সময়টা ঢাকার নবাব আবদুল গনির বাবা খাজা আলীমুল্লাহর জীবনের শেষ পর্যায়ে। সাল ১৮৫২। আলীমুল্লাহ ওই বছরেই বিখ্যাত হীরা দরিয়া-ই-নূর ব্রিটিশ সরকারের নিলামকারী সংস্থা কলকাতার হ্যামিলটন অ্যান্ড কোং-এর কাছ থেকে নভেম্বর মাসে ক্রয় করে নিলেন। দাম ৭৫ হাজার রুপি। এর দু'বছর পর ১৮৫৪ সালে খাজা আলীমুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখ্য, আলীমুল্লাহ তার পুত্র আবদুল গনিকে ১৮৪৬ সালে ওয়াক্‌ফ করে জমিদারির দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই এ দুর্লভ হীরাটি ক্রয় সংক্রান্ত কাগজপত্র আবদুল গনির নামেই তৈরি করা হয়েছিল। এমন দুর্লভ হীরাটি কিনবার জন্য নবাব পরিবার যেন মুখিয়ে ছিল। কারণ এমন একটি রত্নের মালিক হওয়া এই পরিবারের জন্য যেন খুবই প্রয়োজন। কী নেই তাদের! ধন-সম্পদ, জমিদারি। তবুও কী যেন নেই! তাদের প্রয়োজন এখন সামাজিক মর্যাদা। আর সেই মর্যাদা পেতে এমন রত্নের গর্বিত মালিক হওয়া যে তাদের জন্য খুবই দরকার।

খাজা পরিবারের আদি বাস ছিল কাশ্মীরে। আদি পুরুষ খাজা আবদুল হাকিম কাশ্মীরের বাদশা মুহাম্মদ শাহের আমলে কাশ্মীর থেকে দিল্লিতে চলে আসেন। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করেন। দিল্লিতে হত্যা ও লুণ্ঠন চালান নাদির শাহ। দিল্লির মোগল সম্রাটের ময়ূর সিংহাসন-রত্নভাণ্ডার সব লুটে নিয়ে যান। খাজা পরিবার তখন ভাগ্যান্বেষণে বের হয়ে সোজা পূর্ববঙ্গের সিলেটে বসতি স্থাপন করে। খাজা আবদুল হাকিমের দৌহিত্র খাজা আবদুল ওয়াহাব ও খাজা আবদুল্লাহ কাশ্মীর থেকে সোজা ঢাকায় চলে আসেন। শুরু হয় এ দেশে তাদের ভাগ্যোন্নয়নের সূত্রপাত। সেখান থেকে কয়েক পুরুষ তাদের ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি ঘটান। চামড়া, গাঁজাসহ নানা ব্যবসা করে তারা অগাধ ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলেন। কিনেছিলেন জমিদারি। আলীমুল্লাহ তার জমিদারি বিস্তৃত করেছিলেন ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে। ১৮৩৫ সালে ফরাসি কুঠিয়ালদের কাছ থেকে এখনকার অতি পরিচিত আহসান মঞ্জিলটি কিনে নেন তিনি। শুধু ঢাকারই নয়, পুরো পূর্ববঙ্গের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন আলীমুল্লাহ। অর্থবিত্তে সমৃদ্ধ হয়ে উঠলেও সামাজিক আভিজাত্যে তার অবস্থান তখন অনেক নিচে। একসময় আলীমুল্লাহ অভিজাতদের কাতারে নাম লেখানোর প্রয়োজনীয়তা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করলেন। অভিজাত হওয়ার নেশা থেকে কেনা শুরু করলেন রত্নরাজি। ক্রয়ের মূল উৎস ছিল সে সময়ের ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত পরিবারগুলো। আভিজাত্য বাড়ানোর জন্য আলীমুল্লাহ জুড়িগাড়ি কিনেছিলেন, ঘোড়দৌড় আয়োজন করতেন, বিশেষ ভোগ ও জলসার আয়োজনও করতেন। তবে পুরনো রত্নরাজি, মণি-মাণিক্য কেনাই হয়ে উঠেছিল তার মূল নেশা।

দরিয়া-ই-নুরের মালিক হওয়ায় পূর্ববঙ্গে তাদের আভিজাত্য ও ঐশ্বর্য এক উচ্চস্তরে পৌঁছে যায়। সে সময়ে ব্রিটিশ ভারতের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ঢাকায় এসে দরিয়া-ই-নূর দেখে ধন্য হতেন। এসএম তৈফুর Glimpse of Old Dhaka (1954)-তে উল্লেখ করেছেন, আহসান মঞ্জিলের বড় সিঁড়িঘরে একটি সোনার বাঁধাই করা দর্শনার্থীদের জন্য ভিজিটর বুক রাখা হতো। সেই বইয়ে ভারতীয় ও ইউরোপীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এ রত্নরাজি বিষয়ে মন্তব্য করতেন। লেডি ডাফরিন তার লেখা Our Viceregal life in India তে উল্লেখ করেছেন, ১৮৮৭ সালের ৬ জানুয়ারি বালিগঞ্জে ঢাকার নবাবের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ও লর্ড ডাফরিন হাতির দাঁতের পাটি, হীরকখচিত তরবারি ইত্যাদির সঙ্গে দরিয়া-ই-নূর প্রথম দেখেছিলেন। ১৮৮৮ সালের নভেম্বর মাসেও ডাফরিন দম্পতি ঢাকায় পুনরায় দরিয়া-ই-নূর দেখেছিলেন। লেডি ডাফরিন তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, নবাব তাদের বেশকিছু রত্ন দেখিয়েছিলেন, যার মধ্যে কোহিনুরের বোন হিসেবে পরিচিত দরিয়া-ই-নুরও ছিল। এ থেকে বোঝা যায়, দরিয়া-ই-নুরের গুরুত্ব এবং বিখ্যাত কোহিনুরের সঙ্গে এর একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্রও আছে, যা পরে জানব।

বিখ্যাত দরিয়া-ই-নুর ছাড়াও নবাবদের আরও মূল্যবান রত্নরাজি ছিল, যা বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। নবাব আহসানুল্লাহ ও সলিমুল্লাহর সেক্রেটারি মির্জা ফকির মোহাম্মদের দৌহিত্র মোহতারামের Glory that was Ahsan Manjil (Holiday Feb-7, 1982) লেখা থেকে জানা যায়, একবার নবাব আহসানুল্লাহ তার রত্নরাজি দেখানোর আদেশ করলে বড় বড় তিনটি টেবিলে থরে থরে তা সাজানো হয়েছিল। প্রচুর হীরা, রুবি, পান্না, নীলকান্ত মণি, মুক্তার মালায় সেই টেবিলগুলো ছিল পূর্ণ। কলকাতার বিখ্যাত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে ঢাকার নবাব তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বাছাইকৃত অলঙ্কার দিয়ে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করলেন। ছবি ও স্বল্প বর্ণনা দিয়ে প্রকাশিত অ্যালবামটি ঢাকার ইতিহাসের বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই অ্যালবামটি দিয়ে আমরা অন্তত নবাবের রত্নরাজি সম্পর্কে একটি আংশিক ধারণা পেতে পারি। স্বাভাবিকভাবেই ওই অ্যালবামে নবাবের উল্লেখযোগ্য রত্নগুলো ছিল, যার মধ্যে বিখ্যাত দরিয়া-ই-নূরও ছিল। ছবির ওই সকল রত্নরাজির কিছু নবাবদের পুরনো পোর্ট্রেট আলোকচিত্রে পরিধানরত অবস্থায় লক্ষ্য করা যায়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক প্রফেসর দানি তার Dacca. A Record of its changing fortunes (Dhaka-1962) তে উল্লেখ করেছেন, সিনভার ফিলিগ্রি মডেল ও হাতির দাঁতের পাটিসহ বেশকিছু দর্শনীয় নিদর্শন আহসান মঞ্জিলে সংরক্ষিত থাকায় নবাবের প্রাসাদ যেন জাদুঘরের মতো সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। কিন্তু এসব রত্নরাজি ও মূল্যবান দ্রব্যাদি যা নবাব পরিবার তথা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ তার কতটুকু টিকে আছে? দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এই বিশাল রত্নরাজির প্রায় সবই হারিয়ে গেছে বা এর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সৌভাগ্যক্রমে দরিয়া-ই-নূর এখনও এ দেশে ঢাকাতেই রয়ে গেছে। অন্য দ্রব্যাদির মধ্যে দানির উল্লিখিত আহসান মঞ্জিলের দুটি ফিলিগ্রি মডেল, হোসেনি দালানের ফিলিগ্রি মডেল এবং হাতির দাঁতের পাটি বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। নবাবের রত্নরাজির অ্যালবামটিতে প্রায় ১৪টি অলংকারের বর্ণনা ছিল। নবাব প্রাসাদে আগত অতিথিদের স্যুভেনির হিসেবে এটি দেওয়া হতো। রঙিন চিত্র সংবলিত স্যুভেনিরটি আজ দুষ্প্রাপ্য। এই স্যুভেনিরে রত্নগুলোর যে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া যায় সেটা তুলে ধরছি।

১. দস্তবন্ধ বা বাজুবন্ধটি বিশুদ্ধ ভারতীয় টেবল ডায়মন্ড বা হীরার তৈরি। মাঝখানের কেন্দ্রের বড় হীরাটির নাম দরিয়া-ই-নুর বা আলোর নদী। এটা পৃথিবীর একটি বিখ্যাত হীরা, যার নাম কোহিনুর হীরার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। এটি উজ্জ্বলতা ও স্বচ্ছতায় পরিপূর্ণ। আদিতে এটা পারস্যের বাদশার অধিকারে ছিল। পরে তা পাঞ্জাবের রণজিৎ সিংয়ের হস্তগত হয়। পাঞ্জাব যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার এটি হস্তগত করে এবং তাদের কাছ থেকে ঢাকার নবাবের পূর্বপুরুষ কিনে নেন।

২. দরবারি তলোয়ার বেল্টের অলংকৃত বকলেস এটি। বৃহৎ অখণ্ড ত্রুটিমুক্ত আয়তাকার পান্নার চারদিকে উজ্জ্বল হীরার সারি দিয়ে ঘেরা। এটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্ন নিদর্শন।

৩. এটিও অনুরূপ তলোয়ার বেল্টের বকলেস। আয়তাকার মসৃণ লালরির চারদিকে দু'সারি উজ্জ্বল হীরার বর্ডার দিয়ে ঘেরা।

৪. শিরপেচ বা মাথার অলঙ্কার। উজ্জ্বল রুবি কেটে পাপড়ির সমাহারে তিনটি ফুল, যার প্রতিটির মাঝখানে তিনটি বড় পান্না বসানো এবং দুটি পান্না তিনটি ফুলকে বিভক্ত করেছে। এমন চমৎকার অলঙ্কার সে যুগেই দুর্লভ ছিল।

৫. বাজুবন্ধ :এই অলংকারটি মোগলদের অধিকারে ছিল, যা মূল্যবান প্রত্নবস্তু। পান্নার তৈরি কেন্দ্রীয় পাথরটিতে কোরআনের আয়াত খোদিত। পাশের দু'দিকে দুটি পান্নার মাঝখানে একটি করে টেবল ডায়মন্ড বসানো, যার ভেতর আল্লাহ লেখা আছে। কব্জার সাহায্যে পান্না তিনটি সংযোজিত এবং চারদিকে উজ্জ্বল হীরার বর্ডার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।

৬. পাগড়ির অলংকার :গোলাপ ফুল পাতা ও কলিসহ একটি ডাল, যা উজ্জ্বল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হীরা দিয়ে তৈরি। গোলাপের মাঝখানে খাঁটি 'পিজিয়ন ব্লাড' রঙের বার্মা রুবি বসানো। অলঙ্কারের পিছনের আধারে ক্ষুদ্র কোরআন শরিফ রাখা হতো। 'কাশ্মীরি গোলাপ' নামে পরিচিত অলঙ্কারটি ছিল নবাব পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতীক।

৭। স্টার লকেটযুক্ত হার :দুষ্প্রাপ্য পুরোনো উজ্জ্বল হীরার সাহায্যে এই তারকা লকেটটি তৈরি করা হয়েছে। এই লকেটটি দরবারি অনুষ্ঠানে নবাব একটি বড় মুক্তা দিয়ে তৈরি মালার সঙ্গে পরতেন। এই অলঙ্কারটি পূর্বে ইউগিনির সম্রাজ্ঞীর সংগ্রহে ছিল।

৮। শিরপেচ :উজ্জ্বল হীরা ও পান্নার সমন্বয়ে তৈরি এ শিরপেচটি নবাব তার আনুষ্ঠানিক পোশাক ফেজ টুপির সঙ্গে পরতেন।

৯ ও ১০। উজ্জ্বল হীরার তৈরি দুটি তারকা :এই অলঙ্কার দুটি নবাব ও তার পুত্র দরবারি অনুষ্ঠানে তাদের পোশাকে নানাভাবে পরিধান করতেন।

১১। অলংকৃত ফেজ টুপি :টুপির ব্র্যান্ডটি উজ্জ্বল হীরা ও মুক্তা দিয়ে তৈরি। ট্যাসেলে লম্বা সুতোগুলো মুক্তা ও শেষের দু'প্রান্ত পান্না দিয়ে তৈরি। আনুষ্ঠানিক পোশাকের সঙ্গে নবাব এটি মাথায় পরিধান করতেন।

১২। আনুষ্ঠানিক তরবারি :খোদাই নকশাযুক্ত সোনার তৈরি তলোয়ারের বাঁটে হীরা দিয়ে চন্দ্রাকৃতি এবং তারকাকৃতি দ্বারা অলঙ্কৃত। রুপার তৈরি নকশাকৃত খাপের দু'প্রান্তে ও মাঝখানে সোনার তৈরি অলংকরণ এবং মাঝেও অলংকরণের মধ্যে নবারের পরিবারের প্রতীক বা কোট-অব-আর্মস্‌ খোদাইকৃত।

১৩। মালা বা নেকলেস :মুক্তার মালার মাঝে ছয়টি চমৎকার লালরির গুটি ও বেশকিছু পান্নার গুটির সমন্বয়ে তৈরি। দামি ভারতীয় হীরা দিয়ে লকেটটি তৈরি, যার নিচে একটি লালরির তৈরি পেনড্যান্ট সংযুক্ত।

১৪। গলার হার বা নেকলেস :তিন নরী মুক্তার হার, যার দু'প্রান্তে হীরার তৈরি সিঙ্গারা আকৃতির ডিজাইন যুক্ত হয়েছে এবং মাঝখানে হীরার তৈরি লকেটের নিচে একটি পান্নার তৈরি পেনড্যান্ট ঝুলানো। এমন ১৪টি অলংকার নবাবগণ তাদের বিভিন্ন দরবারি অনুষ্ঠানে পরতেন। এর বাইরেও প্রচুর অলংকার ছিল, যা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় তার হদিস আজ আর পাওয়া যায় না। এমনকি অ্যালবামে প্রকাশিত ১৪টি অলংকারের মধ্যে শুধু দরিয়া-ই-নুরের অবস্থান জানা যায়। এসব অলংকারের মধ্যে দরিয়া-ই-নুর তার বৃহৎ আকৃতি, উজ্জ্বলতা এবং ঐতিহাসিক কারণে বিখ্যাত হয়ে আছে। দরিয়া-ই-নূর সে সময়ে বঙ্গে সবচেয়ে বড় হীরকখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সন্দেহ নেই, দরিয়া-ই-নুরই ছিল নবাবদের রত্নরাজির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও মূল্যবান অলংকার। ব্রিটিশ জুয়েলারি হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানি জানিয়েছে, প্রাকৃতিক ও বিশুদ্ধ হীরকখণ্ডটি টেবিল আকৃতির, সমতল পৃষ্ঠ এবং মূল পাথরটি বর্ণহীন। মূল হীরাটির চারদিকে ছোট ছোট আরও ১০টি ডিম্বাকৃতির হীরকখণ্ডকে সোনার ফ্রেমের সাহায্যে মূল হীরার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। দরিয়া-ই-নুর-বাজুবন্ধরূপে ব্যবহার করা হতো। দরিয়া-ই-নুর প্রথমে দীর্ঘ দিন মারাঠা রাজাদের অধিকারে ছিল। এরপর তা হায়দরাবাদের নবাব সিরাজুল মুলকের পূর্বপুরুষ তা এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকায় কিনে নেন। এরপর দিল্লির মোগল সম্রাট খুব সম্ভব হায়দরাবাদ থেকে এই হীরকখণ্ডটি হস্তগত করেন।

নবাব আহসানুল্লাহর পর থেকে নবাব পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয়। সীমাহীন অপচয়, লাগামহীন দানশীলতা, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কোন্দলকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নবাব পরিবারের সংগৃহীত নানা রত্নরাজির কোনো হদিস কেন পাওয়া যায়নি, তা একটি উদাহরণে স্পষ্ট হবে। পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে নবাব আহসানুল্লাহ তার বড় ছেলে নবাব সলিমুল্লাহকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাননি। ইংরেজ সরকার প্রদত্ত খেতাবি প্রথানুযায়ী বড় ছেলে হিসেবে সলিমুল্লাহ নবাব পদে আসীন হলেও পরিবারের সকল কর্তৃত্ব তিনি পাননি। ফলে সুযোগ বুঝে নবাবের অন্য ভাই ও বোনেরা তাদের সম্পদের অংশ দাবি করেন এবং জুয়েলারি জাতীয় সকল দ্রব্য বিক্রি করে সেই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। নবাব সলিমুল্লাহ দরিয়া-ই-নুর এবং তার দরবারি পোশাকে আলোকচিত্রে যে সকল অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় দেখি, তা নবাবি দায়িত্ব নেয়ার সময় পদমর্যাদার প্রতীকস্বরূপ তার হস্তগত হয়েছিল।

নবাব সলিমুল্লাহর সময় থেকেই নবাব পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয়। নবাব সলিমুল্লাহ প্রচুর ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখেও যখন বুঝলেন যে তার পক্ষে আর ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়; তিনি দরিয়া-ই-নুর বিক্রি করার জন্য ১৯১২ সালে হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ইংল্যান্ডে পাঠান। সেখানে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তা ফেরত আসে এবং কলকাতায় হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির কাছে রক্ষিত থাকে। দীর্ঘ দিন পরে পাকিস্তান সৃষ্টির পর কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির হস্তগত থেকে একটি ভেলভেট কাপড়ে মোড়ানো বাক্সে ৬টি মুক্তাসহ দরিয়া-ই-নুর ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ সালে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকার শাখায় তা জমা রাখা হয়।

১৯৫৯ সালে নবাব পরিবারের একটি অংশ দরিয়া-ই-নুরকে পাবলিক নিলামে বিক্রির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। কিন্তু খাজা নাজিমুদ্দিন এর বিরোধিতা করেন। তিনি এর বিশুদ্ধতার প্রশ্ন তুলে বিষয়টি সেবারের মতো ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ঢাকার ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এ দেশ ত্যাগ করে এবং তাদের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানকে অর্পণ করে। উক্ত ব্যাংক থেকে ১৯৬৬ সালের ২১ জুলাই দরিয়া-ই-নুরকে তুলে নিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সদরঘাট শাখার লকারে রাখা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ন্যাশনাল ব্যাংক-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে সোনালী ব্যাংক আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে হীরাটি সোনালী ব্যাংকের সদরঘাট শাখার ভল্টে সংরক্ষিত আছে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর দরিয়া-ই-নূর সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও নানা জটিলতার কারণে ফলপ্রসূ হয়নি। ১৯৮৮ সালে সরকার জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য একটি কমিটি গঠন করলেও তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ১৯৮৫ সালে নবাব পরিবারের পক্ষ থেকে হীরকটির বিশুদ্ধতা ও পরিমাণ যাচাইয়ের জন্য উটাই জেমোলজিক্যাল সার্ভিস, ঢাকাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। উক্ত সংস্থা হীরকটি অকৃত্রিম বলে মত দেয়। ফলে দরিয়া-ই-নুরের বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ দূর হয়।

পৃথিবীর বিখ্যাত রত্নরাজির মধ্যে দরিয়া-ই-নূর উল্লেখযোগ্য। এর ঐতিহাসিক পটভূমির জন্য রয়েছে বিশেষ প্রত্নমূল্য। দরিয়া-ই-নুর আমাদের জাতীয় সম্পদ। এমন মূল্যবান জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীক দরিয়া-ই-নুর আমাদের রক্ষা করা দরকার।

মন্তব্য করুন