বঙ্গবন্ধু সময় সৃষ্টি করেছেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর মিলন হয়েছে। সময়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মেলবন্ধন যেমন অতুলনীয়, তেমনি ঐতিহাসিক। সময়ের সঙ্গে কেবল এ মহান নেতার সম্মুখ সাক্ষাৎ হয়নি, ইতিহাসের জমিনে তিনি সময় চাষ করেছেন। সময়কে নিজ ক্ষমতায় নির্মাণ করে তাকে শানিত করেছেন, করেছেন ফলবতী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সময়ের সন্ধিক্ষণ অনুসন্ধানের বিষয়।

'ডিসাইসিভ মোমেন্ট' বলে একটা কথা আছে, এ শব্দবন্ধটি প্রথম প্রয়োগ করেন ফরাসি আলোকচিত্রশিল্পী হেনরি কার্টিয়ার ব্রিশন। তার মতে, সময়ের সঙ্গে ঘটনার মিলনকাল অতি স্বল্প। এ অতি স্বল্প সময়েই দক্ষ ফটোগ্রাফার ক্লিক করেন। জ্বলে ওঠেন। উপহার দেন নন্দিত আলোকচিত্র। বঙ্গবন্ধুও ডিসাইসিভ মোমেন্ট চিনতে ভুল করেননি। তিনি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সময়ের সন্ধি নিপুণ দক্ষতায় করেছেন। সময় পরিপ্রেক্ষিতে ক্লিক করেছেন, জ্বলে উঠেছেন। আর বাংলাদেশ নামের লাল-সবুজের এক বর্ণিল ছবি জাতিকে উপহার দিয়েছেন।

সম্প্রতি শিলালিপি প্রকাশিত সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে : সময় রেখায় বঙ্গবন্ধু এমন এক প্রকাশনা যেখানে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ঐতিহাসিক মূল্যসংযোজিত সময়ের নিপাট বুনন উপস্থাপিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্ম থেকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া অবধি প্রতিটি ক্ষণ এ প্রকাশনায় তুলে ধরা হয়েছে উচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ নিয়ে। এটি একটি গবেষণাধর্মী কাজ। একদল পেশাগত গবেষক নিষ্ঠার সঙ্গে কাজটি করেছেন। গ্রন্থটি হাতে নিলে এক ধরনের সুখানুভব কাজ করে। কারণ, গ্রন্থটির রয়েছে নিজস্ব বাক্‌স্টম্ফূর্তি। গ্রন্থটি কথা বলতে চায়। পাঠক হিসেবে গ্রন্থটি হাতে নিলে অন্তত প্রথম পৃষ্ঠা না উল্টিয়ে পার পাওয়ার জো নেই। আর তাতেই পাঠক গ্রেপ্তার হয়ে যাবেন। শুরুতেই দেখবেন, বঙ্গবন্ধু সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন- চল তোমাকে আমার ফেলে আসা সময়গুলো ঘুরিয়ে দেখাই।

অতঃপর পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর দৃপ্ত পদচারণা। সিংহপুরুষ ইতিহাসের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছেন আপন গন্তব্যের দিকে-এক আইডেন্টিটি ও স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডের অভিলক্ষ্য নিয়ে। তিনি একা নন, হাঁটছেন সহযোদ্ধাদের নিয়ে। সঙ্গে আছেন নেতা-নেতৃবৃন্দ। আর জাতির পিতার বুকপকেটে কৃষক, মুটে, মজুর, কামার-কুমার, তাঁতি ও জেলের জন্য মুক্তির স্বপ্ন। মুক্তির অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এটি সময় রেখার ওপর দিয়ে কোনো ব্যক্তিবিশেষ পদচারণা নয়, এটি ইতিহাসের মহানায়কের এক দুর্গম অভিযাত্রা।

প্রকাশনার ট্যাগলাইন- সে আগুন ছড়িয়ে গেলে সবখানে। এ আগুন কোনো প্রলয়ের প্রতীক নয়, সৃজনের আঁতুড়ঘর। এ আগুন বাঙালির চেতনা ও মুক্তির স্মারক। এ আগুন নিঃশেষ করে না, বরং সৃষ্টির উন্মাদনা তৈরি করে। জাতির পিতা সময় রেখার ওপর দিয়ে হেঁটেছেন আর বাঙালির মুক্তির বারতা ছড়িয়েছেন। গ্রন্থে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে জাতির পিতা যাত্রা শুরু করেন। এর পর জাতিসংঘে ১৯৭৪ সালে দেওয়া সেই বিখ্যাত ভাষণে চুম্বক অংশ চয়িত হয়েছে, যেখানে বিশ্ব-মানব মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। এরপর ৫৫ বছরের একজীবনে হাজার বছরের অর্জনের গতিশীল উপস্থাপনা। সময় রেখায় আমরা পাই- জাতির পিতার জন্ম, প্রাথমিক শিক্ষা, রাজনৈতিক চেতনার ব্যুৎপত্তি, কলকাতার শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক সংযোগ, সম্প্রদায়িক দাঙ্গারোধে ভূমিকা। এরপর অবিভক্ত বাংলা থেকে পূর্ববাংলা, রাজনৈতিক অগ্রজদের সঙ্গে সফর, যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা, অনুবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, জয়বাংলা, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা ও বিশ্বনেতৃবৃন্দ, দেশ পুনর্গঠন, পরিবার, সংবিধান, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, দেশ গঠনে নানামুখী কার্যক্রম ও ইতিহাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড গ্রন্থিত হয়েছে। বইটিতে জাতির পিতার মহত্তম জীবন-মৃত্যুর এক অনাস্বাদিত অভিজ্ঞান লাভ করি আমরা; অনন্য সাধারণ এক জীবনের সাক্ষাৎ পাই, যে জীবন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সময়প্রবাহে অবিচলভাবে সে লক্ষ্যের দিকে ধাবমান।

আর্কষণীয় ও শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত প্রকাশনাটিতে ঐতিহাসিক ছবির সমারোহ ঘটেছে। ব্যবহূত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতিসমূহ। প্রাসঙ্গিক কবিতা এবং শিল্পকর্মের ব্যবহার প্রকাশনাটির নান্দনিক বৈভব বাড়িয়ে দিয়েছে। চার রঙে ছাপা প্রকাশনার ঝরঝরে অক্ষর বিন্যাস ও নির্ভুল মুদ্রণ বইটির সুখপাঠ্যতা নিশ্চিত করেছে।

সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে : সময় রেখায় বঙ্গবন্ধু গ্রন্থটি পাঠককে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘটনাবহুল জীবনের সম্যক পাঠ গ্রহণে সহায়তা করবে। গ্রন্থটি সঙ্গে আছে মানে পাঠক আস্থার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারছেন এবং অন্যদের জানাতে পারছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে প্রকাশনাটি একটি চলমান সংগ্রহশালা বললে অত্যুক্তি হবে না। সাধারণ পাঠক থেকে গবেষক- সবার জন্য বইটি অত্যন্ত উঁচু মানের একটি সংযোজন।

মন্তব্য করুন