গান বা সিনেমার অঞ্জন দত্তের সঙ্গে সবারই কমবেশি পরিচয় ঘটেছে। কিন্তু থিয়েটারের অঞ্জন দত্তকে হয়তো আমরা অনেকেই সেভাবে চিনি না। সাজ্জাদ হুসাইনের বই 'নাট্যঞ্জন'-এ ভিন্ন এক মানুষ অঞ্জন দত্তের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটেছে। যেখানে অঞ্জন দত্ত বলেছেন, 'প্রথমত তিনি একজন নাট্যাভিনেতা'। গত শতকের সত্তর দশকের শুরু থেকে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু। তিনি চেয়েছিলেন সিনেমার অভিনেতা হতে। তাই নাটক করতে গিয়েছিলেন, অভিনয় শিখতে গিয়েছিলেন। নাটক নিয়ে করেছেন বিস্তর চর্চা। নাটকের প্রেমে পড়েছেন। সেইসব গল্প আর তার কার্যকারণ থাকছে 'নাট্যঞ্জন' বইটিতে।

'নাট্যঞ্জন'-এর লেখক সাজ্জাদ হুসাইনকে নিয়ে অঞ্জন দত্ত ঢুকে পড়েন কলকাতার পুরোনো থিয়েটার পাড়ায়। সেখানে দেখা মিলেছে ধসেপড়া 'রঙ্গনা', 'বিজন', 'সারকারিনা'র। লেখককে সঙ্গে করে প্রখর রোদের ভেতর দিয়ে অঞ্জন দত্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন নর্থ ক্যালকাটার হাতিবাগানজুড়ে। সেখানে নটী বিনোদিনী সরণি, নটী বিনোদিনীর বাড়ি, নাট্যগুরু গিরিশ ঘোষের বাড়ি, বিখ্যাত স্টার থিয়েটার। শ্যামবাজারে নান্দিকারের প্রবীণ সদস্য রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর সঙ্গে কথোপকথন। মঞ্চনাটকের আরেক পুরোধা ব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তীর গলফ গ্রিনের বাড়িতে দীর্ঘ আড্ডা।

এই সবকিছু মিলিয়ে 'নাট্যঞ্জন' অঞ্জন দত্তের নাট্যজীবন নিয়ে লেখা বই হতে হতে কলকাতার বাংলা পেশাদার থিয়েটারের ইতিহাসনির্ভর বই হয়ে গেছে। 'নাট্যঞ্জন' বইয়ের ভূমিকায় অঞ্জন দত্ত লিখেছেন, 'নাটক বা অভিনয় আমার আসল পরিচয়। সেই পরিচয়টা আমার দর্শক বা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তা নিয়ে একটা প্রচণ্ড আক্ষেপ ছিল। আমার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে, বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে যেটা করতে গেলাম এবং খ্যাতি পেলাম, কত দেশ-বিদেশের মানুষের ভালোবাসা পেলাম; অথচ যা দিয়ে যাত্রা শুরু, সেটি খুব একটা কেউ জানল না।' অঞ্জন দত্ত তার থিয়েটারের মাধ্যমেই সিনেমাতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তার থিয়েটারের অভিনয় দেখেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মৃণাল সেনের আগে তিনি বুদ্ধদেব বসুর চোখে পড়লেও তার আগেই মৃণাল সেনের 'চলচ্চিত্র' (১৯৮১) সিনেমাতে এবং 'খারিজ' সিনেমাতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। মাত্র ১১ মাসের ব্যবধানে দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন অঞ্জন দত্ত। তার প্রথম সিনেমা 'চলচ্চিত্র' ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ক্রিটিকসদের বেশ প্রশংসাও লাভ করেছিল। সিনেমাতে তার সৃজনশীলতার প্রসার লাভ করলেও থিয়েটারটাকে পুরোপুরি ছাড়তে পারেননি কখনোই। সিনেমার ফাঁকে ফাঁকে থিয়েটার চালিয়ে গেছেন অঞ্জন দত্ত। জার্মান নাট্যকার টাঙ্কেড দস্ত অঞ্জন দত্তের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকে জার্মানিতে গিয়ে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। গিয়েছিলেন জার্মানিতে কেবল থিয়েটারের টানে। জার্মানিতে অঞ্জন দত্ত থিয়েটার দেখেছেন, করেছেন, শিখেছেন। সেখানে তিনি ব্রেখটের নাটক দেখেছেন। ছোটবেলা থেকে রক মিউজিকের সঙ্গে পরিচিত অঞ্জন দত্ত ইউরোপে গিয়ে সেটার একটা ধারা খুঁজে পেলেন। সেখানে থিয়েটারে লাইভ মিউজিক পরিবেশনা তাকে অভিভূত করেছিল। ব্রেখটের 'থ্রি পেনি অপেরা' লন্ডনের গ্যাংস্টারদের নিয়ে করা, সেখানে মিউজিকের ব্যবহার করা হয়েছে, অঞ্জন দেখেছেন কীভাবে সবকিছু লাইভে করছেন ইউরোপের নাট্যকাররা। কিন্তু মঞ্চাভিনয় পাগল এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটি থিয়েটারের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা আর চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এক সময় থিয়েটার থেকে অনেকটা অভিমান নিয়ে দূরে সরে এসেছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর বাদে অঞ্জন দত্ত থিয়েটারে ফিরে এলেন 'গ্যালিলিও' নাটক দিয়ে। 'গ্যালিলিও'র পর করেছেন 'মেধা', তারপর 'থ্রি পেনি অপেরা'। 'তারায় তারায়' নাটকে তিনি ভ্যান গগের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অঞ্জন দত্তের থিয়েটারের শেষ প্রোডাকশন হচ্ছে 'সেলসম্যানের সংসার'- যার একটা শো ঢাকার বেইলি রোডের মহিলা সমিতিতে মঞ্চায়ন করা হয়েছিল। সেই সময়েই তাকে নিয়ে লেখা সাজ্জাদ হোসেনের এই 'নাট্যঞ্জন' গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করে গিয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত। বইটি পড়ে শুধু নাটকের অঞ্জন সম্পর্কেই নয় তার সঙ্গে থিয়েটার এবং ভারতীয় মঞ্চ ও অভিনয় জগতের বহু অজানা তথ্যই পাওয়া সম্ভব হবে পাঠকের।

মন্তব্য করুন