এখন থেকে প্রায় বছর পনেরো আগে একদিন ঢাকা ক্লাবের লাউঞ্জে এক দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ যুবক এসে বলেন, ফারুক ভাই চিনতে পারেন? আমি বরাবরই স্বল্পস্মৃতিধর মানুষ, তাই আমাকে বেশিক্ষণ স্মৃতি হাতড়ানোর সুযোগ না দিয়ে তিনি বলেন, আমি মারুফুল ইসলাম। তিনি তখন কমলাপুর আইসিডির কমিশনার। প্রথম দর্শনেই চিনতে না পারার ব্যর্থতায় বিব্রত হলেও সাথে সাথে স্মরণ করতে পারি তাঁকে। শুল্ক্ক দপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা ছিল ও আছে। বন্ধু ও জীবনানন্দ গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর বিসিএস পরীক্ষায় কাস্টমস বিভাগে যোগদান করার সুবাদে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে কবি হায়াৎ সাইফ, অনুবাদক আলী আহমদসহ বহু কাস্টমস কর্মকর্তার সাথে। তবে মারুফুল ইসলামের সাথে এই পরিচিতি ও পরবর্তী সময়ের ঘনিষ্ঠতা অবশ্যই শুল্ক্ক বিভাগের সুবাদে ছিল না, তিনি একজন কবি, সেটাই অন্যতম প্রধান কারণ।

মারুফ কবি, তবে আমি অকাব্যিক মানুষ বলেই হয়তো কবি পরিচয় ছাড়িয়ে আমার কাছে বেশি ভাস্বর তাঁর সদাহাস্যোজ্জ্বল বন্ধুবৎসল চরিত্রটি। তারপরও কিছু কথা থেকে যায়। ভ্রমণ কাহিনি রচনার চেষ্টার সাথে ভ্রমণ-সংক্রান্ত বইপত্রের প্রতি একটা সহজাত ঝোঁক আমার রয়েছে, তাই বছর দুয়েক আগে বই মেলায় 'ভ্রমণবৃত্ত' নামে কবি মারুফুল ইসলামের বইটি কিনে ফেলি। তাঁর ভ্রমণকাহিনি পড়বো বলে ভেতরের কিছুই না দেখে বইটি কেনার পর বুঝতে পারি এটি একটি কাব্যগ্রন্থ। বইটির কিছু কবিতা পড়ার পর উপলব্ধি হয়, ভ্রমণগ্রন্থ না হলেও ক্ষতি নেই, মারুফের কবিতায় থাকে ভ্রমণের আমেজ। তিনি যেসব শহর বা দেশ ভ্রমণ করেছেন, সেসব অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান কবিতার রূপ লাভ করেছে। ভ্রমণকে ঘিরে লেখা তাঁর কবিতায় এমন সব অনুষঙ্গ, দৃশ্য বা অনুভূতি পাওয়া যায়, যাকে কেবল ভ্রমণবৃত্তান্ত বলা যায় না, মনে হয় আমাদের দেশের জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা এক ভ্রামণিকের কাব্যিক উপমা। যেমন এই বইয়ের ভিয়েনা নামের কবিতায় তিনি লেখেন, 'ভিয়েনার দুপুর অবিকল শৈশবের হবিগঞ্জের দুপুর/ ঝিমধরা/বিকেলে বৃষ্টি নামে রিমঝিম/অবিকল কৈশোরের কুমিল্লার বৃষ্টি।' কিংবা অন্যত্র যেমন তিনি লেখেন, 'জুরিখে আমার পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে মূর্ছনার হাত ধরে রেখে রাস্তা পার হচ্ছিলাম রিয়া আর আমি.../বাইসাইকেল থামিয়ে এক প্রৌঢ়/আমাদের পার হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে/কোন দেশ থেকে বেড়াতে এসেছি জেনে/আচমকা গেয়ে উঠলেন/বাংলাদেশ বাংলাদেশ।' অথবা 'গ্লোবাল ভিলেজে হয়তো অনেক কিছুই আছে/ হায় আমাদের সেই ছোট্ট গ্রামখানি নেই শুধু/জলের ওপারে/ঘাটে বসে আছি আনমনা।' ভুবনবিখ্যাত খালের নগরী 'ভেনিস' শিরোনামের কবিতাতেও তিনি খুঁজে পান ঢাকা নগরীকে, 'ভেনিসের ভোরের রাস্তায় তুমি হাঁটছিলে/গ্র্যান্ড ক্যানেল চোখ মেলে/সূর্য নয়, তোমাকেই প্রখম দেখেছিল/ ... সেই দৃষ্টিপাত/আজও যে কোনো ভোরে ধানমন্ডি হ্রদের কিনারে/আমাকে এনে দেয় একবুক জলের স্বপ্ন'।

ভুটানের পারো শহরকে নিয়ে লেখা 'পারো' শিরোনামের কবিতাতেও রয়েছে ভিন্ন অনুষঙ্গ, 'পাহাড়ের এক চূড়ায় বিজয়দুর্গ/অন্য চূড়ায় সোনালি বুদ্ধ/সংঘের শরণ আজও খাঁজে খাঁজে ব্যাখ্যা করে/জীবনমৃত্যুর ব্যাকরণ।' তবে তাঁর কাব্যভ্রমণ কেবলই ভৌগোলিক নয়, তাঁর ভ্রমণ সময় ও সমাজ, বোধ ও বোধির জগতে। তাই তিনি লেখেন, 'আমরা যখন কোথাও যাই না তখনও/কোথাও-না-কোথাও যাই।' সেই ভ্রমণ কিংবা মানস ভ্রমণ তখন ভিন্ন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয় আমাদের মগ্নপাঠে। 'ভ্রষ্ট লগ্ন নিমগ্ন মৌতাতে/রাতের আগুনে কয়লা দিনের কাঠ/ভ্রমণের ইতি রমণের সংঘাতে/এক লহমায় মিথ্যে রাজ্যপাট।' সেজন্যই পার্থিব বা ভৌগোলিক ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তিনি খুঁজে নেন ভিন্ন এক পরিব্রাজন, 'অপার্থিব অর্থহীনতার অতলে ডুবে যেতে যেতে ভাবি/পার্থিব পরিভ্রমণের আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কি না।'

মারুফের 'ভ্রমণবৃত্ত' গ্রন্থের নাম কবিতাতে তিনি ভ্রমণবিষয়ে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করেন এভাবে, 'ভ্রমণ মানে ঘুরেফিরে নিজেকে নতুন করে চেনা/বৃত্তাবদ্ধ সমতলে/ অনুভবের অনন্ত পথ ভাঙা/আদতে পথের কোনো প্রান্ত নেই/পুরোটাই মাঝপথ/ ... পথ মুখ বুজে থাকে/কিংবা চোখ খোলা রাখে/ভ্রমণ আসলে ঘুরেফিরে নিজেকেই নবায়ন করা।' 'ভ্রমণবৃত্ত' বইটি ভ্রমণ কাহিনি মনে করে কেনার পর বইটির এমন নামকরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে লিখেছিলাম, 'ভেবেছিলাম ভ্রমণগদ্য/এ যে দেখছি নিরেট পদ্য/'মধ্যবিত্ত' 'প্রবোধ' 'ভাঙচুর'/অসংগতি নদীপথে/কাব্যরসের দিব্যরথে/ নামেই ছিল রহস্য ভরপুর।'

'ভ্রমণবৃত্ত' বইটি ভ্রমণসংক্রান্ত না হলেও তাঁর 'আয়নাশহর' নামের কাব্যগ্রন্থটি সত্যিকার ভ্রমণকবিতার সংকলন। এটির ষাটটি কবিতার সবগুলোর শিরোনামই কোনো নগরীর নামে। তার মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহরের নামে রয়েছে বারোটি কবিতা, ভারতের বিভিন্ন শহরের নামেও রয়েছে সমসংখ্যক। ভুটানের 'পারো' শহরের ওপর দুটো, রেঙ্গুনের ওপর একটি, চীনের তিনটি শহরের নামে তিনটি। বাকি কবিতাগুলো আমেরিকা, ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের বিভিন্ন নগরীর নামে। তাঁর এরকম অভিনব বিষয়ের ওপর আরেকটি কবিতার বই 'আরশিনদীর' চল্লিশটি কবিতাই চল্লিশটি নদীর নামে, তার মধ্যে বিদেশি আটটি ছাড়া বাকি সবক'টিই বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী।

উল্লেখ্য তিনি বাংলা সংগীতের দুই দিকপালকে তুলে এনেছেন 'সাঁইজি' এবং 'নতুন করে পাবো বলে' গ্রন্থে, একটিতে লালন আরেকটিতে রবীন্দ্রনাথ। আমাদের চিরায়ত লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে আমাদের আত্মদর্শন, দেহতত্ত্ব, আমাদের প্রেম ও ভালোবাসার ভাষা তিনি এঁকে দিয়েছেন এই দুই সংকলনে। কবিতার মূল্যায়নে আমার নিজস্ব কিছু খামতি রয়েছে, তবে আমার নিজস্ব অনুভবে কোনো কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি পড়ে যদি মনে হয়, ঠিক একথাটাই তো আমি বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কবি সেটা লিখে ফেললেন, সেটিই কবিতা। সেটি ভালো কিংবা সার্থক কবিতা কিনা শনাক্ত করার উপায় কী? কিংবা কবিতা কী, কীভাবে একটি রচনা কবিতা হয়ে ওঠে? যুগ যুগ ধরে কবিতার যেসব অনুষঙ্গ ও অনুপানের জন্ম হয়েছে, সেসব কি ভালো কবিতা নির্ধারণের মাপকাঠি? নিখুঁত ছন্দ বা অলংকারই কি কবিতাকে সার্থক করে তোলে? এসবের সরাসরি কোন উত্তর নেই। বহু বছর আগে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কবিতার সংজ্ঞা নিয়েও অনেক সময় অনেক বিতর্ক উঠেছে, কেউ বলেন ছন্দই কবিতা, কেউ বলেন উপমাই কবিতা। তাঁর মতে, কবিতা তখনই হয়ে ওঠে যখন কবি লেখার পর তার কোনো প্রিয় পাঠককে সেটা শোনান, শোনার পর পাঠক যদি সন্তুষ্ট হন বা বিরক্ত হন, তাহলে সে কবিতাটি সম্পূর্ণ হয়।

বাঙালিমাত্রই স্বীকার করবেন যে, আমাদের সবার মনের কথা বলে রেখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, তাই 'নতুন করে পাবো বলে' গ্রন্থে রবীন্দ্রসংগীতের চরণ ব্যবহার করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না মারুফের। আর এই উদ্যোগটি তাঁর কবিতাগুলোকে দিয়েছে বাড়তি সৌন্দর্য ও গতি। পাঠকের মনের কথা বলে ফেলেছে বলে কবিতাগুলো যেন নিজস্ব সংজ্ঞায় সার্থক। 'আমার সরোদে তোমার মাত্র একটা টোকার অপেক্ষায়/উৎকণ্ঠিত তৃণভূমি হাত বাড়ায়/আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই', 'সব আছে হাতে, কিন্তু কিছুই নাগালে না/কেন যামিনী না যেতে জাগালে না' কিংবা 'আমিষেই যদি এত স্বাদ এত পরিতৃপ্তি/তবে কেন হব আমি শরীরবিবাগী/আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।'

আমাদের চিরায়ত লোকজীবনের সুর, ভাষা, দেশ ও মানুষকে নিয়ে আমাদের আত্মদর্শী ভাবনা, আমাদের রোমান্টিকতা, লালন বা রবীন্দ্রনাথের দর্শনতত্ত্ব-এসব খুব নিরাভরণভাবে কবিতার বহির্গাত্রে ফুটিয়ে তুলতে পারেন মারুফ, কিন্তু তার ভেতরে থাকে গভীর অভিজ্ঞানের কথা। 'কৃতজ্ঞতাবোধ যদি মানুষের সেরা গুণ তা হলে/ কুকুরেরা শ্রেষ্ঠ মানব/অন্যের অনিষ্ট করা যদি ইবলিশের প্রধান কাজ/তা হলে মানুষেরা শয়তান।' (কথা)

সবসময় কোনো একটা অনুষ্ঠান করে মানুষকে জড়ো করার ছুতো খুঁজতে মারুফের জুড়ি মেলা ভার। আনিসুজ্জামান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কিংবা মঈনুল আহসান সাবেরের জন্মদিন, কোনো বন্ধুর পদোন্নতি কিংবা কোনো উপলক্ষ ছাড়াই আয়োজিত মারুফের সেসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন না, লেখালেখির জগতের এমন মানুষ ঢাকায় কমই আছেন। এরকম একটা তুচ্ছ উপলক্ষে মারুফের বিশাল আয়োজনের পর ফেসবুকে লিখে দিয়েছিলাম, 'কোনোকিছুই নেই যেখানে মারুফ বলে আছে/বন্ধুরা তাই আসবে সবাই পরস্পরের কাছে,/এটাই ছিল গোপন তথ্য/বন্ধুপ্রেমের সফল পথ্য/ ভালোবাসার মানুষরা সব এমনি করেই বাঁচে।'

সদাহাস্যোজ্জ্বল মারুফুল ইসলাম সদ্যপ্রকাশিত তাঁর একটা কবিতায় স্বীকার করেন 'রোমাঞ্চিত রোমকূপে রহস্যের রোদনভরা বসন্ত/জীবনের ভাঁজে ভাঁজে মৃত্যুর ন্যাপথালিন/মৃত্যুর কুঞ্চনে জীবনের কর্পূর/খুব কাছাকাছি কেউ থাকে/ নাকি থাকে না।' এটি পড়ে মনে হয় কবিরা প্রকৃতপক্ষে নিঃসঙ্গ আপন ভুবনে।

মন্তব্য করুন