কালের খেয়া

কালের খেয়া

প্রচ্ছদ

বাংলাদেশের বীজমন্ত্র

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২০

যতীন সরকার

বাংলাদেশের বীজমন্ত্র

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান [জন্ম :১৭ মার্চ, ১৯২০-মৃত্যু :১৫ আগস্ট, ১৯৭৫]

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন অনেক আগেই। বলতে গেলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই। আওয়ামী লীগের অন্যতম স্থপতিরূপে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও কর্মের ধারাবাহিক বিশ্নেষণের মধ্য দিয়েই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বেই শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থেকে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের মতো একটি কৃত্রিম রাষ্ট্রের থাবা থেকে মুক্ত হতে না পারলে তৎকালীন পূর্ববাংলায় যে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, সে কথা ১৯৪৮ সালে বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত আসার সময় থেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ক্রমান্বয়েই তার উপলব্ধিতে আসছিল যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে বৈষম্যের পাহাড় গড়ে তুলে পূর্ববাংলাকে কার্যত একটি উপনিবেশে পরিণত করে ফেলেছে।

ভেতরে ভেতরে তিনি যে স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তারই প্রমাণ পাওয়া যায় ছেষট্টির ছয় দফা ঘোষণায়, উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে এবং একাত্তরের সেই দুনিয়া কাঁপানো দিনগুলোতে এবং ১৬ ডিসেম্বরে যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার দিকে শেখ মুজিবের সংশ্নিষ্টতার এ রকম সব প্রমাণই ইতিহাস সমর্থিত ও দৃষ্টিগ্রাহ্য। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সাধারণভাবেই বাংলাদেশের সকল মানুষের ভেতর বিপুল উৎসাহ- উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটালেও ধূর্ত-মতলববাজদের অনেকের কাছেই এটা মর্মবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াল। স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে ঘটনাক্রমে বা বিশেষ মতলব হাসিলের সচেতন উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিসংগ্রামী সেজেছিল যারা, তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে তার অধিষ্ঠান। তারা শুধু ঈর্ষাকতর হলো না, হিংস্র হয়ে উঠল। সেই হিংস্রতারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটাল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তবে এই চূড়ান্ত হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা ছাড়া। প্রকৃত সত্য হলো- সশস্ত্র সংগ্রামের সফলতার চূড়ান্ত পর্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। সেই সাম্রাজ্যবাদীদের মদদপুষ্ট অনেক মীর জাফরই মুক্তিযুদ্ধের শিবিরে অবস্থান করছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এদের সম্মিলিত শক্তিই সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে পরাজিত পাকিস্তানের প্রেতাত্মাকে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনটির কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন- এ খবরটি কয়েক দিন ধরে প্রচার করা হচ্ছিল। তখনও টেলিভিশনের ব্যাপক প্রচলন ঘটেনি। আমি তখন ময়মনসিংহ শহরে থাকি; ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে অধ্যাপনা করি। রেডিও খুলে কয়েক ঘণ্টা পর পর আমরা খবর শুনি। সেদিনও সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি রেডিওর নব ঘোরাচ্ছি, হঠাৎ একটা কর্কশ কণ্ঠস্বর কানে এলো। সেই কর্কশ কণ্ঠের লোকটির নামও শুনলাম- মেজর ডালিম। সেই ডালিম বারবার জানিয়ে দিচ্ছে রক্ত হিম করা সেই খবর- 'শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।' খবরটি শুনে স্বাভাবিকভাবে অন্য অনেকের মতোই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কণ্ঠ থেকে কেমন একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এসেছিল। সেই আর্তচিৎকারে বাড়ির সকলেই কী হয়েছে, কী হয়েছে বলে আমার পাশে এসে জড়ো হলো। মনে পড়ে, আমি তখন তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা আত্মগোপনের জন্য সেখান থেকে উঠে বাইরে চলে গেলাম। হেঁটে হেঁটে ময়মনসিংহ শহর দেখতে লাগলাম।

রেডিওর খবরে বারবার শোনা যাচ্ছে, সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। তবে সে অনুপাতে ময়মনসিংহ শহরে লোকজনের আনাগোনা বন্ধ হতে দেখলাম না। প্রায় সব দোকানপাটই খোলা। রাস্তায় পুলিশ বা মিলিটারির আনাগোনা নেই। সকাল ৮টার মধ্যে জানা গেল, সামরিক বাহিনী দেশের সর্বময় ক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু তার নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত যে ব্যক্তিটি, সে সামরিক বাহিনীর কেউ নয়, তার নাম খন্দকার মোশতাক আহমদ। আমরা আগের দিন পর্যন্ত জানতাম বাংলাদেশ সরকারের একজন মন্ত্রী; আর আজকে সকালেই শুনি সে বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট।

বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরটা দেখলাম যে, তখনও কেউ কেউ বিশ্বাস করলেও অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করেনি। আবার যারা বিশ্বাস করেছিল, তারা ধরে নিয়েছিল যে, মোশতাকই আসল খুনি। মোশতাককে সেদিন আসল খুনি বলে ধারণা করাটা যে ভুল ছিল না সেটা কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্কার হয়ে যায়। তা ছাড়া বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে যে সরকার গঠন করা হয়েছিল, তার গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্বে দেখা গেল আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে। যেমন- খন্দকার মোশতাক ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের মতো কতিপয় তথাকথিত রাজনীতিবিদকে। এই গ্রুপটি ছিল আওয়ামী লীগের সেই অংশ, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিল এবং চক্রান্ত করে শুধু ব্যর্থ হয়েছিল তাই নয়, খন্দকার মোশতাক সেই নেতৃত্বের লড়াইয়ে শেখ মুজিবের নিকট পরাজিত এক রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন, তখন পাকিস্তানপন্থি এই খন্দকার মোশতাক তার বিরোধিতা করেছিল। ছয় দফাপন্থি আওয়ামী লীগ থেকে একসময় সে বের হয়ে গেলেও পরে অবশ্য দেখা যায়, শেখ মুজিবের নেতৃত্ব স্বীকার করে ছয় দফাপন্থি আওয়ামী লীগেই সে ফিরে এসেছিল। তার বহুদিন পর সেই মোশতাকই নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করল। মূলত এর মধ্য দিয়ে সে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার প্রতিশোধ নিল।

তবে যারা মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে ব্যর্থ হয়েছিল, কেবল তারাই যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মন্ত্রিসভা ও রাষ্ট্রপতির আসনে বসে থাকতেন, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত কাউকেই যদি খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় দেখা না যেত- তাহলে অবশ্য দেশের জনগণের কাছে একটি ভিন্ন বার্তা পৌঁছতো। সেই বার্তায় জনগণ যেভাবে সাড়া দিত, তাতে বাংলাদেশের পরবর্তী ইতিহাস নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যেত। কিন্তু তেমনটি হলো না; হতে পারল না।

১৫ আগস্ট সকালে রেডিওতে ডালিমের কথা শুনে আকস্মিকতার ধাক্কায় সারাদেশের মানুষ একেবারে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার সংবাদটিকে সেদিন অনেকেই ভেবেছিল যে, হয়তো কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী বেতার দখল করে নিয়েছে মাত্র। কারণ বেতার থেকে যা বলা হচ্ছে তা একেবারে অবিশ্বাস্য। তবে সবাই এমনটা না ভাবলেও একটা ক্যু হয়ে গেছে বলে যারা বিশ্বাস করছিল, তারাও মনে করেছে বিষয়টি একেবারে অপ্রতিরোধ্য হবে না। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা নিশ্চয়ই বসে থাকবেন না। ময়মনসিংহের নতুনবাজারের দোকানে বসে লোকজনকে এ রকমটাই বলাবলি করতে দেখেছি। যে বেদখল হয়ে যাওয়া রেডিও স্টেশনটি শিগগির রক্ষীবাহিনী গিয়ে দখল করে নেবে। কিন্তু বাস্তবে সন্ধ্যার আগেই সব পরিস্কার হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ আর থাকল না। বিশেষ করে রেডিওতে যখন মোশতাকের মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের বিবরণ ও সব মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, তখন দেশের সব মানুষের মাঝে অন্যরকম ভাবনার সঞ্চার ঘটল। মানুষের মধ্যে তখন একটা হতাশা দেখা দিল। কেবল হতাশাও নয়, ক্ষমতা দখলকারীদের প্রতি একটা বিদ্বেষভাব তৈরি হতে লাগল। এদিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নতুন রাষ্ট্রপতি হওয়া খন্দকার মোশতাক তার ভাষণ শুরু করেছিল আল্লাহর নামে। শেষ করেছে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে। অর্থাৎ 'জয় বাংলা'র বাংলার যে জয়- সেই জয়কে উৎখাত করে তার স্থলাভিষিক্ত করা হলো পাকিস্তান জিন্দাবাদের মতো করে বাংলাদেশ জিন্দাবাদকে। পাকিস্তানপ্রেমীরা তো স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে 'জয় বাংলা' স্লোগানকে বিদ্রুপ করে ছড়া কাটতো- 'জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি খুইল্লা ধুতি পিন'। মোশতাকের মুখে এবার যখন পাকিস্তান জিন্দাবাদের অনুরূপ ধ্বনি শোনা গেল, তখন সেই পাকিস্তানপন্থিরা তাদের হারানো জোশ ফিরে পেল। খন্দকার মোশতাক এই ক্যুদেতাকে সমর্থন করে যা বলেছিল, তা ছিল এ রকম- 'সকলেই এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছিল, কিন্তু প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন সম্ভব ছিল না বলেই সরকার পরিবর্তনে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়। ঐতিহাসিক প্রয়োজনে সেনাবাহিনী জনগণের জন্য সুযোগের স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছে।' কিন্তু আমরা বুঝে নিয়েছিলাম জনগণের জন্য নয়, এই সুযোগের স্বর্ণদ্বার খোলা হয়েছে মোশতাকের মতো পাকিস্তানপ্রেমীদের জন্য। আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নাটকের এই নতুন অঙ্কে নিহত পাকিস্তানের ভূতই মঞ্চ দখল করে রাখবে। ১৫ আগস্টের রাতেই বিবিসি থেকে শোনা গেল যে, বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক রিপাবলিক বলে ঘোষণা করা হতে পারে। সেই রাতেই নতুন বাংলাদেশ সরকারকে পাকিস্তান স্বীকৃতি জানায় এবং জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশের এই সরকারকে স্বীকৃতিদানের জন্য ইসলামিক কনফারেন্স ও তৃতীয় বিশ্বের ৪০টি জাতিকে অনুরোধ জানায়। যে সৌদি আরব স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সাড়ে তিন বছরেও স্বীকৃতি জানায়নি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরদিনই সেই সৌদি আরবের সানন্দ স্বীকৃতি এসে যায়। ১৫ আগস্টের জুমার নামাজের আগে মোশতাক প্রেসিডেন্টরূপে শপথ গ্রহণ করে এবং জুমার নামাজের পর তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ উঠিয়ে নেয়। উদ্দেশ্য ছিল দেশে ও বিদেশে নিজের একটা ধার্মিক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা; দেশের পাকিস্তানপন্থিদের কাছে এবং বিদেশের পাকিস্তান সমর্থক রাষ্ট্রগুলোর কাছে নতুন এক ধর্মতন্ত্রী রাষ্ট্রের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। এই বার্তা প্রেরণের মধ্য দিয়ে সেদিন থেকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই বাংলাদেশের খোলসের ভেতর পাকিস্তানের শ্বাস পুরে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এরপর তো অনেক বছরই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। অনেক নাটকের অভিনয় হয়ে গেছে। জঙ্গি শাসন জারি হয়েছে। এক জঙ্গির পর আরেক জঙ্গি এসেছে। তারপর আজ ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের বছরটি এবং বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে সেই সংগঠনটি, যে সংগঠনটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাই এই সময়ে মানুষের আশা একটু অন্য রকম যে, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো বুঝি এখন সমাপ্ত হবে। পাকিস্তানের অনুসরণে আমাদের সংবিধানের যে খোলনলচে বদলে দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হবে। কিন্তু আসলে কি তা হয়েছে?

এখন একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে রাখা হয়েছে। সংবিধানেও সেটি আছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রও বহাল আছে। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে এই ধরনের গোঁজামিল কী করে থাকে এটা আমাদের বোধগম্য নয়। এই গোঁজামিল দূর করার দায়িত্ব তো বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছে, তাদের ওপরই বর্তেছে। এই গোঁজামিল যদি দূর না করা হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধুর যথার্থ অনুসারীরূপে আমরা কেউই নিজেকে দাবি করতে পারব না। নিজেদের বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে দাবি করতে হলে তার অসমাপ্ত কাজ অবশ্যই সমাপ্ত করতে হবে। বাকশাল নিয়ে নানারকম কূটতর্ক থাকলেও এটা ঠিক যে, বাকশালের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু যে ঘোষণাগুলো দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রের ব্যাপারে সে ঘোষণা বা সিদ্ধান্তগুলো ছিল অত্যন্ত প্রগতিমুখী। সেই প্রগতিমুখী ঘোষণাগুলো যাতে বাস্তবায়িত হয়, সমবায় পদ্ধতি যাতে সর্বত্র চালু হয়, যথার্থ অর্থেই জনগণের ক্ষমতা যাতে প্রতিষ্ঠা হয়, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা যাতে জোরদার হয়- সেই প্রত্যাশাই সবার। এ ক্ষেত্রে বর্তমানে যারা শাসন ক্ষমতায় আছেন, তারা যদি এগিয়ে না আসেন, আর যাই হোক জাতি কোনোমতেই তাদের বঙ্গবন্ধুর যথার্থ উত্তরাধিকারী বলে মেনে নিতে পারবে না। সেই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাণভোমরায় যে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় চেতনা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা রাখা আছে- এই প্রাণভোমরাটির একটি পাখাও ছিঁড়ে পড়ে গেলে কিংবা তার পরিবর্তে অন্য কিছু যুক্ত করলে প্রাণ আর অবশিষ্ট থাকে না। এমনটি আমরা ইতোমধ্যেই করে ফেলেছি কিনা অর্থাৎ সেই প্রাণভোমরার সংহারে উদ্যত হয়েছি কিনা আমাদের প্রত্যেকেরই সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে এবং মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে তাদের সহযোগী, সহমর্মী ও পৃষ্ঠপোষক সবার সম্পর্কেই অর্থাৎ সব খলনায়ক সম্পর্কেই আমাদের সদাসতর্ক থাকতে হবে। এবং এদের সবার নাটের গুরু যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সে যে আমাদের স্বাধীনতার অমৃত ফল অপহরণ করে নেওয়ার জন্য আগের মতো এখনও সক্রিয়, সে কথা মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হওয়া চলবে না। বিস্মৃত হওয়া চলবে না যে. স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই আমাদের মুক্তির সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। 'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম'- বঙ্গবন্ধু যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই অমর কবিতায় উচ্চারণ করে গেছেন, সেই পঙ্‌ক্তিই আজ আমাদের জাতির বীজমন্ত্ররূপে ধারণ করতে হবে। এবং সেই মন্ত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রযত্ন গ্রহণ করতে হবে।