নিঃসঙ্গতা ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত! যত দূরে সরতে চাইবেন, ততই সে আপনাকে পেয়ে বসবে। পার্টি করবেন, হুল্লোড়ে মাতবেন। নিস্তার নেই। শত মানুষের মধ্যেও দেখবেন, আপনি একা। একেবারে একা।

হারুকি মুরাকামি নিঃসঙ্গ মানুষকে বুঝেছেন। বুঝেছেন বিষণ্ণতা কী। তার মতো করে আর কেউ বোধ হয় বোঝেননি। আমি মুরাকামিকে বেছে নিয়েছিলাম আমার সবচেয়ে বিষণ্ণ দিনগুলোতে। ডুবে গিয়েছিলাম পুরোপুরি। শত চেষ্টায়ও আর ভেসে উঠতে পারিনি।

২.

আমি তখন শান্তিনগর থাকি; পাঁচতলার ওপরে একটা মাঝারি সাইজের অ্যাপার্টমেন্টে। একেবারে একা। ম্যারিড ব্যাচেলর বলা যায়। আমার স্ত্রীর নাম যুথি। সে তখন পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের জন্য বেলজিয়াম গেছে। আমি একা একা বাসায় বসে থাকি। কোথাও যাই না। কিছু করি না। কথাও বলি না কারও সঙ্গে। শুধু নাটকের শুটিং থাকলে শুটিংয়ে যাই। বেঁচে থাকতে হলে টাকা রোজগারের দরকার আছে। শুটিং করি। টাকা পাই। চাল-ডাল কিনি। রান্না করি। খাই। এই তো- মুখস্থ রুটিন।

শান্তিনগরে অশান্তি কত প্রকার ও কী কী, তা হারে হারে টের পাই প্রতিদিন। ২০১৬-এর কথা বলছি।

এর কিছুদিন আগে একটা ছবি বানিয়েছিলাম। ফ্লপ গেছে। সুপার-ডুপার ফ্লপ। মানুষ আর্ট ফিল্ম বানিয়ে ফ্লপ যায়। আমি কমার্শিয়াল ফিল্ম বানিয়ে ফ্লপ গেছি। সুতরাং আমার ডিপ্রেশনের লেভেলটা একটু আলাদা। একদিন আবিস্কার করলাম, শরীরের ওজন কমে যাচ্ছে। দ্রুত কমছে। যুথির বড় বোন ডাক্তার। আমি তাকে আঁখি আপু বলে ডাকি। তিনি বললেন, নির্ঘাৎ ডায়াবেটিস।

আমাকে ঠেলেঠুলে মেডিসিনের এক সিনিয়র ডাক্তারের চেম্বারে পাঠালেন। টেস্ট-ফেস্ট করে দেখা গেল, ডায়াবেটিস নেই। সেই ডাক্তার আমাকে রেকমেন্ড করলেন এক হেপাটোলজিস্টের কাছে। সেই ভদ্রলোক আরও কিছু টেস্ট করলেন। গলার মধ্য দিয়ে একটা নলের মতো জিনিস নামিয়ে দিলেন। সেই নলের আগায় বাঁধা একটা ক্যামেরা। ছবি তোলা হবে লিভারের। প্রক্রিয়াটার নাম এন্ডোসকপি। ছবি-টবি দেখে ডাক্তারের মুখ ভার হয়ে গেল। বললেন, আপনার লিভারে সমস্যা।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, কী ধরনের সমস্যা?

খারাপ ধরনের।

কতটা খারাপ?

লিভার সিরোসিস। ট্রান্সপ্লান্ট করাতে হবে। প্রিপারেশন নেন।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, কোনো কিছুর প্রিপারেশন নেব না। চুপ হয়ে গেলাম। সারাদিন বাসায় থাকি। বই পড়ি। ক্ষুধা লাগলে খিচুড়ি বা নুডলস জাতীয় কিছু একটা রান্না করে ফেলি। কারও সঙ্গে কথা বলি না। অসুখের ব্যাপারটা চেপে গেলাম। শুধু শুধু একগাদা লোককে বিরক্ত করার মানে নেই। চেপে যাওয়া বেটার। জীবন খুব সহজ। এটাকে পেঁচিয়ে জটিল করার কিছু নেই।

একদিন দুপুরের পর আর পারলাম না। মনে হলো, কোথাও যাই। কারও সঙ্গে দুটো কথা বলি। এই পর্যায়ে এসে আবিস্কার করলাম, কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না। বুয়েটের বন্ধুরা কেউ দেশে নেই। পরিচিত-অপরিচিত সবাই ব্যস্ত। বেশ ব্যস্ত। কাজ করছে। কিছুক্ষণ উদ্‌ভ্রান্তের মতো রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে বাসায় ফিরে এলাম। এরপর করলাম একটা ভুল। মস্ত বড় ভুল।

হারুকি মুরাকামির 'নরওয়েজিয়ান উড' বইটা হাতে নিয়ে বসলাম। এর আগে এই লেখকের নাম শুনেছি অনেক। পড়া হয়নি। রাত ৮টায় পড়া শুরু করলাম, ও ধিং :যরৎঃু-ংবাবহ :যবহ, ংঃৎধঢ়ঢ়বফ রহ সু ংবধঃ ধং :যব যঁমব ৭৪৭ ঢ়ষঁহমবফৃ

পরদিন মাঝরাতে গিয়ে বইটা পড়া শেষ হলো। মাঝখানে ঘুম নেই। একবার নুডলস রান্না করে খেয়েছি। এটুকুই। 'নরওয়েজিয়ান উড' এক বসায় পড়ার সাইজের বই নয়। মোটাসোটা বেশ, এগারোটা অধ্যায় আছে। কিন্তু আমি ততক্ষণে ডুবে গেছি। ভেসে ওঠার সামর্থ্য আমার আর নেই। মুরাকামির গদ্যের একটা মজা হচ্ছে, তিনি সচেতনভাবে জটিল শব্দ এড়িয়ে যান। পাণ্ডিত্য দেখানোর নূ্যনতম চেষ্টা করেন না। বইটার ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন জে রুবিন। তার অনুবাদও অত্যন্ত সহজ-সাবলীল। ডিকশনারি নিয়ে বসতে হয় না। তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়।

বইটার যখন ২০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়া শেষ হলো, আবিস্কার করলাম যে একটু একটু করে আমার মন খারাপ হচ্ছে। আর মাত্র শখানেক পেজ বাকি। এই চমৎকার উপন্যাসটা অনন্তকাল ধরে পড়তে পারলে মনের মধ্যে শান্তি পেতাম। ভয় হচ্ছিল, কখন শেষ হয়ে যায়। এ ভয় থেকেই পড়ার গতি কমে এলো। একসময় শেষ হয়ে গেল বইটা। এই শেষ হওয়াটাও খুব ভয়ংকর। বিটলসের গানের মতো। একা করে দিল। একদম একা।

আমি আগে থেকেই ডিপ্রেশনে ছিলাম। মুরাকামি পড়ে মনে হলো, ডিপ্রেশনের একটা কুয়ার মধ্যে আমাকে কেউ যেন ছুড়ে মারল। এখান থেকে আর কখনও উঠতে পারব না। কোনোদিন না। জঘন্য একটা অনুভূতি। জঘন্য কিন্তু আনন্দের। যন্ত্রণার, কিন্তু সে যন্ত্রণা পেতে ইচ্ছে হয়।

আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হলো, কেউ যদি ডিপ্রেশনে ভোগেন, তাহলে মুরাকামি পড়বেন না। মনের ভুলেও না। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন এই ভদ্রলোক থেকে। তার লেখা আপনাকে আরও বিষণ্ণ করে দেবে। মনের মধ্যে এমন একটা সুর আপনি শুনতে পাবেন, যে সুর শোনার জন্য আপনার মন তৈরি নয়। বিপদ ঘটে যেতে পারে।

আমি সাধারণত লেখক ধরে বই পড়ি। কোনো লেখকের একটা বই পড়ে ভালো লাগলে পরপর তার সব বই পড়ার চেষ্টা করি। পরদিন আমি উইকিপিডিয়া ঘাঁটলাম। মুরাকামির সব বইয়ের একটা লিস্ট তৈরি হলো। ততদিন পর্যন্ত তার উপন্যাস বেরিয়েছে ১৩টি। ছোটগল্পের বই চারটি। নন-ফিকশনও লিখেছেন বেশ কিছু। ইন্টারনেটে প্রায় সব বইয়েরই পিডিএফ আছে। একদম ফ্রি।

সমস্যা হচ্ছে, আমি পিডিএফ বই পড়তে পারি না। চোখে চাপ পড়ে। পিডিএফে টেক্সট রিফ্লো অপশন নেই। হিজিবিজি মনে হয়। ইপাব বা মোবি ফরমেটের বই হলে আরাম করে পড়তে পারি। হার্ডকপি বইয়ের দরকার হয় না। বইয়ের দোকানগুলোতে মুরাকামির সব বই পাওয়া যেত না তখন। যেগুলো পাওয়া যেত, সেগুলোর গলাকাটা দাম। আমি ছোটখাটো একটা হিসাব করলাম মনে মনে। এত দাম দিয়ে বই কেনার বদলে একটা অ্যামাজন কিন্ডেল ডিভাইস কিনে ফেলা বেটার অপশন মনে হলো। কিন্ডেলে ই ইনক (ঊ ওহশ) স্ট্ক্রিন। আরাম করে মোবি ফরমেটে বই পড়া যায়। সাইজে ছোটখাটো। ক্যারি করা সহজ। ঢাকার জ্যামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকার সময়গুলো বই পড়ে কাটানো যাবে। খরচও অর্ধেক।

শুধু হারুকি মুরাকামির বই পড়ব বলে আমি একটা কিন্ডেল ডিভাইস কিনে ফেললাম। এরপর প্রথম যে বইটা পড়লাম তা হলো 'ওয়াইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিক্যাল'। ৬০০ পৃষ্ঠার ওপরে বই। ইচ্ছে করেই এত মোটা একটা বই বেছে নিয়েছিলাম। চাচ্ছিলাম না জার্নিটা দ্রুত শেষ হয়ে যাক। একটা উপন্যাস পড়া হলো চরিত্রগুলোর হাত ধরে দীর্ঘ একটা পথ হেঁটে চলা। চরিত্রগুলো যদি হয় আমার মতো নিঃসঙ্গ, তাহলে তাদের সঙ্গে বেশ ভাব হওয়ার সম্ভাবনা।

একটু একটু করে দু-তিন বছর ধরে পড়ে ফেললাম তার সব বই। কোনো বই একাধিকবার। প্রথমবার র‌্যাপিড রিডিং স্টাইলে। দ্বিতীয়বার কিন্ডেল স্ট্ক্রিনে হাইলাইট করে। তৃতীয়বার শুধু হাইলাইটেড অংশটুকু পড়লাম। 'কিলিং কমেনডেটর' উপন্যাসটা বোধ হয় পড়েছি চারবার।

তবে সব বই পড়িনি। নন-ফিকশন কয়েকটা বই পড়ে শেষ করতে পারিনি। এর কারণ সম্ভবত নন-ফিকশনে আমি খুব একটা আগ্রহ পাই না। আর সে বইগুলো তিনি যে বিষয়বস্তুর ওপর লিখেছেন, সেগুলোর সঙ্গে খুব একটা কমিউনিকেট করতে পারছিলাম না।

তার আরেকটা বই পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। জোগাড় করতে পারিনি। সেটা ২০১৫ সালে জাপানি ভাষায় বেরিয়েছিল। বইয়ের খটমট জাপানিজ টাইটেলটা লিখতে পারছি না। ইংরেজিতে বইটার টাইটেল হতে পারে এ রকম 'নভেলিস্ট অ্যাজ অ্যা প্রফেশন'। অনেক ভাষায় অনুবাদ হলেও এখন পর্যন্ত ইংরেজিতে এর কোনো অনুবাদ বের হয়নি। আমারও পড়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বইটা পড়ার ব্যাপারে আমার বেশ আগ্রহ আছে। অনেক কষ্টে অ্যামাজন থেকে একটা অডিওবুক জোগাড় করেছিলাম। সেই অডিওবুকে কিছু অংশ ইংরেজিতে অনুবাদ করা ছিল। এখন আর সেই অডিওবুকটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অ্যামাজনে।

এ বই পড়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহের কারণ হচ্ছে, মুরাকামি এ বইতে তার প্রতিটি উপন্যাস লেখার পেছনের ঘটনাগুলো বলেছেন। মুরাকামি লেখক হওয়ার ঘটনাটা আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন।

তিনি ছিলেন স্টেডিয়ামে। বেসবল খেলা দেখছিলেন। হুট করে মনে হলো, তিনি চাইলে একটা উপন্যাস লিখতে পারেন। এ কথাটা সেদিন কেন তার মনে হয়েছিল, তিনি জানতেন না। আজও জানেন না।

কিন্তু তিনি জেনে গেলেন, তাকে উপন্যাস লিখতে হবে। বাড়িতে ফেরার পথে কাগজ-কলম কিনলেন। সেদিন রাতেই বসে গেলেন কিচেন টেবিলে। বসে গেলেই তো হবে না। উপন্যাস কী, সেটা কীভাবে লেখে, একটা গল্প কীভাবে তৈরি হয়, তৈরি হওয়ার পর সেটা কীভাবে বলতে হয়- এ মৌলিক বিষয়গুলো তো জানতে হবে।

জানার চেষ্টা শুরু হলো। পড়ার অভ্যাস তার আগে থেকেই ছিল। ক্ল্যাসিক রুশ সাহিত্য তার রুচি তৈরি করেছিল। আমেরিকান ডিটেকটিভ গল্পও ছিল পড়া। এবার তিনি পড়তে শুরু করলেন সমসাময়িক জাপানিজ সাহিত্য। এবং একপর্যায়ে আবিস্কার করলেন, তিনি লিখতে শুরু করেছেন।

সাদা পাতা কালো অক্ষরে ভরিয়ে দেওয়া এক জিনিস। আর সত্যিকারের উপন্যাস হয়ে ওঠা অন্য জিনিস। তিনি নিজের লেখার গুণগত মান বিচার করতে বসলেন। একটা উপন্যাস হয়ে উঠতে যে বিষয়গুলো জরুরি, সে বিষয়গুলোর উপস্থিতি তার লেখায় অনুভব করলেন। এবং একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পারলেন, ওটা প্রাণহীন। পাঠক টানার মতো কোনোকিছু ওটার মধ্যে নেই। অন্য কেউ হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিত। তিনি ছাড়লেন না।

মাথা থেকে উপন্যাসের আঙ্গিকগত বিষয়গুলো ঝেঁটিয়ে বিদায় করলেন। মনের কথা শুনলেন শুধু। কাগজ-কলম ফেলে ক্লজেট থেকে টেনে বের করলেন পুরোনো অলিভেটি টাইপরাইটার। খটখট শব্দে লিখতে শুরু করলেন। একেবারে প্রথম থেকে। এবার তিনি সে কথাগুলোই লিখলেন, যেগুলো তার মনের ভেতর থেকে আসে।

মাতৃভাষার বদলে আশ্রয় নিলেন ইংরেজির। এমন নয় যে ইংরেজি ভাষাটা তার দখলে ছিল। ইংরেজিতে তার শব্দভান্ডার ছিল সীমিত। বাক্যরীতি নিয়েও সমস্যায় ভুগতেন। কিন্তু এই সমস্যাগুলো তার জন্য শাপে বর হয়ে এলো। জটিল বাক্যরীতির বদলে তিনি ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করলেন। এবং আবিস্কার করলেন যে সীমিত কিছু শব্দ দিয়েই তার লেখা বেশ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন কোনো শব্দ তিনি লিখলেন না, যার অর্থ বের করার জন্য অভিধান ঘাঁটার প্রয়োজন পড়ে। আশ্চর্য রকমের সরল এক গদ্যভাষা তৈরি হলো।

এরপর টাইপরাইটারটা আবার ক্লজেটে ঢুকিয়ে রাখলেন। টেনে নিলেন পুরোনো কাগজ-কলম। পুরো ইংরেজি লেখাটা জাপানিজে অনুবাদ করতে বসলেন। মুরাকামির ভাষায়, সেটা ট্রান্সলেটেড নয়- ট্রান্সপ্লান্টেড। অনেকটাই নতুন করে লেখা। এ পুরো প্রক্রিয়ায় জন্ম নিল মুরাকামির নিজস্ব গদ্যভাষা। লেখা হলো প্রথম উপন্যাস 'হিয়ার দ্য উইন্ড সিং'।

ওপরের এ ঘটনাটা পড়েছিলাম 'দ্য টেলিগ্রাফ' পত্রিকায়। সেই থেকে তার অন্য উপন্যাসগুলো লেখার পেছনের ঘটনা জানতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। সে যা-ই হোক, মুরাকামি যখন পড়েছিলাম, তখন স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি আমি তার বই বাংলায় অনুবাদ করব। লেখালিখি অনেক জটিল একটি কাজ। নিজের নাটক বা সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখা পর্যন্ত আমার দৌড়। সেটুকু পারি। কিন্তু উপন্যাস লেখা বা অনুবাদের নিশ্চয় আলাদা কিছু গ্রামার আছে। সেই গ্রামারগুলো যেহেতু জানি না, অনুবাদ করব এমন কোনো চিন্তা আমার মাথায় আসেনি।

৩.

২০২০ সালের ২ জানুয়ারি। দিল্লির ফোরটিস হাসপাতালে আমার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হলো। ১২ ঘণ্টার জটিল অপারেশন। ডক্টর বলে দিলেন যে এক বছরের মধ্যে কোনো কাজ করা যাবে না। সারাদিন বাসায় বসে থাকতে হবে।

এই বিশাল সময়টা এখন আমি কী করে কাটাব? ছবি দেখতে শুরু করলাম খেয়ে না খেয়ে। আগেই কিছু বই জোগাড় করে রেখেছিলাম। সারাদিন বই পড়ি, সারারাত ছবি দেখি। দিন পনেরো এভাবে কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু আর কত!

মুরাকামির 'দ্য ইয়ার অব স্প্যাগেটি' গল্পের চরিত্রের মতো অনুভব করলাম, আমার নিজের সময়গুলো ভরিয়ে তোলার জন্য কৃত্রিম একটা কাজ জোগাড় করতে হবে। নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে হবে। মাথার মধ্যে অটোসাজেশন দিতে হবে। বলতে হবে, আমি কিছু একটা করছি। গল্পের চরিত্রটা তার একলা সময় কাটানোর জন্য ক্রমাগত স্প্যাগেটি রান্না করত। সে রকম কিছু একটা।

চিত্রনাট্য লেখা যেতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, কভিড-১৯-এর কারণে শুটিং বন্ধ। চিত্রনাট্য লেখা হয় শুট করার জন্য। টেবিলে ফেলে রাখার জন্য নয়। আর চিত্রনাট্য লেখার সঙ্গে আর্থিক একটা যোগাযোগ আছে। লিখলে সেটার বিনিময়ে টাকা পেয়ে আমি অভ্যস্ত। করোনাকালীন যেহেতু শুটিং হবে না, তাই টাকা পাওয়ার কোনো আশা নেই। টাকা ছাড়া অনুপ্রেরণা হয় না। প্রসেসটায় ফুলস্টপ পড়ে গেল।

শুরু করলাম অনুবাদ। সেটা করেও টাকার আশা নেই। তবু ভাবলাম, নতুন একটা কিছু করার চেষ্টা করা যাক। মুরাকামির যেসব গল্প পড়তে ভালো লেগেছে, সেগুলো বাংলায় অনুবাদ করার কাজ শুরু করলাম। অনুবাদের গ্রামার আমি জানি না। সমস্যা নেই। জানতে হবে না। নিজেকে বোঝালাম, আমি অনুবাদ করছি স্প্যাগেটি রান্নার বিকল্প হিসেবে। কোথাও ছাপতে দেব না। কাউকে পড়তে হবে না। সমস্যা তো কিছু নেই।

কিন্তু সমস্যা দাঁড়িয়ে গেল। আমার করা অনুবাদগুলো পত্রিকায় আসতে শুরু করল। এর পেছনে যেটুকু অবদান, পুরোটাই আমার কিছু বন্ধুর। তাদের পড়তে দিয়েছিলাম। তারা কলকাঠি নেড়েছে।

এ পর্যন্ত হারুকি মুরাকামির দুটো উপন্যাস আমার অনুবাদে বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বই আকারে বেরিয়েছে। সেগুলো হলো 'নরওয়েজিয়ান উড', 'হিয়ার দ্য উইন্ড সিং'। বড়সড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে আমার অনুবাদে মুরাকামির আরও দুটো বই মার্চে বইমেলায় বের হবে। তার মধ্যে একটা উপন্যাস। আর একটা আমার পছন্দের কিছু ছোটগল্প নিয়ে সংকলন।

কিন্তু সত্যটা হলো, আমি একজন হাতুড়ে ডাক্তার। না জেনে, না বুঝে ফোঁড়া কেটে যাচ্ছি। আমাকে যদি কেউ অনুবাদের গ্রামার শিখিয়ে দেয়, আমি এই কাজটা আর করতে পারব না। এ আমার অনুমান নয়। আমি জানি। নিশ্চিতভাবে জানি।

পড়ার সময়ে যেমন মজা পেয়েছি অনুবাদের কাজটা করেও একই রকম মজা পেয়েছি। মুরাকামির একটা বড় উপন্যাস অনুবাদ করতে গিয়ে তার বর্ণনারীতির ছোট ছোট ডিটেইলিং মুগ্ধতার সঙ্গে খেয়াল করেছি। যেটা হয়তো আমার গদ্যেও প্রভাব ফেলেছে কিছুটা। এরপর যা-ই লিখি না কেন, সে প্রভাবটুকু কাটানো বেশ কঠিন হয়ে যাবে।

'নরওয়েজিয়ান উড' বইটির শেষ অধ্যায় অনুবাদ না করে বেশ কিছুদিন ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। অন্য কোনো কাজে যে ব্যস্ত ছিলাম, তা নয়। অখণ্ড অবসর ছিল। কিন্তু কাজটা শেষ হয়ে যাবে চিন্তা করতেই বেশ মায়া লাগছিল।

তবু শেষ হয়। শেষ করতে হয়। শেষ করলাম একদিন। এবং শেষ করে কেমন বোকা বোকা লাগতে লাগল নিজেকে। মনে হলো, খুব আপনজন আমাকে ছেড়ে চলে গেল।

আপনজন চলে যায়। আটকানো যায় না। মানুষ শেষ পর্যন্ত একা, নিঃসঙ্গ। এমন এক গন্তব্যের দিকে সে ছুটে চলে, যেখানে সে পৌঁছাতে চায় না।

মুরাকামি পড়ে এটুকু অন্তত শিখেছি।

মন্তব্য করুন