আমাদের মনে আজ ভারি আনন্দ। আজ আমাদের জন্য রয়েছে মিয়াজিমা দ্বীপ ভ্রমণ। জাপান ট্যুরে এই একটি মাত্র দিন যেখানে ক্লাস নেই, পড়া নেই। হুররে আনন্দ। মিয়াজিমা দ্বীপ হিরোশিমার কাছেই। আদতে এটি একটি ছোট্ট দ্বীপ, কিন্তু ইতিহাস ও প্রকৃতি এই দ্বীপকে অনন্য করে তুলেছে। এই দ্বীপকে পবিত্র দ্বীপ বলে মনে করে জাপানিরা। বিশ্বাস করে ঈশ্বরের আবাস এখানেই। দ্বীপে আছে মিজেন পাহাড়। আর পাহাড় মানেই রহস্য। সপ্তাশ্চর্য কাহিনি আছে একে ঘিরে। কোন অতীতকালে বৌদ্ধ পুরোহিত কনো দাইসি কোকাই চীন থেকে জাপানের এই পাহাড়ে এসে ধ্যানে বসেন। ১০০ দিন ধ্যানের পরে তিনি জানান এটি পবিত্র দ্বীপ, পাহাড়ের চারপাশে অলৌকিক সব রহস্য আছে। এসব রূপকথা উপকথা থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ইটসুকুসুমা নামের মঠ। তোরি তোরণ হিসেবে বাইরের দুনিয়ায় এটি পরিচিতি লাভ করেছে।

সবুজ পাহাড়ের তীরে বয়ে যাওয়া নীল সমুদ্রের বুকে 'তোরি তোরণ' ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ট্রেনিংয়ের শেষ দিনে ফিরে আমরা সব চলেছি সেই পবিত্র দ্বীপে। আমরা মানে সব শ্রেণির মানুষ, বিভিন্ন দেশ ও ভাষার, সুখী ও দুখী, তরুণ ও বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছি, অপেক্ষা করছি একটুকরো সবুজের জন্য। পায়ে পায়ে নীল পেরিয়ে আরও নীল। আমরা চলেছি শেকড় থেকে শিখরে কিংবা শিখর থেকে শেকড়ে। আমরা সমুদ্র দেখব বলে কেউ সিটে বসিনি, ফেরির খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। ওপরে নীল আকাশে সাদা সাদা রাজহাঁসের পালক- নরম নরম মেঘ। সুন্দর সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। দূরে জেগে উঠেছে সবুজ ভূখণ্ড, সমুদ্রের বুকে টিপের মতো। আসমুদ্র নোনাজলে জেগে উঠেছে রক্ত লাল তোরণ, জেগে উঠেছে অপার মহিমায় পবিত্র দ্বীপ মিয়াজিমা। ঘড়িতে তখন সাড়ে ৯টা কেবল, কিন্তু ভোরের বাতাস মিলিয়ে গেছে, দূরে রহস্যময় পাহাড় থেকে নেমে আসছে পায়রা রঙের রোদ। আমি ব্যাগ থেকে গুচির নকল রোদচশমা বের করি। দ্বীপে নামতে গিয়ে দেখি দূরে কোথাও ঝুপ সাঁতারে রূপকথা আনন্দে ভেসে যাচ্ছে কেউ, হঠাৎ তখন ভিনদেশি শব্দগুলো নূপুর হয়ে বাজতে থাকে- ঝম ঝম। ঝম ঝম।

দ্বীপটা সবুজ মানে ভীষণ সবুজ। স্বপ্নের মতো সুন্দর দ্বীপে- তোরি তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ফটোসেশন হয়। ওখানে একটা বিশাল ঘণ্টা আছে, সবাই তাতে ঝংকার তোলে। আমরাই-বা বাদ যাই কেন? চং চং শব্দ করে জানান দেই। আমরা তারপর হাঁটতে শুরু করি এসময় সাক্ষাৎ মেলে একরাশ বুনো হরিণের। যেন সবাইকে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব পড়েছে তাদের ওপর। ভয় নেই তাদের চোখে, হাঁটছে তারা আমাদের পাশে। সুগিয়ামা সান সাবধান করেন, 'হাতে মানচিত্র, চিপস বা ক্যামেরার ব্যাগ দেখলে ছিনতাই করবে এই সব হরিণ'। তাই একটু সাবধানে চলতে হবে। উনি বলে যান, 'এগুলোকে মনে করা হয় পবিত্র প্রাণী- ঈশ্বরের দূত'। একসময় জাপানের আইনে এসব হরিণকে মেরে ফেললে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। আইনের বিধান পাল্টেছে। তবে পবিত্র হরিণের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা এখনও দণ্ডযোগ্য অপরাধ। হরিণের দুষ্টুমি তাই মেনে নিতে হবে হাসিমুখে। এই দ্বীপে আছে পবিত্র মন্দির- সেও রক্ত লাল রঙের। অশুভ আত্মাকে ভয় দেখাতে তোরি তোরণ ও মন্দিরের রং হয়েছে আগুন লাল। মন্দিরে ঢোকার আগে পবিত্র পানি দিয়ে সবাইকে হাত-মুখ ধুয়ে নিতে হয়। 'শিন্তো' মন্দির ও 'বৌদ্ধ' মন্দির দুটো পাশাপাশি। 'শিন্তো' মন্দিরটি বিখ্যাত। আমরা মন্দিরে যাই, বড় সুন্দর তার স্থাপনা। জাপানিরা বড় সৎ, নৈতিকতায় অনন্য কিন্তু ধার্মিক নয়। শিন্তো আর বৌদ্ধধর্ম সহাবস্থান করছে দেশটিতে। কেউ কেউ একসাথে দুটো ধর্ম পালন করে, তাতে কেউ হারে রে রে করে হুংকার তোলে না। মন্দিরে যে কেউ আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারে। তার মনের ইচ্ছেটা জানতে পারে। শিন্তো দেবতা তখন মুচকি হেসে বলেন, 'তথাস্তু'। জাপানের স্থানীয় এবং অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ধর্ম শিন্তো- এই ধর্মে ঈশ্বর নেই, ধর্মগ্রন্থ নেই, নেই পরকাল বা নির্দিষ্ট কোনো রীতিনীতি। এই ধর্মের মূল কথা, কিছু স্বাধীন আত্মা বা স্বর্গীয় সত্তা মানুষের জীবনে নিয়ে আসে শুভ ও কল্যাণ। এদেরকে কামী বলা হয়, পূজা ও আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কামীদের খুশি করার রেওয়াজ রয়েছে। জাপানে ৭২ শতাংশ মানুষের মনে বহু ধর্মের সহাবস্থান রয়েছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়, বিভিন্ন সামাজিক আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্যই তাদের মন্দিরে যাওয়া। জাপানে তাই সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মন্দির বা শ্রাইন। নববর্ষ, শিশু জন্ম, শিশুদের তিন, পাঁচ ও সাত বছরে পদার্পণ, বিদ্যালয়ে প্রবেশানুষ্ঠান, পরীক্ষা, বিয়ে অনুষ্ঠান, শ্রদ্ধা সংক্রান্ত অনুষ্ঠান থেকে পুতুল উৎসবেও সবাই মিলে মন্দিরে যাওয়া। একসাথে অনুষ্ঠান উদযাপন ধর্মকেন্দ্রিক কোনো বিভাজন ও সংঘাত জাপানে নেই। জাপানের বিস্ময়কর অগ্রগতির পেছনে এই বোধের অনেকখানি ভূমিকা রয়েছে।

আমরা রোদে হাঁটতে থাকি এলোমেলো। বিদেশি পর্যটকদের জন্য হেঁটে যাওয়ার রাস্তাটি দারুণ। রাস্তাটির রয়েছে দাঁতভাঙা নাম 'অমোটে স্যাডো শোটেনগাই'। রাস্তার দু'পাশে বর্ণিল সব দোকান। এসব দোকান স্যুভেনিরের জন্য বিখ্যাত। আমরা দৌড়ে দৌড়ে ওইসব দোকানে ঢুকি আর দাম শুনে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু দাম যাই হোক, জাপানি স্যুভেনির তো কিনতেই হবে। আমি কিমানো পরা জাপানি কাঠের পুতুল কিনি। কিনি জাপানি হাতপাখা, ফ্রিজ ম্যাগনেট ও চকলেট। এর মধ্যে এখানকার বিখ্যাত পিঠা কিনে খাই, জাপানের পিঠা বলে কথা। ম্যাপল পাতা আকৃতির মিষ্টি 'সোমিজি মানজু' খেতে ভালো। দুপুরের খাবারের জন্য আমরা বড় রেস্তোরাঁয় ঢুকি। নিখাদ জাপানি রেস্তোরাঁ, দেয়াল জুড়ে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি, তবে পাশ্চাত্য কায়দায় উঁচু টেবিল। পূর্ব আর পূর্বে নেই, পশ্চিমও এসেছে পূর্বে। চপস্টিকের পাশাপাশি কাঁটাচামচ ছুরিও আছে। স্টিকি রাইস, টেম্পুরা, সবজি আর সস দিয়ে সামুদ্রিক মাছ আমাদের সামনে পরিবেশন করা হয়েছে, সাথে মিশো স্যুপ। সমুদ্রের মাছ টাটকা ধরে এনে ভাজা হয়েছে পর্যটকদের জন্য, তার স্বাদও তাই ভালো। মাছ কাঁচা নয়; সয়াসস, আদা আর কাঁচামরিচ দিয়ে রান্না করা। খেতে মন্দ নয়। জাপান খাবার আপ্যায়নে মিতব্যয়ী। টেবিল জুড়ে আমাদের মতো একগাদা খাবার পরিবেশনের রেওয়াজ না থাকায় নষ্ট হয় না খাবার। এবার আমি সব খাবারই খেতে পারলাম, ভালো লাগল টেম্পুরা। আমরা বললাম, 'অইসি।' আমরা জানি জাপানি ভাষায় 'অইসি' মানে মজা। বাইরে তখনও রোদ রুপালি রঙের। এই রোদ যেন গয়না হিরের। আমরা এবার রোদ মাথায় করে যাই অ্যাকুয়ারিয়ামে। এর জাপানি নাম সুইজো- কান। এই ছোট দ্বীপে রীতিমতো সমৃদ্ধ কালেকশন-৩৫০ প্রজাতির তেরো হাজার সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে সাজানো এই অ্যাকুয়ারিয়াম। পেঙ্গুইন ও সামুদ্রিক ঘোড়াকে খাওয়ানোর জন্য ডুবুরিরা নেমে যায় বিশাল জলরাজ্যে। আমরা শিশু আনন্দে তা দেখি- ছবি তুলি। ওপরে শাপলা মাছের মতো বিশাল মাছ ভেসে চলে। আমরা বিশাল পাতাদেহী মাছের চোখ খুঁজতে থাকি। আমাদের সাথের তরুণ সঙ্গীরা এর মধ্যে খবর নিয়ে এসেছে একটু সামনে এগোলেই 'ডক্টর ফিশ রাখা আছে'। মানুষ হাত মেলে দিলে তারা নিপুণ দক্ষতায় পুরোনো চামড়া পরিস্কার করে দেয়। জাপানি শিশুরা ডক্টর ফিশের সামনে একটু কলকল করে উঠছে। স্টার ফিশ, কচ্ছপসহ নানারকম সামুদ্রিক প্রাণী স্পর্শ করে দেখার সুযোগ রয়েছে বাচ্চাদের জন্য। প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার কায়দা দেখতে ভারি ভালো লাগছে। এর মধ্যে পুলের সামনে ডলফিনের নাচের শো শুরু হলে আমরা পড়িমরি করে ছুট দিই। অ্যাকুয়ারিয়ামটা ছোট হলেও নানারকম অ্যাকটিভিটিজ আর মনোরম পরিবেশের জন্য ঘণ্টাখানেক সময় দারুণ কেটে যায়।

মিয়াজিমা দ্বীপ থেকে আর আমাদের ফিরে যাবার ইচ্ছে হয় না, কিন্তু ফিরে যাবার সময় হয়ে যায়। দিনের রোদ্দুরের গন্ধ ততক্ষণে মুছে গেছে। ফেরিতে করে এবার ফিরতে হবে হিরোশিমা। দূরে দাঁড়িয়ে আছে কতশত পর্যটক। অন্য কোনো ফেরির জন্য অপেক্ষা তাদের। এসব শব্দ ও গন্ধ, মেঘ ও মানুষ সব অন্যরকম আজ, সুন্দর কিন্তু বিষাদমাখা। কিন্তু কেন তা বুঝি না। মানুষের কথা যখন হারিয়ে যায়, তখন কথাগুলো কি দীর্ঘশ্বাস হয়ে যায়? আকাশে সাদা রাজহাঁসের মেঘগুলো আর নেই, আকাশ কেমন দাঁড়িয়ে আছে নীল-গোলাপি শাড়ির আঁচল উড়িয়ে। কিংবা কিমানোর মতো মেঘ নিয়ে আকাশ হয়ে উঠেছে জাপানি আকাশ। সত্যি ছিমছাম এই সমুদ্র শহরটিতে আমরা বড় আনন্দ করেছি। সমুদ্রের ঢেউগুলো একটু যেন নেচে নেচে ওঠে আনন্দে, আছড়ে পড়ছে তীরে। মনে হয় আনন্দের সাথে দুঃখ যেন হাত ধরে নেচে বেড়াচ্ছে। যেন কোনো এক ম্লান মেয়ে শতবর্ষের হাহাকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্র তখন সমুদ্র নেই, আকাশ নেই আকাশে। সব কেমন ম্যাজিক রিয়েলিটি হয়ে যায়। আমরা ওই অলৌকিক বিকেলে দু-হাতের মুঠোয় তুলে নিই জল; কিন্তু এ আসলে জল নয়, জীবন- অখণ্ড ও অপার। মনে মনে বলি, ভালোবাসা নাও ঝরাপাতা। ভালোবাসা নাও দূরের না দেখা পাহাড়। সমুদ্রের স্রোতে একটু যেন ঝংকার ধ্বনি শোনা যায়। হুম, কান পাতলে শোনা যায় সমুদ্র গান করে উঠেছে মি- য়া-জি-মা। মি-য়া-জি-মা। দূরে যে রহস্যে ঘেরা পাহাড়ের সারি সেখান থেকেও যেন গান ভেসে আসে মি-য়া-জি-মা। মি-য়া-জি-মা। ফেরিতে উঠতে না উঠতে বৃষ্টি আসে রুপালি ওড়না দুলিয়ে। ফেরিতে মুখ বের করে আমরা দেখি নানা দেশি মানুষ। বৃষ্টি তার রুপালি ওড়না দিয়ে ঢেকে দেয় আমাদের মুখ। সমুদ্রের ওপর এবার বৃষ্টি নামছে খুব। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখি আকাশ গভীর বেদনায় যেন নীল হয়ে উঠেছে। আকাশ আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছে কবিতা লেখার গোপন নীল খাতা। ফেরির ঠান্ডা ঘরে কাচের শার্সিতে মুখ রাখা অচেনা মানুষগুলোকে দুখী লাগে খুব। মনেই হয় না আজই পাহাড়ের চিবুকে দেখেছি পায়রা রঙের রোদ।

মন্তব্য করুন