কাহলিল জিবরানের সঙ্গে পরিচয় বিশ বছর আগে। প্রফেটের মাধ্যমে। প্রফেট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে। সেপ্টেম্বের শেষের দিকে। বিশ হাজার শব্দের এক বই। কালো মলাটের। গায়ের দাম আড়াই ডলার। প্রকাশের বিশ দিনের মাথায় নিউইয়র্কের বইয়ের বাজার থেকে সব কপি শেষ হয়ে যায়। বিশ দিন পর বইটি যারা কিনতে গেছেন, খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। প্রথম কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল ১৩০০ কপি। বইটির পাঠকপ্রিয়তা দেখে গেছেন জিবরান। অভাবনীয় সমাদর পেয়েছেন এই বইয়ের জন্য। সে এক ভিন্ন ইতিহাস। জিবরান বেঁচে থাকতেই বইটি অনূদিত হয়েছে বিশটি ভাষায়। নানা দেশ ও ভাষার পাঠকের কাছ থেকে এসেছে মুগ্ধ চিঠি। এসব সাফল্য দেখে যেতে পেরেছেন জিবরান। এক যুগ ধরে লেখা বইটি তাকে তাকে দিয়েছে খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। আমার জিবরান পাঠের সূত্রও এই বই। প্রকাশের বিরাশি বছর পর পড়েছি প্রফেট। জিবরান যে বইকে তার জীবনের সেরা কাজ বলে মনে করেছেন। বলেছেন, এই বই তাকে লিখেছে। তিনি লেখেননি। বলেছেন, প্রফেট লেখার জন্যই তার জন্ম। প্রফেট তাকে নতুন করে জন্ম দিয়েছে। বলেছেন, প্রফেট আমার প্রথম বই, পরিণত লেখা। এই লেখার জন্য যেন হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। এই প্রফেট পাঠের পর লেখক সম্পর্কে জানার আগ্রহ হয়। শুরু হয় তার চিন্তা, বিশ্বাস, প্রাচ্য প্রেম আর আস্তিকতার শেকড় সন্ধান। ধীরে ধীরে পড়তে থাকি বাকি সব বই। ম্যাডম্যান। ব্রোকেন উইংস। জেসাস সান অব মেনসহ বাকি কাজ। তার চিঠিপত্র। তাকে নিয়ে বন্ধুদের লেখা জীবনী। জীবনীকারদের বিশ্নেষণ। প্রথম দিকে আরবিতে লিখেছেন বেশক'টি বই। শেষের বইগুলো ইংরেজিতে। আরবি বইগুলোর ইংরেজি অনুবাদ পড়েছি। প্রফেট পড়েছি মূল ভাষায়। এই গ্রন্থের বিষয়, মূল বাণী, মানুষের জন্য জীবন দর্শন- সবকিছু মিলিয়ে তার আত্মিক চিন্তার প্রতি মুগ্ধতা জিবরান পাঠে আরও আগ্রহী করেছে আমাকে। প্রেম, বিয়ে জীবন নিয়ে তার দৃষ্ঠিভঙ্গির সঙ্গে নিজের ভাবনার সাদৃশ্যে বিস্মিত হয়েছি।

লেবাননের এক গরিব পরিবারে জন্ম জিবরানের। অসংসারী বাবা উপার্জনের পুরোটাই উড়িয়ে দিতেন মদ আর জুয়ার আসরে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে মাকে। দুর্নীতির দায়ে বাবা কারাগারে যায়। বারো বছর বয়সে মা ও অন্য ভাইবোনদের হাত ধরে পাড়ি দিয়েছেন আমেরিকার বোস্টনে। লেবাননের ছোট এক গ্রামে, পাহাড় ঘেরা প্রকৃতির উদারতায় বড় হওয়া জিবরানের এই প্রথম শহর দেখা। দালানকোঠা দেখা। মোটরগাড়ি আর নাগরিক মানুষ দেখা। এই মানুষ ভিনদেশি ভিনভাষায় কথা বলে তারা। জিবরানের ভাষা আরবি। কখনও সে স্কুলে যায়নি। গ্রামে সে আরবি অক্ষর শিখেছে গির্জায়। পুরোহিত নানার কাছে। জিবরান পরিবারের প্রথম সন্তান যাকে স্কুলে পাঠানো হয়েছে। এই হিসেবে সে ভাগ্যবান। মা চেয়েছেন আদরের ছোট পুত্রের জীবন যেন পরিবারের আর সবার চেয়ে আলাদা হয়। মা পুত্রকে বলে গেছেন ৩৫ বছর বয়সে নিজের সত্তার ডাক শুনতে পাবে সে। আশ্চর্য! তাই হয়েছে। সাদাসিধে এক মা কীভাবে বুঝতে পেরেছেন পুত্রের ভবিষ্যতের সূত্র। জিবরান সারা জীবন মায়ের অবদানের কথা মনে করেছেন। যে মা তার জীবনের নির্জনতাকে রক্ষা করেছেন। প্রথম তার হাতে তুলে দিয়েছেন রঙ-তুলি। তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ভিঞ্চির ছবির সঙ্গে। এই মা পুত্রের শিল্পের পথে বসিয়ে দিয়েছেন প্রথম ইট। কঠিন মাতৃভক্তি জিবরানের জীবনের বেঁচে থাকার সূত্র।

শৈশবে কঠিন দারিদ্র্যের মাঝে বড় হওয়া জিবরান, কামিলের পুত্র জিবরান মায়ের কাছেই পেয়েছেন প্রথম অগাধ প্রশ্রয়। মা সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য বোস্টনের পথে পথে হকারি করেছেন। অন্য সব সন্তানকে ছোট বয়সেই কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন, বড় ছেলেকে মুদি দোকানে, মেয়েদের সেলাইয়ের কাজে। একমাত্র ছোট পুত্রকে ভর্তি করেছেন স্কুলে। এই সিদ্ধান্ত বদলে দেয় পুত্রের জীবন। ছবি আঁকার সূত্রে শিক্ষকের সুনজরে পড়া বালকের জীবনের গতিপথ বদলে যায়। বস্তির জীবন থেকে ধীরে ধীরে সে পা রাখে শহরের অভিজাত পরিবেশে। শিল্পের জগতে। ওঠাবসা শুরু হয় সংস্কৃতিবান মানুষের সঙ্গে। ছবি আকার পর শুরু হয় লেখালেখি।

সারাজীবন আমেরিকায় থেকেও সেদেশের নাগরিকত্ব নেননি। মন ও মননে ছিলেন পুরোপুরি লেবানিজ। অভিবাসী মন পড়ে থেকেছে নিজ দেশে। সেখানকার প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি, আরব রোমান্টিক ও প্রতীকবাদী কবিদের ঐতিহ্য বারবার তার লেখার উপকরণ হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শন, চিন্তার সমন্বয় প্রফেটের শেকড় খুঁজতে গিয়ে এসব প্রসঙ্গও এসেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমেরিকায় কাটানো জিবরান সারাজীবন স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেছেন। বন্ধুদের লেখা চিঠিতে পর্বতময় লেবানন, নিঃসঙ্গ উপত্যকার কথা বলেছেন। সেখানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা এসেছে। বন্ধু মিখাইল নাইমিকে বলেছেন কোনো এক লেবানিজ উপত্যকায়, ঝর্ণার পাশে ছোট বাগানের মাঝে শেষ জীবন কাটানোর তীব্র আকুলতার কথা। মৃত্যুর আগে নিজের দেশে ফেরা সম্ভব না হলেও আল মোস্তাফাকে ঠিক পৌঁছে দিয়েছেন জন্মদ্বীপে। এ যেন জিবরানেরই ফেরা। তারই প্রত্যাবর্তন, নিজের জন্মভূমিতে। পাশাপাশি এ ভ্রমণ আত্মিক। ইহকাল থেকে পরকালের দিকে যাত্রা। মৃত্যুর পর শেষ ইচ্ছা পূরণে স্বজনেরা তার মরদেহ নিয়ে গেছেন লেবাননে। জন্মগ্রামের মাটিতে সমাহিত করছেন। সেখানে স্থাপন করা হয়েছে জিবরান জাদুঘর। সেখানে আছে তার সব ব্যবহূত জিনিস। খাট, টেবিল। পেইন্টিং বইপত্র- সব সবকিছু। পশ্চিমে থেকেও এই যে শেকড়ের প্রতি পিছুটান, প্রাচ্য প্রেম এটা জিবরানের প্রতি আমার মনোযোগ আরও গভীর করেছে। জিবরান ছিলেন নির্জনতাপ্রিয় এক নিঃসঙ্গ মানুষ। সারাজীবন একা থেকেছেন। শিল্পের সাধনার তিনি নিজেই নিজের সঙ্গী। মাঝরাতে নিউইয়র্কের পথে একা হেঁটেছেন। পার্কে গিয়ে বসে থেকেছেন। খ্যাতি আসার পর বেশ কিছু বছর নির্জনতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। পাঠক, প্রকাশক, সাহিত্য আসরের আমন্ত্রণ তার সময়ে ভাগ বসিয়েছে। তখন নিউইয়র্ক থেকে পালিয়ে ছুটে গেছেন শৈশবের শহর বোস্টনে। মাসের পর মাস থেকেছেন বোনের আতিথেয়তায়। এই যে ভিড় থেকে পালিয়ে বাঁচা জিবরান, মানুষের কাছ থেকে আড়াল খোঁজা লেখকের এই নির্জনতাপ্রিয়তা, আড়ালকে ভালোবেসেছি ক্রমশ। এটারও আমার এই লেখকের সঙ্গে সংযোগ গভীর হওয়ার সূত্র।

জিবরান গবেষকদের লেখা বইপত্র পড়ে দেখেছি জিবরানকে তারা কীভাবে দেখেছেন। তার লেখা পড়ে বোঝার চেষ্টা করেছি মননের পরিচয়। প্রফেটের আল মোস্তফা জিবরানের মানসপুত্র। ছায়ার প্রতিবিম্ব। এই আল মোস্তাফাকে দিয়ে জিবরান বলিয়ে নিয়েছেন নিজের সব চিন্তা ও দর্শন। আত্মিক চিন্তা। যে জীবন তিনি পৃথিবীতে দেখতে চান মোস্তাফার বয়ানে সেই জীবনের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার মনে শুধুই স্বদেশ, নিজের সংস্কৃতির প্রতি প্রবল অনুরাগ।

প্রেম নিয়েও তার ভাবনার সঙ্গে নিজের চিন্তার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছি। প্রেম তার কাছে ছিল আত্মিক অনুপ্রেরণা। তার জীবনে যে নারীরা এসেছেন, তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক তাদের লেখা চিঠিপত্র থেকে যে জিবরানকে আবিস্কার করেছি এক বিরল প্রেমিক। যে দেশের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু প্রেমকে স্বর্গীয় করে রেখেছে। স্থাপন করেছে মহান সম্পর্কের দৃষ্টান্ত। মেরি হাশকেলের সঙ্গে তার প্রেম আজীবনের যোগাযোগ এই অনন্ত সৌন্দর্যের উদাহরণ। মেরিকে জিবরান উইল করে গেছেন তার আঁকা সব ছবি। উইল করে গেছেন হৃদয়। বলেছেন জিবরানের মৃত্যুর পর মেরি জীবিত থাকলে যেন তার হৃদয় যেন দেহ থেকে তুলে মেরির হাতে তুলে দেওয়া হয়। মেরিই একমাত্র নারী যাকে তরুণ বয়সে বিয়ে করতে চেয়েছেন জিবরান। সম্পর্কের সৌন্দর্য, বিশেষ করে বিয়ের পর বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে এই ভয়ে নিজের চেয়ে দশ বছরের ছোট জিবরানকে বিয়ে করেননি মেরি। একবার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও পরে পিছু হটেছেন। বলেছেন এটাই জিবরানের ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে। তবে সারাজীবন পাশে ছিলেন, এমনকি মৃত্যুর পরও তার বইপত্র, ছবির দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আর মেরিকে বিয়ে না করতে পেরে প্রবল অভিমানে আজীবন একা থেকেছেন জিবরান। এই মেরি তার বন্ধু, প্রেমিকা, পৃষ্ঠপোষক। প্রথম তারুণ্যে জিবরানকে নিজের টাকায় প্যারিসে ছবি আঁকা শিখতে পাঠিয়েছেন। তার ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করছেন। প্রফেটসহ জিবরানের বিভিন্ন লেখা সম্পাদনা করেছেন। প্রফেট লেখা, ছাপা ও সম্পাদনা নিয়ে দুজনের চিঠি পড়লে বোঝা যায় মেরির ওপর জিবরানের নির্ভরতার মাত্রা। অথচ মেরি থেকে গেছেন অনেকটাই আড়ালে। শেষের দিকে ইংরেজিতে লেখা শুরুর পর কোনো লেখা শেষ করে মেরির কাছে পাঠাতেন জিবরান। মেরি সম্পাদনার পর তা ছাপতে দিয়েছেন। মেরি ছিলেন তার পরামর্শক। মেরি হাশকেল ছাড়াও তার বন্ধুত্ব ছিল মিসরের কবি, সাংবাদিক মে জায়েদার সঙ্গে। শুধুই পত্র যোগাযোগ। কখনও দেখা হয়নি। এই পত্রসাহিত্য এক অনন্য যোগাযোগের দৃষ্টান্ত। এসব চিঠিতে খুঁজে পাওয়া যায় জিবরানের প্রকৃত সত্তার, যে একাধারে প্রেমিক, দার্শনিক ও লেখক।

বাংলাদেশে জিবরান পাঠের চর্চার পরিসর খুব বিস্তৃত নয়। তাকে নিয়ে পড়তে গিয়ে প্রধানত আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে ইংরেজি বইপত্রের ওপর। এখানে প্রফেটের একাধিক বাংলা অনুবাদ পাওয়া গেলেও সব আদর্শ অনুবাদ নয়। দুর্বল অনুরাগ অনেক সময় মূল বইয়ের সৌন্দর্য ও ভাব বিষয় দুটিই নষ্ট করে। বিদেশে থাকা বন্ধুরা আমাকে জিবরানের লেখা ও জীবনী উপহার দিয়ে আমার জিবরান পাঠের পথকে সহজ করেছেন। তাদের কাছে আমার অনেক ঋণ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো প্রফেটের প্রতিই তার পাঠকদের আগ্রহ প্রবল। পৃথিবীব্যাপী তরুণরাই তার প্রধান পাঠক। প্রফেট তার সবচেয়ে বেশি পঠিত বই। অথচ ম্যাডম্যান বা অন্য প্যারাবলসগুলোতেও তার দর্শন, জীবনভাবনা ও আত্মিক চিন্তার ছাপ রয়েছে। জিবরানের মনকে আজীবন শাসন করেছেন যিশু। যিশু তার প্রিয় চরিত্র। তার অধিকাংশ লেখায় বারবার ফিরে এসেছেন যিশু বাইবেলের নানা ঘটনা চরিত্র। মুসলিম অধ্যুষিত অটোমান সাম্রাজ্যের এক গ্রামে বড় হয়েছেন জিবরান; যে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ খ্রিষ্টান। মুসলিম ও খ্রিষ্টধর্ম দুই ধর্মই তার মনকে প্রভাবিত করেছে।

জিবরানের মন ও মনন বুঝতে হলে শুধু প্রফেট নয়, অন্য বইগুলোর সঙ্গেও পরিচয় থাকা ভালো। বিদেশি সাহিত্য পড়তে গেলে আমাদের প্রধানত নির্ভর করতে হয় অনুবাদের ওপর। অনুবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মূল বই পাঠ করতে পারলে অধিক বোঝার সুযোগ তৈরি হবে লেখককে। বিশেষ করে জীবনের শেষ দিকের যে বইগুলো ইংরেজিতে লিখে গেছেন জিবরান। প্রফেটের বাংলা অনুবাদের চেয়ে ইংরেজি পাঠই আমাকে আনন্দ দিয়েছে বেশি। রিলকে, এলিয়েটের পর কহলির জিবরানকে আবিস্কার আমার পাঠের আনন্দকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশ কিছু বছর শুধু জিবরানের লেখা নিয়েই থেকেছি। এই ভ্রমণে বারবার তার আত্মিক জগতের সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। জিবরানের বইটির কাজ শেষ হলেও এ বছর না ছেপে রেখে দিয়েছি। তার সঙ্গে বোঝাপড়া আর একটু দীর্ঘায়িত করার জন্য। কহলিল জিবরান এখনও আমার মন ও মননের সঙ্গী।

মন্তব্য করুন