আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার পরিচয় সত্তরের শুরু থেকে, তাকে আমি হাসনাত ভাই বলে সম্বোধন করতাম। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকলেও তিনি একজন কর্মীর মতো নিজেকে সক্রিয় রাখতেন। পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি সব সময়ই যুক্ত থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংসদের নেতৃত্বের ভূমিকায়ও তিনি ছিলেন। তাকে আমি সংস্কৃতির মাঠে সক্রিয় দেখেছি। তার নিজেরও সাহিত্যে কীর্তি ছিল। তিনি একজন কবি ছিলেন, ঔপন্যাসিক ছিলেন। বিশেষ করে ছোটদের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। তার সাহিত্য প্রতিভা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তিনি যখন সম্পাদনার জগতে চলে গেলেন, তখন তার অন্যসব প্রতিভা কেমন করে যেন আড়ালে চলে গেল।

আমার কাছে অবশ্য হাসনাত ভাই সব সময় একজন বড় কবি ছিলেন। একজন শিশুসাহিত্যিক ছিলেন। একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, তিনি খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন। ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন। প্রথম শ্রেণিতে খেলা খুব সহজ কথা নয়। তার একটা বড় গুণ ছিল তার বিনয়। এই বিনয়ের কারণে নিজের সম্পর্কে বলতে সর্বদাই তিনি সংকোচ বোধ করতেন।

হাসনাত ভাইয়ের আরও বড় একটা পরিচয় ছিল- তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই তিনি আগরতলা চলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কলকাতা গেলেন। কলকাতায় তিনি তার দলের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রেখে মুক্তিযুদ্ধে যা যা করার করে গেছেন। এখানেও তিনি তার স্বাভাবসিদ্ধ নীরবতা পালন করেছেন। কিন্তু নীরবতার কারণে কখনোই তার সক্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান আমরা অনেকেই হয়তো জানি না। কিন্তু তার অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে একাত্তরে তিনি যে সকল কাজ করেছেন, তার তালিকা দিলেও এ লেখার কলেবর অত্যন্ত বড় হয়ে যাবে- শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তিনি কাজ করেছেন। শরণার্থীদের সহায়তা করেছেন। বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে তার একটা বড় সংযুক্তি ছিল, তাদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের খবর তিনি বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেবার কাজ করেছেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। তা ছাড়া সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের বুদ্ধিজীবী ও লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে তিনি তাদের সমর্থন আদায় ও সমাবেশ ঘটানোর কাজটি খুব দক্ষতার সঙ্গে করেছিলেন। তার একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রয়েছে- সেখানে তিনি এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কিছু কিছু বলেছেন। কিন্তু সবসময়ই তিনি নিজের ব্যাপারে বলার ক্ষেত্রে সংযত থাকার চেষ্টা করতেন। কাজ করেছেন, তবে কাজের জন্য কখনও কোনো কৃতিত্ব দাবি করেননি।

ঢাকায়, আমার সঙ্গে যখন তার আন্তরিকতা হলো- এর আগে কবি হিসেবে তাকে আমি জানলেও আমাদের তেমনভাবে আলাপ পরিচয় ছিল না। সে বার তিনি নিজে এসে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এর একটা কারণ আমি ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা করেছি এবং ইংরেজি সাহিত্যে তখন অধ্যাপনা শুরু করেছি। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন গণসাহিত্য পত্রিকায় লেখার জন্য। ততদিনে আমি চিত্রকলা নিয়ে লিখতে শুরু করেছি। হাসনাত ভাই আমাকে বললেন, বাংলাদেশের চিত্রকর- একেবারে জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে যারা কাজ করছেন, তাদের নিয়ে লিখতে হবে। আমি তার ব্যবহারে এত মুগ্ধ হয়েছি যে, আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। সেই সময় থেকে একটা বন্ধুত্ব তার সঙ্গে আমার তৈরি হয়েছিল। তিনি একাধারে আমার একজন বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন, বন্ধু ছিলেন, পথপ্রদর্শকের মতোও ছিলেন।

যে সময়ে তার সঙ্গে আমার আন্তরিকতা হলো তখন বাংলাদেশের জন্য খুব কঠিন একটা সময় যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হাসনাত ভাই সে সময় বিচলিত হয়ে বারে বারে আমাকে বলতেন যে, এই মানুষগুলোর দুঃখ কীভাবে লাঘব করা যায়। আমি দেখেছি হাসনাত ভাইয়ের মধ্যে যে রাজনৈতিক সত্তাটা ছিল- সেটি জনদরদি, গণমুখী এবং পরিবর্তনকামী। এই পরিবর্তনটা যখন সম্ভব হয়নি, তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি আশা করছিলেন স্বাধীনতার পর একটা নীরব বিপ্লব হবে। আমার মনে হয়েছে, তিনি সমাজকে নিয়ে যে স্বপ্নটা দেখতেন সেটির বাস্তবায়ন না হওয়ায় মনে মনে তিনি খুবই কষ্টে ছিলেন। কিন্তু মুখ ফুটে তিনি কখনও তার কষ্টের কথাগুলো বলতেন না। তবে তিনি মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা কখনও ছেড়ে দেননি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়তো তিনি মানুষকে নিয়ে স্বপ্নটা দেখেছেন। পরিবর্তনের চিন্তা করে গেছেন। এবং পরিবর্তনের জন্য যে সমস্ত শক্তিকে সক্রিয় করতে হবে, সেগুলোকে সক্রিয় করার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন।

সত্তর দশকের শুরুতে এসে তিনি ভেবেছিলেন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলে তিনি বহু মেধা ও প্রতিভাকে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে পারবেন; এবং সেই মেধা ও মননের সমন্বয়ে তিনি বাংলাদেশে একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবেন। যে সংস্কৃতি মানুষকে জাগাবে। তিনি সংস্কৃতির শক্তিতে বিশ্বাস করতেন এবং সেটা সেই সংস্কৃতি, যেটা আমাদের ভূমি থেকে উৎসারিত। যাকে আমরা বাঙালিয়ানা বলি- সেই গ্রামবাংলার থেকে উঠে আসা সংস্কৃতির তিনি একজন বড়মাপের বিশ্বাসী ছিলেন। সে জন্য তিনি 'গণসাহিত্য' করেছেন। 'গণসাহিত্য' নামটিতেও সেই দ্যোতনা আছে। মানে গণমানুষের সাহিত্য। সেখানে কামরুল হাসানের ওপর আমার লেখাটা যখন বেরুলো, তখন কামরুল হাসানের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সূত্রপাত হলো। আমি দেখলাম যে, কামরুল হাসানকে কেন আবুল হাসনাত এত পছন্দ করতেন। ব্রতচারী আন্দোলন থেকে শুরু করে মানুষের পক্ষে যত সংগ্রাম- সেগুলোতে কামরুল হাসানের অকুণ্ঠ সমর্থন ও অংশগ্রহণের কারণে।

মোটা দাগে হাসনাত ভাইয়ের রাজনৈতিক চিন্তাগুলোকে আমি বিশ্নেষণ করি, তাহলে বলা যাবে যে, রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি গণমুখী ছিলেন, তিনি সমাজতন্ত্রী ছিলেন, একেবারে কমিউনিস্ট পন্থার সমাজতন্ত্রে তিনি এক সময় বিশ্বাস করলেও পরে কিছুটা সরে এসেছেন। সরে এলেও এই সমাজতন্ত্রের কমিউনিস্ট যে ব্যখ্যা ছিল, সেটাতে তিনি আস্থা স্থাপন করে এসেছেন। তার রাজনীতি ছিল তৃণমূলের সক্রিয়তার বিষয়। এবং সেখানে সংস্কৃতির একটা বড় ভূমিকা তিনি সবসময় গড়ে নিয়েছেন। তাকে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যদি দেখি, সেখানেও দেখা যাবে যে, একাত্তর থেকে তিনি আসলে এই গণমানুষকে সংগঠিত করার চেষ্টাটি করে গেছেন। আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই সমাজতান্ত্রিক চেতনার বাস্তবে প্রয়োগ ঘটলে হাসনাত ভাই তার সমাজ সংস্কারকে ভূমিকাটি আরও প্রসারিত করতেন। তার এই সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি তিনটি বিষয়কে খুব গুরুত্ব দিতেন। এসব ব্যাপারে তার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আমার দীর্ঘ আলাপও হয়েছে। বিষয় তিনটি হলো- শিক্ষা, সংস্কৃতি আর সক্ষমতা। শিক্ষাই সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে, আর সংস্কৃতি সেই সক্ষমতার ভিত্তিটাকে আরও উজ্জ্বল করে এবং তা মানুষের মনে ছড়িয়ে দেয়। এই সমাজ চিন্তা থেকে তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন। তবে প্রতিকূল অবস্থাতে তার মতো অনেকটা নিভৃতচারী মানুষের পক্ষে খুব জোরেশোরে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না। তবে আমি সবসময়ই বলি, তিনি নিভৃতচারী ছিলেন, তার চিন্তা ছিল একেবারে সম্মুখসারির। কিন্তু নিজেকে তিনি সব সময় আড়ালে রাখতেন এবং যখনই কোলাহল দেখতেন, কলহ দেখতেন- সেখান থেকে তিনি দূরে সরে থাকতেন। আমাদের রাজনীতিটা যেন কোলাহলের জায়গা হয়ে গেল, কলহের জায়গা হয়ে গেল- তখন তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে চলে গেলেন। তবে তিনি তার স্বপ্নটা লালন করে গেছেন।

আবুল হাসনাতের সাহিত্য চিন্তার কথায় যদি আসি- তিনি নিজেও সাহিত্যিক ছিলেন। কবিতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন কিন্তু শিশুসাহিত্যকে অনেক বড় করে দেখতেন। আমি মনে করি, আবুল হাসনাতের একটা পরিচয় হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিশু সাহিত্যিক এবং ষাটের দশকের একজন মানবতাবাদী ও জীবনধর্মী কবি। তিনি যে কবিতা লিখতেন তাতে সর্বদাই জীবনের একটা সুর থাকত। তিনি কখনও নিরীক্ষাবিরোধিতায় যাননি, নিরীক্ষাসর্বস্বতায়ও তিনি যাননি, নিরীক্ষাকে তিনি কবিতার বিষয়বস্তুর আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। যে বিষবস্তুতে জীবনের ঘনিষ্ঠতা থাকবে তার প্রকাশটি খুব জটিল হবে না, সেটা তিনি বিশ্বাস করতেন। হ্যাঁ, বিমূর্ততায় তার ঝোঁক ছিল, মাঝে মাঝে বিমূর্ত চিন্তাও তিনি কবিতায় উপহার দিতেন। কিন্তু এই বিমূর্ত চিন্তা একজন নিরালম্ব নাগরিকের নয়, এই বিমূর্ত চিন্তাটি জীবনের একজন সক্রিয় চিন্তাবিদের। এই বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে। তার কবিতার ভেতর জীবন ছিল, নিরীক্ষা যা ছিল জীবনের কারণেই সেটা এসেছে। এই নিরীক্ষা কখনও তার প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করেনি। তার কবিতায় রোমান্টিক চেতনা ছিল, নিসর্গ চিন্তা ছিল, দেশচিন্তা ছিল। তবে সবচেয়ে বড় ছায়াপাত ঘটিয়েছে সমকাল। তার কবিতায় সমকাল যেভাবে ধরা পড়েছে, তাতে মনে হয় তিনি সমকালে সমর্পিত একজন মানুষ ছিলেন। ইতিহাস চেতনা বলি, ভবিষ্যৎ চিন্তা বলি- তার কবিতায় চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে।

হাসনাত ভাই মাহমুদ আল জামান নামে কবিতা লিখতেন। কারণ পাকিস্তান আমলে যখন তিনি লেখা শুরু করেছেন, তখন স্বনামে লেখাটা একটা বিপজ্জনক বিষয় ছিল। এবং তার মতো জীবনধর্মী ও প্রতিবাদী চিন্তার কবিতা যারা লিখতেন, তাদের পক্ষে একটা আবরণ তৈরি করাটা সেসময় প্রয়োজনীয় ছিল।

আমি মনে করি তার কবিতা নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়নি কারণ তার কবিতাকে তার অন্যান্য চিন্তা থেকে আলাদা করা যায় না। তার সমাজ চিন্তা থেকে আলাদা করা যাবে না, তার সংস্কৃতি চিন্তা থেকে আলাদা করা যাবে না, তার নন্দন চিন্তা থেকে আলাদা করা যাবে না। তার কবিতায় তিনি কোনো চমক সৃষ্টি করতে চাননি বা কোনো নিরীক্ষাধর্মিতাকে প্রধান করতে চাননি। বিষয়বস্তুর ঘনিষ্ঠতাই তার কবিতার প্রধান অবলম্বন।

তিনি নিজে যেহেতু আড়ালে থাকতে পছন্দ করতেন, সে কারণে তার কবিতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। আর তার সম্পাদক সত্তা অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছায়া ফেলে রেখেছিল। মানুষ প্রথমেই তাকে সম্পাদক হিসেবে দেখতেন, তাকে যে প্রথমেই একজন কবি হিসেবে দেখতে হবে সেটা অনেকেরই মাথায় আসত না। তাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনার কারণে আমি তার কবিত্ব শক্তির প্রকাশ দেখেছি, কবি সত্তার প্রকাশ দেখেছি, তার সম্পাদক সত্তারও আমি একজন সাক্ষী। তার সম্পাদক সত্তার বিকাশ এবং উৎকর্ষের সময়ে তিনি যেসব কাজ করেছেন, তারও আমি সাক্ষী। আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। বহুদিন আমরা নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছি, তার সঙ্গে দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে আমার। হোটেলে একসঙ্গে আমরা ছিলাম। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় গিয়ে একই কক্ষে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। হাসনাত ভাই একটু বিব্রতবোধ করছিলেন যে, আমার তাতে কোনো অসুবিধা হয় কিনা! কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম, হাসনাত ভাই, আপনার সঙ্গে একই কক্ষ ভাগ করে থাকতে পেরে আমি আনন্দিত এই জন্য যে, আপনার কথাগুলো আমি রাতে এবং বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনতে পাবো।

বিদেশ ভ্রমণে গেলে যেটি হয়- দেশের পরিচিত গণ্ডি থেকে দূরে গিয়ে ভিন্ন একটা পরিবেশে অনেকেই নির্দি্বধায় তাদের কথার ঝাঁপি খুলে ফেলেন। আমাদের মধ্যেও প্রচুর আলাপ হয়েছে। হাসনাত ভাই সাধারণত খুব স্বল্পবাক ছিলেন, এমনকি টেলিফোন যখন করতেন নিতান্ত প্রয়োজনীয় দু-একটি কথার পরেই ফোন শেষ করে দিতেন। কিন্তু বিদেশে যখন গেলাম, বিশেষ করে কলকাতায়, একবার শান্তিনিকেতনে, একবার দিল্লিতে- তখন দেখেছি তার সঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে আমার আলাপ হয়েছে। সেইসব সুযোগে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি তার কাছ থেকে, জেনেছি তাকেও। সেই সব কিছু মাথায় রেখেই তাকে প্রথমে আমি একজন কবি হিসেবে বিবেচনা করি, এবং সেইসঙ্গে আমি তাকে একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে দেখি যেখানে তার মস্ত বড় কৃতিত্ব রয়েছে। তার শিশুসাহিত্য অসাধারণ অনুপ্রেরণাদায়ী। শিশুকিশোরদের ভাষাটা তিনি দারুণভাবে ধরতে পারতেন। তার 'সিটি দিয়ে যায় স্টিমার' এবং এমন অনেকগুলো শিশুসাহিত্যের বই পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে- তাকে যেমন গাম্ভীর্যপূর্ণ একজন মানুষ বলে সবার কাছে মনে হয়, তিনি শ্যেন দৃষ্টি নিয়ে যেভাবে সম্পাদনার কঠিন কাজটি করেন; সেই মানুষটি কীভাবে একেবারে শিশুদের মনের ভেতর ঢুকে তাদের বয়সটা ধারণ করে লিখে গেছেন! তাদের ভাষায় তাদের কল্পনাকে জাগ্রত করার কাজটি যারা করতে পারেন তাদের আমি সবচে বড় শিশুসাহিত্যিক মনে করি।

হাসনাত ভাই যে ক্রীড়াবিদ ছিলেন সেটা তিনি কখনও বলতেন না। কিন্তু আমরা অনেকেই দেখেছি একজন ক্রীড়াবিদের মতো শৃঙ্খলাবোধ তার মধ্যে ছিল। তার কাজের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ছিল। সময় নিয়ে তার মধ্যে উদ্বিগ্নতা আমি কখনও দেখিনি। দৈনিক সংবাদে যখন কাজ করতেন, আমি তার কাছে অনেকবার গিয়েছি। তখন দেখতাম তিনি একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। টেবিলে কাগজের ওপর ঘাড় গুঁজে আছেন, কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ করছেন না, সময় কোথায় চলে যাচ্ছে, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে খেয়াল করছেন না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আগে কাজটিই শেষ করতে হবে। একই অফিসে সন্তোষ গুপ্ত কাজ করতেন। সন্তোষ দা একদিন আমাকে বলেছিলেন, হাসনাত যখন কাজে নামে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে ঘড়ির দিকে তাকায় না। এ বিষয়টি আমার দারুণ লেগেছিল। আসলে কাজের যে নৈতিকতা- যাকে আমরা কর্মনৈতিকতা বলি হাসনাত ভাই তেমনই একজন কর্মনৈতিক মানুষ ছিলেন। আর সম্পাদক হিসেবেও তার গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না।

হাসনাত ভাই একটি লেখার ভাষার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। আর বানানের ব্যাপারেও ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। বানান ভুল দেখলে মনঃক্ষুণ্ণ হতেন। আমাকে অনেক দিন বলেছেন, বানানটা খুব যত্ন করে লিখতে হবে, কারণ বানান ভুল থাকলে একটা লেখা দাঁড়ায় না। বস্তুত আবুল হাসনাত সেই সম্পাদক ছিলেন, যিনি লেখক তৈরি করতেন। এটি আমি বাড়িয়ে বলছি না। এ রকম সম্পাদক বাংলাদেশের হাতে গোনা তিন-চারজন ছিলেন। হাসনাত ভাই ছিলেন সেই দলের শেষ প্রতিনিধি। আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও তিনি আমার কোনো ত্রুটি দেখলে তার সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। আমার গদ্য তার কাছে ঋণী- এটা আমি এক বাক্যে স্বীকার করি। সুঠাম গদ্য কীভাবে লেখা যায়- এ ব্যাপারে অনেকদিন আমি তার সঙ্গে আলাপ করেছি। অনেকেই এমনভাবে উপকৃত হয়েছেন তার কাছ থেকে। আমার ধারণা আবুল হাসনাতের এই সম্পাদকের জীবনী আমরা যদি কেউ একজন লিখতে পারি, এটা ভবিষ্যৎ সম্পাদকদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

এটা ঠিক এই সম্পাদক জীবনটাই তার অন্যান্য কীর্তিগুলো থেকে বেশি সামনে চলে এসেছিল। কিন্তু আমি যদি তার জীবনের দিকে সামগ্রিকভাবে তাকাই, তাহলে দেখবো একজন সম্পাদকের ভালোমন্দ বিচারটা তার মধ্যে ছিল। রাজনৈতিক শৃঙ্খলাটাও ছিল তার। গণমানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিল। সমাজ ও সংস্কৃতিকে উদযাপন করার একটা মানসিকতা তার মধ্যে সবসময়ই ছিল। বিবর্তনের ধারায় দেশের মানুষ আবার জেগে উঠবে এমন একটা আশাবাদ তার ছিল। এবং একটা সুষম সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় জনগোষ্ঠীর মতো একই সুবিধা ভোগ করে- সেই স্বপ্নটা তার ছিল। আমাদের জীবনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনিবার্যতা তিনি সব সময় স্মরণ করেছেন। তিনি ক্রমাগত নিজেকে সংশোধন করার জন্য সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতাকে জনপ্রিয় করে তোলার একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন। তার যত্নশীল সম্পাদনার কারণে দৈনিক সংবাদের বৃহস্পতিবারের পাতার জন্য তখন পাঠক অপেক্ষা করতেন। কাকে তিনি সেই সাহিত্য পাতায় জায়গা দেননি? যেই একটি প্রতিভা পেয়েছেন তাকেই তিনি তার পাতায় স্থান করে দিয়েছেন। তার সাহিত্যপাতায় যে বইয়ের লেখা ছাপা হতো সেটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের 'হূৎকলমের টানে'র মতো অসংখ্য বইয়ের কথা বলা যাবে।

এই যে বহুবিধ প্রতিভা ও রুচির অধিকারী একজন মানুষ, যে মানুষটি সংস্কৃতির ভেতরকার শক্তিতে আস্থা স্থাপন করতেন, তিনি তরুণদের সংস্কৃতবান হতে উপদেশ দিতেন, নিজের সংস্কৃতিতে বিশ্বস্ত হতে বলতেন, নিজের জীবনে বাঙালিয়ানার চর্চা করতেন এবং অন্যদের উৎসাহিত করতেন- সেই মানুষটির অভাব আমরা কোনোদিন পূরণ করতে পারব না।

মন্তব্য করুন