুলোয় একটি রূপবতী ইলিশ ও তার পাশে মাঝারি মাপের কিছু ফর্সা চিংড়ি পড়ে আছে। দু-একটা চিংড়ি নড়ছে। কিন্তু পেটের কাছটা গোলাপি ও পিঠের ওপরটা ইস্পাত সবুজ ইলিশটি নড়ছে না। ইহা ভালোই মৃত। আর পাশে মন্তাজ ভাই অপরাধীর মতো কোমরে হাত দিয়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুলোর সামনে ভাঁজ করা পুরোনো আজাদ পত্রিকার ওপর কিছু তাজা পুঁইশাক, কিছু মাঝারি মাপের আলু, গোটা বারো পটোল, কাঁচামরিচ ও কয়েকটা হাল্ক্কা বেগুনি পেঁয়াজ। আরও ছিল কাগজের প্যাকেটে সরু পাটের দড়ি দিয়ে বাঁধা পোয়াখানেক মসুর ডাল। আম্মার ফর্দে এক পোয়া বুটের ডাল, আধা সের আলু, একটি মাঝারি মাপের ইলিশ ছয় আনার মধ্যে এমন করেই লেখা থাকতো। আম্মার রাঙা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ও মুখাবয়বে বিরক্তি। তিনি সোনামুগ ভেজে সরু চাল দিয়ে ভুনা খিচুুড়ি রেঁধেছেন। তারপর টকটকে লাল শুকনো মরিচ, কাটা পেঁয়াজ ও বাগানের তাজা ধনেপাতা দিয়ে সরষের তেলে ডিম মামলেট করেছেন। রান্না ঘরে ফ্যান নেই তবু সে সুগন্ধ আমাদের পড়ার ঘর পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে ডাকার আগেই আমিও টেবিল পাততে উঠে এসেছি।

দেখি বেজার মুখে কোমরে হাত দিয়ে মন্তাজ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন।

-মন্তাজ, তুমি ইলিশ মাছটার কান উঠিয়ে লাল কিনা দেখেছিলে?

- জি আম্মা।

- কিন্তু মাছটা তো ঠিক আনো নাই।

-কী অইছে?

- তোমারে না সব সময়ে বলি ইলিশ মাছ বাইট্টা ও পেট মোটা দেখে কিনবে। তা হলে গায়ে গোস্ত হয় আর পেটে ডিম থাকে। এইটার কানের রক্ত খয়েরি হয়ে আছে! আর এটা তো ছয় আনা হবার কথা। আট আনা কেন?

- মাছ বেশি ছিল না। গুদারা ঘাটেই নাকি শেষ হয়্যা গেছে।

আম্মা তখন তার বাকি ফর্দ মেলাতে থাকেন। সেটারও একটা গল্প পরে বলছি।

তো ততদিনে বাজারে এক পয়সা, দশ পয়সা, পঞ্চাশ পয়সার মুদ্রা চালুর চেষ্টা চলছে। আমরা স্কুলে শিখছি ১ টাকা সমান ১০০ পয়সা, পঁচিশ পয়সা সমান সিকি বা চার আনা। কীভাবে যেন ওই ম্যাট্রিক সিস্টেমকেই অবজ্ঞা করে চলছে টাকা আনা পাই-এ বেচাকেনা।

মন্তাজ ভাইর একটা কালো র‌্যালি সাইকেল ছিল। ভাইয়া আর আমি দু'জনই ওটার ত্রিকোণ রডের মধ্যে পা ঢুকিয়ে কোমর বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে প্যাডেল মেরে সাইকেল চলানো শিখেছি। আর নিজেরা আছাড় খেয়ে সাইকেলটার অবস্থা কাহিল করেছি। সে সাইকেলের সিটের পেছনে কেমন ইঁদুর ধরার ফাঁদের মতো কালো টিন বা লোহার কেইসসহ ব্যাগেজ ক্যারিয়ার ছিল। আমার কনিষ্ঠ ভাই ওটার উপর বসে তার ছোট ছোট হাতে মন্তাজ ভাইর কোমর জড়িয়ে ধরতো। তিনি তাকে ঘুরিয়ে আনতেন। মন্তাজ ভাই রেল স্টেশনের কাছে সিংহযানির বা পাথালিয়া থেকে কাঁচাবাজার করে আনতেন। আর তারপর ফেরার পথে ঘুরে আবার বকুলতলা থেকে ইদ্রিস কসাইর দোকান থেকে গরুর মাংস কিনতেন। তার এই ডিট্যুরের কারণ আমাদের অ্যালসেশিয়ান কুকুর ম্যাক্সিম। সারা শহরে ওখানেই কুকুরের খাদ্য মাংস পাওয়া যেতো। তখন সে শহরে আর কারও কুকুর কেনা মাংস খেতো কিনা জানি না। কিন্তু চার আনায় যা কেনা যেতো তার অনেক কিছুই এখন মানুষও খেতে পায় না। গরুর ফ্যাপসা, ফুল্লা, ফেলনা গোস্ত ও হাড়ে প্রায় একটি বড় হাঁড়ি ভরে যেত। সেগুলোতে লবণ ছাড়া শুধু হলুদে সেদ্ধ দিয়ে রাখা হতো এবং প্রতিদিন তার কিছুটা নিয়ে চালের সঙ্গে সেদ্ধ করে একধরনের একটা খিচুড়ি দিয়ে পুরো সপ্তাহ চালিয়ে দেওয়া যেত। মাছ-মাংস সাইকেলের হ্যান্ডেলে ব্যাগে ঝুলে ঝুলে আসতো। আর সব শাকসবজি রঙিন ছবিওয়ালা চটের ব্যাগে বাঁধাছাদা হয়ে সাইকেলের পেছনে ওই লাগেজ ক্যারিয়ারে আটকে।

মন্তাজ ভাইর বাজেট ছিল দুই থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত। তাতেই কত কি যে বাসায় আসতো! ইলিশের মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যেতো চার আনায়। বাড়িতে কখনোই কোনো মাছ ও মুরগিওয়ালা আসতো না। মাঝারি মুরগি এক টাকা থেকে পাঁচ সিকেয় পাওয়া যেতো। পাঁচ সিকে মানে পাঁচটি সিকি। একটি সিকি সমান চার আনা বা পঁচিশ পয়সা। চিংড়ি সাইজ অনুযায়ী ভাগাপ্রতি এক থেকে দু' আনার মধ্যে হতো।

তো ততক্ষণে আমরা ভাইবোনেরা যখন সেই মামলেট ও খিচুড়ি খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছি, কিন্তু আম্মা তার ফর্দ হাতে নিয়েই মন্তাজ ভাইকে আবার ধরে পড়েন।

-পুঁইশাক এক আঁটি, ছোট আলু দুই পোয়া আনতে বলেছি।

- জি ওই তো।

- কিন্তু এক আঁটি পুঁই যখন এত ছোট দেখলে তখন দুইটা আনলে না কেন?

একটা তরকারির জন্য কতটা লাগে তার আন্দাজে তো কিনবে নাকি? আর আমি তোমাকে লিখে দিয়েছি দুই আনার মাঝারি মাপের চিংড়ি। তুমি নিয়া আসছো কুঁচো চিংড়ি।

- আম্মা আমরা এইডারে মাঝারি মাপ কই।

- কী আশ্চর্য, একটা আন্দাজ আছে না?

বিরক্ত হয়ে আম্মা তাঁর আন্দাজ নিয়ে পড়েন। আমরা খিচুড়ি খেতে থাকি। ছুটির দিনে আম্মার কত কাজ! টেবিলে ফিরে গজ গজ করতে থাকেন, মানুষের আন্দাজ না থাকলে যা হয়।

আজ ভাবি ১৯৮৯ সালে আম্মা, আনোয়ারা তরফদারের রন্ধন গ্রন্থ 'খাদ্যবিলাস' সম্পাদনা করার সময় তার রান্নার উপকরণে তিনি কখনোই ক'চামচ লবণ বা চিনি দিতে হবে তা না লিখে লিখতেন, 'আন্দাজ মতো'। আমি কিছুতেই তাঁর সেই আন্দাজের মাপ বের করতে পারিনি। বরং বিস্মিত হয়ে বলেছেন, কী বলিস মানুষের একটা আন্দাজ থাকবে না। আমি বুঝে নিয়েছি আম্মার ওই 'আন্দাজ'ও একটা মাপ যাকে আমরা পছন্দ মতো বা পরিমাণ মতো বলে থাকি।

একই ব্যাপার হয়েছে আম্মার ফর্দ নিয়ে আব্বা ঈদের বাজার করে আনলে। এটি তারও আগের ঘটনা। তখন আমরা ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ায় থাকি। আব্বা মহকুমা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। বছরে একবার তার ঢাকা সচিবালয়ে যেতে হতো। তখন তিনি ঢাকা থেকে আমাদের ঈদের জামাকাপড় নিয়ে ফিরতেন। আম্মা যথারীতি এক টুকরো কাগজে কোন কাপড় কয় গজ কিনবেন তা লিখে দিতেন। সেই কাপড়্‌গুলো এলে সাদা পানিতে ধুয়ে শুকাতে দিতেন। তারপর দু'জন মিলে পরামর্শ করে আমাদের মাপ অনুযায়ী আম্মার ডিজাইন মতো কেটে সিঙ্গার মেশিনে সেলাই করে বানিয়ে দিতেন।

মেয়েরা বাজার না করলে যা হয়। আমাদের কিছুই পছন্দ হয় না। তখন আব্বার ওপর শুধু আম্মা নয় আমরাও রাগ-অভিমান করেছি। আব্বা আমার জন্য হলদেটে একরঙা ফ্রকের কাপড় এনেছেন; কিন্তু সে সময় মেয়েরা নানা রঙের ছিটের জামা আর ছেলেরাই কেবল এক রঙের শার্ট পরতো। নরম লিনেনের সে কাপড় দেখে আমি উচ্চ স্বরে কাঁদতে শুরু করে দিলাম। আমার তখন মনে হচ্ছিল ঢাকা থেকে কেনার কি দরকার, যখন তা স্থানীয় কাপড়ের চেয়ে সুন্দর না হলো!

সে সময় মেয়েরা যাতে ঘরে বসে জামাকাপড় কিনতে পারে তাই মাথায় নানা রঙের ছাপা কাপড়ের গাঁট নিয়ে ফেরিওয়ালারা আসতো। মাথায় মোট বয়ে নিয়ে যেতো অল্প বয়সী মিন্ত্মি আর পেছনে পেছনে ছাতা মাথায় তার মালিক। নিরাক পরা দুপুর বেলা আমরা ক্লান্ত হাঁক শুনতে পেতাম- এ্যাই ছি...ট কাপড় ছি...ই..ই....ইট কাপড়। দাম গজপ্রতি পাঁচ সিকা থেকে দেড় টাকা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই কান্না ভুলে গেলাম দেখে যে, আব্বা আমাদের চার ভাইবোনের জন্য অনেক দামি নতুন একধরনের রাবারের স্যান্ডেল নিয়ে এসেছেন। উপরটা সাদা, পাশটা রঙিন এবং পুরু বিস্কুটের ভেতরের মতো। সেই সোলের মধ্যে তিনটা ফুটো। চারজনের চার রঙের আলাদা স্যান্ডেলস্ট্র্যাপ। ওই ফুটো তিনটিতে সাবান বা তেল লাগিয়ে পরে আব্বা এক বিশেষ কায়দায় স্ট্র্যাপগুলো ঢুকিয়ে আমাদের সামনেই ম্যাজিকের মতো চার জোড়া স্যান্ডেল বানিয়ে ফেললেন! বললেন, এর নাম স্পঞ্জের স্যান্ডেল। জাপান থেকে এসেছে। আমরা চার ভাইবোন তখন মহানন্দে সারা বাড়িময় হেঁটে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিলাম। আর আম্মা তার ফর্দ নিয়ে এবার আব্বার আনা জিনিসের সঙ্গে তা মিলাতে থাকলেন। া