[মানুষ বেদনায় নিমজ্জিত হয়ে থাকে। ব্যক্তি বেদনা, সামাজিক বেদনা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মহামারির বেদনা। মানুষ মুষড়ে পড়ে। মানুষের বেদনার কারণ কিন্তু মানুষই। পুরো নয় কিন্তু বেশিরভাগ। নিচের এ আখ্যান নিজের জন্য ছিল, এ আখ্যান সকলের কাছে দিচ্ছি এ জন্য যে, যাতে সকলে জানতে পারেন, আমার জন্য আমার কাছে কোনো আখ্যান ছিল। এ আখ্যান একজন মানুষের। কিন্তু আমরা এও জানি, একজন একজন করেই গঠিত হয়েছে মানবমণ্ডলী]

মাধবীরা খুব গরিব। তার বাবা শ্রীদাম মফস্বল শহরে একটা প্রেসে কাজ করে। মাধবীর মা আরতি সুন্দরভাবে সংসার সামলায়। মাধবীকে আদর করে, স্কুল পাঠায়। শ্রীদাম যা বেতন পায় তাতে কোনো সঞ্চয় হয় না কিন্তু সংসার সুন্দর মতো চলে।

একদিন হঠাৎ করেই শ্রীদাম অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে আর সুস্থ হতেই পারে না। ভালো কোনো ডাক্তারকে দেখানোর মতো সামর্থ্য তার ছিল না। গ্রামের পাশের বাজারের এক লোকাল ডাক্তার চিকিৎসা দিত। এ চিকিৎসাতে কিছুই উন্নতি হচ্ছিল না। তাদের যে সামান্য সঞ্চিত টাকা ছিল সেগুলোও শেষ হয়ে যায় খাবার খেতেই। ওষুধ কিনতেও পারত না ঠিকমতো।

একদিন লোকাল ডাক্তার আরতিকে প্রস্তাব দেয় তার ডিসপেনসারিতে কাজ করার জন্য। ওষুধ গোছানো, রোগীদের ওষুধ বুঝিয়ে দেওয়া এসব কাজ। শ্রীদামকে আরতি ডাক্তারের প্রস্তাবের কথা বললে শ্রীদাম চুপ করে থাকে। নিজের বউকে অন্যের দোকানে কাজ করতে দেবার ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু যেহেতু চুলা বন্ধ হতে চলেছে সেহেতু সে রাজি হয়। আরতি ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে কাজ করা শুরু করে। ডিসপেনসারিটা ডাক্তারের বাড়ি লাগোয়া। ডিসপেনসারির ঘরটাতে দুটো দরজা। একটা দিয়ে ডাক্তার ইচ্ছে করলে বাড়ির ভেতর ঢুকতে পারে। অন্য দরজা বাইরের সাথে। রোগীরা আসা-যাওয়া করে।

আরতি প্রতিদিন সকালে যায় সন্ধ্যায় আসে। মাধবীর স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। সে সারাদিন তার বাবার সেবা করে। বাড়ির কাজ করে।

আরতি সকালে যায় সন্ধ্যায় আসে, এই রুটিনও মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ে। কখনো কখনো রাতে থেকে যায়। তখন শ্রীদামের মন খারাপ হয়, মাধবীরও মন খারাপ হয়। এসকল ক্ষেত্রে, আরতি পরদিন এসে বলে, 'এমন একটা রোগী এসেছিল যাকে সারারাত চিকিৎসা দিতে হয়েছিল। তার সেবা করার জন্যই ডাক্তার থেকে যেতে বলেছিল।' শ্রীদাম চুপচাপ থাকে, তাকে দেখে বোঝা যায় না সে আরতির কথা বিশ্বাস করেছে কিনা।

একদিন আরতি সন্ধ্যায় ফেরে না, রাতে ফেরে না, পরদিনও ফেরে না। খবর আসে, আরতি রমজান ডাক্তারকে বিয়ে করে নিয়েছে। নতুন নাম নিয়েছে মানসুরা। শ্রীদাম পাথর হয়ে যায়। সে নির্বাক। চৌদ্দ বছরের কিশোরী মাধবী কান্না শুরু করে। শ্রীদাম মাধবীর দিকে তাকিয়ে বলে - 'মা রে কাঁদিস নে। কাঁদলে তো আরো অনেক কিছু নিয়েই কাঁদা যায়। কাঁদার বিষয়ের অভাব নেই। কান্না কোনোদিন ফুরোবে না।'

শ্রীদাম সুস্থ হতে চায় মনে-প্রাণে কিন্তু সুস্থ হতেই পারে না। খাবারের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। মাধবী বাড়ি থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে যায়। জঙ্গল থেকে জংলি লাউলতা, মেটে আলু, নটেশাক, কচুশাক, ওলকচু, মানকচু তুলে নিয়ে আসে। লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে। বাপ মেয়ে মিলে খায়।

এর মধ্যে হঠাৎ করেই একদিন শ্রীদাম তার এক পায়ে একটা পচন দেখতে পায়। এটা নতুন রোগ নাকি এ রোগ হবে বলেই তার বর্তমান রোগ তা বুঝতে পারে না। পায়ের পচন বাড়তে থাকে। ব্যথায় কাতরাতে থাকে শ্রীদাম। মাধবী একদিন তারই এক প্রতিবেশীকে বলেকয়ে একজন ডাক্তারকে নিয়ে আসে। এ ডাক্তারও লোকাল ডাক্তার। সে পচন দেখে বলে - 'এটা খুব খারাপ ধরনের অসুখ।' যেখান থেকে পচন আছে সেখান থেকে কেটে ফেলতে হবে।' শ্রীদাম বলে - 'এ তো অনেক টাকার ব্যাপার। টাকা আমাদের নেই। তার চেয়ে পচন থাক। পচন সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে যাক।' ডাক্তার বলে- 'অনেক টাকার ব্যাপার এ কথা ঠিক। কিন্তু আমার কাছে খুব বেশি খরচ হবে না। ওষুধপত্রের যা খরচ আর আমি সামান্য কিছু পারিশ্রমিক নেব।' শ্রীদাম ডাক্তারের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। ডাক্তার বলে- 'আমি লোকাল ডাক্তার ঠিক আছে; কিন্তু শহরের জাঁদরেল ডাক্তারদের সাথে থেকেছি পাঁচ বছর। এসব আমি পারি। তবে একটা কথা, এসব কথা গোপন রাখতে হবে। এমন অপারেশন করার এখতিয়ার আমার নেই। আপনার অবস্থা বিবেচনা করেই এটা করতে চাচ্ছি। কম টাকাতেই হয়ে যাবে।' শ্রীদাম বলে- 'কম টাকাও আমাদের নেই।' এবার ডাক্তার হতাশ হয়। সহসা তার চোখ যায় মাধবীর দিকে। মাধবীর কানে খুব কম ওজনের সোনার দুল। মাধবীও ভুলে গেছিল যে, তার কানে সোনার দুল আছে। এ দুলের বিনিময়েই অপারেশন হবে বলে জানায় ডাক্তার। শ্রীদাম আর মাধবী রাজি হয়ে যায়, কার হাত দিয়ে কী হিত হয় কে জানে? পরের দিন এসেই ডাক্তার পায়ের যেখান থেকে পচন ছিল সেখান থেকে কেটে ফেলে। যাবার সময় মাধবীর হাতে ওষুধ দিয়ে যায়। কখন কীভাবে খাওয়াতে হবে বুঝিয়ে দেয়।

শ্রীদামের অবস্থা পরের দিন থেকে মারাত্মক থেকে মহামারাত্মক আকার ধারণ করে। প্রচণ্ড ব্যথা করে। শ্রীদাম চিৎকার করে। মাধবী ব্যথার ওষুধ দেয়। কিছুটা থামে। এর পর কোনো ওষুধেই আর কিছু হয় না। কাটা জায়গা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। ঘরে টেকা দায়, তবু মাধবী ছল ছল চোখে শ্রীদামের সেবা করে, বাবার ব্যথা নিজে নিয়ে নিতে চায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শ্রীদাম মরে গেল। মাধবী পাথরের মতো হয়ে গেল। সে কাঁদলও না। শ্রীদামের লাশ শ্মশানে চলে গেল। জ্বলে গেল। ছাই হয়ে গেল। নাই হয়ে গেল।

পাড়াপ্রতিবেশীরা মাধবীকে খাবার দিয়ে যায়। মাধবী কিছু খায় না। চরম বেদনায় মুহ্যমান হয়ে থাকে। তার বেঁচে থাকাকে নিরর্থক মনে হয়। সে মনে মনে ফাঁসি দেবার পরিকল্পনা করে। একদিন সে দিনের বেলা ঘরের চালার সাথে ফাঁসির দড়ি বেঁধেও ফেলে। ঘরের ভেতর ফাঁসির দড়ি ঝোলে, সে বারান্দায় বসে থাকে। রাতের বেলা ফাঁসি দেবে। কিন্তু সন্ধ্যার আঁধার নামতেই কয়েকজন যুবক তার ঘরে হানা দেয় আর তার মুখ বেঁধে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন সে তাকে একটা পতিতালয়ে দেখতে পায়। যুবকেরা তাকে বিক্রি করে গেছে।

অন্যদিকে, আরতিকে রমজান ডাক্তার তালাক দিয়ে দিয়েছে। রমজান ডাক্তারের আগের পক্ষের বউ-বাচ্চা আছে। তার বড় ছেলেটা আরতির বয়সি। আরতিকে হিন্দু সমাজও আর গ্রহণ করে না। দুর্দশাগ্রস্ত আরতি হাটে বাজারে ঘুরে বেড়ায়। সবাই তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ দয়ার বশে কিছু খেতে দেয়। রাত হলে ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন বিল্ডিংয়ের বারান্দায় শুয়ে থাকে। তার গা ঘেঁষে কুকুর বিড়াল শুয়ে থাকে। গায়ের ওপর দিয়ে ইঁদুর ছুঁচো তেলাপোকা চলাফেরা করে। সে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুম এলে ঘুমায়। একসময় কিছু কামুক পুরুষের দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। তারা এসে আরতিকে নগ্ন করে দেয়। এটা অনেকটা নিয়মিত হয়ে পড়ে। আরতি প্রথম দিকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করত; কিন্তু পরে সে চেষ্টাও বাদ দেয়। এভাবে জঘন্যভাবে জীবন বহন করে চলে আরতি আর মাধবীর খোঁজ করতে থাকে মনে মনে। মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করার কথাও ভাবে। আরতি কিছুদিন পর গর্ভবতীও হয়ে যায়।

আরেক দিকে, মাধবী পতিতালয়ে প্রতিদিন কাঁদে। সে ভাবে, এখান থেকে বেরোবেই সে। এখান থেকে বেরিয়ে বাড়িতে যে ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ে রেখে এসেছে সে দড়িতে গিয়ে ফাঁসি নেবেই সে। কিন্তু এখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। পতিতালয়ের সর্দারনির লোক চোখ চোখ করে থাকে। এখানে ফাঁসি নেওয়াও অসম্ভব। যখন একা থাকতে পায় মাধবী, তখন চোখ বন্ধ করে বাড়িতে ঝুলে থাকা ফাঁসির দড়িকে ভাবে, ওই দড়িকে মুক্তিদাতা হিসেবে কল্পনা। সে ভাবে, মৃত্যু ছাড়া জীবন বাঁচানো অসম্ভব।

একদিন আরতি খোঁজে খোঁজে পতিতালয়ে এসে হাজির। মাধবী তার মাকে দেখে অবাক। সে ভেবেছিল, তার মা রমজান ডাক্তারের সাথে সুখে আছে, কিন্তু এ কী অবস্থা! আরতি সব কথা খুলে বলে মাধবীকে। মাধবী আর আরতি গলা জড়িয়ে কাঁদে। পতিতালয়ের সর্দারনি জানতে চাই- 'এই মহিলা কে?' মাধবী বলে- 'আমার মা গো মাসি।' সর্দারনি খেঁকিয়ে ওঠে- 'তা এখানে কী করছে, বের করে দে এখনি।' মাধবী বলে- 'মাসি, আমার মা অসুস্থ, তার গর্ভকাল প্রায় পূর্ণ হয়ে এসেছে, এ অবস্থায় সে কোথায় যাবে, একটু দয়া করেন।' সর্দারনির দয়া হয় না। সে কঠিন বাক্যে বেরিয়ে যেতে বলে। এবার আরতি স্বয়ং সর্দারনির পায়ে পড়ে- 'দিদি গো, তুমি আমার বোন, আমাকে কয়েকটাদিন মাত্র থাকতে দিন, পরে আমি নিজেই চলে যাব।' সর্দারনি রাজি হয়- 'মাত্র কয়েকদিন কিন্তু তারপর চলে যেতে হবে।' মাধবীর ঘরের বারান্দায় আরতির শুয়ে থাকার ব্যবস্থা হয়। আরতি বারান্দায় শুয়ে শুয়ে দেখে, তার মেয়ের ঘরে পুরুষের যাওয়া-আসা। কান্না চেপে রাখতে পারে না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে যতটা নিঃশব্দে সম্ভব কাঁদে।

আরতি কয়েকদিন পর বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে মারা যায় তবে বাচ্চাটি বেঁচে যায়। মেয়ে শিশু। মরার আগে মাধবীকে ডেকে কিছু কথা বলেছিল। আরতি বলেছিল- 'তুই যে বেশ্যাখানাতে আছিস এটা ভাবতেই আমার বুক ফেটে যায়। মনে হচ্ছে আমার মৃত্যু হবে। এতে আমার দুঃখ নাই। আমার মৃত্যু হচ্ছে বেশ্যাখানাতে এটা একদিক দিয়ে ভালোই, তোর উপর, তোর বাবার উপর যে অন্যায় করেছি, তার কিছুটা শোধ হবে এতে। তবে, তোর মৃত্যু যেন এখানে না হয়, তুই অবশ্যই একদিন এ নরক থেকে বেরিয়ে যাবি। যে বাচ্চাটা আমার হবে সে যদি বেঁচে থাকে তাকে নিয়ে তুই এখান থেকে বেরিয়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করবি।'

শাপলা নামের এক পতিতার সাথে মাধবীর ভালো পরিচয় হয়েছিল। শাপলা অনেকটা দয়ালু ধরনের। আরতির বাচ্চাটা যখন কয়েক বছরের তখন মাধবী শাপলার সাহায্য নিয়ে পতিতালয় থেকে পালিয়ে যায়।

সর্দারনির লোকের অভাব নেই। পালিয়ে এসেছে জানতে পারলেই তার লোক ছেড়ে দেবে সে। মাধবী খুব ভয়ে ভয়ে চলেছে পথে। পায়ে হেঁটে, কখনো বাসে, কখনো নৌকায় চড়ে সে বাড়ির দিকে যেতে থাকে। বাড়ি পৌঁছার কয়েক মাইল আগে মাধবী ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একটা নির্জন আমবাগানের ভেতর বসে। বসে থাকতে থাকতে তার ঘুম ধরে যায়। বাগানের শুকনো পাতার উপর বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে মাধবী ঘুমিয়ে পড়ে। সে স্বপ্ন দেখে, একটা মানুষ এসে তার সামনে বসে মিষ্টি করে হাসছে। মাধবী বলে - 'আপনি কে? হিন্দু না মুসলমান? সাধু না শয়তান?' লোকটা বলে, আমি তোমার হৃদয়েই থাকি, আমি তোমার হূৎফলের রস। এ রস সবাই পান করতে পারে না বলেই তো কষ্ট পায় মানুষ। আমি তোমাকে তোমার হূৎফলের রস পান করাতে এসেছি। আমি মানুষ, হিন্দুও না মুসলমানও না।' মাধবী অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটা বলে- 'আমি তোমাকে দুটো গল্প বলব, ঠিক গল্প নয় কথা, দুটো কথা। মাধবী শোনার জন্য তার দিকে গভীরভাবে তাকায়।

প্রথম গল্পে বা কথায়, লোকটা বলে,

'ঈশ্বর বাঘের শরীর তৈরি করলেন। বাঘের শরীর শুয়ে থাকল। ঈশ্বর বাঘের প্রাণ তৈরি করলেন আর সেই প্রাণ বাঘের দেহে মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। বাঘ শুয়ে শুয়ে চোখ মেলল। এবার ঈশ্বর বাঘ তৈরি করলেন আর বাঘ ঢুকিয়ে দিলেন বাঘের শরীরে। বাঘ উঠে দাঁড়ালো।

ঈশ্বর হরিণের শরীর তৈরি করলেন। হরিণের শরীর শুয়ে থাকল। ঈশ্বর হরিণের প্রাণ তৈরি করলেন আর সেই প্রাণ হরিণের দেহের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। হরিণ শুয়ে শুয়ে চোখ মেলল। এবার ঈশ্বর হরিণ তৈরি করলেন আর হরিণ ঢুকিয়ে দিলেন হরিণের শরীরে। হরিণ উঠে দাঁড়ালো।

এভাবেই গরু, ছাগল, কেঁচো, জোঁক, সাপ, উট, গাধা, ঘোড়া সবকিছু তৈরি করলেন ঈশ্বর।

ঈশ্বর এবার মানুষের শরীর তৈরি করলেন। মানুষের শরীর শুয়ে থাকল। ঈশ্বর মানুষের প্রাণ তৈরি করলেন আর সেই প্রাণ মানুষের দেহের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। মানুষ চোখ মেলল। মানুষের ভেতর মানুষ ঢুকানোর আগেই মানুষ তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। মানুষের ভেতর মানুষ ঢুকাতে পারলেন না ঈশ্বর। ঈশ্বর মানুষের দিকে তাকিয়ে বললেন- 'যাও নিজের চেষ্টায় নিজের ভেতর মানুষ প্রতিষ্ঠা করো গে।'

গল্প শুনে মাধবী চুপচাপ মানুষটার দিকে তাকালো। মানুষটা বলল, বেশিরভাগ মানুষই মানুষ হতে পারছে না। ফলে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে মানুষ থেকে, মানুষ কষ্ট পাচ্ছে মানুষেরই কর্মের আবহ থেকে।

মানুষটা এবার দ্বিতীয় কথা শুরু করে - 'শোনো, উপরের কথা আর এখন যে কথা বলব তা প্রায় একই। তবু মন দিয়ে শোনো।' মাধবী মন দিয়ে শুনবে বলে মাথা ঝাঁকাল। মানুষটা বলতে লাগল- 'খালি বস্তার ভেতর মানুষ ধান গম যব বিবিধ শস্য রাখে। কখনো কখনো মানুষ ধানের বস্তা থেকে ধান বের করে তুষ রাখে বা ছাই।' মানুষটা একটু থামে। মাধবী তার দিকে তাকায়। দৃষ্টি বিনিময় হয়। দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিশিয়ে নেয়।

মানুষটা আবার বলে - 'এই যে তুমি মাধবী। তুমি একটা মাধবীবস্তা। এই মাধবীবস্তা থেকে মাধবীশস্য বের করে ফেলে, বেদনাশস্য, ভয়শস্য, হতাশাশস্য ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে। তোমার ভেতর থেকে বের করে ফেলা মাধবী তোমার পাশে পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমার ভেতর ঢুকতে পারছে না জায়গা নেই বলে। বের হয়ে যাওয়া মাধবীশস্য কত সাহসী ছিল, কর্মঠ ছিল, মর্মঠ ছিল, সেবাপরায়ণ ছিল, প্রেমপূর্ণ ছিল। এই মাধবীকে আবার মাধবীথলের ভেতর বেদনাশস্য, ভয়শস্য, হতাশাশস্য, ঘৃণাশস্য বের করে ফেলে জায়গা করে দাও। মাধবীর ভেতর মাধবী থাকুক। মানুষের ভেতর মানুষ প্রতিষ্ঠা হোক।'

মাধবীর ঘুম ভাঙে। এদিক ওদিক তাকিয়ে অলৌকিক লোকটাকে খোঁজে। খুঁজে পায় না। ভালো করে চোখ থেকে ঘুম সরে গেলে সে নিজের ভেতরেই ঐ মানুষটার অস্তিত্ব বুঝতে পারে। নিজেকে তার মাধবী মনে হয়। নিজেকে তার মানুষ মনে হয়। হূৎফলের রস এত সুস্বাদু তা আগে জানতে পারেনি।

বাচ্চাটাকে বুকে করে তার বাড়ির কাছে যখন পৌঁছে তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। বাড়ি দেখে সে আঁতকে ওঠে। সারাবাড়ি জঙ্গুলে লতাপাতাতে জড়িয়ে ধরে আছে। মাধবীর স্মরণ হয় স্বপ্নে দেখা লোকটার কথা। সে নিজের ভেতর থেকে ভয়, আতঙ্ক, হতাশা মুছে দিয়ে সাহস আর শক্তিকে আহ্বান করে। বাচ্চাটাকে একজায়গায় দাঁড় করিয়ে মোম জ্বালে। জংলি লতাপাতা ছিঁড়ে ফেলে বসতবাড়িকে মুক্ত করতে থাকে। একটা সাপ বেরিয়ে আসে হিসহিস করে। মাধবী সাহসী হয়ে লাঠি তুলে নেয় হাতে - 'আমি মাধবী। শ্রীদাম আর আরতির কন্যা মাধবী নই। শয়তান আর সর্দারনির বেড়াজালে থাকা মাধবী নই। আমি নিজেকে নিজে আবার জন্ম দেওয়া মাধবী। সমগ্র পৃথিবীর বীর এসে হাজির হলেও আমি পিছিয়ে যাব না।' সাপ লাঠির প্রথম আঘাতেই পালাতে থাকে। এবার সে ঘরের ভেতর ঢোকে। অনেক বছর আগে নিজের জন্য ঘরের চালায় বাঁধা ফাঁসির দড়ি দেখতে পায়। সে ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে ফেলার জন্য এগিয়ে যায়। ছোট বাচ্চাটি মাধবীর দিকে তাকিয়ে আছে।

মন্তব্য করুন