রোজকার নিয়মে পুরোহিত খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠে পড়লেন। কেবল পাখিরাই তার আগে বাসা ছেড়ে বের হয়। তারপর পরম ভক্তিসহকারে তিনি প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রার্থনার পর তাঁর বিশপের এলাকার কাজ শুরু হলো। প্রাচ্যের এই এলাকায় তিনি ছিলেন দেবসুলভ গুণের অধিকারী একজন যাজক। তাঁর স্বধর্মের লোকেরা তাঁকে উচ্চ মর্যাদার আসনে স্থান দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষও তাঁকে খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং মান্যগণ্য করে।

ঘরের দরজার বাইরেই তাঁর নিজ হাতে লাগানো একটি খেজুরগাছের চারা রয়েছে; সুর্যোদয়ের আগেই সবসময় তিনি এতে পানি ঢালেন। আর নিবিষ্টভাবে অবলোকন করতেন, দিগন্ত থেকে হঠাৎ উদিত হয়ে খেজুরের মতো লাল সূর্যচক্র শিশিরসিক্ত পাতার ওপর কিরণ দিচ্ছে; আর সোনালি রেশমি সুতা দিয়ে মোড়া রুপার শিশিরবিন্দুগুলো টপ টপ করে ঝরে পড়ছে। সেদিনও ভোরে খেজুরগাছের চারায় পানি দেওয়া শেষ করার পর পুরোহিত আবার ভেতরে ঢোকার জন্য যেই ঘুরবেন, ঠিক তখনই চোখে পড়ল দুখী এবং উদ্বিগ্ন চেহারার কিছু লোক তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ওই দলের একজন লোক সাহস করে তার দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে বলল :

'বাবা আপনি আমাদের বাঁচান! আপনি ছাড়া আর কেউ আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। আমার স্ত্রী মৃত্যুশয্যায়। আর মরার আগে সে আপনার আশীর্বাদ চাচ্ছে।'

'সে এখন কোথায়?'

লোকটি বলল, 'কাছেই একটা গ্রামে।' তারপর লোকটি কাছেই জিন পরানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা দুটো গাধা দেখিয়ে বলল, 'ঐ যে বাহনও তৈরি।'

পুরোহিত বললেন, 'ঠিক আছে বাছা, আমি তোমার সাথে যেতে রাজি আছি। একটু অপেক্ষা করো, সবকিছু গোছগাছ করে আমার ভাইদের কিছু নির্দেশ দিয়ে আসছি।'

লোকগুলো সমস্বরে বলে উঠলো, 'না বাবা, হাতে একদম সময় নেই! ওই মহিলা প্রায় মরেই যাচ্ছে। পৌঁছতে দেরি হলে তাকে আর পাব না। আপনি যদি সত্যিই আমাদের উপকার করতে চান আর মৃত্যুপথযাত্রী একজন নারীর রক্ষাকর্তা হতে চান, তাহলে এখুনি আমাদের সাথে চলুন। এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়, এখন রওনা দিলে দুপুরের আগেই ফিরে আসতে পারবো।'

ওদের কথা শুনে পুরোহিত বললেন, 'চল, তাহলে এখনই রওনা করা যাক!' তারপর তিনি অপেক্ষমাণ গাধা দুটোর দিকে এগোলেন, লোকগুলোও তাকে অনুসরণ করলো। পুরোহিত একটা গাধার পিঠে চড়লেন আর মরণোন্মুখ মহিলার স্বামীটি অন্য গাধাটার পিঠে চড়লো। তারপর ওরা মাটি দাপিয়ে দ্রুত ছুটে চললেন।

কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেল। পুরোহিত যখন জিজ্ঞেস করলেন, আর কত দেরি, তখন গাধাটা তাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকা লোকটি উত্তর দিল, 'এই তো প্রায় পৌঁছে গেছি!' তারপর যখন প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে, তখনই গ্রামের সীমানা চোখে পড়লো। গ্রামে ঢুকতেই কতকগুলো কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল, সেই সাথে গ্রামবাসীরাও ওদেরকে স্বাগত জানাল। পুরো দলটি গ্রামের সবচেয়ে বড় ঘরটির দিকে এগোল। তারপর ওরা পুরোহিতকে একটি কামরায় নিয়ে গেল, সেখানে একজন মহিলা ছাদের দিকে মুখ করে বিছানায় শুয়ে রয়েছে।

তিনি তাকে ডাকলেন, তবে মহিলা কোনো সাড়া দিল না, কেননা সে তখন মৃত্যুর দুয়ারে। অগত্যা তিনি তার ওপর আশীর্বাদ বর্ষণ করতে শুরু করলেন, তার আশীর্বাণী শেষ হতে না হতেই মহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোঁপাতে শুরু করল। পুরোহিত তখন ভাবলেন, যে ভূতের আসর তার ওপর হয়েছিল, তা বোধহয় এখন তাকে ছেড়ে যাচ্ছে।

তবে মহিলাটি বরং কিছুক্ষণ চোখের পাতা পিট পিট করে চোখ মেলে তাকিয়ে বিড় বিড় করে বলল:

'আমি কোথায়?'

পুরোহিত হতবাক হয়ে বললেন, 'আপনি আপনার নিজের বাসাতেই রয়েছেন।'

'আমাকে একটু পানি দিন।'

সাথে সাথে পুরোহিত পেছন ফিরে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার আত্মীয়দের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললেন, 'পানির কলসটা আনেন! জলদি এক জগ পানি আনেন!'

ওরা সাথে সাথে ছুটে গিয়ে এক জগ পানি আনলো আর মহিলাটি জগ থেকে লম্বা এক ঢোক পানি পান করলো। তারপর সে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলল:

'খাওয়ার কিছু নেই? আমার তো ভীষণ খিদে পেয়েছে!'

বাড়ির সবাই তখন ছোটাছুটি করে কিছু খাবার আনল। তারপর হতভম্ব হয়ে যারা চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের সবার সামনেই মহিলাটি গপ গপ করে খাবারগুলো খেলো; খাওয়া শেষে বিছানা থেকে উঠে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং ভালো হয়ে সে হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। এটা দেখে লোকগুলো মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পুরোহিতের হাতে-পায়ে চুমু খেতে খেতে চেঁচিয়ে উঠল:'হে ঈশ্বরের সিদ্ধপুরুষ! আপনার আশীর্বাদ এই বাড়ির ওপর বর্ষিত হয়েছে আর এই মৃত নারী আবার জীবন ফিরে পেয়েছে! কী দিয়ে আমরা আপনার ঋণ শোধ করব আর কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব?'

পুরোহিত উত্তর দিলেন, 'পুরস্কার বা ধন্যবাদ পাওয়ার মতো এমন কিছু আমি করিনি। এটা ঈশ্বরের শক্তিতেই হয়েছে।' পুরো ঘটনা দেখে তার নিজেরও হতভম্ব ভাবটা তখনও কাটেনি।

বাড়ির কর্তা বলল, 'হে ঈশ্বরের সিদ্ধপুরুষ! আপনি যাই বলুন না কেন, এই অলৌকিক ঘটনাগুলো ঈশ্বর আপনার হাত দিয়েই ঘটাতে চেয়েছেন। আমাদের এই গরিব ঘরে এসে আপনি আমাদের জন্য সম্মান এবং সৌভাগ্য বয়ে এনেছেন। এখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমাদের সাধ্যমতো আপনার প্রতি যে আতিথেয়তা আমরা দেখাব তা আপনাকে মেনে নিতেই হবে।'

তারপর বাড়ির মালিক অতিথির থাকার জন্য একটি নির্জন কামরা ঠিক করার নির্দেশ দিয়ে সেখানে অতিথিকে নিয়ে গেল। যখনই পুরোহিত চলে যাওয়ার কথা বলল, তখনই বাড়ির মালিক শপথ করে বলল যে, অতিথির সেবা করাটা তার জন্য একটি পবিত্র দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তত তিনদিন পার না হলে এই মাঙ্গলিক অতিথিকে সে চলে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারে না-আর এই আতিথেয়তা এমন একজন মানুষকে দিতে হচ্ছে, যিনি তার স্ত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আর ঠিকই সে অতিথির খুব যত্নআত্তি করল আর তার প্রতি গভীর সম্মান দেখাল।

আতিথেয়তার তিন দিন সময় পার হওয়ার পর একটি গাধার পিঠে জিন চড়িয়ে সাথে ঘরে তৈরি রুটি, ডাল আর মুরগিসহ নানা ধরনের উপহার দিয়ে গাধার পিঠ বোঝাই করা হলো। এছাড়া বাড়ির মালিক গির্জার তহবিলের জন্য পাঁচ পাউন্ড পুরোহিতের হাতে গুঁজে দিল। তারপর পুরোহিতকে সাথে নিয়ে গাধার কাছে পৌঁছানো মাত্রই একজন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে হাজির হলো। সে সরাসরি পুরোহিতের পায়ের সামনে শুয়ে পড়ল।

লোকটি কাকুতিমিনতি করে বলল, 'বাবা, আপনার অলৌকিক ক্ষমতার কথা সারা গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। আমার এক চাচা আছেন, তিনি আমার বাবার মতো। সেই চাচা এখন মৃত্যুশয্যায়। তার একান্ত প্রত্যাশা যে, আপনি তাকে একবার আশীর্বাদ করবেন। অনুগ্রহ করে তার মৃত্যুর আগে এই আশাটুকু অন্তত আপনি পূর্ণ করুন। '

একটু অনিশ্চিতভাবে পুরোহিত উত্তর দিলেন, 'কিন্তু দ্যাখ বাছা, আমি তো এখন বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছি।'

'এতে খুব একটা বেশি সময় লাগবে না- আমার সাথে চলুন চাচাকে দেখবেন, তার আগে আমি আপনাকে যেত দেব না!' এই কথা বলে সে গাধার গলায় বাঁধা রশিটা ধরে টেনে নিয়ে চলল।

পুরোহিত জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার এই চাচা কোথায় আছেন?'

'খুবই কাছে- কেবল কয়েক মিনিটের দূরত্ব।'

পুরোহিত বুঝলেন, লোকটির অনুরোধ না মেনে আর কোনো উপায় নেই। এক ঘণ্টা পথ চলার পর ওরা পাশের গ্রামে পৌঁছলেন। সেখানে পৌঁছে আগের মতোই একটা বড় বাড়ি দেখলেন, যেখানে অসুস্থ আর মৃতপ্রায় লোকটি বিছানায় শুয়ে রয়েছে আর তার চারপাশ ঘিরে তার পরিবারের লোকজন আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছে। লোকটির কাছে গিয়ে পুরোহিত যথারীতি আশীর্বাদের মন্ত্র পড়তে না পড়তেই আবার সেই অলৌকিক ব্যাপারটি ঘটল; মৃতপ্রায় লোকটি শয্যা থেকে উঠেই পানি আর খাবার চাইল। এই অলৌকিক কীর্তি দেখে চারপাশের সবাই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। ওরা সাথে সাথে শপথ নিল, এই পুণ্যাত্মার প্রতি তাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা অবশ্যই পালন করতে হবে- পুরো তিন দিন তাকে এখানে রেখে অতিথিসেবা করতে হবে।

পুরোহিতের খুবই যত্ন নেওয়া হলো আর যথাযথ সম্মান দেখিয়ে আতিথেয়তার সময়টুকু পার হলো। তারপর ওরা প্রচুর উপহার দিয়ে পুরোহিতকে গ্রামের ফটকের কাছে পৌঁছাতেই, তৃতীয় গ্রাম থেকেও আরেক লোক তার সামনে হাজির হলো। সে অনুরোধ করল অন্তত সামান্য সময়ের জন্য হলেও যেন তিনি তাদের গ্রামে এসে আশীর্বাদ করে যান। কেননা ইতোমধ্যে তার সুখ্যাতি পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই লোকটির হাত থেকেও পুরোহিত নিস্তার পেলেন না। সেও গাধার গলার রশি টেনে নিয়ে তার গ্রামের দিকে চলল। সেখানে পৌঁছে পুরোহিত দেখলেন একজন পঙ্গু তরুণ সেখানে অপেক্ষা করছে। তাকে পুরোহিত স্পর্শ করতে না করতেই পঙ্গু তরুণটি দুই পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। এ দৃশ্য দেখে ছেলেবুড়ো সবাই খুশিতে আর আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল।

যথারীতি সমস্ত লোকজন শপথ নিল যে, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এই সাধুর আতিথেয়তা করা তাদের অবশ্য কর্তব্য এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে ওরা তা পালন করল। অন্যরা যা করেছে, অর্থাৎ তিন দিনের কম থাকলে চলবে না। যাই হোক অতিথিসেবার তিন দিন সময় পার হওয়ার পর ওরাও প্রচুর উপহার দিয়ে গাধার পিঠ বোঝাই করল। এত এত উপহারের ভারে গাধাটা প্রায় নুয়ে পড়ল। ওরাও মুক্তহস্তে তাকে প্রচুর অর্থ দিল এবং ইতোপূর্বে পাওয়া টাকার সাথে মিলিয়ে তার কাছে এখন প্রায় বিশ পাউন্ড জমল। একটি ছোট্ট ব্যাগে পাউন্ডগুলো ভরে তিনি পোশাকের ভেতর লুকিয়ে রাখলেন। তারপর গাধার পিঠে চড়ে বসে ওদেরকে অনুরোধ করলেন যেন ওরা তার সাথে সাথে চলে তাকে তার গ্রাম পর্যস্ত পৌঁছে দেন। কাজেই ওরা সবাই তার গাধার পেছন পেছন রওনা দিল।

ওরা বলল, 'আমরা প্রাণ দিয়ে আপনাকে রক্ষা করব। আমাদের জীবন হবে আপনার মুক্তিপণ। আপনার বাড়ির মানুষের কাছে পৌঁছে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা আপনাকে ছেড়ে চলে যাব না: আমাদের কাছে আপনি সোনার মতোই মূল্যবান।'

পুরোহিত বললেন, ' সত্যি আপনাদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করলাম। তবে আপনারা তো জানেন এই পথটা নিরাপদ নয়, এই প্রদেশে ডাকাতের ভীষণ উপদ্রব।'

ওরা উত্তর দিল, 'কথাটা সত্য। এখানে ওরা দিনদুপুরে মানুষজনকে অপহরণ করে।'

পুরোহিত বললেন, 'এই দুর্বৃত্তদের নিবারণ করতে এমনকি সরকারও অসহায়। আমি শুনেছি গ্রামের রাস্তায় চলাচল করা বাস থামিয়ে এই ডাকাতরা চড়ে বসে, তারপর যাত্রীদের ওপর চোখ বুলিয়ে দেখে কে একটু পয়সাওয়ালা, তখন সাথে সাথে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়, যাতে পরে তার পরিবার-আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করতে পারে। সত্যি বলতে কি অনেক সময় বাসের মধ্যে থাকা নিরাপত্তা প্রহরীদের বেলায়ও এই ধরনের ঘটনা ঘটে। আমি একবার একটা ঘটনার কথা শুনেছি, একদল ডাকাত যখন ডাকাতির উদ্দেশ্যে এরকম একটি বাস পথের মাঝে থামিয়েছিল, তখন বাসের যাত্রীদের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্যও ছিল; আর যখন ডাকাতরা একজন যাত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই যাত্রী ওই পুলিশের কাছে সাহায্য চাইল। কিন্তু ডাকাত দলের ভয়ে ওরাও এমনই ভীত ছিল যে, অপহৃত লোকটির উদ্দেশ্যে ওই পুলিশ দুজন বলল: ' দূর হও- এই চল আমরা যাই!' পুরোহিতের একথা শুনে গ্রামবাসীরা হেসে উঠে তাকে বলল, 'ভয় পাবেন না! যতক্ষণ আপনি আমাদের সাথে আছেন, ততক্ষণ কোন ভয় নেই। নিরাপদে গ্রামে পৌঁছার পরই কেবল তখন গাধার পিঠ থেকে নামবেন।'

'আমি জানি তোমরা কীরকম উদারচেতা আর সাহসী! উদারতা আর সম্মান দিয়ে তোমরা আমাকে সত্যি অভিভূত করেছ!'

'এমন কথা বলবেন না- আমাদের কাছে আপনি অত্যন্ত মূল্যবান!' ওরা পুরোহিতের পিছন পিছন চলল আর নিজেদের মধ্যে তার গুণের উচ্চপ্রশংসা করতে করতে কী ধরনের অলৌকিক কেরামতি কাণ্ড তিনি ঘটিয়েছেন, তার বিশদ বর্ণনা করে চলল। তিনি তাদের কথাগুলো শুনলেন, তারপর যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন। অবশেষে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, 'এটা সত্যি যে, গত কয়েকদিনে আমার সাথে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত অসামান্য! কিন্তু তাই বলে এটা কী সম্ভব যে, কেবল আমার আশীর্বাদের কারণেই এই অলৌকিক ব্যাপারগুলো ঘটেছে?'

'কেন, আপনার কি এতে কোনো সন্দেহ আছে?'

'আমি তো কোনো নবী নই যে, নয় দিনে এই ঘটনাগুলো ঘটাতে পারব। বরং আমার মনে হয় তোমরাই এই অলৌকিক ব্যাপারগুলো ঘটাবার জন্য আমাকে বাধ্য করেছ!'

ওরা সবাই একসাথে বলে উঠল, 'আমরা মানে? আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?'

' হ্যাঁ, তোমরাই এর মূল উৎস বা হোতা।'

'এ কথা আপনাকে কে বলেছে?' পরস্পর দৃষ্টিবিনিময় করতে করতে ওরা বিড় বিড় করে কথাটা বলল।

উত্তরে পুরোহিত দৃঢ়তার সাথে বলে চললেন, 'এটা তোমাদের ধর্মবিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই তোমাদের এইসব অর্জন করিয়েছে। একজন বিশ্বাসীর আত্মার মাঝে যে কী পরিমাণ শক্তি আছে, তা তোমরা জান না। দ্যাখো বাছা, বিশ্বাস হচ্ছে একটি শক্তি! বিশ্বাসই হচ্ছে প্রবল শক্তি! অলৌকিক বিষয় তোমার আত্মার মাঝে লুকিয়ে রয়েছে, যেমন পাথরের মধ্যে পানি থাকে এবং কেবল বিশ্বাসই তা সেখান থেকে বের করে আনতে পারে!' তিনি এইভাবে এই সুরেই কথা বলে চললেন, অন্যদিকে তার পিছু পিছু আসা লোকগুলো কেবল মাথা নাড়তে লাগল। তিনি আরও আবেগময় সুরে কথা বলে চললেন, তবে মোটেই লক্ষ্য করলেন না যে, তার পেছন পেছন আসা লোকগুলো একজন একজন করে সটকে পড়ছে। তারপর যখন তিনি নিজ গ্রামের সীমানায় পৌঁছলেন, তখন গাধার পিঠ থেকে মাটিতে নামলেন। তারপর লোকগুলোকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য যেই পেছন ফিরে তাকালেন, তখন হতবাক হয়ে দেখলেন, তিনি সেখানে একা আর কেউ নেই তার সাথে।

তবে এই হতবাক ভাবটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, কেননা সাথে সাথে দেখলেন তার পরিবারের লোকজন, অন্যান্য পুরোহিত ভ্রাতৃবৃন্দ এবং যাজকরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে হাতে চুমু খেতে শুরু করল। খুশি আর আবেগে ওদের গাল বেয়ে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। একজন পুরোহিত ভাই তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'শেষপর্যন্ত আপনি তাহলে নিরাপদে ফিরে এলেন! ওরা ঠিকই ওদের কথা রেখেছে। টাকা নিলে নিক, কিন্তু আপনাকে তো আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে, বাবা! আমাদের কাছে যেকোনো পরিমাণ টাকার চেয়ে আপনি মূল্যবান!'

টাকার কথা শুনে পুরোহিত অবাক হয়ে বললেন, ' টাকা মানে? কিসের টাকা?'

'যে টাকাটা আমরা ডাকাত দলকে দিয়েছি।'

'কীসের আর কোনো ডাকাত দল?'

'যারা আপনাকে অপহরণ করেছিল। প্রথমে ওরা এক হাজার পাউন্ডের কমে মোটেই রাজি হচ্ছিল না, ওরা বলছিল আপনার শরীরের ওজনে সোনা দিতে হবে। আমরা অনেক অনুনয়বিনয় করলাম এর অর্ধেক নিতে এবং শেষপর্যন্ত ওরা তাতেই রাজি হলো। তখন আমরা আপনার মুক্তিপণ হিসেবে গির্জার তহবিল থেকে ৫০০ পাউন্ড দিলাম।'

এ কথা শুনে পুরোহিত চিৎকার করে উঠলেন, '৫০০ পাউন্ড দিয়েছ, আমার মুক্তিপণ হিসেবে সে টাকা দিয়েছ- আর ওরা বলল যে, ওরা আমাকে অপহরণ করেছে?'

'আপনি গায়েব হয়ে যাওয়ার তিন দিন পর কয়েকজন লোক এসে আমাদের জানালে যে, এক সকালে আপনি যখন বাড়ির দরজার কাছে চারাগাছে পানি দিচ্ছিলেন, তখন ওরা আপনাকে অপহরণ করেছে। ওরা শপথ করে বলল যে, মুক্তিপণের টাকা না দিলে আপনার সর্বনাশ হবে। আর যদি আমরা মুক্তিপণের টাকা দিই, তবে ওরা আপনাকে সহিসালামতে ফেরত দেব।' কথাগুলো শুনে পুরোহিত স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর একে একে মনে পড়ল কী কী ঘটনা তাঁর সাথে ঘটেছে।

তারপর তিনি আপন মনে বললেন, 'তাহলে সত্যি এবার সবই বোঝা গেল। ওই মৃত, অসুস্থ আর পঙ্গু লোকগুলো আমার আশীর্বাদ পাওয়ার সাথে সাথেই লাফিয়ে উঠল! কী এক রহস্য বটে! '

আত্মীয়রা আবার তার কাছে এগোলো, তারপর ওরা তার পুরো শরীর আর পোশাকআশাক পরীক্ষা করে খুশিতে বলে উঠল, 'আপনার নিরাপত্তা ছাড়া আর কোনো বিষয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই, বাবা। আশা করি ওরা যখন আপনাকে বন্দি করে রেখেছিল, তখন নিশ্চয়ই আপনার সাথে খারাপ আচরণ করেনি, তাই না? আচ্ছা ওরা আপনার সাথে কী করেছিল?' উদ্ভ্রান্তের মতো তিনি উত্তর দিলেন, 'ওরা আমাকে দিয়ে অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছে যে অলৌকিক ঘটনার জন্য গির্জাকে চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে!'

বিখ্যাত মিসরীয় লেখক ও নাট্যকার তওফিক আল-হাকিমের [৯ অক্টোবর ১৮৯৮-২৬ জুলাই ১৯৮৭] 'মুজিজাত ওয়া কেরামত' নামের এই গল্পটি ডেনিশ জনসন 'মিরাকলস ফর সেল' নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। গল্পটি মডার্ন অ্যারাবিক শর্ট স্টোরি নামে একটি গদ্য সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। এই কাহিনির ঘটনার পটভূমি ১৯০০ সালের প্রথম দিকে কয়েকটি মিসরীয় গ্রামে।

মন্তব্য করুন