- ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বিশেষ ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

শৈশবে মায়ের মৃত্যু, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের শরণার্থী জীবন এবং ১৯৮২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মেজো ভাই ও বড় ভাইয়ের স্ত্রীর মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

- আত্মপ্রকাশলগ্নে কেনো প্রতিবন্ধকতার কথা মনে পড়ে?

কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হইনি।

- প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি?

১৯৮৮ সালে আমার প্রথম বই 'জগদীশ গুপ্তর গল্প : পঙ্ক ও পঙ্কজ' প্রকাশিত হয়। লেটার প্রেসে ছাপা এই বইটি ঢাকার ফুলদল প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেন আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজীজ। সেই স্মৃতি প্রভূত আনন্দের।

- কোন বই বারবার পড়েন? কেন?

অনেক বইই বারবার পড়ি। তবে বিশেষভাবে বলব আর্নেস্ট হেমিংওয়ের 'দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি' এবং সমরেশ বসুর 'শাম্ব' উপন্যাসের কথা। এ দুটি উপন্যাসেই মানুষের বিশ্বাসের জোর ও অসীম সম্ভাবনার কথা শিল্পিত হয়েছে। মানুষ যে বেঁচে থাকে, এগিয়ে যায় এই বিশ্বাসই উপন্যাস দুটির প্রাণ।

- এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

ব্যস্ত নই, ত্রস্ত আছি। বিশ্বজুড়ে রোগাক্রান্ত মানুষের হাহাকার। গত চৌদ্দ মাসে বহু প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি। প্রতিদিন ঘনিয়ে আসছে দুঃসংবাদ। দুর্দিনকে পেছনে ফেলে শুভদিনকে আসতেই হবে- এই বিশ্বাসে ভর করে এখনও বেঁচে আছি।

- ব্যক্তিজীবনের এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি, যা আপনাকে কষ্ট দেয়?

আমার কোনো আক্ষেপ নেই, আমি পরিতৃপ্ত মানুষ। এই পরিতৃপ্তিই হয়তো আমার একধরনের সীমাবদ্ধতা।

- আপনার চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

হতাশ না হওয়ার শক্তি। কোনো পরিস্থিতিতেই হতাশা আমাকে গ্রাস করতে পারে না। আজকের তুলনায় আগামী দিনটি সুন্দরতর হবে- এই বিশ্বাসের ওপর ভর করে চলি। আমার প্রয়াত পিতার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা।

- নিজের সম্পর্কে বেশি শোনা অভিযোগ কোনটি?

আমার আলস্যকে অনেকেই অভিযোগের আকারে দাঁড় করান।

- নিজের সম্পর্কে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বেশি শোনা প্রশংসাবাক্য কোনটি?

প্রশংসাবাক্যের কথা মনে রাখিনি। হয়তো-বা প্রশংসারই যোগ্য নই!

- কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?

ছোটবেলা থেকেই স্কুল শিক্ষক হতে চেয়েছি। পরে চেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাহিত্য-সমালোচক হতে। এক অর্থে দুটোই পূর্ণ হয়েছে। তবে শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক-সমালোচক হিসেবে কতটুকু সফল হয়েছি তার বিচারভার শিক্ষার্থী ও পাঠকবৃন্দের হাতে।

- আপনার প্রিয় উদ্ধৃতি কোনটি?

'A man can be destroyed but not defeated.’

- জীবনকে কেমন মনে হয়?

সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা নিয়েই জীবন সুন্দরতম। এই জীবনকে যাপন করাই শ্রেষ্ঠ আনন্দ। জীবনানন্দ!

ভীষ্মদেব চৌধুরীর রচনা থেকে

অর্জুনের প্রথম মৃত্যু তারই পুত্রের হাতে; বভ্রুবাহন সেই পিতৃ-হন্তারক, যে বিমাতা উলুপীর পরামর্শে যুদ্ধে আহ্বান করেছিল পিতাকে। মণিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার গর্ভজাত ওই পুত্রের হাতে নিহত হলেও অর্জুন তার অপর স্ত্রী নাগকন্যা উলুপীরই দেওয়া সঞ্জীবন মণির শুশ্রূষায় লাভ করেছিলেন পুনর্জীবন। মিথিক ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস এই যে, লক্ষ্যভেদী সব্যসাচী ও যুগনায়ক যিনি, আত্মজ কিংবা আপনজনই তার হত্যাকারীর ভূমিকায় মাথা তুলে দাঁড়ায়। কিন্তু অব্যর্থ লক্ষ্যভেদও কখনো-কখনো ব্যর্থ হয়ে যায়। কেননা, অর্জুন 'জিষ্ণু' পরিচয়ে বেঁচে থাকেন, বেঁচে থাকবেন। স্বর্গারোহণ হয় না বটে তাঁর, তবু মিথ-পুরাণের অর্জুন মৃত্যুহীন ও লক্ষ্যভেদী বিজয়ী রূপেই মানুষের মনোলোকে অক্ষয় চিহ্ন এঁকে রেখে যান। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অর্জুনও উপর্যুপরি আক্রান্ত হয় তারই বন্ধুর ইন্ধনে, যে-বন্ধুরা ছিল আপৎকালের সহযাত্রী, অনিশ্চিত দেশান্তর-অভিযাত্রার এক-একজন অডিসিয়ুস! সুনীলের আত্মজীবনেরই অনেকটা প্রতিরূপ-চরিত্র অর্জুন, অর্জুন-বৃক্ষের মতোই যে অভ্রভেদী হয়ে ওঠে এবং মিথ-পুরাণের সারাৎসার নিজের চৈতন্যে ধারণ করে বলে :'... বেঁচে থাকাটা এত আনন্দের! তবু মানুষ কেন মরতে চায়, কেন অন্যকে মারতে চায়! ... আমার বুকে আর ব্যথা নেই- আমার মাথা পরিস্কার- আমি ঠিক বেঁচে থাকবো! বেঁচে থাকবো! বাঁচতে আমার ভালো লাগে। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, আমি মরবো না।'

['আমি অর্জুন... আমি মরবো না' শীর্ষক নিবন্ধের অংশ]

[২৩ মে ২০২১ সংখ্যা কালের খেয়ায় প্রকাশিত 'আপন দর্পণ' বিভাগে ভীষ্ফ্মদেব চৌধুরীর সাক্ষাৎকারে কিছু তথ্যগত ভুল ছিল। এজন্য আমরা দুঃখিত। সাক্ষাৎকারের সঠিক পাঠ পত্রস্থ হলো। -বি.স.]

গ্রন্থনা :গোলাম কিবরিয়া

মন্তব্য করুন