'ওই যে, লোকটাকে দেখছ, ওই লোকটার নাম ইদ্রিস মিয়া, আজব একটা লোক।'

রুবানার কথা শুনে আমি লোকটার দিকে তাকালাম। বয়স হবে পঞ্চাশের মতো। আরও কমও হতে পারে। স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে বলেই হয়তো এতোটা বেশি দেখাচ্ছে। চুল-দাড়ি বেশিরভাগই পাকা। মাথায় উসকোখুসকো চুল। দাড়িগুলো আরো অগোছানো। মনে হচ্ছে, শুকনো কচুরিপানার নিচের অংশ এক গোছা আঠা দিয়ে মুখে লাগিয়ে দিয়েছে কেউ। পরনে একটা নীল রঙের লুঙ্গি, গায়ে ছাতাধরা সাদা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির ওপর একটা ময়লা ছেঁড়া-ফাড়া জাম্পার। কতোকাল তার পরনের কাপড় ধোয়া হয়নি, আল্লাহই জানে। দেখে তো মনে হচ্ছে, মাত্র মাটির তলা থেকে কুড়িয়ে এনেছে। এমনভাবে হেলেদুলে হেঁটে আসছে দেখে মনে হচ্ছে, হাঁটতে হাঁটতেই ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ ওষ্ঠা না খায়! ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা। রিকশা থেকে নেমে আমি ব্যাগ-লাগেজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছি। বাকিটা পথ হেঁটেই যাব মন স্থির করেছি। শায়লা পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট। ওকে নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়াটা রিস্কি। রিকশাটা ঘুরিয়ে চলে যেতেই রুবানা লোকটাকে দেখাল। আমি আমার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলালাম, রুবানার লাগেজটা নিলাম ডান হাতে। শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি, হাতে মিষ্টি, ফলমূলের প্যাকেট আছে দুটো। সেগুলো শায়লার হাতেই। আমি বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে বললাম, দাও, ওগুলো আমার হাতে দাও। রুবানা বলল, থাক, পারব। তুমি বরং রুবেলকে ফোন দাও। বলো, আমরা রিকশা থেকে নেমে গেছি।

রাস্তার পাশে লাগেজটা রেখে আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। ওই লোকটা এগিয়ে আসছে। রুবানাও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রুবানাকে দেখে লোকটা সামনে দাঁড়িয়ে সবকটা দাঁত বের করে হেসে বলল, কী বুবু, আইছেন? দ্যান, ব্যাগডি দ্যান। বাইত দিয়া আই।

রুবানা একদম গা-ঝাড়া দিয়ে দু'হাত নাড়িয়ে বলল, না না, লাগবে না। আমরাই পারব। বাড়ি থেকে লোক আসছে। আপনি যান।

তাও লোকটা আমার হাতের লাগেজের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলো- আরে দ্যান না, অসুবিধা নাই। আমিই দিয়া আই।

রুবানা লাগেজটি আমার হাত থেকে সটকে টান দিয়ে সরিয়ে বলল, খবরদার, কোনো জিনিসপত্রে হাত দিবেন না! যান আপনি; যান বলছি।

ধমক খেয়ে লোকটা আবার হেলে-দুলে হাঁটা শুরু করল। আমাদের কথা যেন শুনতে না পায় এতোটা দূর যেতেও তার দু'তিন মিনিট লাগল। এর মধ্যে পাশ দিয়ে ধুলা উড়িয়ে একটা ট্রাক্টর গেল। ধুলার হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা দু'জনই নাক-মুখ ঢেকে বিলের দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। রাস্তার একপাশে সবুজ ধানের বিস্তীর্ণ বিল, আরেক দিকে এঁকেবেঁকে চলে গেছে গোমতী নদী। তাও এই রাস্তাটাকে কেমন জাহান্নামের মতো লাগছে। ধুলার কারণেই দাঁড়ানোর উপায় নেই। লোকটা এর মধ্যে অনেকটা দূর চলে গেছে। ওদিকে তাকিয়ে রুবানা বলল, লোকটা কবরস্থানে ঘুমায়।

এমন একটা কৌতূহলোদ্দীপক কথা শুনেও এ অবস্থায় সেখানে দাঁড়িয়ে এ-বিষয়ে আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। আমি বললাম, তাড়াতাড়ি চলো। রুবানা বলল, ওই পথটা দিয়ে নেমে যাও, গ্রামের ভিতর দিয়ে চলে যাই। একটু দেরি হবে, তাও ধুলোর হাত থেকে বাঁচব।

বাড়িতে পা রাখতে রাখতে প্রায় সন্ধ্যা। রুবানাকে দখল করে নিল তার বাড়ির লোকজন। তাকে যখন আমি একলা পেলাম তখন রাত প্রায় এগারোটা বাজে। শুয়ে পড়ে হঠাৎ আমার ওই লোকটার কথা খেয়াল হলো- আচ্ছা, ওই লোকটা কবরস্থানে ঘুমায় কেন?

কোন লোকটা?

ওই যে আসার সময় দেখা হলো।

ও! ইদ্রিস মিয়া! সে এক মজার কাহিনী। মজার না, খুব বেদনার। খুব দুঃখের।

কী?

ওর মা মারা গিয়েছিল ছোটবেলায়। বাবা মারা গিয়েছিল আরো আগেই। ত্রিকুলে আর কেউ ছিল না। মানে নিকটাত্মীয়-স্বজন। মা মানুষের বাড়ি কাজ করত। তাতেই মা-ছেলের চলে যেত। ছোটবেলায় ইদ্রিস মিয়া নাকি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল। হাফেজি পড়ার জন্য। কিন্তু মাদ্রাসায় গিয়ে থাকতে পারত না। মানে মাকে ছাড়া থাকতে পারত না। মাও নিশ্চয় থাকতে পারত না ছেলেকে ছাড়া। একমাত্র ছেলে। ওর মার আবার বিয়ে দেবারও চেষ্টা করেছিল আত্মীয়-স্বজন। কিন্তু ইদ্রিস মিয়ার মা রাজি হয়নি।

আমার হাই উঠছে। বললাম, বাদ দাও। পরে শুনবো।

শোনো না, ইদ্রিস মিয়া তার মা মারা যাবার পর থেকেই কবরস্থানে থাকে। ওর মা একলা কীভাবে থাকবে, এই ভেবে! ওরও নিশ্চয় খারাপ লাগত মাকে ছাড়া থাকতে।

কতোদিন আগের কথা?

মানে ওর মা কবে মারা যায়?

সে হবে বিশ-বাইশ বছর। আমাদের ছোটবেলার কাহিনি। আমি ওর মাকে কখনো দেখিনি। ওই যে বলল না, একবার বর্ষাকালে আমাকে কাঁধে করে রাস্তা পার করে দিয়েছিল, তখনই শুনেছি, ও নাকি কবরস্থানে থাকে! আব্বাই বলেছিল। শুনে তো আমার গা গুলিয়ে বমি আসার জোগাড়। স্কুলে না গিয়ে আমি সাথে সাথে বাড়ি এসে গোসল করেছি।

তাই আজ ব্যাগ ধরতে দিলে না?

দ্যাখো না, গা-ভর্তি ময়লা। গোসল করে না কতোদিন কে জানে! পায়খানা-প্রস্রাব করেও বোধহয় পানি নেয় না।

হুম্‌। ঘুমালাম।

ঘুমের জন্য পাগল হয়ে গেলে মনে হচ্ছে?

ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে।



পরদিন সকালে রুবেলকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম আড়ংয়ে। গিয়ে দেখা পেলাম ইদ্রিস মিয়ার। হোটেলে বসে পরোটা খাচ্ছে। গায়ে গতকালের দেখা পোশাক-আশাকই বহাল আছে। তবে বাড়তি একটা চাদর যুক্ত হয়েছে। সে চাদরও ছেঁড়াফাড়া এবং দুনিয়ার ময়লা। আমাকে দেখে হাসল এবং সরে বসে বলল, আসেন, ভাইসাব, বসেন।

দোকানের অন্যান্য লোকও আমাকে দেখে সরে বসল। কেউ আমাকে সালাম দিল, আমি কাউকে সালাম দিলাম। বেশিরভাগই মুরুব্বি লোকজন। এঁদের মধ্যে আমার চাচাশ্বশুর, জ্যাঠাশ্বশুর অনেকেই থাকবেন। আমি মুখ দেখে হঠাৎ কাউকে শনাক্ত করতে পারলাম না। রুবেলই বলল, দুলাভাই, চা খাইতে চাইলেন। কই রহিম ভাই, কাপ ধুইয়া চা দেও।

কে এক মুরুব্বি বললেন, দুইটা পরোটা খাও জামাই।

আমি মাথা নেড়ে আপত্তি করলাম, না, শুধু চা-ই খাব। আপনারা কে কী খাবেন খান। মিষ্টি খান সবাই।

বুড়ো লোকটা পান খাওয়া ফোকলা দাঁত বের করে হাসল। কী সুন্দর হাসি আর সরল! পাশের লোকদের হেসে হেসে বলল, জামাইয়ের বুদ্ধি আছে, শ্বশুরবাড়ি আইসা খালি খাইয়া যাইব না; খাওয়াইও যাইব।

মেসিয়ার ছেলেটা আমার কাছে চায়ের কাপ রেখে গেল। আমি তাকে সবাইকে মিষ্টি দিতে বললাম। ইদ্রিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখি তার নাশতা খাওয়া প্রায় শেষ। বললাম, মিষ্টি খাবেন নাকি?

সে মাথা নাড়িয়ে বলল, দেন একটা। খাই।

লোকটা কবরস্থানে ঘুমায়! একটা লোক কবরস্থানে ঘুমায়- এ-কথা শুনলে একটু কৌতূহল না হয়ে পারে না। গ্রামের লোকজন দেখলাম তার প্রতি খুব সদয়। এতো ময়লা গায়ে বসে আছে, তাও কারো কোনো আপত্তি নেই। আমার একটু ইচ্ছে হলো লোকটার সাথে কিছু কথা বলি। কিন্তু, ভরা হোটেলে বাড়তি কথা বলার উৎসাহ পেলাম না। চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি। কথা বললেও জোরে বলতে হবে। আর বলবোই-বা কী? মিষ্টি খাওয়া শেষ করে ইদ্রিস মিয়া উঠল। যাওয়ার আগে বলে গেল, আইচ্ছা, যাই, আসসালামালাইকুম।

মুরুব্বি লোকটাই হাত উঁচিয়ে সালামের উত্তর নিয়ে বললেন, যারে, পাগলা। দুপুরে খাইয়া যাইছ আমার বাড়িতে। ইদ্রিস মিয়া হেসে বললেন, কথা দিতে পারতেছি না। কহন কই থাকি। ভুখ লাগলে আয়াম, পারলে।

একজন লোক ইদ্রিস মিয়ার হাত ধরে বলল, আমার বাপের কবরটা একটু দেখিস। আরেকজন লোক টেবিলের ওদিক থেকে বলল, আমার মার লাইগ্যা একটু দোয়া কইরো, ভাই।

ইদ্রিস মিয়া হাত উঁচিয়ে যেতে যেতে বলল, সবার জন্যই দোয়া করি। সব মুর্দার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ সবাইরে বেহেশত নসিব করুক। সবার বাপ-মা ভালো আছে। আমি দেখি তো, কারো কবরে কোনো আজাব নাই। সবাই বেহেশতের বাগানে ঘুমাইতেছে...

ভিড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ইদ্রিস মিয়া হাত উঁচিয়ে বলতে থাকে। ভিড় সরে তাকে জায়গা করে দেয়। যেন একজন রাজা হেঁটে যাচ্ছে।

ইদ্রিস মিয়া চলে গেলে টেবিলের ওদিকের লোকটা চোখের পানি ফেলে দিয়ে বলে, আহা, পাগলা আছে বইলা মারে নিশ্চিন্তে কবরে রাইখা আইছি। পাগলায় এহন রাইত জাইগা আমার মার কবর পাহারা দেয়!

ইদ্রিস মিয়ার প্রতি আমার কৌতূহল আরো বাড়ল। ওই একদিনেই আবিস্কার করলাম, ইদ্রিস মিয়াকে প্রায় পীরের মর্যাদা দেয় গ্রামের মানুষ। তাকে কেউ ভয় করে না। শুধু সম্মানই করে। ইদ্রিস মিয়া কারো কাছ থেকে কখনো একটা টাকাও নেয় না। নতুন কাপড়ও নেয় না। একটা কাপড় পরেই সে বছরের পর বছর থাকে। সেসবও সে কুড়িয়ে নেয়। চাওয়ার মধ্যে শুধু যখন তার ক্ষুধা লাগে তখন যার-তার বাড়ি গিয়ে খাবার চায়। যার বাড়িতেই যাক সবাই তাকে খুব আদর করে খাওয়ায়। ইদ্রিস মিয়া কারো বাড়ি খেতে গেলে সে-বাড়ির লোকজন খুব সম্মানিত বোধ করে। গ্রামে কেউ মারা গেলে ইদ্রিস মিয়া প্রথম কদিন সেই নতুন কবরের পাশে রাত জেগে বসে থাকে। পুরো কবরস্থানটাই সে পাহারা দিয়ে রাখে। কখনো নিজেও কবর খোঁড়ে; লাশ কবরে নামায়। জীবিত ও মৃত ব্যক্তির সাথে ইদ্রিস মিয়া যেন অদ্ভুত এক সেতুবন্ধ গড়ে তুলেছে।

দু'দিন পরই আমি রুবানাকে বাপের বাড়ি রেখে ঢাকা চলে এলাম। ডেলিভারি হওয়ার আগে ও আর আসবে না। বাচ্চা হওয়ার আগে মেয়েদের বাপের বাড়ি চলে যেতে হয়- এটাই ওদের গ্রামের নিয়ম। আর আমারও বাসায় কেউ নেই ওকে দেখে রাখার। মার বয়স হয়েছে, বছরে সাত-আট মাস দুই মেয়ের বাসাতেই থাকে। এখন অবশ্য আমি একা বলে আমার কাছে চলে এসেছে। অফিসে থেকে ফিরে রাতে খেয়েদেয়ে রুবানার সাথে ফোনে কথাবার্তা সেরে আমি মার সাথে গল্প করতে বসি। বিয়ের পর মা একটু দূরে সরে গিয়েছিল। ছাত্রজীবনের মতো এখন আবার রাতদুপুরে মার সাথে গল্পের আসর জমে ওঠে। কথায় কথায় একরাতে মাকে আমি ইদ্রিস মিয়ার কথা বলি। শুনে মার চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে। আমাকে বলে, একবার আমারে নিয়া যাবি? লোকটারে দেখতে খুব মন চাইতাছে।

বললাম, চলো না, আগামী মাসেই চলো।

পরের মাসে মাকে নিয়ে এলাম রুবানাদের বাড়ি। ধানগাছে ছড়া এসেছে। আমগাছে কড়া এসেছে। রুবানার পেট আরেকটু ফুলে উঠেছে। হাঁসের মতো হেলে-দুলে হেঁটে সে এখন উঠান পার হয়। রাতে আমি ওর পেটে কান পেতে বলি, কী নড়েচড়ে? কী মনে হয়, ছেলে, না মেয়ে?

রুবানা বলে, আমি কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাফি করব না। আগেই জানতে চাই না, কী আসছে।

আমি বললাম, তা তো করতে হবে। ছেলে, না মেয়ে তা না জানার জন্য হলেও বাচ্চার অবস্থান ও অন্যান্য পরিস্থিতি জানার জন্য। দাঁড়াও, কালই তোমাকে একবার চেক-আপের জন্য নিয়ে যাব।

আলট্রাসনোগ্রাফি করে জানা গেল, আমাদের কন্যা সন্তান হবে। বাড়িতে একটা মিলাদ পড়ানো হলো। ইদ্রিস মিয়াকে খবর দিয়ে নিয়ে আসা হলো। মিলাদ শেষে দুপুরের খাবার দেয়া হলো। কয়েকজন ভিক্ষুক বসে ছিল উঠানের কোণে আমগাছতলায়। ইদ্রিস মিয়া কোন ফাঁকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের সাথে গিয়ে বসল। কেউ তাকে ডাকাডাকিও করল না। আমি রুবেলকে বললাম, ওনাকে ডেকে ঘরে এনে বসাও। রুবেল বলল, ডাইকা লাভ নাই। ও মাটিতে বইসাই খায়।

ইদ্রিস মিয়ার খাওয়া শেষ হলে আমি তাকে মার সাথে দেখা করতে নিয়ে গেলাম। মা কয়েক পলক ইদ্রিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমারে আমি কী দিতে পারি বাবা, যা পাইলে তুমি খুশি হইবা?

ইদ্রিস মিয়া বলল, মার কাছে সন্তান আর কী চায়, দোয়া ছাড়া।

মার চোখ দিয়ে পানি চলে এলো। আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল, আমি তো জানি না বাবা, আমার কবর কই হইব, কে আমার কবর পাহারা দিব! এইখানে যদি আমার কবর হইতো তয় তো তুমি আমার কবর পাহারা দিয়া রাখতে পারতা।

আমি একটু অপরাধ বোধ করলাম। আমি নিশ্চয়ই ইদ্রিস মিয়ার মতো মার কবর পাহারা দিতে পারব না। ইদ্রিস মিয়া বলল, কবর পাহারা দেওনের কিছু নাই, মা। কবর তো থাকে জীবিত মানুষের বুকের ভিতর।

মা ইদ্রিস মিয়ার বুকে-পিঠে-মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ইদ্রিস মিয়া মাকে সেলাম করে বাড়ির পেছন দিয়ে চারাক্ষেতের নামায় নেমে গেল। অপরাহেপ্তর রোদের ভিতর আমি তাকে মিলিয়ে যেতে দেখলাম।

সময়ের এক মাস আগেই আমার মেয়ে পৃথিবীতে এসেছিল। রুবানার গর্ভে হঠাৎ পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। ওকে ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়েছিল। বাচ্চটা তিন দিন ছিল আইসিইউতে। ওর অনেক নাম ঠিক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু কোনো নামেই ওকে আমরা ডাকার সুযোগ পাইনি। অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লা রুবানাদের বাড়ি যেতে যেতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। মাগরিবের নামাজের পর মসজিদের পাশে ওর জানাজার নামাজ পড়ানো হলো। আমি কোলে করেই ওর ছোট্ট দেহটা কবরস্থানে নিয়ে চললাম। হাতের পাঞ্জার সমান একটা বাচ্চা। কেন সে পৃথিবীতে এসেছিল, আর কেনই-বা চলে গেল গেল! এটা আমাদেরই সন্তান, আমাদের ভালোবাসার ফসল। মনে হচ্ছে, আমার বুকের ভিতর থেকে কেউ কলিজাটা আলাদা করে নিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর এমন ভয়াবহ হিমশীতল অনুভূতি আমি আগে কখনো স্পর্শ করি নাই। আব্বার মৃত্যুর সময়ও না। আব্বা মারা গিয়েছিলেন মোটামুটি ভালো বয়স হয়েই; রোগে-ভোগে। কিন্তু, এ কেমন মৃত্যু, এমন অপ্রত্যাশিত, আচমকা!

কবর আগেই খুঁড়ে রাখা হয়েছিল। আমাদের সাথে ইদ্রিস মিয়া ছিল। সে আমার কোল থেকে মামণির দেহটা নিয়ে অন্ধকার গুহায় শুইয়ে দিল। মাটি দিতেও আমার ভয় লাগছিল। মাটিচাপায় না ছোট্ট শরীরটা ব্যথা পায়! অ্যাম্বুলেন্সে আসতে আসতে আমার বারবারই মনে হয়েছে, সত্যিই কি সে আর বেঁচে নাই! অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাই, অন্য কোনো ডাক্তার দেখাই, ভালো কোনো ডাক্তার নিশ্চয় কোনো উপায়ে তাকে আবার জীবিত ফেরত দিতে পারবে!

কবর দেয়া শেষ করার পরও অনেকক্ষণ আমি কবরটার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। রুবেল ও মুরুব্বিরা ধরে আমাকে নিয়ে এলো। অনেকে বোঝালো, কবর দেয়ার পর নাকি মুর্দার পাশে বেশিক্ষণ থাকতে নাই।

চল্লিশার মিলাদ পড়িয়ে রুবানাকে নিয়ে ঢাকা আসার আগে মেয়ের কবর দেখতে গেলাম। কবরস্থানটা ফুলবাগানের মতো সুন্দর। মাঝখানে বিশাল একটা বকুল গাছ। ফুল পড়ে বিছিয়ে আছে। ইদ্রিস মিয়া ঘাস পরিস্কার করছিল। আমাদের দেখে এগিয়ে এলো। রুবানা তার ময়লা দেহ জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে বলল, আমার কলিজার টুকরাটারে দেইখা রাইখো, ইদ্রিস ভাই।

মন্তব্য করুন