আমার লেখার ঘরের জানালার পাশে দেয়াল বেয়ে ওঠা মালতীলতার ডালে বাসা বেঁধেছে এক জোড়া বুলবুলি। এর আগে রোজ ওদের খড়কুটো মুখে বয়ে নিয়ে আসা, ক্যাচোর-ম্যাচোর ডাকাডাকি, পুরুষ পাখিটির নারীটিকে মুগ্ধ করবার প্রয়াসে বিস্তর নাচানাচি, আনন্দময় গান- এসব দেখেছি শুনেছি। এখন ওদের পরিপাটি ঘর তৈরি। ওরা সুস্থির হয়ে বসেছে ওদের ঘরে। নারী পাখিটির বোধহয় ডিম পাড়ার সময় ঘনীভূত।

ডিম কখন ফুটবে, ডিমে তা দেবার সময়টিতে পুরুষ পাখিটি কী কী করবে, সঙ্গিনীর জন্য মুখে করে দিনের খাবার আনবে কি আনবে না- এসব দেখবার আশায় আমি প্রায়ই বারান্দায় গিয়ে একটু দূরে বসে অপেক্ষা করি। কখনো কখনো লেখার টেবিলের জানালার ওপারে উঁকি মেরে পরখ করি। সারাদিন ওরা প্রায় থাকেই না ঘরে। গোধূলি বেলায় আসে। এরই মাঝে চলে ঘরটা আরো বড় করবার তোড়জোড়।

ডিম ফুটবে। তা দিলে তা থেকে ছোট ছোট ছানাপোনা বেরুবে। এসব নিয়ত চিরচেনা তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও আমি ওদের ডিম ও তৎপরবর্তী বিষয়াদির জন্য অপেক্ষায় থাকি। বুলবুলিদের ঘরে ফেরার শব্দ আমাকে চঞ্চল করে। ওরাও অপেক্ষা করে গোধূলির। আলো নিবুনিবু হলেই ঘরে ফিরতে হয়- এই সরল জীবনসত্য মাথায় নিয়ে সারা দিনরাত আকাশে আকাশে ঘুরে বেড়ায় যে পাখি, তার অপেক্ষার রঙ গোধূলির মতোই আরামদায়ক এক বিষণ্ণতায় ভরা। জীবনের সত্য ও বাস্তবতাকে আমরা ঠিক যেরকম স্বাভাবিক ভেবে কাছে টেনে নিই, অথচ বুকের ভেতরে কী এক অর্থহীন বিষাদকে লালন করি- ঠিক সেরকম। এই মাত্রাছাড়া কিন্তু অবশ্যম্ভাবী বিষাদকে সহনীয় করে তোলে অপেক্ষা। একমাত্র অপেক্ষাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। অপেক্ষার ঘোরে ঘোরে কেটে যায় আমাদের আস্ত জীবন।



ছোটবেলায় অপেক্ষা ছিল নতুন ক্লাসের। ফোরে পড়বার সময় মনে হতো, কবে হাইস্কুলে যাবো। সিক্স সেভেন এইট নাইন- নাইন ক্লাসটাকে খুব আভিজাত্যময় মনে হতো। নাইনের অপেক্ষায় কেটে যেত বছর। পরের বছর। আরো বছর। শুনতে পেতাম ক্লাস টিচারের খুট খুট হিলজুতোর আওয়াজ। রেজাল্ট শিট নিয়ে ক্লাসে আসছেন। আহা! এই ধ্বনি বুকের ভেতরে যে ঢিপঢিপ প্রায় মৃত্যুধ্বনি তুলতো, সে খবর কে রাখতো? অথচ আমি অপেক্ষাই তো করেছি- নতুন বছরের নতুন ক্লাসের!

একটি ঋতুস্রাবের পর নারী অপেক্ষা করে পরেরটির জন্য। ২১ দিন কি ২৮ দিনের চক্করে। একটি ঋতুস্রাব শেষ করবার পর যে চনমনে ঝরঝরে অনুভূতি সে পায়, একই সাথে পরের ঋতুস্রাবটিকেও সে ধারণ করে নেয় নিজের ভেতরে। এর মধ্যবর্তী ভাগে গর্ভসঞ্চার, উর্বরতার সেরা সময় ইত্যাদি পার হয়। পার হয় হরমোনাল ঝড়, মুড সুইং, মন খারাপের দিন, 'কেউ বোঝে না আমায়' দিন- আরো কত!

আমি যখন গর্ভে সন্তান ধারণ করেছি, আমার প্রতিটি দিন কেটেছে অস্থিরতায়। এই অস্থিরতার ভেতরেই আমি মনেপ্রাণে সন্তানের চেহারাটা কল্পনায় আনতে চেয়েছি। তাকে ভালোবাসতে চেয়েছি আগেই, তার জন্য প্রার্থনা করেছি। আর শুনেছি তার পদধ্বনি, আমার প্রতি, আমার বরাবরে। এরপর অপারেশনের টেবিলে শুয়ে যে জল ক্লেদে মাখামাখি শিশুকে আমি দেখেছি প্রথমবার, প্রথম দেখার পর আমার বুকের ভেতরে যে সংগীত বেজে উঠেছে অকস্মাৎ, সেই গানের, সেই ধ্বনির কোনো সংজ্ঞা কিংবা বর্ণনা দেবার সাধ্য আমার নেই। আজও সেই ধ্বনি আমার বুকের ভেতরে বেজে যায়, যতবার আমার সন্তান দুই হাত বাড়িয়ে ছুটে আসে আমার দিকে, ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে, আমার ও আমার সন্তানের মধ্যবর্তী দূরত্বটুকুর ভেতরে যে ক্ষণিকের অপেক্ষা আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্ত অব্দি, সেই অপেক্ষাটুকুই বেঁচে থাকার রসদ, আমার সন্তানের সেই চরণধ্বনিই আমার জীবনের সুধা।

এরকম ছোট ছোট কত অপেক্ষা ধ্বনির ভেতর দিয়েই জীবন গড়িয়ে যায়। রসে বশে ফুলে ফলে ভরে ওঠে। কান্নায় নত হয়। ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে। হতাশায় ভেসে যায়। আবারও নতুন ধ্বনি খড়কুটোর মতো ভেসে আসে। তাকে আঁকড়ে ধরে, তার দিকে কান পেতে রেখেই আবার জেগে ওঠে মানুষ। এই তো জীবন!

আবার এসব ছোট ছোট ক্ষণে ক্ষণে জেগে ওঠা, নেচে ওঠা ধ্বনিগুলোর সাথে পা মিলিয়ে আসে কত রহস্যময় সংগীত। বুকের ভেতরে কুয়াশার মতো আছড়ে পড়ে। সেইসব আবছায়ার গান, সেইসব 'ঘরের ভেতর মোমের আলো'য় আমাদের হৃদয় ঘাই দিয়ে ওঠে। আমাদের নিতান্ত এলেবেলে বুকের ভেতরে এসব গোয়েন্দা সংগীত ঢুকে পড়ে চোরাপথে। আলো ফেলে এখানে সেখানে। কোথায় কোন শূন্যতাকে আড়াল করে রেখেছি চিরকাল, সেই শূন্যতার মুখ খুলে দেয় একটানে। নগ্ন শূন্যতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা একদম বোকা হয়ে যাই। আমাদের না পাওয়াগুলো বোকা হয়ে যায়। আমাদের ভুলে থাকাগুলো থমকে চমকে ওঠে। আমাদের মুখোমুখি যে অসীম নগ্নতাকে আমরা হঠাৎই চিনতে পেরে স্তব্ধ হয়ে যাই, সেই নগ্নতাকে টেনে বের করে দিলো যে বিপন্ন সংগীত, তার চরণধ্বনিই আমাদের আরাধ্য ছিল না এতকাল? আমরা কি মনে মনে তার প্রতীক্ষায় থাকিনি? আমরা কি তার আসা-যাওয়ার পথের ধারে বসে থাকিনি?

কিংবা সে সিনেমাটা আজও বানাতে পারিনি? তার বেলা? ওই যে সেইসব দৃশ্যপট, ওই যে আকাশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা গাঙচিল? ওই যে মেয়েটা, সারা শরীরে তাজা কালশিটে? ওর মুখোমুখি দাঁড় করানো ক্যামেরা ট্রাইপড! লাইট বুম ইত্যাদি! ওই যে দৃশ্যরা আসি আসি করে! ওই যে কথোপকথনগুলো বুকের ভেতরে ঘোরে! ওই যে গল্পটা! ওই যে আমার কলম- আমার লেখার খাতা- ল্যাপটপ! আমার স্কেচবুক। আমার পেন্সিল ইরেজার! এই যে এত এত নতুন ভাবনায় আমার দিন কেটে যায়, ওই যে ওরা পায়ে পায়ে ঘোরে, ওদের আসবার শব্দ, অপেক্ষায় ফেলে রাখা শ্বাস, এইসব কিছুই তো আমার জীবনের ভেতরে মূল্যবান আসা-যাওয়ার ঘোর হয়ে আছে। কত নীরব নির্জনে কত মধুসমীরে।

মাঝে মধ্যে ভাবি, এই চল্লিশ পেরোনোর মুহূর্তে আমি আসলে কার চরণধ্বনি শুনি? কে সে? কোন সে মহৎ সংগীত আমাকে ফের অস্থির আশা নিরাশার দোলাচলে ডুবিয়ে মারে, ভাসিয়ে তোলে? কোন সে হারাই হারাই গান আমাকে উচাটন করে যে মন আমার ঘরে রয় না? কোন সে ধ্বনির টানে আমি ভেসে যেতে চাই, অপেক্ষায় কাটাই, আশায় বাঁধি বুক?

একটা পাহাড়। পাহাড়ের ওপরে ঘর। ঘরের ভেতরে দুটো তিনটে ঘর। পড়ার ঘর। থাকার ঘর। সামনে সবুজ পাহাড়। হলুদ পাহাড়। ধূসর পাহাড়। খয়েরি বেগুনি পাহাড়। এত এত বাতাসের ঢেউ। এক একটা ছোট ছোট মুহূর্ত। তুমি আমি আর আমাদের সন্তান। ঠিক এখন যেমন আছি। আরো আরো থাকা। ওই পাহাড়ের গায় হেলান দিয়ে। ওই পাহাড়ের চোখে চোখ রেখে। একটা সরল জীবন, যেখানে কাঠুরিয়া কাঠ কুড়িয়ে আনে, হলুদ আগুনে আলু পুড়িয়ে খায়, ধ্যানে বসে, গানে বসে, চাঁদের রাতে চোখ রাখে চাঁদে। আমাদের এই জীবনটা যদি কোনোদিন ওই জীবনে গিয়ে দাঁড়ায়, যদি নতুন নতুন স্বপ্ন বুনতে শেখে?

কিংবা একটা ঘন নীল সাগর। সেই সাগর তীরে একটা বইয়ের দোকান। আমি তার দোকানি। রাশি রাশি বইয়ের ভেতরে আমি নেশাগ্রস্তের মতো বসে আছি নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে। তুমি জলের ভেতরে ঘাই দিয়ে ওঠা সোনালি মাছ। সেই মাছের বুকের মধ্যে আমার বেঁচে থাকার প্রবাল। মাছ যতবার সাগরে নামে, আমার প্রতীক্ষা ততো প্রবল হয়ে ওঠে। জ্যোৎস্নার ভেতরে জল চিকচিকে মুক্তো ছড়ালে, আমি সেই মুক্তোর অলংকার পরে রানী হয়ে উঠি। আমাদের আশৈশব ভালোবাসাবাসির স্মৃতির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এইসব অদ্ভুতুড়ে স্বপ্ন আমার বুকের ভেতরে দ্রিমি দ্রিমি শব্দে হাঁটে।

'Had I the heavens’ embroidered cloths,
Enwrought with golden and silver light,
The blue and the dim and the dark cloths
Of night and light and the half light,
I would spread the cloths under your feet:
But I, being poor, have only my dreams;
I have spread my dreams under your feet;
Tread softly because you tread on my dreams.'


যে চিঠির ভেতরে নীলচে আগুন থাকে, সবুজ আরাম থাকে, সোনালি বেদনা থাকে, সেই চিঠি আজও আমার বুকে গান হয়ে বাজে। যে প্রেমের চিঠি মানে ইয়েটসের কবিতা, যে ভালোবাসার পত্র মানে এলভিস প্রিসলির গান, কোহেনের লিরিক, সেই চিঠি আমাকে নতুন করে প্রতীক্ষার অনুপ্রেরণা দেয়। যে অসীম আদর আর ভালোবাসার ভেতর দিয়ে আমাদের যাত্রা চলেছে আরও অসীমের পথে, সেই পথ কত কত ধ্বনি বয়ে আনে। যে ধ্বনির ভেতরে নতুন নতুন বাঁচবার গল্প কি স্বপ্ন উদ্ভট বাজিকরের মতো আমাকে সাহস জোগায়। যে কথা যায় না বলা তবু লিখে দেওয়া যায়, যে চুমু এক হাত দূরে মুচকি হাসির মতো, জীবনের কত কত ঘটনা ও দুর্ঘটনার মতো, বারবার কত কত ধ্বনি ও ধ্বনি বিপর্যয়ে বেঁচে আছি পাশাপাশি এবং একা- এই তো জীবন। এই তো জীবনের চরণধ্বনি শুনি...

মন্তব্য করুন