কালের খেয়া

কালের খেয়া

প্রচ্ছদ

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২০

বিনায়ক সেন

'এখন আমাদের একটা স্লোগান। আগে ছিল ৬ দফা, এখন বলি ৪টা স্তম্ভ। আমার বাংলার সভ্যতা, আমার বাঙালি জাতি এ নিয়ে হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। ...এ হলো আমার এক নম্বর স্তম্ভ। দ্বিতীয় স্তম্ভ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এ সমাজতন্ত্র আমি দুনিয়া থেকে ভাড়া করে আনতে চাই না। এ সমাজতন্ত্র হলো বাংলার মানুষের সমাজতন্ত্র, তার অর্থ হলো শোষণহীন সমাজ, সম্পদের সুষম বণ্টন। ...কিন্তু সমাজতন্ত্র যেখানে আছে সে দেশে গণতন্ত্র নেই। দুনিয়ায় আমি বাংলার মাটি থেকে দেখাতে চাই যে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে আমি সমাজতন্ত্রকে কায়েম করব। আমি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। ...গণতন্ত্র বাংলায় অবশ্যই থাকবে। চতুর্থত, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ... এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ... সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। এই হলো চার দফা, চার স্তম্ভ।' -বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে (১৯৭২ সালের ৭ জুন)


১. অন্য ধরনের সমাজতন্ত্র

'আগে ছিল ৬ দফা, এখন বলি ৪টা স্তম্ভ'- চার দফাই বলা যায় একে। দফাগুলো হচ্ছে- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। একটি আপ্তবাক্যের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নতুন 'প্যারাডাইমের' জন্ম দিলেন। ১৯৭১ সালের পূর্বে ছিল ৬ দফার সংগ্রাম; ১৯৭১ সালের পরে শুরু হয়েছে ৪ দফার সংগ্রাম। সমাজতন্ত্র চাই সেই সাথে চাই গণতন্ত্রও। লিবারেল ডেমোক্রেসির সাথে সমাজতন্ত্রের সমন্বয়। অবাধ ধনতন্ত্রের পথেও হাঁটবো না, আবার একনায়কত্বশীল সমাজতন্ত্রের পথেও হাঁটবো না। এ দুয়ের মাঝামাঝি পথ ধরে চলব। জাতীয়তাবাদ চাই, কিন্তু সেই সাথে চাই ধর্মনিরপেক্ষতাকেও। তাহলে জাতীয়তাবাদ উগ্র আকার ধারণ করবে না, সাম্প্রদায়িকতা শাখা খুলতে পারবে না। যখন বলছেন যে এই সমাজতন্ত্র হবে বাংলার মানুষের সমাজতন্ত্র, বাংলার মাটির সমাজতন্ত্র, তখন তিনি সমাজতন্ত্রকে আসলে প্রোথিত করছেন বাংলার সভ্যতায়- বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যে। কিন্তু সেই সাথে এ কথা ভুলে যাননি বাইরের দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক চর্চার প্রধান সমস্যা। সেখানে গণতন্ত্রের বা লিবারেল ডেমোক্রেসির অনুশীলন নেই। সেখানে মানব প্রকৃতিকে অস্বীকার করা হচ্ছে। একই সাথে 'চারটি দফা' দেওয়া শুধু নয়- একই সাথে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন চার চারটি ফ্রন্টে। প্রথম ফ্রন্টের লড়াইয়ে বাঙালি মুসলিম ও অমুসলিমকে বলছেন- তুমি গোটা বাঙালি 'সভ্যতার' উত্তরাধিকারী হও। তুমি হিন্দু-মুসলমানের ঐতিহ্যের সমান অংশীদার। এবং সে জন্যই শ্মশান-বাংলাকে 'সোনার বাংলা' করার জন্য বেছে নিয়েছেন ষাটের দশকের একটি বহুল ব্যবহূত গান- 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।' দ্বিতীয় ফ্রন্টের লড়াইয়ে শোষক ভূস্বামী, পুঁজিপতি ও আমলা শ্রেণিকে বলছেন- এবার ক্ষান্ত হও। অন্যায়ভাবে আর দেশের বাইরে উদ্বৃত্ত পাচার ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনুপার্জিত অর্থ আহরণ করতে দেব না। নৈসর্গিক বৈষম্যের অতিরিক্ত কোনো অর্থনৈতিক বৈষম্যকে প্রশয় দেব না; অন্যদের দারিদ্র্যে রেখে ধনীদের আমি আর ধনসম্পদ বাড়াতে দেব না। 'বাংলার কৃষক, মজুর, বাংলার বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক এ দেশে সমাজতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করবে।' তৃতীয় ফ্রন্টের লড়াই হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা তথা 'লিবার্টি প্রিন্সিপালকে' ঘিরে। শুধু ভোটের অধিকার নয়, যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বাকস্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ সংগঠন করার মতো মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা চাই। একই সাথে রাষ্ট্রের 'গণতন্ত্রায়ণ'- ক্রমান্বয়ে বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ, স্থানীয় গণতন্ত্রের বিকাশ, সংসদকে সার্বভৌম করে গড়ে তোলা। লড়াইয়ের চতুর্থ ফ্রন্টও খুলেছেন তিনি। ধর্মের ভিত্তিতে সাতচল্লিশের দেশ-ভাগের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে অগ্রসর হতে চান তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করতে চান। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা তার মনে খুবই জীবন্ত। গণতান্ত্রিক কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম হলেই পাকিস্তান সরকার বলে বেড়াত- 'ইসলাম বিপন্ন'। সর্বত্র ভারতের 'ষড়যন্ত্রের হাত' আবিস্কার করা হতো। সে জন্যই বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার একটা মানে আছে। এর মানে হলো, সকলের যার যার ধর্ম পালনের অধিকারের পাশাপাশি কাউকেই 'ধর্মের নামে রাজনীতি' করতে দেওয়া হবে না। কাউকেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। মুজিব বরাবর স্পষ্টভাষী, সোজা-সাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করেন। এই বিষয়ে তাকে টলানো যাবে না। মনে রাখতে হবে যে, তখনও বাহাত্তরের সংবিধান রচিত হয়নি। ১৯৭২ সালের ১৭ এপ্রিল সংবিধান রচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কেবল। এটি চূড়ান্ত হতে হতে ওই বছরের নভেম্বর হয়ে যাবে। বাহাত্তরের সংবিধান গৃহীত হবে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর, আর কার্যকর হবে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে। এই সংবিধানের Preamble-এ ঘোষিত হবে বঙ্গবন্ধুর পূর্ব ঘোষিত চার দফা বা ৪ স্তম্ভের কথা, -অবিকল ১৯৭২ সালের ৭ জুনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তার ভাষণে বিবৃত পর্যায়ক্রমতা রক্ষা করে। প্রথমে আসবে জাতীয়তাবাদ, পরে সমাজতন্ত্র, তারপরে গণতন্ত্র এবং সবশেষে, ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চারটি আদর্শ বাংলাদেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও একত্রিত করেছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। এ জন্যই এদের স্থান হয়েছে প্রারম্ভিকীতে (Preamble)। এটা একান্তভাবেই বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন, পৃথিবীর অন্য কোনো সংবিধানে নেই। এমনকি ড. আম্বেদকরের নেতৃত্বে পাঁচ বছর ধরে তৈরি করা ভারতীয় সংবিধানের ঘোষণাপত্রে কোথাও 'সমাজতন্ত্র' এবং 'ধর্মনিরপেক্ষতা' শব্দটি ছিল না। ১৯৭৬ সালে এসে ৪২তম সংশোধনীর দ্বারা (তখন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামল)। এই দুটি শব্দ ভারতীয় সংবিধানের প্রারম্ভিকীতে (Preamble) সংযোজিত হয়। পারস্পরিক প্রভাবের প্রশ্নই যদি ওঠে, এ ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে প্রভাবিত করেনি, বরং বাংলাদেশই ভারতকে প্রভাবিত করেছে। উভয় দেশের প্রতিতুলনাটি সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো :

বাংলাদেশ (১৯৭২) :  ‘Pledging that the high ideals of nationalism, socialism, democracy and secularism, which inspired our heroic people to dedicate themselves to, and our brave martyrs to sacrifice their lives in the national liberation struggle, shall be the fundamental principles of the constitution.’

ভারত (১৯৫১) : ‘We, the people of India, having solemnly resolved to constitute India into a sovereign democratic republic and to secure to all its citizens : Justice, social, economic and political; Liberty of thought, expression, belief, truth and worship; Equality of states and opportunity; and to promote among them all Fraternity assuring the dignity of the individual and the unity of the Nation.’

ভারত (১৯৭৬-২০১৫) : ‘We, the people of India having solemnly resolved to constitute India into a sovereign socialist secular democratic republic and to secure to all its citizens : বাদ বাকি অংশ আগের উদ্ৃব্দতিটির মতোই।

এখানে এ-ও বলা দরকার, শুধু যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি ভারতীয় সংবিধানের আদিরূপে ছিল না, তা-ই নয়। সেখানে বিধৃত নীতিমালা ও আদর্শ- যার মধ্যে রয়েছে ফরাসি বিপ্লবের মৌলিক তিনটি আদর্শ যথাক্রমে লিবার্টি, ইকুয়ালিটি ও ফ্রেটারনিটি- কোনোটিকেই সংবিধানের 'মৌলিক নীতিমালা' ( Fundamental Principles ) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বাড়তি যে চতুর্থ আদর্শটি (অর্থাৎ  Justice ) সংযোজিত হয়েছিল ভারতীয় সংবিধানের Preamble-এ সেটিও এই স্বীকৃতি পায়নি। সেদিক থেকে দেখলে দেখা যায় যে, নেহরু-আম্বেদকরের সংবিধানের থেকে বঙ্গবন্ধুর বাহাত্তরের সংবিধান ছিল অনেক বেশি প্রাগ্রসর চিন্তার ফসল। আমরা শুধু চারটি আদর্শকে চারটি স্তম্ভ হিসেবেই ঘোষিত করিনি; এগুলোকে 'মৌলিক নীতিমালা' হিসেবেও গ্রহণ করেছি। এর অর্থ, এ দেশ যতদিন থাকবে তার প্রতিটি নিয়ম ও আইন-কানুন এই মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, বাহাত্তরের সংবিধানের তুলনামূলক প্রাগ্রসরতার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর নিজের অবদান কতটুকু? তথ্য-উপাত্ত বিচার করে দেখছি যে, এই সংবিধানের Preamble-এর মধ্যে বিধৃত চার দফা, ৪ স্তম্ভ বা আদর্শ প্রায় সর্বাংশেই বঙ্গবন্ধুর অবদান। বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের আগেই মুজিব এই মৌলিক ফর্মুলেশন করেছিলেন। এই ৪ স্তম্ভের সর্বপ্রথম উল্লেখ তিনি করেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। সদ্য কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু তখন লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে স্টপ-ওভার করেছিলেন। সেই যাত্রা বিরতিরকালে এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় উঠে এসেছিল মূল আদর্শের কথা:

'আমি বিশ্বাস করি, সেকুলারিজমে, আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করি সোস্যালিজমে।'

এরপর ১০ জানুয়ারি যখন মুক্ত স্বদেশে পা রাখলেন, তখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেই ঐতিহাসিক ভাষণে প্রথম বারের মতো রাষ্ট্রের আদর্শগত ভিত্তি হিসেবে উচ্চারিত হলো চার স্তম্ভের কথা :

'বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।'

এর এক মাস পরই ৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে জনসভায় এই একই কথা আরও স্পষ্ট করে বললেন:

'বাংলাদেশ চারটি স্তম্ভের ওপর চলবে- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এর মধ্যে কোনো কিন্তু ফিন্তু নাই। এর মধ্যে কেউ হাত লাগাতে পারবে না। এটা সোজাসুজি আমরা করব। আর আপনারা জানেন আমি সোজা মানুষ, সোজা কথা বলি, যা বলি যেটা বলি, যেটা বুঝি এবং সেটা করি। এর মধ্যে আমি ভয়ও করি না কাউকে এবং করবও না। আমার সোনার বাংলা সত্যি আমার সোনার বাংলা। তাই আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত করেছি- 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় বড় ভালোবাসি।'

এরপর থেকে যতবারই রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রশ্ন উঠেছে, আমৃত্যু তিনি তার বিশ্বাসের চার জায়গার কথাই বলে গেছেন।

এই চারটি আদর্শের মধ্যে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় (একইভাবে বলা যায়, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পরের সীমানা বেঁধে দিয়েছে)। একই সাথে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে পেতে চাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে গভীর মৌলিক উপলব্ধি কাজ করে থাকবে। মুজিব প্রথাগত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকেই উঠে এসেছিলেন। কোনো বামপন্থি বা কমিউনিস্ট আন্দোলন বা সংগঠন থেকে উদ্ভূত হননি। তাহলে তিনি কেন সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং কেন গণতন্ত্রকে সমাজতন্ত্রের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ হিসেবে ভেবেছিলেন, এটা বোঝাটা জরুরি। কেউ বলতে পারেন যে তিনি আসলে ছিলেন একজন আপাদমস্তক 'সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট'। শব্দটি তিনি ব্যবহার করেননি বটে, কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষাকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির (বা 'সামাজিক গণতন্ত্র')। অনুবর্তী মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংসস্থান প্রভৃতি মৌলিক প্রয়োজন যেন সকল মানুষের করায়ত্ত হয়। এর জন্য রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকা প্রয়োজন। এটা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির 'সোশ্যাল' দিকটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আবার, মানুষ শুধু অন্নে-বস্ত্রে বাঁচে না, তার দরকার ব্যক্তিস্বাধীনতাও। ভিন্ন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের স্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবোধ। এটা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির 'ডেমোক্রেসি' দিকটির কথা মনে করিয়ে দেয়। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ। প্রথাগত রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের  ( state socialism ) মডেল প্রায় কোথাও নেই আজ, অন্যদিকে অবাধ ধনবাদী বিকাশের 'নিওলিবারেল' পথ একের পর এক সংকটের জন্ম দিয়ে চলেছে গোটা বিশ্বে। বৈষম্য বাড়ছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, গণতন্ত্র নানা দেশে পিছু হটছে, মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত, পরিবেশ বিপর্যস্ত। এক কথায় ব্যক্তিস্বার্থের পুঁজিবাদ গণতন্ত্র ও মানবকল্যাণের বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছে। সেদিনও কি এ বিষয়গুলো এতটা স্পষ্ট ছিল আজকের মতো? অথচ এই দুটো প্রবণতাই ষাটের দশকেই বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনীতি সচেতন সহকর্মীদের চোখে পড়েছিল (আমি এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন প্রমুখের কথা উল্লেখ করতে চাই)। হয়তো সে কারণেই সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র উভয় আদর্শের একত্র-সমাবেশকেই তারা নতুন সমাজ-রাষ্ট্রের একান্ত পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। হাংগেরি-চেকোশ্নোভাকিয়ায় গণ-অসন্তোষ দমনে সোভিয়েতের ট্যাংক গিয়েছিল- সেটা সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ভিয়েতনামে-কম্বোডিয়ায় মার্কিন সামরিক আগ্রাসন এক দশকব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। সেটা উদার পুঁজিবাদের যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে ফেলেছিল। গণচীন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াল না এবং এর আগেও 'ডোন্ট ডিস্টার্ব আয়ুব' নীতি থেকে দেশটি সরে আসেনি তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী-সমাজতন্ত্রী দুই শিবিরেই পদস্খলন ঘটেছে এটা তত্ত্ব দিয়ে না হোক, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীরা তখন অনুধাবন করে থাকবেন। ফলে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই দুই বিরোধী সত্ত্বাকে এক সূত্রে গাঁথার রাজনৈতিক-দার্শনিক অভিপ্রায় সেকালের (এবং একালের) বিচারে দুঃসাহসিকভাবে মৌলিক প্রস্তাব বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে এর নির্মাণের অভিজ্ঞতা যা-ই হোক, এর চিন্তার মৌলিকত্ব ও সাম্প্রতিক তাৎপর্যকে আমরা কোনো মতেই অস্বীকার করতে পারি না। স্বাধীনতার সেই ঊষালগ্নেই সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র এই দুই বিপ্রতীপ সত্ত্বাকে মেলানোর কথা তারা বলেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদে 'স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কিত প্রস্তাব'-এর ওপরে আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধান রচনার মূল দিকনির্দেশনা দিয়ে গেলেন। সংবিধানের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ধারা-উপধারা পরবর্তীতে অনেক কিছু সংযোজিত হবে, কিন্তু আদি দিকনির্দেশনা এসেছিল তারই কাছ থেকে। উদ্ৃব্দতিটি প্রাসঙ্গিক মনে করছি এখানে :

'জনাব স্পিকার সাহেব, আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরি করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ... আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তারা দুনিয়ার সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।'

এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিনই স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তাব গৃহীত হলো, যার শেষ স্তবকে বাংলাদেশের সমগ্র মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে চার স্তম্ভের কথা উল্লিখিত হলো এভাবে :

'এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সেই সব মূর্ত আদর্শ, যথা জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করছে।'

২. বাঙালির সাম্য চিন্তা ও বঙ্গবন্ধু

অনুন্নত দেশের পটভূমিতে মুজিব প্রায় দুই অসম্ভব আদর্শ তথা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে এক সূত্রে বাঁধতে চাইলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি তত্ত্ববিরোধী অসম্ভব প্রস্তাব। বুর্জোয়া বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরেই পূর্ণ গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব হয়, এরিস্টটল থেকে হবস ও মিল প্রমুখ মনীষীর এ-ই ছিল মত। অন্যদিকে মার্কস স্বয়ং ভেবেছিলেন যে, পুঁজিবাদের পরিণত বিকাশের স্তরেই কেবল সমাজতন্ত্রের প্রকৃত অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়া সম্ভব হয়। পরে লেনিন এই মত থেকে সরে আসলেও ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র গড়তে এক-দুই দশক নয়, প্রায় ষাট-সত্তর বছর লেগে যেতে পারে। সে তুলনায় বাংলাদেশ তো ১৯৭২ সালে ছিল বিকাশের অনেক নিচু পর্যায়ে। তার ওপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অবকাঠামো প্রায় পুরোটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। এ রকম পর্যায়ে গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের কল্পনা করাও সহজ নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও বাহাত্তরের সংবিধানের আদি রূপকারেরা এটা সম্ভবপর বলে ভেবেছিলেন এবং একটি আদর্শের জন্য অন্য আদর্শটিকে তারা পরিত্যাগ করতে চাননি।

এ ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, বঙ্গবন্ধু ও তার কাছের বৃত্তের আদর্শ-সচেতন সহকর্মীরা যদি গণতন্ত্রের হাত ধরে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাই চাইলেন তাহলে তারা সমাজতন্ত্রের ধারণার আরেকটু স্পষ্টতর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ দিলেন না কেন? তাদের কাছে তো দুটিই পথই খোলা ছিল থিওর‌্যাটিক্যালি। একটি হলো 'সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল' থেকে বেরিয়ে আসা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো 'সোশ্যাল ডেমোক্রেসির' পথ। নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন- এসব দেশের 'সামাজিক গণতন্ত্র' বাহাত্তরের সংবিধান রচনাকালে কিছুটা হলেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব উন্নত দেশের সায়ের-সুবোদের 'ওয়েলফেয়ার স্টেট'-এর মডেল অনুন্নত কৃষি বা কৃষক-প্রধান বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব তা নিয়ে প্রচণ্ড সংশয় ছিল সংবিধানের রূপকার ও পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত তারা ওয়েলফেয়ার স্টেটকে উন্নত পুঁজিবাদের মডেল হিসেবেই দেখেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানের একটা বড় বিশেষত্ব ছিল এর কোথাও একবারের জন্য হলেও পুঁজিবাদের প্রশংসা করা হয়নি বা সাফাই গাওয়া হয়নি। অথচ 'সমাজতন্ত্র' শব্দের ব্যবহারে কোথাও কোনো কুণ্ঠাবোধ দেখা যায় না। বোঝা যায়, সার্বিকভাবে সেদিনের গণপরিষদে সমাজতন্ত্রের পক্ষে একটা নিরঙ্কুশ সমর্থন বিরাজ করছিল। যেটা আজকের অবস্থান থেকে দুর্বোধ্য ঠেকবে। বরং পুরো গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ফর্মুলা নিয়েই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ ছিল সকলের। খসড়া সংবিধানের ওপরে আলোচনা করতে গিয়ে এম মনসুর আলী (১৯৭৫ সালে জেলে চার শহীদ নেতার এক নেতা) বলেছিলেন, 'একমাত্র বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এই যে গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি অবস্থান এবং অগ্রসর হওয়া এটা সম্ভব। ... সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যদি গণতন্ত্র না থাকে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে যদি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে প্রকৃত সমাজতন্ত্র হতে পারে না। কারণ সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। 'সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।' এ ধরনের চিন্তা ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজম ধারার থেকে অনেক দূরে।

অন্য অর্থটি হলো, অনুন্নত দেশের পটভূমিতে এক ধরনের সমাজতন্ত্র অভিমুখীনতার পথ। যেটার শুরু হতে পারত, লেনিনীয় ধারার 'নিউ ইকোনমিক পলিসি' (বা NEP ) দিয়ে। গৃহযুদ্ধের পরে রাশিয়ায় লেনিন ১৯২১ সালে উপলব্ধি করেন যে, পুঁজিবাদকে আংশিক পুনরুজ্জীবন করা ছাড়া, কৃষকদের ব্যক্তি উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়া ছাড়া, শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ওপরে নির্ভর করে সমাজতন্ত্রের দিকে যাওয়া যাবে না। রাশিয়ার ক্ষেত্রেই যদি এই উপলব্ধি হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী অনেকাংশে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশে শিল্প-ব্যবসা খাতে পুঁজিবাদের আংশিক পুনরুজ্জীবন ছাড়া, গ্রাম ও কৃষকমুখী কর্মোদ্যোগ ছাড়া, সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া কী করে সম্ভব? তদুপরি, রাষ্ট্রায়ত্ত খাত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় 'ম্যানেজেরিয়াল ক্লাস' তখনও পর্যন্ত গড়ে তোলা যায়নি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করে দক্ষ করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু ও তার প্রাগ্রসর সহকর্মীরা এসব সমস্যা সম্পর্কে অসচেতন ছিলেন না। এ জন্যই ১৯৭৪ সালেই বেসরকারি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা 'নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনভেস্টমেন্ট পলিসি ১৯৭৪'-এর মাধ্যমে পূর্বেকার ২৫ লাখ থেকে ৩ কোটি এবং পরবর্তী সময় ১০ কোটিতে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আজকের মূল্যমানে সিপিআই ধরে হিসাব করবে এটা অন্তত ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ প্রথম পঞ্চবার্ষিকী হাতে নেওয়ার এক বছরের মধ্যেই বেসরকারি শিল্প-বাণিজ্য বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছিল। নতুন বেসরকারি খাত বা বিনিয়োগকে কোনোভাবেই নিরুৎসাহিত করা হয়নি। পরিকল্পনাবিদরা মেনে নিয়েছিলেন যে, পুঁজিবাদের আংশিক পুনরুজ্জীবন ছাড়া সমাজতন্ত্র-অভিমুখীন কৃষি-প্রধান অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করা যাবে না। এ জন্যই সংবিধানের ১৩নং ধারায় উপস্থাপন করা হয়েছিল 'মিশ্র-অর্থনীতি'র কাঠামো, যেখানে ছিল তিন ধরনের মালিকানা-সম্পর্কের উপস্থিতি- রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী মালিকানা ও ব্যক্তিমালিকানা। সুতরাং লেনিনীয় নিউ ইকোনমিক পলিসির দৃষ্টিকোণ থেকেও বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের অর্থনৈতিক দর্শনে 'সেন্স অব রিয়ালিজম'-এর কোনো খামতি ছিল না। তা-ই যদি হয় তবে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পথকে নিছক একটি 'মিশ্র-অর্থনীতি' (Mixed Economy) ধারার ব্যবস্থা বলতে বাধা ছিল কোথায়? যে দল গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে একত্রে পেতে চায়, যে দল বিভিন্ন মালিকানার মিশ্রণকে মেনে নেয়, তার পক্ষে 'মিশ্র অর্থনীতি' শব্দবন্ধটি ব্যবহার করাই ছিল প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক পদক্ষেপ।

এর একটি উত্তর ড. কামাল হোসেন আমাকে দিয়েছেন। তার উত্তর ছিল, গণতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্র মিলিয়ে যে সমাজ ব্যবস্থা আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম, সেটাকে শুধু 'মিশ্র অর্থনীতি' বলা আমাদের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। সেভাবে দেখলে তো পৃথিবীর প্রায় সব ধারার দেশই 'মিশ্র অর্থনীতির' দেশ : ‘We did not use the term mixed economy as it does not spell out specifically the objectices and time periods during which these goals were to be pursued’. আমি তাকে অবশ্য জিজ্ঞেস করলাম, কী করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এত নিশ্চিতভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় 'সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি' বাস্তবায়নের পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভবপর হয়েছিল? কী করে এত দ্বিধাহীনভাবে 'সমাজতন্ত্রের' পক্ষে সমাজতন্ত্র শব্দটি ব্যবহারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে বঙ্গবন্ধু ও তার কাছের বৃত্তের নেতৃত্ব দাঁড়াতে পেয়েছিলেন? বাহাত্তরের খসড়া সংবিধান প্রস্তুতের ক্ষেত্রে অন্যতম মূল ভূমিকা ছিল যার, সেই ড. কামাল হোসেন যে উত্তর দিয়েছিলেন আমাকে তা বর্তমান আলোচনার জন্য পদ্ধতিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ :

‘The Political discourse in the late Fifties and Sixties gave importance to political Freedom but emphasized that such freedom would not lead to concentration of Economic Power in the hands of a privileged elite.’

এর থেকে ধারণা করি যে, গণতন্ত্রের হাত ধরে চলা সমাজতন্ত্র হচ্ছে সেই উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ব্যবস্থা, যেখানে কোনো সুবিধাভোগী এলিটের কাছে অর্থনৈতিক বিত্ত ও ক্ষমতা ঘনীভূত ও কেন্দ্রীভূত হতে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে এই অবস্থায় সাধারণ আপামর জনগণের মৌলিক অর্থনৈতিক চাহিদা যথা- অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করা হবে। মোটামুটি এই দাঁড়ায় তাহলে ‘Socialist orientation within a democratic framework’ বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের কেজো সংজ্ঞা।

এই সংজ্ঞায় বঙ্গবন্ধুর কোনো আপত্তি ছিল না অর্থনৈতিক ক্ষমতার ঘনীভবন- তা সে শিল্প-বাণিজ্য খাতে 'বাইশ পরিবার' সৃষ্টির মাধ্যমেই হোক, বা কৃষি খাতে জমিদার-জায়গিরদার শ্রেণি সৃষ্টির সুবাদেই হোক- তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ছিলেন গোড়া থেকেই সোচ্চার। জমিদার-জায়গিরদার শ্রেণির অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি সম্পর্কে পাকিস্তান পার্লামেন্টে উত্থাপিত সংবিধানের খসড়ার ওপরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ১৯৫৬ সালে মুজিব বলেছিলেন যে, পাকিস্তানে এ রকম সামন্তবাদের কোনো স্থান নেই। যেখানে এসব বৃহৎ ভূস্বামীরা তাদের প্রতিপত্তি বাড়িয়েই চলেছে, অথচ সাধারণ চাষিরা খেটেই মরছে। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় অংশেই এই বৃহৎ ভূস্বামী শ্রেণি নানাভাবে তাদের প্রভাব খাটাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানে এদের প্রভাব এখন আরও অনেক বেশি। এর জন্য তিনি ইসলামী ন্যায়-নীতির দ্বারস্থ হলেন। সামন্তবাদবিরোধী সমতাবাদী চিন্তার বিকাশের জন্য মুজিবের বক্তব্য থেকে পুরো উদ্ৃব্দতিটা তুলে ধরতে চাই। বৃহৎ ভূস্বামীরা কী করে পারেন তাদের সামন্তবাদ টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ইসলামিক ন্যায়-নীতিভিত্তিক কোন যুক্তি দিতে? এই প্রশ্ন রাখলেন তিনি। আর তাদের জমির ওপরে সর্বোচ্চ মালিকানার 'সিলিং' দিয়ে যে পরিমান উদ্ৃব্দত জমি পাওয়া যাবে তা তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দিয়েই কেবল নেওয়া যেতে পারে- এই যুক্তির সাথেও সহমত হলেন না তিনি। 'মার্কেট-বেইজড কোন ক্ষতিপূরণ কীভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতি 'সাসটেইন' করা সম্ভব? এই ছিল মুজিবের যুক্তি। এই যুক্তিকে নানা দেশের ভূমি-সংস্কারের অভিজ্ঞতাও সমর্থন করে। পুনর্বণ্টনমূলক কর্মসূচি 'নন-মার্কেট' নীতিমালার ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়েছে রাশিয়ায়, চীনে, ভিয়েতনামে, এমনকি পাশের দেশ ভারতের কেরালা রাজ্যে। মুজিব সেদিন বলেছিলেন, পাঞ্জাবে, ফ্রন্টিয়ার প্রদেশে, সিন্ধু প্রদেশে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে যেদিকে দু'চোখ যায় কেবল একজন বা দু'জন ভূস্বামীরই সম্পতি নজরে পড়ে। এটা কীভাবে ইসলামের ন্যায়-নীতি (বা সাম্যের যে কোনো ন্যায়-নীতির) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন :  ÔCan they produce anything to support them in their feudalism of jagirdaris and zamirdaris; [They say] “Nobody can take the property of a zamindar without providing Compensation”? Who will give the compensation- the people who have tilled and toiled... Islam means equal distribution of wealth. Do they contemplate distributing the wealth of the country to the poor cultivators? What do we find in the punjab, Frontier and in sind? You tour for a whole day and you see the property of one man. Whose property- Talpur’s property; whole property- Daultana’s property; Mian Iftikharuddin’s property. It is not the property of the man who works on the field; it is not the property of the poor “Mussulman”.

কৃষিতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার ঘনীভবন (concentration) বা সামন্তবাদের বিরুদ্ধে মুজিবের স্পষ্ট অবস্থান একদিক থেকে দেখলে আমাদেরকে বঙ্কিমের সাম্য-চিন্তার কথা মনে করিয়ে দেয়। 'বঙ্গদেশের কৃষক' প্রবন্ধে বঙ্কিম লিখেছিলেন : "জীবের শত্রু জীব; মনুষ্যের শত্রু মনুষ্য; বাঙ্গালী কৃষকের শত্রু বাঙ্গালী ভূস্বামী। ব্যাঘ্রাদি বৃহজ্জন্তু, ছাগাদি ক্ষুদ্র জন্তুগণকে ভক্ষণ করে; রোহিতাদি বৃহৎ মৎস্য, সফরীদিগকে ভক্ষণ করে; জমিদার নামক বড় মানুষ, কৃষক নামক ছোট মানুষকে ভক্ষণ করে।" পরবর্তীতে 'সাম্য' প্রবন্ধে ফরাসি দার্শনিক জাঁ জাক রুশোর  Le Contract social গ্রন্থের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, 'এ দেশে এবং অন্য দেশে সচরাচর সম্পত্তি ব্যক্তিবিশেষের। আমার বাড়ি, তোমার ভূমি, তাহার বৃক্ষ। কিন্তু ইহা ভিন্ন আর কোনো প্রকার সম্পত্তি হইতে পারে না, এমত নহে। ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি না হইয়া, সর্বলোক সাধারণের সম্পত্তি হইতে পারে। এই সর্বলোক পালিকা বসুন্ধরা কাহারও একার জন্য সৃষ্ট হয় নাই বা দশ পনের জন ভূম্যধিকারীর জন্য সৃষ্ট হয় নাই। অতএব ভূমির উপর সকলেরই সমান অধিকার থাকা কর্তব্য।' রুশোর এ চিন্তা স্বাধীনতার-পরবর্তী ভূমি-সংস্কারের চিন্তার পেছনে পরোক্ষভাবে তাত্ত্বিক যুক্তি দেখিয়ে থাকবে পরোক্ষভাব- কেননা রুশোর প্রভাব যেমন পরেছিল ফরাসি বিপ্লবের ওপরে, তেমনি মার্কস ও পরবর্তী যুগের সমাজতন্ত্রীদের ওপরে। বঙ্কিম লিখেছিলেন, ÔLe Contract social  গ্রন্থের চরম ফল ষোড়শ লুইর সিংহাসন চ্যুতি এবং প্রাণদণ্ড। ফরাসি বিপ্লবে যাহা কিছু ঘটিয়াছিল, তাহার মূল এই গ্রন্থে।' শুধু এখানেই রুশোর প্রভাব সীমিত নয় : "কিন্তু 'ভূমি সাধারণের' এই কথা বলিয়া রুশো যে মহাবৃক্ষের বীজ বপন করিয়াছিলেন, তাহার নিত্যনতুন ফল ফলিতে লাগিল। অদ্যপি তাহার ফলে ইউরোপ পরিপূর্ণ। 'কম্যুনিজম' সেই বৃক্ষের ফল। 'ইন্টারন্যাশনল' সেই বৃক্ষের ফল।" একাধারে রুশো ও জন স্টুয়ার্ট মিলের ভাবশিষ্য বঙ্কিম 'কম্যুনিস্ট' ছিলেন না। তিনি ছিলেন- আজকের যুগের নিরিখে একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী। মুজিব চিন্তা-চেতনায় (এবং বাস্তব কাজে) কতিপয় এলিটের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার ঘনীভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন যথাসাধ্য। এ কাজে তার সফলতা এসেছিল কতটুকু, সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। তিনি সর্বাংশ সফল হতে পারেননি বা তাকে সফল হতে দেওয়া হয়নি- এই বিতর্ক আজও আমাদের ক্ষত-বিক্ষত করে। কিন্তু তার আন্তরিকতায় কোনো খামতি ছিল না। পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের মতো বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক বিত্ত ও ক্ষমতা একশ' বা হাজার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাক- এটা তিনি কখনও চাননি। এ ব্যাপারে তার নিজের মনে এবং কর্মপরিকল্পনায় কোনো সংশয় ছিল না। তিনি বঙ্কিমের মতো রুশো বা মিলকে সাক্ষী মানেননি, বা কমিউনিস্টদের মতো মার্কস বা মাও থেকে উদ্ৃব্দতি দেননি (যদিও আমরা পরে দেখাব যে তাঁর বাহাত্তরের সংবিধানে লিবারেল ও সোশ্যালিস্ট এমন অনেক চিন্তারই ছাপ রয়ে গেছে)। মুজিব এসব থিওরির জল-হাওয়াতেই মানুষ বা এসব থিওরি থেকে উদ্ৃব্দতি দেওয়া মানুষদের কাছের বৃত্তেরই মানুষ ছিলেন। সমাজতন্ত্রের বণ্টন-নীতি- 'সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ এবং শ্রম অনুযায়ী বণ্টন'- বাহাত্তরের সংবিধানের ২০নং আর্টিকেলে স্পষ্ট করে লেখা আছে : ‘Work is a right, a duty and matter of honour for every citizen who is capable of working and everyone shall be paid for his work on the basis of the principle from each according to his abilities, to each according to his work’.

এই বণ্টন-নীতিটি হুবহু মার্কসের 'ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম' রচনা থেকে নেওয়া। ভারতীয় সংবিধানে ফরাসি বিপ্লবের লিবার্টি, ইকুয়ালিটি ও ফ্রেটারনিটির কথা আছে, কিন্তু মার্কসের শ্রম অনুযায়ী বণ্টন-নীতির কোনো উল্লেখ কোথাও নেই। এই তাৎপর্যপূর্ণ বণ্টন-নীতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর সাম্য-চিন্তায় পূর্ণ সমর্থন ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, বাহাত্তরের সংবিধানে এই বণ্টন-নীতির প্রতি এতদিন সেভাবে আলোকপাত করা হয়নি। যারা ইতোপূর্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালনার 'সমাজতান্ত্রিক ভিত্তি' নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাদের অনেকেরই এটি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বঙ্কিমের মতো করে রুশো-মিল না আওড়ালেও বঙ্গবন্ধু প্রায় নিঃশব্দে সামাজিক ন্যায়ের (Social Justice) একটি নতুন ঐতিহ্য রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। এক হিসেবে, তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আদর্শ সচেতন সহকর্মীরা (তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন প্রমুখ) জাঁ জাক রুশো, জন স্টুয়ার্ট মিল ও কার্ল মার্কস- লিবারেল ও সমাজতন্ত্রী ধারার মূল চিন্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনার পরিকল্পনাবিদদের মধ্যেও (ডিগ্রির তারতম্য মেনে নিয়েই বলছি।) লিবারেল ডেমোক্রেসি ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি মেলানোর আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা ছিল। তত্ত্বালাপের নিকট বৃত্তে বাস করে বঙ্গবন্ধু 'গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের' ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখতেন তা নিচের উদ্ৃব্দতিগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে তিনি চটজলদি কোনো সমাধান খোঁজেননি সেটাও পরিস্কার হয়ে ওঠে। হঠকারী সমাজতন্ত্রীরা, ছদ্ম-সমাজতন্ত্রীরা যে চলার পথে সমস্যা তৈরি করছে সেটাও তিনি রাখঢাক না করেই প্রকাশ করেছেন। ১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে এবং ১৯৭৪ সালের ৪ ডিসেম্বর সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেস, বঙ্গবন্ধু যা বলেছিলেন তা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র গড়ার সমস্যাকে তুলে ধরে। উদ্ৃব্দতিগুলো পর্যায়ক্রমে সাজালে তার মনের ভাবনা ও দুর্ভাবনাগুলো উপলব্ধি করা যায়। এ রকম কনফেশানস রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।

১৯৭৩ সালেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন :

'ছাত্র ভাইরা দেশের অবস্থা ভালো না। চোরের জ্বালায় আমি অস্থির হয়ে গেছি। যেদিকে তাকাই সেদিকে চোর দেখি। ... কার কাছে ভার দেবো? যার কাছে ভার দেই, সেই করে চুরি। ... আমি বাজে কথা বলি না। আমি বলেছিলাম, সোনার মানুষ দেও যদি, সোনার বাংলা গড়তে পারি। আর না হলে পারব না। শেখ মুজিবকে বাইট্টা খাওয়াইলেও হবে না। ... এখানে আমাদের প্রয়োজন জনমত সৃষ্টি করা। ... সমাজতন্ত্র করতে হলে ডিসিপ্লিন দরকার। ... সোজা রাস্তা নাই সমাজতন্ত্রে। ... আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি। ... শোষণহীন সমাজ, সুষম বণ্টন। সম্পদের মালিক জনগণ, তোমরা তা বিশ্বাস কর। সোজা পথ নাই- অনেক রাস্তা আছে, যেতে হবে।'

মুক্তিযুদ্ধের পরের দু-তিন বছরে পুরোনা সমাজ-কাঠামো ও মূল্যবোধ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। এর ফলে একদিকে যেমন দেখা দিয়েছিল নতুন আদর্শগত ও প্রগতিশীল রূপান্তরের সম্ভাবনা, তেমনি অন্যদিকে দেখা দিচ্ছিল নেতিবাচক দিকগুলো। মুজিবের কথাই অন্যভাবে- অন্য এক পরিস্থিতিতে- প্রকাশ করেছিলেন লেনিন ইতোপূর্বে ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে:

‘All the elements of disintegration of the old society ... are bound to ‘reveal themselves’ during such a profound revolution. And these elements of disintegration cannot ‘reveal themselves’ otherwise than in an increase of crime, hooliganism, corruption, profiteering and outrage of every kind. To put these down requires time and requires an iron hand.’

কিন্তু ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি বঙ্গবন্ধু ্তুরৎড়হ যধহফ্থর রক্ষায় অগ্রসর হতে পাননি। তিনি লিবারেল ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করেন, তিনি ইমার্জেন্সিতে বিশ্বাসে করেন না। কিন্তু উদারনৈতিকতাবাদ উপজীব্য করে কত দিন চলতে পারবেন, এ নিয়ে এরই মধ্যে তাঁর মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সেদিনের ছাত্র-সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, '... স্বাধীনতা নাই' এখন খবরের কাগজে ছাপে, কিন্তু দুঃখের বিষয় বলতে হয়, আজও ইমার্জেন্সি পাকিস্তানে আছে। আজও ইমার্জেন্সি ভারতবর্ষে আছে। কিন্তু আমি শেখ মুজিবুর রহমান, আমার সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, মানবাধিকারে বিশ্বাস করে, ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলেই তাড়াতাড়ি শাসনতন্ত্র দিয়েছি। কিন্তু ইমার্জেন্সি দেই নাই। ... যা আছে সম্পদ, বাংলার মানুষের। তা যদি ভাগ করে দেই এবং তা-ই ভাগ ভাগ কইরা মিল্লা মিশ্যা খেতে হবে আমাদের।'

[ক্রমশ]