কালের খেয়া

কালের খেয়া

গল্প

অলৌকিক শিশু, আব্বা তার চেয়েও বেশি, বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু...

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২০

নাসরীন জাহান

দীর্ঘতম অন্ধকারে ডুবে ছিলাম মনে হতো আমি নিজ ঘরে অন্তরীণ। মনে হতো, এতো অন্ধকার, আমি কি আদৌ কবরে আছি? নাকি অনন্ত পাহাড়ের গভীর গুহায় কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না। আচমকা কেউ যেন আসমান থেকে নামতেই থাকে, নামতেই থাকে, তালগাছ দু'হাতে আমাকে সজোরে ধাক্কা দিলো।

আমার দিন-তারিখ তো মনে থাকার প্রশ্নই ছিল না। হুড়মুড় তাজ্জবে জেগে দেখি, সারা ঘরে যেন আলোয় আচ্ছন্ন, আমি স্পষ্ট দেখছি, জানালার ওপার থেকে আলো কি অন্ধকারময় বাতাস আসছে। ফের তাজ্জবে মনে পড়লো- আজ ১৫ই আগস্ট, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী।

আমার আব্বারও যে কেন আগে আব্বারটা মনে পড়লো না? যোদ্ধাহত আব্বা মর্মান্তিক পঙ্গুত্বভারে জর্জরিত, বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-সান্নিধ্যের কথা বলতে বিছানায় শয্যাশায়ী আব্বা আমাকে অলৌকিক শিশু ভেবে দেড় বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু কী ... আমাদের কোনো আলাদা দেশ ছিল না, এ দেশের নাম যখন পাকিস্তান ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে আলাদা রাজ্যের বিভাজন ছিল, এখন মুজিবের ডাকে যে বাংলাদেশ এসেছিলো এই পূর্ববাংলা তখন পাকিস্তানেরই অধিকারে ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান ছিল বুর্জোয়াদের দখলে। তারা পূর্ববাংলার মানুষকে নিজ দাসত্বে তুমুল তাচ্ছিল্যে মর্মান্তিক শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে আমাদের শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছিলো।

এরপর সশব্দে কানে এলো ৭ মার্চের কথা। বিস্তারের পরে আসছি, পল্টনের ময়দানে যেন বা লাখ লাখ অথবা কোটি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নিপীড়িত মানুষেরা জড়ো হয়েছিলো, সবার প্রত্যাশার স্বপ্নে যে আসমান থেকে ধেয়ে আসা দুর্লভ রাজপুত্র, লক্ষ স্বর্গ থেকে ধেয়ে আসা সে রাজপুত্রের কাছেই আছে তাদের অনন্ত মুক্তির সোনার কাঠি তার সেই অনবদ্য অপার্থিব একনিষ্ঠ পশ্চিমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী এমন প্রতিবাদী ভাষণ উচ্চারণ করেছিলেন, যা, ছিন্নমূল-অছিন্নমূল সম্পূর্ণ বিশ্বাসে আবেগেই বলছি সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে আত্মা থেকে অংশ নিয়েছিলেন আমার আব্বা এদেশের অনেকটা বিখ্যাত লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

আব্বার কথানুসারে আম্মার গর্ভে থাকা আমার জন্ম হয় ঠিক ১৬ ডিসেম্বর। আব্বার হাঁটুতে, ডান হাতে, কব্জিতে চূড়ান্ত পঙ্গুত্বে আব্বা যাতনাভার সহ্য করতে না পারায় নিজেকে তার কাছেই সমর্পিত করলেন। ১৬ ডিসেম্বর আমার জন্মতে আব্বা আমাকে অলৌকিক শিশু ভাবতে শুরু করেছিলেন। আমি ফের স্মৃতি থেকে চেতনায় ফিরে এলাম। আমি আবার সেই জানালার অপার্থিব বাতাস শুনতে পেলাম, শুনতে পেলাম সেই বজ্রকণ্ঠ ভাষাহীন দেশমাতৃকার আকুল প্রেমে শেখ মুজিবের ভাষা! অন্ধকারে থাকা আমার অস্তিত্ব থেকে সব ছুটে যায় আমার কানে সে ভাষণের বিমূর্ত ধ্বনি। আম্মা বুঝলেন, আমি অটিস্টিক হয়ে জন্মেছি। আব্বার দাঁড়ানোহীনতা থেকে আমার হাঁটাহীনতা একাকার হয়ে গেলো। আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আমি বললাম 'কই না তো' কেন কষ্ট হবে, আমি তো জানি- আমি হাঁটতে পারবো' কীভাবে জানো?

আমাকে পরীরা প্রতি রাতে কানে কানে বলে যায় মুক্তিযুদ্ধ কি জানো?

-জানবো না কেন, আমি কি সে গ্রুপের ছাত্র?

আর বঙ্গবন্ধু?

-জয় বাংলার বঙ্গবন্ধু! এতো দিনে এটাও আমি জানবো না! উনিই তো সোনার অলৌকিক কাঠি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ব্যাপক লাতিম দিয়ে আমাদের দেশকে পরাধীনতা থেকে সম্পূর্ণ 'আমার সোনার বাংলা, জয় বাংলার স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অধিকর্তা ছিলেন।'

তার কোনো ছবি দেখেছো কখনো?

-কী তাজ্জব কথা বলছো। আব্বা তুমি শরীরের সব কষ্ট কিছুতেই ভুলতে পারো না। যুদ্ধস্মৃতি বঙ্গবন্ধুর অপার্থিব স্নেহ-সান্নিধ্য, এখানেই আটকে রেখেছো নিজেকে। পরের জীবনটা স্মৃতিভ্রষ্ট হতে দুর্বল হতে থাকার ভার মস্তিস্কে চাপাবে না প্লিজ। একদিন না তিনি এলেন? ভুলে গেলে, এত কাজ এত দায়িত্বের ভার কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে ভেঙে তিনি এলেন, ঘুণে খাওয়া এ ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে অসুস্থ তোমাকে না দেখতে এলেন। তোমার আর আম্মার চোখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর ... তার চেয়ে আমার চোখ ... বিপুল বিস্ময়ে দেখেছিলাম, আমি যা শুনেছিলাম, সীমা-পরিসীমাহীন অনড় হাতকাটা কালো কোটে ঢেকে, উনাকে কেউ যেন রাজা মনে না করে, সেই আবরণে নিজেকে ঢেকে রেখেছিলেন?

-কেন? আমার কি না আসার কথা ছিল?

ছিন্নবস্ত্রের আম্মার হতভাগ দু'হাতে চেকবই তুলে দিতে দিতে বলেছিলেন, আমরা সব যুদ্ধাহতদের হাতে এসব তুলে দিচ্ছি। তুমি আমার একান্ত আপন, তাই তোমাকে অনেক বেশি দিলাম। ঘরদোর ঠিক করো, নিজের চিকিৎসার ত্রুটি করো না। তখন তোমার কণ্ঠে আব্বা, মুজিবের কণ্ঠের প্রদীপ ধ্বনি ... যেন, বললে 'ক্ষমা করবেন ওটা ফিরিয়ে নিন। আমি এক আনাও প্রাপ্তির জন্য যুদ্ধ করিনি। ক্ষমা করবেন, দোয়া করবেন।' আম্মা কেবল আমাকে জড়িয়ে কম্পনকণ্ঠে জয়া ... জয়া উচ্চারণ করছিলেন। পেছনে অনেক লোক প্রথমে আম্মা ওর নাম জয়া বুঝি! আম্মার কণ্ঠের খুব কম্পন থামেই না। আমি উত্তর দিলাম, জি। ১৬ ডিসেম্বরে আমি জন্মেছিলাম। এরপর বাকি যা দিনরাত, বছর। বছর ধরে যা ঘটে গেছে ভুলে গেছি, আদৌ ভুলেছিলাম!

অন্ধকার কক্ষ সমস্ত জানালা, সম্মুখ দরজা দিয়ে আসা অবারিত আলো-বাতাসের রশ্মিতে ভরে যেতে থাকলো, স্পষ্ট মনে পড়লো পঁচাত্তর সালের অন্য এক কক্ষে থাকা আমাকে একজন জানালো দেশদ্রোহী পিশাচেরা শিশু রাসেল, যাকে আমি আমার প্রাণের বন্ধু অথবা ছোট ভাই ভাবতাম, তাকেসহ সপরিবারে হত্যা করেছে!

মাটিতে যেনবা ভুলুণ্ঠিত আমি অমোঘ প্রতিবাদ, বোবা-কান্নার ভারে প্রথমে বিছানার কার্নিশ ধরলাম, ভুলে গিয়েছিলাম, আব্বা, তোমার মাথার কাছে সবসময় রেডিও থাকে। তোমাকে নিয়ে ভয়, নিজের বোবা-কান্না প্রকাশ হতে না দেওয়ায় ক্রমশ কাঁদতে কাঁদতে প্রথমে একধাপ ওপরের দিকে, এরপর আরো কয়েক ধাপ, সবটুকু ওপরে, রাজপুত্র মারা গেছে! ছোট রাসেলও! হায়! হায়! এ কী হলো!

আচমকা যখন নোনা জল পায়ের ওপর পড়লো, দেখি আমি আমার দু'পায়ের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খিক দুর্মর শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছি।

হায়! হায়! আব্বার কী হবে? প্রথমে হেঁটে, তারপর ছুটে আব্বার কক্ষে এলাম, রেডিও বেজে যাচ্ছে, আম্মাও আমূল ডুবিডুবি অবস্থায় ... আব্বার মাথার কাছে গেলাম, তুমি কাঁদতেও ভুলে গেছো? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, জয়া আমি তোমার মতো দেহকষ্ট মনোকষ্টের ভার বাড়িয়েই গেছি, এক মুহূর্তের জন্যও কষ্ট ভুলতে পারি না। মৃত্যু ... মৃত্যু চাই আমি। আম্মা হতবাক চোখে, এরপর আব্বাও কেরোসিনের আলোতে যেমন আগের চেয়ে শেষ দপ করে জ্বলে ওঠে। উজ্জ্বল চোখে আব্বা আমার বিস্ময়কর দু'পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আব্বার কণ্ঠে, 'এ আমি দেখে যেতে পারবো', আমি ঠিক জানতাম।

আমি আব্বার মাথায় দুর্মর প্রত্যাশার হাত রেখে ... রেডিও থেকে আসা জিয়া অথবা অন্য কারো জোরালো কণ্ঠের ধ্বনি, বঙ্গবন্ধু ... সপরিবারে ... আব্বা দু'কান চেপে বললেন, আর না ... এ ভার, এ কষ্ট আমি, আর সহ্য করতে পারবো না। প্রার্থনা করো জয়া, তোমার আসমানে থাকা নিকটতম বন্ধু ফেরেস্তাদের কাছে বলো, আমাকে যত জলদি তুলে নিক তুলে নিক। আমি আব্বার, বুকে হাত রেখে অনুভব করি, হূৎপিণ্ড- কম্পন কমে আসছে ... ক্রমে আসছে ...। আমিও তোমার মুক্তির জন্য সে প্রার্থনা করতে থাকি।

তোমার দু'চোখের পাপড়ি বন্ধ হলো, কেবল কণ্ঠে জয় বাংলা ... জয় বাংলা ধ্বনি, সবশেষে ধর্মনিরপেক্ষতার অটুট বিশ্বাসে মুজিব যেমন ছিলেন মুসলিম পরিবারে জন্মের কথা ভুলে যাননি। বঙ্গবন্ধুর মার্চের ভাষণে অমোঘ যেন - জাদুকরি - শেষদিকে 'ইনশাআল্লাহ' বলেছিলেন তুমিও ধীরে ধীরে যখন ... তার একটু আগে আম্মা আমাকে জড়িয়ে প্রচণ্ড কষে ধরলেন। বললেন, তোমার বাবা যেন না মারা যায়, জয়া দোয়া করো ... দোয়া করো ...। আব্বা নিভু কণ্ঠে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স.) পড়লেন। এর পর চার পাশের সব শব্দ থেমে গেলো।

যেন জানালা স্রোতে এগিয়ে আসার রশ্মির ধাক্কায় বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে এরপর ধীরে ধীরে চোখের পাপড়ি খুললাম। চোখ খুলতেই দেখি, নার্স গেটআপে আম্মা দাঁড়িয়ে। বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকে গেছে। আমি প্রশ্ন করলাম, আমি এখন কোথায়?

-আম্মা তুমুল উচ্ছ্বাসে, শিশুদের মতো ধেই ধেই নাচতে নাচতে বলতে থাকলেন, আমি জানতাম, এইই হবে। আজই হবে। তুই অনেক বছর ধরে কোমায় ছিলি ... তোর বাবার প্রগাঢ় বন্ধু যে ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ রাজাকার ছিল, সরল আব্বা বুঝতে পারেননি। যুদ্ধের পরে সে পালিয়ে ছিল। তোর আব্বার মৃত্যুশয্যার সামনে আচমকা সে ঢুকলো, লাঠি হাতে আমাকে, তোকে পেটাতে পেটাতে ... চোখ খুলে দেখি ও ... ওরা তোকে ধরে নিয়ে গেছে!

-আমি প্রশ্ন করি, এটা কোন সাল?

-অনেক বছর, হাজার কোটি বছর, কত বছর গেছে জানার দরকার নেই তোকে নিয়ে যাওয়া, এ দেশের অনেক মানুষের সর্বনাশ করা, ওর আজ ভোরে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।

আয় আয় হাত ধর ... ধর বল, বঙ্গবন্ধু ... বঙ্গবন্ধু...

জয়বাংলা ... জয়বাংলা ...।