পর্ব-৬

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী বলেন, 'সাতচল্লিশের রাজনীতিতে পলিটিক্যাল লেবেলে ভারতের সাথে আমরা মিলে যাব- এটা আমরা কখনও ভাবিনি।' অর্থাৎ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনীতি তো চলছেই, কিন্তু ভারতের সাথে মিলে যাবার কথাও কখনও ভাবা হয়নি।

এই অঞ্চলের মানুষেরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে যে রকম শোষিত ছিল- তাই আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা ছাড়া আর কোনোভাবে তাদের উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। এই যে উন্নয়ন সম্ভব ছিল না আলাদা রাষ্ট্র ছাড়া- এটাই হচ্ছে আমাদের ইতিহাস চর্চার মূল সূত্র।

ইনার গ্রুপে বেশকিছু সদস্য ছিল যেমন- রুহুল কুদ্দুস, আহম্মেদ ফজলুর রহমান, কামরুদ্দীন, নাসের, শোয়েব চৌধুরী এবং আরও অন্যান্য। এই নাসের পরে মানসিক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর এই শোয়েব চৌধুরী হলেন প্রয়াত চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর বাবা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে মোয়াজ্জেম চৌধুরী বলেন, 'একে ষড়যন্ত্র মামলা আমি বলবো না; আগরতলা দিয়ে পাস করার কারণে একে আগরতলা মামলা বলা হয়েছিল। আমাদের মূলত যেটা পরিকল্পনা ছিল, মুজিবকে পার করে দিয়ে, লন্ডনে গিয়ে সুভাষ বসুর মতো একটি যুক্তফ্রন্ট করব। সুভাষ বসু যেমন বাইরে থেকে আঘাত করেছিল, সেইভাবে স্বাধীনতার সংগ্রামে মুজিব আঘাত করবে।'

তবে তিনি স্বীকার করেন, সেরকম কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা তাদের ছিল না। কিন্তু তারা নিজ নিজ ভূমিকায় সবল ছিলেন।

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, ইনার গ্রুপ সুভাষ বসুর মডেল দ্বারা অনেক প্রভাবিত ছিল। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিমও সুভাষ কসু দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। এবং যৌথ বাংলার প্রস্তাব প্রথম আলোচনা করা হয়েছিল সুভাষ বসুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সাথেই।

দুই.

এই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিক পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাবো যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচেষ্টা কোনোভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, কোনোভাবেই ভারতের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। এটা ছিল একটা স্বতন্ত্র ধারাবাহিকতা; পর্যায়ক্রমিকভাবেই বিভিন্ন ঘটনা ও পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটা তৈরি হয়েছে এবং এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

জানুয়ারি ১৯৬৯, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুকে জেলখানা থেকে নিয়ে যাওয়ার পথে

আগরতলার ঘটনাকেও সেই ঐতিহাসিক ধারাবহিকতারই অংশ বলে মনে করা যায়। যে ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ যুক্ত হয়েছেন। তার মধ্যে একটা অংশ হচ্ছে তৎকালীন সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের থেকে আসা। যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্ভবত শেষ দিকে এসে যুক্ত হয়েছিলেন। যেমন- সার্জেন্ট জহুরুল হক, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ। এ প্রক্রিয়ার ভেতরে মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীরা যে ধারা থেকে এসেছিলেন তার সাথে এই সেনাবাহিনী থেকে আসা ধারার সংযোগ ছিল না। তারা যুক্ত হয়েছিলেন আহমেদ ফজলুর রহমান, রুহুল কুদ্দুস- এদের সঙ্গে। দেখা যাচ্ছে এখানে দুটি ধারার সন্নিবেশ ঘটেছিল। দুই ধারার অনেকেরই নাম পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে তো একাত্তরের ২৬ মার্চ ভোরবেলা বাসায় হামলা চালিয়ে হত্যাই করে পাকিস্তানি সেনারা। মোয়াজ্জেম চৌধুরীরা সাতচল্লিশ থেকে ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সের সাথে যথেষ্ট সম্পর্ক রেখে চলছিলেন। একটা হেডকোয়ার্টার বা উপকেন্দ্র তৈরির চিন্তা করে ১৯৫৪ সালের পর তারা কলকাতা যায়, তাদের ধারণা ছিল সবাই এখানে একত্রিত হবে এবং শেখ মুজিবও আসবেন সেখানে। কিন্তু পরে সেটা হয়নি।

পরিস্থিতি পাল্টে যায় ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল চালু হবার সাথে সাথে। এতকিছুর পরেও পাকিস্তানের যতটুকুই-বা টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিল, সেটিও এবার শেষ হয়ে যায়। আটান্নর পরে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবেও বাংলাদেশের মানুষের রাষ্ট্র ছিল না। অর্থাৎ, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কৃত্রিম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় ১৯৫৮ সালে। এবং এর পরেই বাংলাদেশের সকল দলের মধ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচেষ্টাগুলো জোরদার হয়ে যায়। এ সময়ে এসে গোপন ইনার গ্রুপ ছাড়াও একাধিক সংগঠন স্বাধীনতার চেষ্টা করতে থাকে। বস্তুত পক্ষে আমি এমন অনেক সংগঠনের নাম পেয়েছি যারা স্বাধীনতার জন্য কাজ শুরু করেছিল। এসব গ্রুপ বিশেষ কয়েকজন মানুষের সাথে সবসময় যোগাযোগ রক্ষা করত। এবং তাদের মধ্যে যার কথা বারবার আসে- তিনি হচ্ছেন শেখ মুজিব। ১৯৫৮ সালে যদিও তিনি প্রধান নেতা নন, কিন্তু স্বাধীনতার যে ধারাবাহিকতা সেটার তিনি প্রধান ব্যক্তিত্ব। সোহরাওয়ার্দী স্বাধীনতার পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি গণতান্ত্রিক পাকিস্তানই চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার আন্দোলন তিনি করেননি। মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীও বলেছেন যে, 'স্বাধীনতার পক্ষের লোক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল যে, গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সে কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে সে কোনোদিন অস্বীকার করেনি, এর সাথে কোনোদিন কম্প্রোমাইজ করেনি- সে জন্যই সে এতবড় নেতা হতে পেরেছিল।'

১৯৫৮ থেকে '৬২ সাল পর্যন্ত দেখা যায় শেখ মুজিব বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বেশি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬২ সালের দিকে দেখা যায় কমিউনিস্ট পার্টির খোকা রায়ের সঙ্গে শেখ মুজিব স্বাধীনতার কথা বলছেন- যেটা খোকা রায়ের 'আমার দেখা রাজনীতির দুই দশক' বইতেও উল্লেখ আছে। কিন্তু খোকা রায়রা আবার রাশিয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। তারা রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে রাশিয়ার দিক থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ পাওয়া যায়নি তখন। সে সময় রাশিয়া নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার কথা বলে। ঠিক এ কথাটি আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির আসাদ্দর আলীও বলেছেন।

কমিউনিস্ট পার্টির সাথে আলোচনায় ব্যর্থ হয়ে শেখ মুজিব মোয়াজ্জেম চৌধুরীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। মোয়াজ্জেম চৌধুরী বলছেন, 'তখন আমরা শেখ মুজিবকে নিয়ে যাই।' মোয়াজ্জেম চৌধুরীর ভাগ্নে রেজা আলী শেখ মুজিবকে নিয়ে সম্ভবত প্রথম যান তেজগাঁও রেল স্টেশনে। সেখান থেকে জাকির খান চৌধুরী শেখ সাহেবকে নিয়ে যান সিলেটে; এই জাকির খান চৌধুরী পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছিলেন। সেই জাকির খান চৌধুরীর সাথে গিয়ে শেখ মুজিব সিলেটে ন্যাপ নেতা সাইদুর রহমানের চা বাগানে ছিলেন। সেখানে চা বাগান থেকে মোয়াজ্জেম চৌধুরী এবং শেখ মুজিব হেঁটে বর্ডার পর্যন্ত যান। মোয়াজ্জেম চৌধুরী বলছেন, 'রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা। খুব ঘন জঙ্গল- আমরা বর্ডার পার হলাম। শেখ মুজিবের সঙ্গে ছিল তারেক চৌধুরী এবং আমির হোসেন বলে একজন। আমি তাদের প্রায় এক মাইল পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেলাম। আগরতলা পার হবার সময় বোঝা গেল এ মুভমেন্ট সম্পর্কে ভারতীয়দের আগে থেকে জানানো হয়নি। এই দায়িত্ব ছিল নাসের সাহেবের। কিন্তু তিনি জানাতে পারেননি। ফলে আগরতলা থেকে শেখ মুজিবকে ফিরে আসতে হয়। ফিরে আসার সময় তার খুব কষ্ট হয়েছিল; এবং ফিরে এসেই তিনি ধরা পরেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিল শেখ মুজিব আগরতলা পার হয়ে দিল্লি যাবেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলবেন।'

ভারতে যাওয়ার পর কী হয়েছিল, এ ব্যাপারে পরে যেহেতু কেউ কথা বলেনি তেমন একটা, আমরা জানি না যে, সেখানে আসলে কী হয়েছিল। তবে ভারতীয়দের কারও কারও বইতে এ বিষয়ে কিছু লেখা হয়েছিল। বাংলাদেশেও কিছু লেখা হয়েছে। তবে, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি নিয়ে সবসময়ই পরস্পরবিরোধী তথ্যভিত্তিক কথাবার্তা চলে। মোয়াজ্জেম চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন যে, ওখানে যাওয়ার পর ভারতীয়রা শেখ মুজিবের সাথে খুব একটা আশানুরূপ ব্যবহার করেননি এবং শেখ মুজিব এতে অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়েই সেখান থেকে ফেরত আসেন। এরকম নানা কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন, ভারতীয়রা বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই প্রচেষ্টাকে সিরিয়াসলি নেয় না। মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী বলেন যে, "এই ভাবনাটা শেখ মুজিবকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে যখন শেখ মুজিবকে আমি বললাম, তোমাকে আমি দেশ থেকে বের করে নিয়ে যাই- শেখ মুজিব বলেছিল, তুমি দেখছো না ঢাকায় চারপাশে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে; আমাকে যদি না পায় ওরা, আমাকে খুঁজতে গিয়ে ঢাকা শহরের সমস্ত বাড়িঘর ভেঙে ফেলবে। আমি যাব না। তোমার মনে নেই আমি যখন তোমার কথায় ইন্ডিয়া গিয়েছিলাম, তখন ওরা আমার সাথে কী ব্যবহার করেছিল?"

১৯৬২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন ভারতে যাচ্ছেন, তিনি তো যাচ্ছেন আগামীর একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। সুতরাং, তিনি সে রকমই ইজ্জত আশা করেছিলেন। সেই অহংকারটা তার ছিল। সেই যথাযোগ্য সম্মান পাননি বলেই শেখ মুজিব ক্ষুব্ধ ছিলেন। আরও অন্যান্য বিষয় তো ছিলই। এ কথাগুলো মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীই বলেছিলেন।

তাহলে বোঝা যায়, মোয়াজ্জেম চৌধুরী ভারতীয়দের সাথে যুক্ত হয়েই এই কাজটি করছিলেন। দ্বিতীয়ত তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন গোপনে। তৃতীয়ত, ততটা সংগঠিত তারা ছিলেন না, কিন্তু প্রচেষ্টা হিসেবে এটি ছিল ঐতিহাসিক। এবং এই প্রচেষ্টাটার ধারাবহিকতা কিন্তু লাহোর প্রস্তাবের সময় থেকেই চলে আসছে। আর এই লাহোর প্রস্তাবের ধারাবহিকতা চলে আসছে পূর্বেকার রাজনীতি থেকে। লাহোর প্রস্তাবটা এই জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, আলাদাভাবে একক রাষ্ট্র হবার কথা এটাই প্রথম।

তিন.

একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী ভারতে চলে যান। কমিউনিস্ট নেতা হায়দার আকবর খান রনো এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, 'আমরা যখন ভারতে যাই ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সরা আমাদের আটকায়। তারা বলে ভেটিং করা ছাড়া তোমাদের ছাড়া হবে না। তখন আমরা বলি, কে আমাদের ভেটিং করবে? ভারতীয়রা বলে, আমাদের লোক আছে, তার ওপর আমরা পুরোপুরি আস্থা রাখি। ভারতীয়দের পক্ষ থেকে আমাদের ভেটিং করার জন্য আসলেন মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী। সে স্বীকৃতি দেবার পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।'

ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে মোয়াজ্জেম চৌধুরীর যে সম্পর্ক ছিল, এ কথা তিনি আমার কাছে গোপন করেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল দেশ স্বাধীন করা। তার কাছে স্বাধীনতার জন্য কাজ করার এটাও একটা পথ। তবে এটাই প্রধান পথ নয়। এটা গোপন পথ। তবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬২ সালে ভারত থেকে ফেরত আসার পরে গোপন রাজনীতির দিকে আর ফিরে তাকাননি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়তো ছিল, কিন্তু গোপন রাজনীতির ধারায় তিনি আর যুক্ত হননি। তখন তিনি দাঁড়ালেন ছয় দফার ধারায়। এবং ছয় দফার ধারাই সবচেয়ে সবল ধারা হলো। সবচেয়ে সফল ধারা হলো। এবং সেই ছয় দফার প্রথম ধারাটাই হলো লাহোর প্রস্তাবের ধারা।

মূলত, শেখ মুজিবুর রহমানের যে বিশাল রাজনৈতিক পরিমণ্ডল- তার মধ্যে এই গোপন রাজনীতিও একটি ধারা ছিল। সে ধারায় শেখ মুজিব যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রধান ধারা ছিল রাজপথের রাজনীতি।

মোয়াজ্জেম চৌধুরী বলেছিলেন, 'শুরু থেকেই শেখ সাহেব মনে করতেন এটা পশ্চিম পাকিস্তানের একটা কলোনি হবে।' আমি বললাম, তার মানে প্রথম থেকেই তার পাকিস্তানের ওপর কোনো আস্থা ছিল না? তিনি বলেছিলেন, 'না কোনো আস্থা ছিল না।'

আমি মনে করি, এই কয়েকজন ব্যক্তি, যেমন- শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক এবং এমন আরও কয়েকজনকে যুক্ত করলে আমাদের ইতিহাসটা বুঝতে সুবিধা হয়। এটা ব্যক্তির ইতিহাস নয়, এটা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, আমাদের ইতিহাস। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আচরণ বিশ্নেষণের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এটা একদিনের ইতিহাস নয়, এটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতার ইতিহাস। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যে মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক। আর সেই ধারাবাহিকতারই প্রধান ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান সর্বদাই উন্মুক্ত রাজনীতির মানুষ ছিলেন। মূলত ইনার গ্রুপের মতো সংগঠনগুলোর সঙ্গে জড়িত থাকার ব্যাপারটি ছিল তার একটি গোপন পর্যায়।

স্বাধীনতার জন্য এইসব গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী বলেছিলেন, পরে আমরা বুঝেছিলাম যে, আমাদের প্রচেষ্টা কতটা অপরিপকস্ফ ছিল। আসলে জনগণকে সাথে না নিলে এ ধরনের উদ্যোগ সম্ভব নয়।

চার.

আমার মতে এসব ঘটনা সম্পর্কে আমরা আজকের দিনে বসে খুব জোরালো বা স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না, যেহেতু এগুলোর পর্যাপ্ত প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। তবে গোপন রাজনীতির এই ধারাকে আমাদের আমলে নিতে হবে; কারণ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ঐতিহাসিক বাস্তবতা কিছুটা হলেও এখান থেকেই উঠে এসেছে। তবে শেখ মুজিবকে এ মামলায় আক্রান্ত করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ছয় দফা। কারণ ছয় দফার ঢেউকে না আটকাতে পারলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।

কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা আমাকে বলেছে- শেখ মুজিব যখন ১৯৬২ সালে তাদের সাথে স্বাধীনতার কথা বলতে যান, তখন তো তিনি সোহরাওয়ার্দীর লোক হিসেবেই বেশি প্রতিষ্ঠিত। ভারতীয়রা তাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিল যে, আপনার নেতা তো পাকিস্তানপন্থি। শেখ মুজিবের উত্তর ছিল- আমার নেতার পলিটিকস তার কাছে, আমার পলিটিকস আমার কাছে।

আমি মনে করি, যে রাজনীতি করে শেখ মুজিবের সবসময় সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে, সেই রাজনীতিটাই তিনি করেছেন। তার কাছে হয়তো মনে হয়েছে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থাকলেই তিনি রাজনীতিতে এগোতে পারবেন, তাই তিনি তার সঙ্গে এগিয়েছেন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ভাবনা এক ছিল না। তিনি হলেন স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ধারার মানুষ। সেই মানুষ ১৯৪৭ সালের আগেই স্বাধীনতার কথা ভাবছেন। সে জায়গায় শেখ মুজিবের কোন যুক্তিতে পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসা হতে যাবে! এর কোনো উদাহরণও নেই। তার রাজনৈতিক ইতিহাসের কোনো কর্মকাণ্ডই পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য নয়। আর ছয় দফা দাবির পর এটা নিয়ে বিতর্ক করার কোনো মানে নেই। তার পরেও যদি তাকে জোর করে পাকিস্তানপন্থি বা এক সময় তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছেন- এমন দেখানোর চেষ্টা করা হয়, সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু ইতিহাস চর্চার দিক থেকে আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে, এগুলো মানুষের বয়ান। তৎকালীন রাজনীতির এ রকম বিভিন্ন মানুষের বয়ান আমি শুনেছি। তখনকার যতগুলো স্বাধীনতার প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানতে পেরেছি- সবগুলোর সঙ্গে শেখ মুজিব যুক্ত না থাকলেও সবার কথাই তিনি জানতেন।

১৯৬৬ সালের পর ইনার গ্রুপের কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়। আর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর অনেক অবস্থারই পরিবর্তন হয়ে যায়। ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তান তো রাষ্ট্র হিসেবে কেবল একটা ফরমালিটিতেই পরিণত হয়েছিল। স্বাধীনতা বিষয়টি তখন আর এসব সংগঠনের নয়, স্বাধীনতা তখন সবার হয়ে গেছে। ঐতিহাসিকভাবে তাদের প্রয়োজন তখন শেষ হয়ে যায়।

অনেকেই বলেন, একসময় আমরা পাকিস্তান চেয়েছি। এটা একেবারেই মিথ্যে কথা। এটা যারা বলেন, তারা সেই সময়ের রাজনীতিটা জানেন না। যেখানে ইনডিপেন্ডেন্ট ইস্ট পাকিস্তানের কথা হচ্ছে, যেখানে ইউনাইটেড বেঙ্গল মুভমেন্টের কথা হচ্ছে, যেখানে ইনার গ্রুপের মতো সংগঠন কাজ করছে এবং যার প্রত্যেকটার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেঙ্গল মুসলিম লীগের রাজনীতি জড়িত। সেখানে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান রাজনীতির প্রতি আনুগত্য থাকার কথাটা আসে কী করে!

আমাদের সমস্যা হলো, আমরা পাকিস্তান আর ভারতের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ যে একটা নয়া বাস্তবতা ছিল- সেটা ভাবতে এবং স্বীকার করতে এখনও দ্বিধাবোধ করি। সেই বাইনারি চিন্তার বাইরে চিন্তা করতে আমরা অনেকেই দ্বিধাবোধ করি। কিন্তু সেটা যতদিন পারব না, ততদিন আমাদের আত্মবিশ্বাসও আসবে না, বাংলাদেশের ধারাবাহিক ইতিহাসও লিখতে পারব না। আমাদের বুঝতে হবে আমরা শত বছরের পুরোনো ইতিহাসের লোক। আমরা সংগ্রাম থেকে সৃষ্টি হয়েছি।

[এ প্রসঙ্গ সমাপ্ত]

মন্তব্য করুন