সকলে বলে, বরিস পাস্তারনাক ১০ বছর পরিশ্রম করে ডক্টর জিভাগো বইটি লেখেন। তারপর তিনি প্রকাশ করতে চাইলে সে বই রাশিয়া সরকার প্রকাশ করতে দেয় না। সময় ১৯৫৫ সাল। তিনি বইটি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৪৫ সালে। স্টালিন চলে গেছেন, মসনদে আছেন ক্রুশ্চেভ। কেমন করে এই বইটির একটি কপি ইতালিতে চলে যায়। বইটি ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ হয় এবং সেখানে প্রকাশিত হয়। রাশিয়া এতে খেপে যায়। তারপর যা হয়, বইটি অনেক ভাষায় অনুবাদ হয়। একসময় সে বই রাশিয়ান ভাষারও বাইরে প্রকাশিত হয়। ফলে রাশিয়া সরকারের ক্রোধ আরও বেড়ে যায়। অনেকে বলেন, বইটি সিআইর অসীম ক্ষমতায় খুব তাড়াতাড়ি সারাবিশ্বে তোলপাড় আনে। তারা নাকি বইটিকে নানাভাবে নানা জায়গায় বিক্রি করে। আর এসব গোলমালের ফলে এই বই নোবেল কমিটির 'টপ লিস্টে' চলে যায়। এবং ১৯৫৮ সালে তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। রাশিয়া সরকার বলে, বরিস পাস্তারনাক যদি এই পুরস্কার আনতে অসলো যান, তাকে আর কোনোদিন দেশে ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। তিনি দেশের বাইরে থাকেবেন। দেশ ছেড়ে যাবেন না পাস্তারনাক। তিনি টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেন, এই পুরস্কার তিনি নেবেন না। নোবেল কমিটি বলে- বইটির ভাষার লিরিক্যাল গুণ এবং রাশিয়ার সাহিত্য ঐতিহ্যের যোগ্য উত্তরসূরিকে এই পুরস্কার দেওয়া হলো। পাস্তারনাকের ছেলে ইউজিন পাস্তারনাক পুরো ব্যাপারটি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে লিখে যান। ছেলে বলেন- সেদিন বাবাকে বড় করুণ, ক্লান্ত এবং অনেকটা পাগলের মতো লাগছিল। একই কথা তিনি বারবার বলছিলেন- আমি টেলিগ্রাম করে বলে দিয়েছি, এই পুরস্কার আমার দরকার নেই। এখন আর কিছু চিন্তা নেই। তারপর? এই কষ্ট মেনে নিয়ে বেশিদিন বাঁচেননি। দুই বছর পর ১৯৬০ সালের মে মাসে তিনি মারা যান। ১৮৯০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তার জন্মদিন। দুই বছর কেবল একটু-আধটু অনুবাদের কাজ করেছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে শেষ পর্যন্ত বইটি রাশিয়ায় প্রকাশিত হয়। এবং বরিস পাস্তারনাকের ছেলে অসলোতে গিয়ে পরের বছর এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। বাবা নয়, ছেলের হাতে তুলে দেন পুরস্কার। তখন রাশিয়ায় ছিলেন গর্বাচভ।

এই হলো বইটির প্রকাশ ও বিকাশের গল্প। এখন এই বইটির 'থিম' থেকে একটি নাটক রচনা করেন বিবিসি। সেই নাটক দেখতে গিয়েছিলেন বরিস পাস্তারনাকের বোনের নাতনি আনা পাস্তারনাক। ১০ বছর আগে তার দাদি জোসেফিন পাস্তারনাক মারা যান। বলেন আনা- ভাগ্যিস আমার দাদি বেঁচে নেই। বিবিসি বরিস পাস্তারনাকের উপন্যাস নিয়ে যে নাটক বানিয়েছে, তাতে তিনি সত্যিই ক্রুদ্ধ হতেন। ভাইয়ের মাস্টারপিস ডক্টর জিভাগো নিয়ে আমার দাদির গর্বের শেষ ছিল না। আমাদের বাড়িতে সংগীত ও শিল্পের চর্চা হতো। আমার দাদার মা ছিলেন একজন কনসার্ট পিয়ানিস্ট। এবং তাদের বাবা ছিলেন একজন বড় আঁকিয়ে, যিনি টলস্টয়ের বই 'ওয়ার অ্যান্ড পিস'-এর নানা সব ছবি এঁকেছিলেন। বরিস পাস্তারনাকের মায়ের নাম ছিল রোসা আর বাবার নাম ছিল লিওনার্দ। লিওনার্দ ইমপ্রেশনিস্ট পেইন্টার ছিলেন। তারা প্রি-রেভুলেশন মস্কোতে বড় হয়েছিলেন। আমরা মা জোসেফিন আর বরিস একেবারে হরিহর আত্মা। দু'জন একসঙ্গে বড় হয়েছেন। বরিসের লেখা কবিতা শোনা আমার দাদির সবচেয়ে প্রিয় ব্যাপার ছিল। দাদি বলতেন- বরিস পাস্তারনাকের সমস্ত শরীরে ও আচরণে ছিল জিনিয়াসের ছাপ। কেবল কবিতাতেই নয়, এখন বিবিসি একটি প্রেম ও কবিতার উপন্যাসকে যেভাবে বিকৃত যৌনতাসর্বস্ব একটি নাটক বানিয়েছে, তাতে আমার দাদি বেঁচে থাকলে মূল ঔপন্যাসিককে খুন করার অপরাধে মামলা করতেন। এই ট্র্যাজিক প্রেমের গল্পটি মিলিয়ন মিলিয়ন পাঠককে একেবারে 'মেসমেরাইজ' করে রেখেছিল। আমার দাদা ছিলেন জীবনের চাইতে বিশাল একজন। তিনি জানতেন, আমাদের এই যন্ত্রণাময় পৃথিবীতে যা আমাদের মুক্তি আনতে পারে, যা আমাদের 'হিল' করতে পারে, সে কোনো মহৎ প্রেম। বইতে উইরি জিভাগো একজন ডাক্তার ছিলেন। তিনি মনের আনন্দে মুঠো মুঠো কবিতাও লিখতেন। যিনি রাজনীতির নানা সব ডামাডোলে কষ্ট পেতেন। কখনও বিক্ষুব্ধ হতেন। সান্ত্বনার মতো কবিতার 'হিলিং' বা নিরাময়ী ক্ষমতায় ডুবে যেতেন। ডুবে যেতেন সেই সৃষ্টিশীলতায়, যা লেখককে জীবনের গভীরে নিয়ে যায়। সে চলে যায় এমন এক পৃথিবীতে, যা আগে সে কোনোদিন জানেনি। মাছরাঙা পাখির মতো হৃদয়ের গভীর থেকে তুলে আনে সোনার মাছ। ডক্টর জিভাগোর জীবনে দু'জন নারী ছিল। একজন স্ত্রী টনিয়া ও একজন প্রেমিকা লারা, যাকে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বিদ্রোহের দিনে। টনিয়া পাস্তারনাকের স্ত্রী জিনাইডার ছাপ। আর লারাতে আছে তার 'সোলমেট' বা আত্মার বন্ধু ওলগা আইভানোস্কি। লারাকে তার মায়ের প্রেমিক কামারোভস্কি যৌন পীড়ন করেছিলেন। এ ঘটনা লারা সারাজীবন ভুলতে পারেননি। বত্তিচেলির নির্দোষ ছবির মতো লারাকে কামারোভস্কি প্রথম নখরাঘাতে দিশেহারা করে। কিন্তু বরিস পাস্তারনাকের বর্ণনার গুণে আমাদের ভালো লাগা থেকে যায়। কারণ, তিনি ছিলেন সত্যিকারের কবি। কেউ কেউ বলে 'ডক্টর জিভাগো' বইটির শেষে, মানে উপন্যাস শেষ হওয়ার পর কিছু কবিতা আছে। কিন্তু আসলে কবিতা আছে বইটির ভাষা নির্মাণ ও বর্ণনায়। শেষে নয়। লারা ও ইউরিকে পাস্তারনাক কোনো এক আধ্যাত্মিক ঘটনার মতো কাছে এনে দিয়েছিলেন। এক সুবিশাল আকাশের তলায় এক হয়েছিল এ দু'জন। লারা খুঁজতে এসেছিল স্বামী পাশাকে, যে ডামাডোলে নিখোঁজ। ওদের একটি মেয়ে ছিল কাটিয়া। ইউরি আর লারার শারীরিক মিলনের কথা লেখক কখনও সরাসরি বর্ণনা করেনি। কিন্তু বিবিসি একে একটা যৌনতাসর্বস্ব রমরমে নাটক করেছে। যেন ওদের দু'জনের এক হওয়ার এই হলো প্রধান ঘটনা। যখন লারা ও বরিসের দেখা হয়েছিল, রাশিয়া তখন বলশেভিকদের ক্ষমতা হস্তান্তরে ছিন্নভিন্ন। লেখক এই ক্ষমতা হস্তান্তরের সত্যকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, যা রাশিয়ার লেখক সমিতি মেনে নিতে পারেনি। তারা তাকে ভুল বুঝেছিলেন। মনে করেছিলেন, তিনি অ্যান্টিকমিউনিস্ট। স্টালিনের পক্ষে এসব কোমলতা সহ্য করা মুশকিল ছিল। এসব ফুল ঋতুর কবিতা। নর-নারীর নিবিড় সুন্দর প্রেম। তারপরও স্টালিন তাকে কোনো লেবারক্যাম্পে পাঠাননি। সে অবশ্য বিস্ময়। পাস্তারনাক যখন কারও মুখ চেয়ে একটিও পঙ্‌ক্তি বদলাতে চান না, তাকে তখন রাশিয়ার লেখক সমিতি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পাস্তারনাকের এইটিই সবচেয়ে বড় গদ্য রচনা। সত্যি কথা, এই জটিল রচনার প্রতিটি পাক খোলা সহজ নয়। পরতে পরতে যে কাহিনি জমে আছে, তা বুঝতে পারাও সহজ নয়। ১৯৬৫ সালে ডেভিড লিন যখন এই বইটির সিনেমা করতে গেলেন, বললেন- এই হতচ্ছাড়া পাস্তারনাক এমন এক বই লিখিছেন, যা সিনেমা করতে আমার জীবন বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জীবনেও এমন কঠিন কিছু করিনি। মনে হয়, আমি মাকড়সার সুতোকে টানটান করার চেষ্টা করছি। আমার দাদি কখনোই বিশ্বাস করেননি, কোনো পরিচালকের পক্ষে একে সিনেমা করা সম্ভব হবে। ডেভিড লিনের মহৎ ও আন্তরিক প্রচেষ্টাকে আমার দাদি সব সময় বুঝবেন, এ হাত পারে না। লারা ও ইউরির নায়ক-নায়িকা জুলি ক্রিস্টি ও ওমর শরীফ মাঝেমধ্যে দাদিকে হতাশ করত সে কথা ঠিক, তবে বর্তমান বিবিসির নাটকের মতো নয়। যখন সিনেমা শুরু হয় দাদি বলেছিলেন- এ তো রাশিয়া নয়। কথা ঠিক। ডেভিড লিন রাশিয়াতে ছবি বানানোর অনুমতি পাননি। ফলে তাকে ছবি বানাতে হয়েছিল স্পেনে। সেটা দাদি ছবি শুরু হওয়ার ১০ মিনিটের ভেতর বুঝতে পেরে হল ছেড়ে বাইরে চলে যান। যেই মাদার রাশিয়াকে ছেড়ে যাবেন না পাস্তারনাক, রাশিয়াতেই দস্তখত করে থেকে গেলেন- সেই রাশিয়া নেই সিনেমায়, সেইটি আমার দাদি কী করে সহ্য করবেন। দাদার চাপে তিনি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন, তারপর হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। যাকে বলা হয় পত্রপাঠ বিদায়। বর্তমান বিবিসির অ্যান্ড্রু ডেভিস তাকে চাকু দিয়ে কেটেছেন। 'সেক্সি স্টিমি' সিনে পরিপূর্ণ এই নাটক। ডক্টর জিভাগোর সৃষ্টিকর্তাকে সকলে বলে- লাস্ট রোমান্টিক ইন রাশিয়া। আর তার বইকে করা হলো একেবারে শরীরের মাতামাতি, রুদ্ধশ্বাস 'লাভ মেকিং'। এক প্রকার কামসূত্র। আমার দাদা পাস্তারনাক কোনোদিন আত্মাকে অস্বীকার করেননি। রাশিয়ার চাপে কোনো কিছু বদলাতে চাননি। কেবল স্ট্যালিনের জন্যই তিনি প্রাণে বেঁচে ছিলেন। সে এক মস্ত রহস্য। স্ট্যালিন তার সিক্রেট সার্ভিসকে বরেছিলেন- ওর মাথা মেঘের ভেতর। হিস হেড ইন দ্য ক্লাউড। স্পেয়ার দিস পোয়েট। কারণ? কে বলবে? আর বর্তমান পরিচালক আত্মা থেকে শরীর বের করে এনে কেবল শরীরকেই প্রধান করেছেন। জিব্রান বলতেন, আমি ছবি আঁকতে চাই আত্মাশুদ্ধ। কিন্তু অ্যান্ড্রু ডেভিস নাটক করেন আত্মাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে। এ নিয়েই আনা পাস্তারনাকের প্রতিবাদ। অনেক খবরের কাগজে, সবখানে। বলেন এই পরিচালক, 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস' এত সুন্দর করে সৃষ্টি করলেন, তিনিই বিবিসির নাটকে এ বইকে কী করে এমন সস্তা বানালেন। ভাবতে পারি না। মাঝেমধ্যে কিছু সস্তা সংলাপ ঢুকিয়ে একেবারে সস্তা করে ফেলা হয়েছে। এ তো জেন অস্টেন বা ডিকেন্সের বই নয়। এ বইয়ের নাটক করতে অনেক যত্ন প্রয়োজন। কথাবার্তা আরও সোফিসটেকেটেড হওয়া প্রয়োজন ছিল। আসল বইতে ষোলো বছরের লারা 'লাভার' শব্দটিও উচ্চারণ করতে চায়নি। কিন্তু বর্তমান নাটকে যেসব ডায়ালগ দেওয়া হয়েছে, তা অশালীন এবং বাজে। তারা কীভাবে একটি সংবেদনশীল রোমান্টিক নির্দোষ নাটককে শেষ পর্যন্ত 'ট্রাশ' বানালেন। অ্যান্ড্রু ডেভিস বলেন- আমি নাটকটির এমন একটি শেষ দিয়েছি, যা দর্শক মুগ্ধ হয়ে মেনে নেবে। অনেক হৃদয়গ্রাহ্য আমার শেষটুকু। এ হৃদয়গ্রাহ্য নয়, সুড়সুড়িগ্রাহ্য। খোদার ওপর খোদকারি করে নাটকটিকে একটি জঞ্জাল বানিয়েছে। আসলে পাস্তারনাক ছিলেন আমাদের বিবেক। আনার প্রবন্ধে আরও অনেক কিছু ছিল। আমাকে ভাবায় সেই মাদার রাশিয়ার কনসেপশন। আমি আনার চোখ দিয়ে মাদার রাশিয়াকে দেখতে পেলাম। 'হে আমার দেশের মাটি, হে আমার বালাকলাইকা, হে আমার মাঠ, হে আমার ঘ্রাণভরা প্রাণভরা ডাফোডিলগুচ্ছ। আমি যে তোমাকে ফেলে আর কোথায় যেতে পারি না।' এই তো ছিল পাস্তারনাকের আর্তনাদ। নোবেলের চেয়ে মূল্যবান আমার দেশ।' আনার প্রবন্ধ এভাবে আমাদের ভাবতে বলে। আরও গভীর করে বুঝতে বলে। প্রতিটি শব্দকে টাঁকশালের নতুন টাকার মতো যত্ন করতে বলে।

আনা বলেন, যখন সেক্স সম্বন্ধীয় প্রশ্নে সতেরো বছরের লারা তার বন্ধুকে প্রশ্ন করে- হ্যাভ ইউ ডান ইট? হাউ ইজ ইট লাইক? পাস্তারনাক শুনলে আর্তনাদ করে বলতেন- না না, আমার লারা এভাবে প্রশ্ন করে না। ফর গডসসেক কিপ হার ইনোসেন্স। তবে যখন ডেভিড লিন বলেন- 'হোয়াট এ বুক দ্যাট বাগার পাস্তারনাক ক্রিয়েটেড ফর আস? এই ছিল তার কথা। এ অবশ্য ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা মেশানো 'বাগার' কমেন্ট। তার মতে, পাস্তারনাক একজনই আছেন সারাবিশ্বে। তিনি সেই স্বাধীনতাকে ভাবেন, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তিনি কোনো তন্ত্র বা ডগমাকে মানেন না। জানেন সেই সত্য, যা আত্মা বিকশিত করে। তার কাছে ধর্মও তাই। ডগমা বা তন্ত্র নয়- এ ভাইটাল ফিলিং।

ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই, লরেন্স অব আরাবিয়া এসব ছবি যিনি বানান, তিনি চেষ্টা করেন একখানা দারুণ ডক্টর জিভাগো তৈরি করতে। প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া ডেভিড লিনের আরও একটি মনে রাখার মতো সিনেমা।

আমার মতে, ডক্টর জিভাগো প্রেম, প্রকৃতি, যুদ্ধ বা কবিতার উপন্যাস নয়। আসলে এ হলো জীবনের গল্প। নদীর মতো জীবন বয়ে চলে খানাখন্দ পেরিয়ে। আর যখন ইউরি ক্লান্ত নির্মল পিপাসার জল সেই নিরাময়ী বা হিলিং প্রেম, যা ইউরিকে প্রশান্তি এনে দেয়। নির্দয় রোদ থেকে সরে এসে কেউ যখন ছায়াময় গাছের নিচে দুদণ্ড বসে। যখন টানিয়া বা সন্তান কেউ কাছে নেই, যুদ্ধে বিচ্ছিন্ন, যখন ইউরি একা, প্রেম আসে লারা হয়ে। তখন ইউরি মরীচিকার মতো টানিয়া ও সন্তানকে দেখতে পান। ধরবে বলে ছুটে যান, ওরা মিলিয়ে যায় কোনোখানে।

ডক্টর জিভাগো বেঁচে থাকেন সেই মেয়ের ভেতরে। নদীর গতি অব্যাহত থাকে। পাস্তারনাক বলেছেন তার দীর্ঘদিনের মিস্ট্রেস অলগা আইভানোস্কি লারা। যে নারী তার চাইতে বাইশ বছরের ছোট ছিলেন। আর স্ত্রী জিনাদে টানিয়া। আর যে তৃতীয় মেয়েটির কথা ডেভিড লিন উল্লেখ করেন না, তিনি হলেন মারিনা। একসময় এই মেয়েটি ইউরির জীবনে এসেছিলেন। দুই বছর ছিলো। ডেভিড লিন বলেন- টু মেনি ক্যারেবটর টু হান্ডল। মারিনাকে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি ডেভিড লিন। আর বিবিসির নাটক? প্রশ্নই ওঠে না। যেখানে লারা ও ইউরির 'লাভ মেকিংই' প্রধান ঘটনা সেই নাটকে। যেখানে লারা 'হাউ হজ ইট লাইক' বলে স্বাদ বুঝতে চান। বইতে আছে মারিনার কথা। লারা ও ইউরির মেয়ে টানিয়ার গল্প দিয়ে সিনেমা শেষ। কিন্তু বইতে আরও একটু আছে। আনা পাস্তারনাক লিখেছেন একটি বই- 'দি আনটোল্ড স্টোরি দ্যাট ইন্সপায়ার্ড ডক্টর জিভাগো'। আমাদের জীবনের না বলা অনেক কথা ও কাহিনি লেখায় আসে। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই।

প্রথম মহাযুদ্ধ, রাশিয়ান রেভুলেশন ও রাশিয়ান সিভিল ওয়ারের পটভূমিতে বিশাল ক্যানভাসে আঁকেন এই উপন্যাস। ব্যবহার করেন সূক্ষ্ণ তন্তু।

কত সব মহৎ উপন্যাস আমাদের সিনেমায় অন্য রকম হয়ে যায়। কত শরৎ, কত রবীন্দ্রনাথ, কত বঙ্কিম, কত তারাশঙ্কর বদলে যায়। কিন্তু আনার মতো চিৎকার করার কেউ নেই, তাই বারবার এমন ঘটনা ঘটে। এ কারণে সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু বেঁচে থাকেন। অ্যান্ড দে লিভ হ্যাপিলি এভার আফটার। ভাগ্যিস দেবদাসের বেলায় এমন ঘটনা ঘটেনি।

মন্তব্য করুন