গ্রেগর সামসা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আবিস্কার করেছিলেন রূপান্তরিত অবস্থায়। সাহিত্যের টুকটাক খবর রাখা সকলেই এই সত্যটা জানে। তবে আমার কাছে ব্যাপারটা শুধু সাহিত্যের অংশ নয়, আমি জানি এমন কিছু সত্যিই ঘটেছিল। কিছু ফিকশন এমনভাবে জীবনের সাথে মিশে যায়, তার সাথে বাস্তবের আর বিভেদ থাকে না। মেটামরফসিস কিংবা রূপান্তরকে আমি সেভাবেই দেখি।

তেমন একটা গল্প আপনাদের বলতে চাই। তবে ছোট্ট একটা পার্থক্য তৈরি হতে পারে অনুভবের জায়গায়। আমার বন্ধুর একদিন সকালে আচমকা বধির হয়ে যাওয়ার গল্পটা অবশ্য মনে হতে পারে ফিকশন। কারণ গল্পটা আমি বলছি, পৃথিবীর খুব ছোট্ট একটা দেশের ছোট্ট একজন লেখক। শুরুতে আমি নিজেই বলছিলাম গল্প, তবে এটাও গল্প নয়। আরিশ নামে আমার একজন বন্ধু আছে এবং সে সত্যিই বধির হয়ে গিয়েছিল। একদম আচমকাই। কোনো এক শীতের সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আরিশ হারিয়ে ফেলেছিল মধুর, অমধুর, কৃত্রিম, আন্তরিক সকল ধরনের শব্দ শোনার ক্ষমতা।

বধির হওয়ার দু-একদিন আগের কোনো এক সন্ধ্যায় আমাকে বলেছিল, সে মরে যেতে চায়।

আমি তাকে বলেছিলাম, মরে যেতে চায় না কে?

এরপর আমরা দুই বন্ধু মিলে একটা তালিকা করেছিলাম এবং দেখতে পেয়েছিলাম মূলত সকলেই মরে যেতে চায়। মরে যেতে চাওয়ার ভেতরে স্মার্টনেস নেই। তাই আমি বলেছিলাম একটা জিনিস চাইতে পারিস, বল আমি যেন বধির হয়ে যাই।

হাসতে হাসতে আরিশ বিষয়টা চেয়ে ফেলেছিল আর সেই মুহূর্তেই আকাশ থেকে পড়ে যাচ্ছিল একটা তারা। আমরা বাড়ি ফিরেছিলাম হাসতে হাসতে। সম্ভবত সেটাই ছিল আরিশের জীবনের সর্বশেষ হাসি।

প্রথমে আমরা কেউ বিষয়টি পাত্তা দিইনি। ফলিং স্টারের কাছে কিছু চাইলেই পাওয়া যাবে সেটা জানলে আমরা কি আর এমন কিছু চাই? তাছাড়া ওই মুহূর্তে ইচ্ছা পূরণের তারা আমাদের পাশ দিয়ে যাবে সেটাও তো জানা ছিল না। কিন্তু নিরাময় মিলছিল না। আমরা ছুটছিলাম এদিক সেদিক। এক মাসে যখন ঠিক হলো না, তখন ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম দেশ- বিদেশের নানা ডাক্তারের কাছে। আরিশদের প্রায় সব জমি বিক্রি করে ফেলতে হয়েছিল, তাতেও মেলেনি সমাধান।

চাকরি হারাল আরিশ। সম্প্রতি পাস করেছিল একটা পরীক্ষা যেটি দিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে প্রমোশন পাওয়া যায় দ্রুত। তবে সে মূলত ছিল একজন পদার্থবিদ। পদার্থবিদ ব্যাংকার শ্রবণশক্তি হারিয়ে বনে গেল অপদার্থ।

আরিশের বাবা রিটায়ার করেছেন আগেই, বোনের একটা পা কাটা গেছে রেললাইনে, মায়ের ছিল লুপাস নামের জটিল একটা রোগ। ওর কোনো প্রেমিকা ছিল না। কেননা যৌনতার বেলায় সে ছিল ভীষণ দুর্বল। নিজেই পেত ভয়। বধির হয়ে যাওয়ার আগে আরিশ মরে যেতে চাইছিল, তখন ওর মৃত্যু কামনার পেছনে যথাযথ কারণ ছিল না। এখন সে বাঁচতে চায়, যদিও তার বেঁচে থাকার কারণ কেবল প্রকৃতি চক্র পূরণ করা।

এই চক্র পূরণ করা নিয়ে আমার ও আরিশের ভেতরে বহু আলাপ আছে। আমরা দুজনেই মনে করতাম কিংবা করি মানুষ শুধু প্রকৃতির টিকে থাকার ইচ্ছাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকে। বিয়ে, সন্তান, ওসব প্রকৃতির চাওয়ার অংশ। ব্যক্তি মানুষের খুব বেশি কিছু করার নেই। যেহেতু তার জন্ম হয়েছে সেহেতু স্বাভাবিক নিয়মেই তাকে তার জীবন পার করতে হবে। কেবল একটা উপায়ে প্রকৃতির চাওয়াতে যতি বসানো যায়। সেটা হলো স্বেচ্ছামৃত্যু। এখানেও তর্কের অবকাশ আছে। তবে সেদিকে যাব না আজ। আরিশের বধির হওয়ার গল্পটা বলে শেষ করি।

আরিশ আমার বন্ধু, ও মরে যেতে চেয়েছিল, এখন বেঁচে থাকতে চায়; কিন্তু বেঁচে থাকতে চাওয়ার মতো কারণ যার নেই। সেই আরিশের একমাত্র সহায় হলাম আমি। ও আমার কথা শুনতে পায়, জগতের আর কারও কথা সে শোনে না, এমনকি নিজের কথাও শোনে না। কেবল আমার কথা কেন শুনতে পায়? এই প্রশ্ন করলে বিপদে পড়ে যাব। আমার জানা নেই। আরিশেরও নেই।

কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়েছিলাম। বিচে বসে আছি। সেই সময়ে আরিশের ফোন।

বলল, তুই কি আশপাশে?

আমি বললাম, তুই যদি কক্সবাজারে থেকে থাকিস তাহলে হয়তো আশপাশেই।

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। সেটা অনেক জোরালো, ঢেউয়ের গর্জনকে ছাপিয়ে গেল।

দীর্ঘশ্বাসের পর জানতে চাইল, আমার কথা কি বুঝতে পারছিস?

পারছি বলে তো মনে হচ্ছে।

তারপর ফোন রেখে দিলো।

এই কাজটা প্রায় করে আরিশ। নিজের কথা শুনতে না পারার কারণে সম্ভবত তার শব্দ নিয়ে, বাক্য নিয়ে বিভ্রম ঘটে।

আরেকটা কাজও সে করে। ফোন দিয়ে বলে খুব জোরে গান গাইতে, চেঁচামেচি করতে।

শুরুতে আমি করতাম না। কিন্তু এখন করি। অন্তত ওর বাসায় গেলে কাজটা করি। ওর মা পাশে এসে বসে থাকে কখনো কখনো। মায়ের ঝনঝন পায়ের আওয়াজে টের পাই তিনি আসছেন। সিগারেট ফেলে দিই তখন। এমন শব্দ কীভাবে হয়?

আরিশ বলেছিল, শব্দটা তার ভীষণ প্রিয়। ছোটবেলায় মা দূরে চলে গেলে এই শব্দ শুনেই বুঝতে পারত মা আসছে। এখন সে এমন একজন মানুষ যার জীবনে কোনো শব্দ নেই, একদম নিঝুম চারপাশ, তার জন্য এতটুকু পাগলামি করতে আমার ভালো লাগে।



দুই.

একটা প্রজেক্টের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি ভীষণ। বাসাতেও যেতে পারছি না ঠিকঠাক। মা রেগে থাকছে। বাবা রেগে থাকছে। একটা ট্র্যাডিশন আমরা ঠিক রাখতে চেষ্টা করি পরিবারে। রাতে এক টেবিলে বসে খাওয়ার ট্র্যাডিশন। আমার জন্য তাতে ছেদ পড়েছে। খেপে থাকাটাই স্বাভাবিক।

এতকিছুর ভেতরে আরিশের ফোন ধরা হচ্ছে না, দেখাও হচ্ছে না অনেকদিন। এমনকি এতদিনও হতে পারে যতদিন দেখা না হলে মানুষের দেখা হয় না, এই কথাটা আর মনে থাকে না। অথচ আমি ভাবতাম আরিশের জীবনে যেহেতু আর কিছু নেই সেহেতু আমি একটা নয়েজ হয়ে থাকার চেষ্টা করব। একটা মানুষ কোনো শব্দ শুনতে পায় না, ভাবা যায়? গুলির শব্দ শুনতে পায় না। গালির শব্দ শুনতে পায় না। কান্নার শব্দ শুনতে পায় না। হাসির শব্দ শুনতে পায় না। অবশ্য হাসির শব্দ আজকাল কেউ শোনে না। দেখে সম্ভবত। অনলাইনে। হাসি কতটা দুর্লভ হয়ে গেছে সেটা ভেবে অবাকই লাগে। সেদিন অফিসে মিষ্টি নিয়ে এলো আতাউর। একটা পরীক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে ফেল করে যাচ্ছিল, সেটা পাস করেছে। মুখে ছিল হাসি। নির্মল। শব্দ করে হাসল। দেখতে ভালো লেগেছিল।

রেনিও অনেক হাসে। আমরা লেকের ছায়ায় সন্ধ্যা হতে দেখি। বলে নিই, এত ব্যস্ততার ভেতরেও সন্ধ্যাটা আমরা একসাথে দেখি। কিন্তু রেনিওর হাসিতে আজকাল শব্দ খুঁজে পাই না। আমার কষ্ট হয়। কান্না পায়। আমি আবার কাঁদতেও পারি না। আমার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই।

এসব ভাবছিলাম, রাতে। ঘুম আসছিল না। অন্ধকার। একটা বড় চাঁদ আছে, বারান্দা দিয়ে দেখা যায়। তারপরও অন্ধকার।

তখন আরিশের ফোন এলো। মনে পড়ে গেল, আরিশ পৃথিবীর কোনো শব্দ শুনতে পায় না, কেবল আমার কথা শুনতে পায়।

আরিশ বলল, একদম ভুলে গেলি।

ওর কণ্ঠটা কাঁপছিল। মৃত্যু শিয়রে বসে আছে এমন। অথবা মরে গেছে। কবর থেকে ফোন করেছে। মরে গেলে মানুষ যোগাযোগ করতে পারে না, কথাটা সত্য নয় আরিশ অনেক আগে দাবি করেছিল।

আমি বললাম, এই মুহূর্তেই তোর কথা ভাবছিলাম।

কেন? আরিশের কণ্ঠ যেন আরও দূরে।

শহরে খুব গোলাগুলি হলো ক'দিন। অফিসের পাশেই। এত শব্দ। মনে হচ্ছিল বধির হয়ে যাই।

আরিশ বলল, বধির হওয়াটা ভালো কিছু নয়।

আমরা কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললাম না।

তারপর আরিশ বলল, আমার সাথে কেন এমন হলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমি কেমন করে দেব? আমার কাছে উত্তর নেই, তাই চুপ করে থাকি।

শরীর খারাপ লাগছে বলে ছেলেটা ফোন রেখে দিলো।



তিন.

অনেকদিন পর একটা বন্ধ পেলাম। শুক্রবার। রেনিও বলল, নামাজ পড়ে যেখানে যাওয়ার যাও। আমি বললাম, আচ্ছা।

নামাজের অধ্যায় সেরে আরিশের বাড়িতে গেলাম। দরজা খুলে দিলেন লুপাস আক্রান্ত মা। আজকে দুপুরে ওদের বাড়িতে রান্না হয়নি।

মায়ের চোখ ফোলা। আরিশ ছিল ঘরেই। আমার পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। সিগারেট মুখে। ঘরটা ধোঁয়াময়। অ্যাশট্রেতে শত সিগারেট। কতদিন ধরে জমাচ্ছে, কে জানে। আমি নিয়ে এসেছি দু প্যাকেট ডানহিল। ওর পছন্দের।

কাঁধে হাত রাখতেই চমকে উঠল। পায়ের আওয়াজ শুনতে পায় না। কেবল গলার আওয়াজটাই পায়।

আমাকে দেখে বলল, তুই টানা কিছুক্ষণ কথা বলে যা।

আমি টানা অনেক কিছু বললাম। অনেক কিছু। বলতে বলতে কখন সন্ধ্যা হয়ে টের পেলাম না।

আরিশ বলল, খিদে লেগেছে।

বাইরে যাবি?

না, যাব না। সবাই জেনে গেছে। হাসে আমাকে দেখে। বলতে বলতে আরিশ কাঁদল।

আন্টি ঘরে এলেন। আন্টির হাতে নাশতা। মনে হয় আমাকে আসতে দেখে আনিয়েছেন। আমার হাতে সিগারেট ছিল দেখে লজ্জা পেলাম। আরিশ পেল না। স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

আন্টি চলে যাওয়ার পর আরিশ বলল, পৃথিবীর সব শব্দ ভুলে যাচ্ছি আমি। কেবল মায়ের ঝনঝন পায়ের আওয়াজটাই থেকে থেকে মনে পড়ে।

মন্তব্য করুন