অন্য কারো জীবনের কথা সেভাবে বলতে পারব না, তবে আমার জীবনে অলৌকিক ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটেছে এবং আমার জীবনবোধকে পাল্টে দিয়েছে বারবার।

যখন আমি খুব ছোট ছিলাম, আট বা দশ বছর বয়স, একদিন একটা বাজারের রাস্তার ধারে বেভুল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এরকম প্রায় আমার হতো, এমন সময় একটা ট্রাক তীব্র বেগে আমার কানের পাশ দিয়ে যেন উড়ে চলে গেল। আমার মাথার চুল উড়তে লাগল। গায়ে গরম তাপ অনুভব করলাম। তখন একজন বড় মানুষ বিরক্ত হয়ে আমাকে বললেন, এই ভ্যাবলা, এক্ষুনি যে ট্রাকের পেটের নিচে চলে যেতিস, চোখে তাকিয়ে দেখিস নে?

সেদিন আমি মনে মনে খুব ভয় পেয়েছিলাম। দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু বাড়ি ফিরে মার খাওয়ার ভয়ে মাকে বলতে পারিনি।

আরেকদিন, সেটিও সেই ছেলেবেলার ঘটনা, ছেলেবেলা থেকে গল্পের বই পড়তে ভালোবাসতাম, বাজারে ঢুকে বইয়ের দোকানের সামনে ঝিম মেরে বসে থাকতাম। জুলজুল চোখে তাকিয়ে দেখতাম শোকেসের ভেতরে সাজিয়ে রাখা রংবেরঙের গল্পের বই। সব শিশুতোষ রচনা।

বই কেনার পয়সা নেই।

ভেতরটা হাহাকার করত। বাচ্চাদের যে বই কিনে দিতে হয় এই বোধ তখন আমাদের বাবা-মায়ের মনের ভেতরে ছিল না। শুধু বড়দের মুখে রাতের বেলা রূপকথার গল্প শুনলেই আমাদের শিশুদের জন্য যথেষ্ট, এই কথা মনে করা হতো।

কিন্তু না, আমার মতো শিশুর জন্য সেটা যথেষ্ট ছিল না।

তো একদিন সেই দোকানদার ছেলেটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি গল্পের বই পড়তে ভালোবাসো তাই না, খুকি?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।

তুমি গল্পের বই পড়তে চাও?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।

সে তখন বলল, তারই বাবার বইয়ের দোকান, তুমি আজ দুপুর বেলা আমাদের বাড়ি এসো, আমি তোমাকে মজার একটা গল্পের বই দেব!

সত্যি? আমি খুশির চোটে চকচকে চোখ করে তাকালাম।

সে বলল, হ্যাঁ। তুমি এসো দুপুর বেলা, আমি তোমাকে বই দেব।

তখন আমার এই বুদ্ধি নেই যে, তাকে বলি, বই দেবেন তো এখনই দেন না, তার জন্য দুপুরে আপনার বাড়ি যেতে হবে কেন?

তো গেলাম তার বাড়িতে দুপুরে। আমরা যেখানে থাকি, তার কিছু দূরেই তার বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখি তাদের পাঁচিলের দরজাটা খোলা।

তো দরজা ঠেলে ঢুকলাম সে বাড়িতে। নির্জন একটি বাড়ি। কোনোদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। খোলা সিমেন্টের উঠোনে চড়চড় করছে রোদ্দুর। আমি বোকা মেয়ে ভেতর বাড়ির বারান্দায় উঠে সামনেই যে ঘর দেখলাম সেখানেই ঢুকে ডাক দিলাম, ও দাদা-

দেখি দাদা বিছানায় শুয়ে গড়াচ্ছে!

আমাকে দেখে দাদা ঘুমচোখে তাকিয়ে থাকল। বোধহয় বুঝতে পারেনি, আমি সত্যি সত্যি তার বাড়ি গিয়ে হানা দেব সামান্য একটা গল্পের বইয়ের জন্য!

সে তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে একেবারে আমাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল। আমি প্যান্টফ্রক পরা শিশু মেয়ে। বড়জোর আট বা দশ বছর বয়স। কিন্তু ছেলেবেলা থেকে ভালো ভালো খাওয়াদাওয়ার জন্য বাচ্চা হাতির মতো চেহারা! সে জড়িয়ে ধরতেই আমি বিপদের ইশারা পেলাম। আঁচড়ে কামড়ে চিৎকার করে উঠলাম। আর সে ভয় পেয়ে আমাকে ছেড়ে দিল।

আমি দৌড়ে পাঁচিলের দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে বাড়ি চলে এলাম।

বড় হয়ে যতবার এই দৃশ্য আমার মনে পড়ে, মনে হয় এখনকার সময় হলে আমি প্রাণ নিয়ে সেদিন সেই বাড়ি থেকে বেরোতে পারতাম না! ওই দুপুরবেলাতেই সেই নির্জন বাড়ির কোটরে আমার সমাধি হতো। কারণ কেউ সেদিন নির্জন সেই দুপুরে তাকিয়ে দেখেনি আমি সে বাড়িতে ঢুকেছি। কেউ জানত না আমি সেদিন ওই বাড়িতে যাবো। কারণ যাওয়ার কোনোই কারণ ছিল না।

বাবা-মার জীবন থেকে আমি শুধু হারিয়ে যেতাম। যেমন আর দশজন বাচ্চা হঠাৎ হারিয়ে যায়।

আমি জীবনে কোনোদিন আমার বাবা-মাকে এই ভয়াবহ ঘটনার কথা বলিনি। জানতাম বললে আমাকে মার খেতে হবে।

কিছু কিছু ঘটনা আছে, যা শিশুবেলায় ঘটলেও বাবা-মাকে বলা যায় না। এমনকি বড় হয়ে বিবাহিত হয়ে স্বামীকেও নয়। এসব একটি মেয়েশিশুর ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা জীবনের। যা কারও সাথেই শেয়ার করা যায় না।

সেদিন যে আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলাম এ কথা এখনও আমি বিশ্বাস করি।


১৯৭১ সাল ছিল বাঙালির জীবনের একটি ভয়াবহ সংকটকাল। ছিল পাকিস্তানি হানাদারের কবলমুক্ত হওয়ার কাল। ছিল মুক্তিযুদ্ধের কাল। নয়টি দীর্ঘ মাসের প্রতিটি দিন ছিল অবরুদ্ধ বাঙালির মৃত্যুর দিন। আমি সেই সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ডাক্তার হিসেবে কর্মরত। আমার কপাল পোড়া, তাই ১৯৬৭ সালের ৩১শে জানুয়ারি বেশি মাইনের এবং পদবির লোভে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলামের সহায়তায় সেই চাকরিতে যোগ দিয়েছি। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম তখনও বিখ্যাত হননি। তখন তিনি শুধু আমার প্রিয় বন্ধু ডাক্তার ফরিদা হকের সদ্যবিবাহিত স্বামী মাত্র। সবে বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে এসেছেন।

বিমানবাহিনীর চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় বন্ড সাইন করতে হয়েছে যে, পাঁচ বছরের আগে চাকরি ছাড়তে পারব না! তখন কল্পনা করেছি পাঁচ বছর দেখতে দেখতে চলে যাবে। তাছাড়া আমি জীবনেও পশ্চিম পাকিস্তানে পোস্টিং হলে যাব না। ফল খাওয়ার লোভেও না।

কিন্তু আমার ভাগ্য বিধাতা তখন মনে মনে নিশ্চয় মুচকি হেসেছিলেন। স্বামীকে ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করে টিকিট কেটে চামড়ার ব্যবসায়ী হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও আমার ঘাড়ে তখন বাপের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ির সব ছেলেমেয়ের দায়িত্ব। রাতে ডজনকে ডজন রুটি সেঁকতে হতো। দিনে ভাত রাতে রুটি। দিনে মাছ, রাতে ভাজি বা সবজি। প্রতিটি ছেলেমেয়ের জুতোর ভেতরে দুশো টাকা করে গুঁজে রাখা হতো। বিপদের সময় যে যেভাবে পারে, নিজের প্রাণ রক্ষা করবে।

রাতে কিছু খেলে সেটা যেন হজম হতো না। পেটের ভেতরে শুধু নড়াচড়া করত। আবার চাকরিতে রিজাইন দেব সে আশাও দিন দিন দূরে চলে যাচ্ছিল যেহেতু যে কোনো স্টেট ইমারজেন্সিতে সামরিক বাহিনীর চাকরি ছাড়া যায় না।

সেই সময় ফ্ল্লাইট লেফটেন্যন্ট নুরুল ইসলাম, সেটা খুব সম্ভব এপ্রিল মাসের শেষ, আমাকে বললেন, ম্যাডাম আমাকে একটু মিরপুরে নিয়ে যাবেন?

আমার নিজস্ব গাড়ি ছিল। সৈয়দ হক কিনে দিয়েছিলেন।

আমি নিজেই গাড়ি চালাতাম। কারণ মুক্তিযুদ্ধে ড্রাইভার রাখার সাধ্য ছিল না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

নুরুল ইসলাম বললেন, সেখানে আমার একজন ভাই থাকেন, এপ্রিলের প্রথম থেকে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।

আমি এমন একজন ইডিয়ট যে, তার অনুরোধে রাজি হয়ে গেলাম। কখনো চিন্তা করে দেখলাম না যে, মিরপুরে সেই এপ্রিলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব কিনা।

তো গেলাম। যাবার সময় দেখলাম ধু-ধু রাস্তাঘাট। সেকেন্ড ক্যাপিটাল (তখনকার নাম) এর ঘাসে মানুষের রক্ত লাগানো আছে এখানে সেখানে। বাস রিকশা গাড়ি কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। সেই তরুণ অফিসারও বোধহয় আমার মতোই অবুঝ ছিলেন। মিরপুরের অলিতে গলিতে আমরা তার ভাইয়ের খোঁজ করতে লাগলাম। আমার মেরুন রঙের গাড়ি বার্লিনা ডাইহাটসু চালিয়ে। একবারও বুঝতে পারলাম না যে, না বুঝে বাঘের গুহায় ঢুকে পড়েছি। হয়তো তারাও ভেবেছে আমরা অসীম শক্তিশালী কেউ!

বাঙালি হলেও!

আমার স্বামী বা বাচ্চাদের কথাও মনে পড়ল না!

বাড়িতে ছোট ছোট ভাইবোন, মা ও শাশুড়ি, প্লাস নিজের ছোট ছোট দুটো বাচ্চা ফেলে প্রতিদিন এয়ারফোর্সে চাকরি করতে যাওয়া তে চাট্টিখানি কথা ছিল না। তবু জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ স্বামীকে যে চামড়ার ব্যবসায়ী করে নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠাতে পেরেছি যে, এই বোধ মনের ভেতরে একটু সাহস দিত। কত প্ল্যান ছিল মনে। এই চাকরি একদিন ছাড়ব, লন্ডনে যাব, সেখান থেকে ভারতে, সেখান থেকে বাংলার মুক্তিযুদ্ধে, এই যুদ্ধ তো অনেক দিন চলবে, পৃথিবীর যে কোনো স্বাধীনতাকামী যুদ্ধই তো দীর্ঘদিন ধরে চলে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

কর্মস্থলে কোনো কাজই ছিল না। শুধু হাজিরা দেওয়া। কারণ আমি ছিলাম ফ্যামিলি উইংয়ের ডাক্তার। সব ফ্যামিলি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালেই। যারা আছে তারা সব বাঙালি পরিবার।

চোখ কান খোলা রেখে শুধু যেতাম আর যুদ্ধের খবরাখবর রাখতাম।

এর ভেতরেই শুরু হলো যুদ্ধ। তখন আর কিসের চাকরি। কীসের বন্ড। য পলায়তি স জীবতী। আমি নিজেই গাড়ি চালাতাম। তাই ৪ঠা ডিসেম্বর তারিখে ভোরে উঠেই ছেলেমেয়ে ভাইবোন মাসহ সোজা চলে গেলাম পুরোনো ঢাকায় আমার শ্বশুরবাড়িতে।

সেখানে গিয়ে উঠলাম।

তার আগে আমি থাকতাম তখন গ্রিন রোডে একটি ভাড়া বাসায়। ওপর তলায় ভাড়া থাকতাম। নিচের তলায় থাকতেন সৈয়দ হকের একজন বন্ধু মাজেদ সাহেব। যাবার আগে মাজেদ সাহেবকে বললাম, ভাই, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি।

কোথায়? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

বললাম, আমার শ্বশুরবাড়ি, লক্ষ্মীবাজারে।

মাজেদ ভাই সে বাড়ি ভালো করেই চিনতেন। কতদিন সৈয়দ হকের সঙ্গে সে বাড়িতে বসে আড্ডাও দিয়েছেন।

যাওয়ার সময় বোকার মতো আমার বাসার টেলিফোনটা নিচে নামিয়ে দিয়ে বললাম, এই থাকল টেলিফোন, কোনো সংবাদ থাকলে আমাকে দেবেন।

তিনি বললেন, আচ্ছা।

সেই টেলিফোন এলো ১৩ তারিখের সন্ধ্যায়। একজন উর্দুঅলা রাতের বেলা মাজেদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, ডাগদার সাব কিধার হ্যায়?

মাজেদ ভাই তার গলার তেজালো স্বর শুনে ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, সে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে।

কোথায় সে শ্বশুরবাড়ি?

হুংকার দিয়ে বলল লোকটা।

এই হুংকার শুনে ঘাবড়ে গেলেন মাজেদ ভাই। কোনো রকমে বললেন, লক্ষ্মীবাজার।

কত নম্বর? প্রশ্ন করল লোকটা।

মাজেদ ভাই বলতে পারলেন না, কত নম্বর। অথচ এই নম্বর তার ভুল করার কথা নয়। সৈয়দ হকের প্রতিটি বইয়ে এই নম্বর দেওয়া আছে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে করতে পারলেন না। তিনি বললেন, হামারা ইয়াদ নেহি।

এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে খুব খারাপ একটা গালি দিয়ে লোকটা ফোন ছেড়ে দিল।

এ খবর মাজেদ ভাই আর আমাকে দেননি। কিন্তু আমার ওপরে যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।

তারপর দেশ স্বাধীনের পর, যে স্বাধীনতার সংবাদ পেলাম সৈয়দ শামসুল হকের কণ্ঠে, আমি কেন সমগ্র দেশবাসী সেই সংবাদ শুনলেন, আমার এখন যেন মনে হয় আমি আমার সর্বস্ব বিক্রি করে সৈয়দ হকের লন্ডনে যাওয়ার টিকিট কেটেছিলাম শুধু ষোলোই ডিসেম্বর বিবিসিতে তার কণ্ঠস্বরে স্বাধীনতার যুদ্ধের যবনিকার সংবাদ শুনব বলে, আমার জীবন সেদিন ধন্য হয়েছিল, পরে শুনেছিলাম সেদিন নাকি সৈয়দ হকের খবর পড়বার কথাই ছিল না, ছিল ভারতের একজন বাঙালির খবর পড়বার, কিন্তু কোনো একটা বিশেষ কারণে ভারতীয় সেই বাঙালি সেদিন খবর পড়তে আসতে পারেননি, সেজন্য সৈয়দ হককে অনুরোধ করা হয়েছিল খবর পড়তে। সৈয়দ হক নিজেও জানতেন না যে, সেদিন আমাদের দেশ রাহুমুক্ত হবে। পাকিস্তানিরা পরাজিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করবে।

সাধারণ খবর পড়বার মাঝখানে উইলয়াম ক্রলি এই খবরটা ইংরেজিতে লিখে সৈয়দ হকের ব্রডকাস্টিং রুমে চালান করে দেন।

এবং ইংরেজি থেকে মুখে মুখে সৈয়দ হক সেটি তর্জমা করে বিশ্বের সমগ্র বাঙালি জাতিকে শোনান।

একজন বাংলাদেশির মুখ থেকেই বাঙালিরা সেদিন যুদ্ধ জয়ের খবরটা পান।

বাংলা মায়েরও হয়তো সেরকমেরই ইচ্ছা ছিল!



বিজয়ের পর ডিসেম্বরের ১৮ বা ১৯ তারিখে আমি আবার আমার গাড়ির মধ্যে সকলকে ভরে নিয়ে গ্রিন রোডের বাসায় হাজির হলাম। সকলকে সেটেল করে নিচে নেমে একগাল হেসে মাজেদ সাহেবকে বললাম, মাজেদ ভাই, জয় বাংলা।

উত্তরে মাজেদ ভাই রোষকষায়িত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, জয় বাংলা বলছেন, হ্যাঁ? আর আপনার জন্য এক মেড়ূয়া ব্যাটার গালি আমাকে শুনতে হলো, হ্যাঁ? কী পেয়েছেন?

তার কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, কেন, ভাই কী হয়েছে?

তিনি রাগতে রাগতে যা বললেন, তাতে বুঝলাম তিনি আমার ঠিকানা ঠিকমতো বলতে পারেননি বলে খুব গালি খেয়েছেন। এরকম গালি তিনি জীবনে কখনও খাননি!

আমি তার কথা শুনে বললাম, কিন্তু ভাই, আপনি তো আমার সঙ্গে সৈয়দ হকের আলাপের বহুবছর আগে থেকে সৈয়দ হকের বাড়িতে যাতায়াত করেছেন, তো বাড়ির ঠিকানা বলতে পারেননি কেন?

আমার কথা শুনে মাজেদ ভাই মাথা চুলকে বললেন, কি জানি কেন? আসলে আমি লোকটার এত খারাপ গালি শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম!

এ কথা শুনে আমি মনে মনে ভীষণ অবাক হলাম।

এরকম কি তাহলে হতে পারে?

কিন্তু আল্লাহর মহিমা কে বুঝতে পারে?

মাজেদ ভাইয়ের হাত ধরে বললাম, ভাই, আপনি গালি খেয়েছেন, তার জন্যে আমি খুব লজ্জিত, কিন্তু ভাই, আপনি যে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন বাড়ির ঠিকানা মনে করতে না পেরে, এ কথাটা কি কখনো ভেবেছেন?

আমার কথা শুনে যেন মাজেদ ভাইয়ের চৈতন্য হলো। তিনি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললেন, ও- ও-

আমি নিজেও জানতাম আমার ওপর রাজাকারদের রাগ ছিল। কারণ এক বিহারি রাজাকারকে আমি এয়ারফোর্সের একজন অফিসারকে দিয়ে মার খাইয়েছিলাম। সেই রাজাকার আমাকে মনিপুরের রাস্তায় অপমান করেছিল। মার খাইয়ে তার প্রতিশোধ নিয়েছিলাম।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ এয়ারফোর্স থেকে রিলিজ অর্ডার নিয়ে লন্ডনে উচ্চশিক্ষার জন্য রওনা হলাম। সঙ্গে আমার সাত বছরের মেয়ে, আর তিন বছরের ছেলে। স্বামী বিবিসিতে কর্মরত। সেখানে অনেক কষ্টে ট্রেনিং নিয়ে এখানে সেখানে কিছুদিন চাকরি করে অ্যানেসথেসিয়াতে লম্বা একটা চাকরি পেলাম। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া আমার কোনোদিন ভালো লাগত না। তবু জীবিকার তাগিদে আর লন্ডনে থাকার সুযোগ পাওয়ার জন্য, কারণ স্বামী লন্ডনেই বিবিসিতে কর্মরত, আমি লন্ডনের হাইগেট হিলের কাছে একটা নামকরা হাসপাতালে চাকরি পেলাম। অ্যানেসথেসিয়াতে নতুন কাজ শিখেছি, হাত তখনও পাকেনি, মাত্র সিনিয়র হাউস অফিসার। সেই সময় আমাকে নাইট ডিউটি দেওয়া হলো। লন্ডন বা তার আশপাশে প্রতি সেকেন্ডে একটা করে অ্যাক্সিডেন্ট হয়। ফলে ভীষণ ব্যস্ত নাইট ডিউটি। তারপর সাধারণ ইমার্জেন্সি তো আছেই। এরকম সময়ে আমার একদিন নাইট ডিউটি; সমস্ত হাসপাতালে আমিই একমাত্র অ্যানেসথেটিস্ট।

তো হল ইমার্জেন্সি। আমি, রাত তখন প্রায় দুটো, রোগী অজ্ঞান করতে অপারেশন থিয়েটারে হাজির হলাম।

রোগী একজন মহিলা।

অ্যানেসথেসিয়া মেশিন একেবারে টিপটপ গোছানো থাকত সবসময়। না থাকলে যে ডিউটিতে থাকত, সেই গুছিয়ে রাখত।

আমি প্রি-অপারেটিভ রুমে রোগীর সঙ্গে তার নামধাম জিজ্ঞেস করে দুটো হাসিঠাট্টার কথা বলে স্বাভাবিক রেখে তাকে অজ্ঞান করবার জন্য ইনজেকশন দিলাম। তারপর শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে কৃত্রিম উপায়ে তার গলার শ্বাসনালির ভেতরে নল ঢুকিয়ে অক্সিজেন মেশিনের সঙ্গে যোগস্থাপন করতে চেষ্টা করলাম। যোগ স্থাপন করা হয় সামান্য চার আঙুল লম্বা একটি বাঁকা কানেকটিং টিউবের মাধ্যমে। রোগীকে অজ্ঞান করার আগে সবকিছু গোছানো আছে কিনা দেখে নিয়েছিলাম, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দেখা গেল সেই কানেকটিং টিউবটি খুঁজে পাচ্ছিনে!

এদিকে রোগী সম্পূর্ণভাবে প্যারালাইজড। ইনজেকশন দিয়ে তাকে প্যারালাইজড করা হয়েছে। তার নিঃশ্বাস এখন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। অক্সিজেনের অভাবে একটু পরেই সে নীল হয়ে আসবে। এবং হয়তো আর বাঁচানো যাবে না!

আমি হন্যের মতো আঁতিপাঁতি করে সেই কানেকটিং টিউব খুঁজতে লাগলাম। কোথায় সেই টিউব? এই তো এক্ষুনি হাতের কাছেই ছিল।

এখন আমি কী করি?

আমার ওপরের র‌্যাঙ্কের সিনিয়র রেজিস্ট্রার একজন মিসরীয়। তিনি তার কোয়ার্টারে ঘুমিয়ে আছেন। হাসপাতালেরই কোয়ার্টার। তাকে ডেকে আনার আগেই তো আমার রোগীর দফারফা হয়ে যাবে! আর তাই যদি হয় তাহলে আমার এদেশে ডাক্তারির ইতিকথা শুরু হয়ে যাবে!

সমস্ত হাসপাতাল ঢি ঢি পড়ে যাবে। কোন দেশের ডাক্তার? বাংলাদেশ? হা, হা।

মাথার ভেতরে তখন পাগলের মতো হাবিজাবি চিন্তা। আর এদিকে কানেকটিং টিউব খুঁজে পাচ্ছিনে! আমার শরীর শীতের দিনেও দরদর করে ঘামতে শুরু করেছে। ভাবছি রোগীর মুখে ফুঁ দিয়ে আবার তাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করব কিনা। ওদিকে অপারেশন রুমে সার্জন দু'হাতে গ্লাভস পরে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে আছেন আমি কখন তাকে রোগীটা অপারেশন রুমে ঠেলে দেব।

প্রতিটি মুহূর্ত এখন হাতে গোনা।

এমন সময়, ঠিক এমন সময় কে যেন আমার হাতের কাছেই রাখা কানেকটিং টিউবটি রোগীর মুখের নলের সঙ্গে লাগিয়ে দিল!

শুরু হয়ে গেল রোগীর অক্সিজেন সাপ্লাই।

আমি মুখে মাস্ক পরা অবস্থাতেই ঘুরে তার দিকে তাকালাম।

কে এই দেবদূত?

তাকিয়ে দেখি ইজিপশিয়ান সেই ডাক্তার। আমার সিনিয়র রেজিস্ট্রার।

আমি নীরবে এবার রোগী ঠেলে অপারেশন রুমে নিয়ে চলে গেলাম। আমার সঙ্গে একজন নার্স।

সেদিন সারাক্ষণ সেই রেজিস্ট্রার আমার সঙ্গে থাকল।

সবকিছু সারা হয়ে গেলে সেই ডাক্তারের হাত ধরে আমি বলে উঠলাম, ভাই, তুমি আমার জীবনে আজ দেবদূত হয়ে দেখা দিলে। এরকমের বিপদ আমি জীবনে সামনা হইনি!

সে বলল, কি জানি, অন্যদিন আমি রাত দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি। আজ আমার কিছুতে ঘুম আসছিল না। অনেকক্ষণ টিভি দেখে শেষে ভাবলাম, যাই অপারেশন থিয়েটারটা একটু ঘুরে দেখে আসি! তাই এসেছিলাম। এসে দেখি তুমি রোগী অজ্ঞান করে বসে আছ অথচ কানেকটিং টিউব লাগাচ্ছ না! তোমার হাতের কাছেই রয়েছে সেই টিউব। তোমার কী হয়েছিল? মন ভালো তো?

সেদিনই আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, মন ভালো বা খারাপ, কোনো কথা নয়, অ্যানেসথেসিয়া আমার লাইন নয়!

এ রকম বহুবিধ অলৌকিক ঘটনা দিয়ে আমার জীবন গড়া। মাত্র একটুর জন্য সবকিছু থেকে বেঁচে যাওয়া। যাপিত জীবনেও মিরাকল ঘাটে ঘাটে ঘটেছে। সবচেয়ে বড় মিরাকলই তো সৈয়দ হকের সঙ্গে আলাপ এবং জীবন যাপন। নইলে তিনি কোথায় উত্তরের আর আমি কোথায় দক্ষিণের। আমরা যশোরের মানুষ যে কোনো দৈনন্দিন খাওয়া শুরু করি ডাল দিয়ে এবং ভাজা দিয়ে। মাছ বা মাংস মাঝখানে। শেষ করি টক বা অম্বল দিয়ে। আর রংপুরের মানুষ খাওয়া শেষ করে ডাল দিয়ে! শুরু করে মাছ-মাংস দিয়ে। কল্পনা করা যায়?

রংপুরকে তো আমরা অংপুর বলে ভ্যাংচাতাম। সেই দেশের ছেলের সঙ্গে বিয়ে? কল্পনা করা যায়?

অলৌকিক ঘটনাবলি দিয়ে জীবন পরিবৃত বলেই না মানুষের জীবন এত মোহময়!

মানুষ মাত্রই আমার ধারণায় ছোট বা বড় অলৌকিক ঘটনা দিয়ে আবৃত অলৌকিক এক মহাযানের আরোহী।

আর সেই অলৌকিক মহাযানটি হচ্ছে আমাদেরই এই পৃথিবী, যা অবিশ্রান্ত ভাবে ঘূর্ণায়মান।

মন্তব্য করুন