কালের খেয়া

কালের খেয়া

তাঁর অনিঃশেষ যাত্রাপথে

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২০

শাহীন আখতার

এ তখনকার কথা, যখন গোলাপে সুবাস ছিল। যখন শিলাইদহের কুঠিবাড়ি আড়াল-করা ব্যাঙের ছাতার মতো টুরিস্ট লজগুলি গজায়নি। সকাল সকাল কুষ্টিয়া শহর থেকে নেমে শুস্ক গড়াই-এর তপ্ত বালু ঠেলে এগোচ্ছি। মাথার ওপর খরতাপ। খানিক পর পর বালুচেরা ক্ষীণ স্রোত। তাতে ঘন ঘন পা ডুবিয়ে স্যান্ডেল সাফ করে নিতে হচ্ছিল। তারপর কাপড়ের ধুলা ঝেড়ে ফের হাঁটা। এভাবে কায়ক্লেশে এ পাড়ে এসেই রিকশাভ্যান। মাটির রাস্তায় ঝাঁকুনি খেতে খেতে মনে হচ্ছিল জমিদারবাবু রবীন্দ্রনাথের মহলে ঢুকে পড়েছি। পথের মাসুল নেই, খাজনাপাতির বালাই নেই। বজরায় চেপে পদ্মায় ভেসে বেড়াও...

এমন এক আধা-জাগতিক আধা-কাল্পনিক জগতের বার্তা বয়ে আনে সম্ভবত শৈশবে পড়া রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রের পত্রগুচ্ছ। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ব্যতিরেকে এ অঞ্চলের পদ্মা যেন ভাবা যায় না- এ পুস্তকের সুবাদেই। 'ইন্দ্রের আছে ঐরাবত, আমার তেমন পদ্মা'- এটি ছিন্নপত্রে ব্যক্ত করা কবি ঠাকুরেরই উক্তি।

একবার আমরা শিলাইদহ থেকে যাব পাবনা। ঘাটে এসে মনে হলো এক অচিহ্নিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। নদী আছে ঢেউ নেই। দূরে দূরে ধূসর বালুর পাহাড় রোদ পড়ে চিকচিক করছে। এ তল্লাটে রবীন্দ্রনাথের ঘন ঘন আনাগোনা ছিল জমিদারি পরিদর্শন উপলক্ষে ১৮৮৯ সাল থেকে প্রায় বারো-তেরো বছর। আমাদের চোখের সামনেই কত খরস্রোতা নদী বালুচরে পথ হারাল! এ তো এক শতাধিক বছর আগের কাহিনি। সেদিন যোজন পথ পাড়ি দিয়ে ঘণ্টা তিনেক পর আমাদের ভটভটি নোঙর ফেলেছিল পাবনার ঘাটে।

তবে কুঠি, পুরনো কেল্লা, জাদুঘরের দেখভালের দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদের বেলায় দেখেছি সময়ের কোনো গাছপাথর থাকে না। সেইবার শিলাইদহের এক বৃদ্ধ মালী তারে পেঁচিয়ে এক গুচ্ছ গোলাপ দিয়েছিলেন। কেমন নেশা ধরা মিষ্টি ঘ্রাণ। সঙ্গী-সাথিরা নিচে। আমি তখন কুঠিবাড়ির ছাদ থেকে জোড়া প্যাঁচা দেখতে ব্যস্ত। মালী বললেন, রবিঠাকুরের আমলেও এ আমগাছের ডাল থেকে প্যাঁচা জোড়া ফটফটিয়ে চেয়ে থাকত। কী আজগুবি কথা! প্যাঁচা একশ'-দেড়শ' বছর বাঁচে? বাঁচেও যদি এই সেই প্যাঁচা, তিনি জানলেন কী করে? আজ্ঞে, না জানলেও বলা যায়। আচমকা শরীরটা আমার কেমন ভার ভার ঠেকে। ফুলের তোড়া হাতে দ্রুত ছাদের কিনার থেকে সরে আসি। মণিহারা জাতীয় অশরীরী গল্পগুলি যতদূর জানি, কবি এ মনজিলে বসে লেখেননি।

এবার 'ছিন্নপত্র'র প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এ গ্রন্থের পত্রাবলি [আটখানা ছাড়া] আদিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে [১৮৭৩-১৯৬০] লিখেছিলেন। এর সিংহভাগই শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরে বজরায় ভাসতে ভাসতে লেখা। এ সম্পর্কে কবির কবুলতি, 'তখন আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম বাংলার পল্লীতে পল্লীতে, আমার পথ-চলা মনে সেই-সকল গ্রামদৃশ্যের নানা নতুন পরিচয় ক্ষণে ক্ষণে চমক লাগাচ্ছিল; তখনি তখনি তাই প্রতিফলিত হচ্ছিল চিঠিতে।' এ চিঠিগুলি স্বহস্তে অনুলিপি করে ইন্দিরা দেবী ফেরত দিয়েছিলেন রবিকাকে। অনুলিপির সময় তিনি নিজেও কিছু বাদসাদ দিয়েছেন। তারপর কবিগুরুর হাতে যথেষ্ট পরিবর্জন ও সংশোধনের পর পুস্তকাকারে 'ছিন্নপত্র' বেরোয় ১৯১২ সালে।



২.

'ছিন্নপত্র'র চিঠিগুলি পড়লে মনে হয়, এ যেন অনিঃশেষ নৌভ্রমণ। বজরার জানালার খড়খড়ি তুলে জমিদারবাবু নদীর শোভা দেখছেন। কখনও জলের গায়ে রৌদ্র-মেঘের খেলা, পাখির ডানা-ঝাপটানি, আচমকা ঝড়ের তাণ্ডব। নদীকূলের জনজীবন চলন্ত বোটের পাশ দিয়ে সরে সরে যায়। যা মনে গেঁথে থাকে, তা দিয়ে কবিতা হবে, গান-গল্প-নাটক হবে। এ হলো এক দিক। আদতে জমিদারি পরিদর্শন উপলক্ষে বাবু রবীন্দ্রনাথকে বাঙাল মুলল্গুকে এক রকম নির্বাসনই দিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সোমত্ত ছেলেদের বেলায় এটাই ছিল সেই আমলে জোড়াসাঁকোর বাড়ির দস্তুর। তারও আগে [২২ অগ্রহায়ণ ১২৯০] রবীন্দ্রনাথের বিয়ের মাত্র দু'দিন বাকি, মহর্ষি পুত্রকে নির্দেশ দিলেন- 'এইক্ষণে তুমি জমিদারির কার্য্য পর্য্যবেক্ষণ করিবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমত সদর কাছারিতে নিয়মিতভাবে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমাওয়াশিল বাকী ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তার সারমর্ম্ম নোট করিয়া রাখ।' অর্থাৎ বসে খাওয়ার দিন শেষ। এইবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। উক্ত দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথ কতখানি পালন করেছিলেন জানা যায় না। আসল দায়িত্বভার বর্তায় আরও কয়েক বছর পর। ততদিনে তাঁর দুটি সন্তান বেলা ও রথী। এবার জমিদারি পরিদর্শনে জোড়াসাঁকোর আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হলো। ১৮৮৯ সালের ২৫ নভেম্বর স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ তিনি যাত্রা করলেন শিলাইদহের উদ্দেশে। এসে উঠলেন পদ্মার ওপর বজরায়। সে সময়কার ছিন্নপত্রে আছে সন্ধ্যার মুখে বলেন্দ্রনাথসহ মেয়েদের [মৃণালিনী দেবী ও তাঁর সহচরী] পদ্মার চরে হারিয়ে যাওয়ায় এ নিয়ে বিস্তর ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি। অন্যত্র পাওয়া যায় ওখানে তাঁদের সময় কাটানোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ। সে সময় কয়েকজন লোকাল গায়ক রোজ বজরায় এসে গান শোনাতেন। দু'জন ছিলেন বাঁধা। কাঙাল হরিনাথের গান গাইতেন একজন। আরেকজন গায়ক নেড়ে, নাম সুনা-উল্লাহ, তিনি নানাপদের গান করতেন। তার মধ্যে গগন হরকরার কয়েকটি গান ছিল। রোজ দু'আনা বরাদ্দ ছিল সুনা-উল্লাহর। গানে মুগ্ধ হয়ে মৃণালিনী দেবী দিয়েছিলেন একখান শাড়ি আর তাঁর সহচরীর ফসফরিক সালসার একটি খালি বোতল। উল্লেখ্য, সুনা-উল্লাহর গাওয়া গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গানের সুর অবলম্বনে রবিঠাকুর রচেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।'

কুঠিবাড়ির তখনও হদিস নেই। তারও ইতিহাস আছে। আগে গড়াই ও পদ্মার মিলনস্থলে কোম্পানি আমলের একটি নীলকুঠিতে ছিল ঠাকুর-এস্টেটের কাছারিবাড়ি। পদ্মা এ দিকপানে ধাওয়া করলে নীলকুঠিটা আগেভাগে ভেঙে ফেলা হয়। আর এর মালমসলা দিয়ে দূরবর্তী স্থানে গড়া হয় আজকের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। ১৮৯৪ সালের ২৩ আগস্ট জোড়াসাঁকোর পাততাড়ি গুটিয়ে রবিবাবু সপরিবারে এসে ওঠেন ওখানে। এ পর্বে বিষয় ধরে ধরে পুত্র-কন্যার জন্য দেশি-বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ, পলু পোকার লালন-পালনসহ শিলাইদহে পুরোদস্তুর সংসার পেতে বসলেন রবীন্দ্রনাথ।

এর আগে খেপে খেপে তিনি জমিদারি পরিদর্শনে আসতেন। এ অঞ্চলে মাসাধিককাল তাঁর টানা থাকার নজির নেই। শিলাইদহ থেকে ইন্দিরা দেবীকে কবি লিখছেন, 'সবে দিন চারেক হলো এখানে এসেছি, কিন্তু মনে হয় যেন কতদিন আছি তার ঠিক নেই- মনে হচ্ছে আজই যদি যাই তা হলে যেন অনেক বিষয়ে অনেক পরিবর্তন দেখতে পাব... আসলে, কলকাতা থেকে এখানে এলে সময়টা চতুর্গুণ দীর্ঘ হয়ে আসে।'

এ নির্জন নদীকূলেও কিন্তু লেখার সময় নষ্ট করার আয়োজন-অনুষঙ্গের খামতি নাই। কাছারির আমলা, পাইক-প্যাদা তো আছেই অতিথি সমাগমেও সব ভুল হয়ে যাচ্ছিল। অতিথিরও রকমফের আছে। তার মধ্যে মুরগি, টিনের মাছ, সসেজ, শ্যাম্পেন ক্ল্যারেট, হুইস্কি সাবাড় করে দেওয়ার মতো ছিলেন কেউ কেউ। সে যাত্রায় এক ডেপুটিবাবু বেশ জমে গিয়েছিলেন। 'এখানে তাঁর আগমনে আমলা-প্রজারা মনের সন্তোষে আছে, মৌলবির তো কথাই নাই।'

এক রহস্যজনক চরিত্র এ মৌলবি। তিনি কুঠিবাড়ির কোনো কর্মচারীই হবেন। নাম-পরিচয় ব্যতিরেকে তাকে হঠাৎ হঠাৎ হাজির হতে দেখা যায়। অসম্ভব বাচাল বটেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে দেখলে মনে হয়, সে সময় শান্ত-সচ্ছল এক জনপদ ছিল পদ্মার তীর অঞ্চল। খুব বেশি হাঙ্গামা নেই। থাকলেও এ নিয়ে সরাসরি কথা নেই। তবে মানুষ যেখানে, ঝগড়া-ফ্যাসাদ না থেকে পারে না। এর সামান্য আভাস মেলে, রবীন্দ্রনাথ যখন বিচার-সালিশ না-পছন্দের কাজ বিবেচনা করে তা থেকে ইলাজের পথ খুঁজছেন, এমন এক সময় লেখা চিঠিতে। এসবের চেয়ে মনে হয় তখন অনাহূত মেহমানেরা তাকে বিরক্ত করেছে বেশি। 'এমনি আমি স্বভাবত অসভ্য- মানুষের ঘনিষ্ঠতা আমার পক্ষে নিতান্ত দুঃসহ।... বোধ হয় আমাকে সম্পূর্ণ বাদ দিলেও মনুষ্যসাধারণ ভালো ভালো সদবন্ধু খুঁজে পেতে পারবেন। তাঁদের সান্ত্বনার অভাব হবে না।' এ চাঁছাছোলা মনের ভাবটি ছিন্নপত্র প্রকাশকালে রবীন্দ্রনাথ কেটে বাদ দিয়েছেন।

লেখা বা চিন্তার মাঝখানে ব্যাঘাত, এ যেন বিধিলিখন, ছোট-বড় সবারই বরাতে জোটে। এ নিয়ে উষ্ফ্মা প্রকাশও বিচিত্র নয়। তবে আখেরি হিসাবে খাগের কলম আর সেরেস্তা কালিতে জমিদারির হিসাব-পত্তর যত লেখা হয়েছে, তার তুলনায় এ পর্বে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ভাণ্ডার উপচে পড়ার মতোই বিশাল। এর কিছু কিছু কবি স্বয়ং কবুল করে গেছেন।

হালে শিলাইদহ কুঠিবাড়ির এত নামডাক, তখন এর অস্তিত্বই ছিল না। ছিন্নপত্রর পাতায় আঁকা হয়েছে শাহজাদপুরের বাড়ির সৃষ্টি-অনুকূল এক মহৎ পরিবেশ। এ ছিল অনেকদিন বোটে ঘোরাঘুরির পর মাটিতে পা রাখার মতো কবির জন্য একটি জুৎসই আশ্রয়। চার-চারটি বিশাল ঘর, আলো-বাতাস খেলানো বড় বড় দরজা-জানালাসমেত এর খোলামেলা পরিসর তাকে বরাবর আপল্গুত করেছে। 'বিশেষত' রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে লিখছেন, 'এখানকার দুপুর বেলাকার মধ্যে একটা নিবিড় মোহ আছে। রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের- বিশেষত কাকের ডাক, এবং সুন্দর সুদীর্ঘ অবসর- সবসুদ্ধ আমাকে উদাস করে দেয়। কেন জানি নে মনে হয়, এইরকম সোনালি রৌদ্রে ভরা দুপুর বেলা দিয়ে আরব্য উপন্যাস তৈরি হয়েছে।'

শিলাইদহের ঘাটে বাঁধা বোটে বসে রবীন্দ্রনাথ 'এলিমেন্টস অব পলিটিকস' পড়ছেন। পড়তে পড়তে মনে হলো, বইয়ের কথাগুলি যেন জলের ওপর তেলের মতো এখানকার শান্ত-নিবিড় নিসর্গের ওপর ভাসছে। কদাচ মিশ খাওয়ার নয়। এই যে শান্ত নদী, উদাসী হাওয়া, অখণ্ড আকাশ, দুই কূলের অবিরল শান্তি, নিস্তব্ধতা- সব যেন বৈষ্ণব কবিদের ছোট ছোট পদ পড়ারই অনুকূল। আর লেখা যেতে পারে মেয়েলি রূপকথা, যা নদীর জলে গা ডুবিয়ে নারীকুলের কলকলানির মতো সহজ সুন্দর।

হঠাৎ হঠাৎ নদীকূলের কিছু কিছু মুখ কবির মনের মধ্যে বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। যা থেকে লেখা হয়েছে 'সমাপ্তি', 'ছুটি'র মতো গল্প। 'সমাপ্তি' গল্পের মৃন্ময়ীর নেপথ্যের কন্যাটি পয়লা দর্শনেই রবীন্দ্রনাথের নজর কাড়ে। ছেলেদের মতো ছোট করে চুল ছাঁটা, দেখতে বেশ কালো অথচ বেশ ভালো। সহজ, বুদ্ধিদীপ্ত, সপ্রতিভ চাহনি। ছেলে কোলে সে বজরার ওপর দণ্ডায়মান জমিদারবাবুকে নিঃসংকোচে নিরিখ করছিল। কবিরও ওর দিকে চেয়ে থেকে মনে হলো, 'ছেলেদের মতো আত্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন ভাব এবং তার সঙ্গে মাধুরী মিশে ভারি নতুন রকমের একটি মেয়ে তৈরি হয়েছে।'

'মেঘ ও রৌদ্র' গল্পের গিরিবালাও এ রকম পথে পাওয়া। তবে লেখার ব্যাঘাত ঘটানোর তো লোকের অভাব নেই! রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, 'সবেমাত্র পাঁচটি লাইন লিখেছি ... আমার বোটে আমলাবর্গের আগমন হল- তাতে করে সম্প্রতি গিরিবালাকে কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে হল। তা হোক, তবু সে মনের মধ্যে আছে।'

ছিন্নপত্রর কাল শেষ হয়েছে বহু পূর্বে। বিশ শতকের সূচনায় পদ্মাকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হলো। সেই সঙ্গে অর্ধেক আয়ু। এ সময়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে কবির ভরপুর সংসার। তার পরপরই শুরু হয়ে যায় শোক-তাপে দগ্ধানো অনিঃশেষ পথে যাত্রা।



সূর্য পাটে বসেছে। বাগানের খোয়ার পথ ধরে ঘাটের দিকে হাঁটছিলাম। এক অন্ধ গায়ক দোতারা বাজিয়ে ঘাটের ধারের ছায়ায় বসে লালনের গান গাইছে। বিরতিতে পুকুরের পানিতে মাছের টুপটাপ লাফালাফির আওয়াজ। পাতা-বাঁশির পোঁ-পোঁ থেকে থেকে ভেসে আসে কুঠিবাড়ির আঙ্গিনা থেকে। আমরা কলাপাতায় মোড়া ঠান্ডা কুলপি খাই। বেশ মজাদার। সে যুগে এমন কুলপি এ মুলল্গুকে হতো কিনা কে জানে। কোথাও তো লেখা নাই। টিনের দুমড়ানো বাটিতে টু-টাং সিকি-আধলি পড়তে গায়ক ফের গান ধরলেন। আমরা তাকে 'আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গাইতে বিশেষভাবে অনুরোধ করি। প্রথম কলি দুই-তিন বার গেয়ে আপনমনে গুন গুন করেন গায়ক। বাকিটা মনে পড়ে না। ইস্‌ সুনা-উল্লাহ বেঁচে থাকলে পুরো গানটা শোনা যেত! া