পর্ব-৭

[নতুন প্রসঙ্গ]

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আমরা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম নিয়ে থাকি। তবে তার জীবনের পটভূমি বা যে নেপথ্য থেকে তিনি এসেছেন তার সম্পর্কে আমাদের তেমন আলোচনা হয় না। তাই তার ব্যক্তিজীবন এবং রাজনৈতিক আচরণের মধ্যকার সম্পর্ক ও প্রভাব নিয়ে আমাদের ধারণাটাও অস্বচ্ছ। এর একটি কারণ হচ্ছে, আমরা ধরে নিই যে, ভারতে ইংরেজ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে ব্যাপারটি ছিল- সেটি ছিল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বড় একটা ঝগড়া। কিন্তু এর মধ্যে যে অন্য বিষয়গুলো বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগত, শ্রেণিগত যে দ্বন্দ্বগুলো ছিল- সেগুলো সম্পর্কে আমরা ততটা সচেতন না। আমরা দেখে আসছি যে, জিন্নাহ টুপি-শেরওয়ানি পরা আপাদমস্তক একজন মুসলমান লোক এবং তার যে ছবিটা দেখতেই আমরা অভ্যস্ত যে, সে বোধহয় খুব ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ ছিলেন। ঠিক তেমনিভাবে জহরলাল নেহরু সম্পর্কেও আমাদের একধরনের অভ্যস্ত অভিজ্ঞতা আছে যে, 'দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া'র মতো বই লিখেছেন; জেলে গেছেন ইত্যাদি। মূলত এই ধারণাগুলো এক অর্থে সঠিক, আবার অন্য অর্থে এগুলো তাদের জীবন ও ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্রটা দেয় না। ভারতের উপনিবেশবিরোধী রাজনীতিতে যদি দুজন ব্যক্তিত্ব থেকে থাকেন যারা নিজেরাই উপনিবেশপন্থি ছিলেন, ঔপনিবেশিক শক্তির সাথেই যাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশি, যাদের জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনা ছিল পুরোপুরি ইংরেজ ঔপনিবেশিক- তাদের একজন এই জিন্নাহ, অন্যজন ছিলেন নেহরু। এবং সেইসঙ্গে এটাও স্মরণ রাখা দরকার যে, এদের কেউ একজন অন্যজনকে সহ্য করতে পারত না। এ বিষয়টি একাধিক গ্রন্থ ও গবেষণায়ও রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটা যে, এই দুজনের দ্বন্দ্ব আর প্রকট বৈরিতার ফলাফলে তৈরি সবচেয়ে বড় বোঝাটা বহন করতে হয়েছে বাংলাদেশের মানুষকেই। ইতিহাসে একাধিকবার চেষ্টা করেও যে আমরা বাঙালিরা এক হতে পারিনি, বাঙালির স্বাধীন দেশ হতে পারেনি- তার অন্যতম কারণ হয় জিন্নাহ, নাহয় নেহরু। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের যৌথ বাংলা আন্দোলনটা সফল হয়নি পুরোপুরি নেহরুর কারণেই। কিন্তু মনে রাখা দরকার নেহরুর জন্য যে যৌথ বাংলা সম্ভব হয়নি, তার সাথে জড়িত জিন্নাহ-নেহরুর এই দ্বন্দ্ব। তখন নেহরুর ভাবনায় ছিল যে জিন্নাহ বাংলাকে খেয়ে নেবে। মূলত তখনকার রাজনীতির ক্ষেত্রটাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে জিন্নাহ-নেহেরুর এই দ্বন্দ্ব- যার ভুক্তভোগী এই বাংলাদেশের মানুষ।


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ


অন্য বিষয়টি হচ্ছে, সাংস্কৃতিকভাবে এরা দু'জনেই উত্তর ভারতীয়। লেখাপড়া থেকে শুরু করে এদের সমস্ত বিষয়টাই পুরোপুরি ইংরেজ-নির্ভর। ইংরেজ আমলে ইংরেজমনস্ক এই যে এলিট শ্রেণি তৈরি হয়েছে- কেবল ইংরেজি জানা নয়, ইংরেজ মানস দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করার তারা চিন্তা করছে তখন- সেই চিন্তাই তাদের দু'জনকে এক পাটাতনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এবং একই কারণে ক্ষমতা নিয়ে তাদের ভেতরকার দ্বন্দ্বটা এত প্রকট হয়ে পড়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কথাই ধরি- তার বাবা বড় হয়েছেন করাচিতে। জিন্নাহ ছোটবেলা থেকে লেখাপড়া করেছেন বিলেতে। সেখান থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে এসে প্র্যাক্টিস শুরু করেন। এখানে লক্ষণীয়, জিন্নাহর যে জীবন- সে জীবনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি মুম্বাই হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতেন, যেসব ক্লাবে যেতেন, যাদের সাথে মিশতেন- তারা মূলত মুম্বাইয়ের অবস্থাপন্ন; বিশেষ করে পার্সি সম্প্রদায়ের লোকজন। স্বাভাবিকভাবেই জিন্নাহ কোনোদিন সাধারণ জীবন, সাধারণ জীবনযাপন, ধ্যান-ধারণার মানুষ ছিলেন না। প্রথম জীবনে তার যে বিয়ে হয়েছিল, সেই স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় যে বিয়েটি হয়েছিল সেও পার্সি ধনাঢ্য পরিবারে। অর্থাৎ তার সমগ্র পরিমণ্ডলটাই উঁচুতলার মানুষের। আর জহরলাল নেহরুও একই রকম অবস্থাপন্ন গণ্ডির মানুষ। দু'জনের লেখাপড়া, চিন্তাভাবনা সমস্তটাই বিলেতকেন্দ্রিক। উপনিবেশবিরোধী রাজনীতি তারা কোনোদিনই করেনি। নতুন রাষ্ট্র তারা চাইছে মূলত তাদের এলিট শ্রেণির সুবিধার জন্য। জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিলো কংগ্রেস থেকেই। সেই কংগ্রেস আসলে কোনো দল নয়, কংগ্রেস একটি প্ল্যাটফর্ম। সেখানে অনেকগুলো দল ছিল। জিন্নাহর সেখানে তেমন কোনো দল ছিল না নির্দিষ্ট। সে মূলত উপরতলার রাজনীতি করতেই এসেছিল- যেটা নিয়ন্ত্রণ করবে সর্বভারতীয় রাজনীতিকে- সেই ভাবনা থেকেই তার রাজনীতি। কিন্তু রাজনীতিতে এসে জিন্নাহ খেয়াল করল যে, কংগ্রেসের নেতৃত্বরা যেটা ব্যবহার করতে পারছে, তা হলো হিন্দু সম্প্রদায়গত রাজনীতি; যে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে ব্যবহার করে কংগ্রেসের নেতৃত্ব রাজনীতিতে সবল হচ্ছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের এই কৌশলটার সঙ্গেই জিন্নাহর বিরোধটা হলো। ধর্মগতভাবে বিরোধ নয়, বিরোধ হলো ক্ষমতাগতভাবে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সাথে উঠতি এলিট শ্রেণির যে দ্বন্দ্ব ছিল- সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে জিন্নাহ ছিলই না, কারণ তার বসবাস তারও ওপরে। সে-ই ছিল এলিট।

১৯১৪ সালের লখনৌ প্যাক্ট-এর মাধ্যমে একটি পৃথক নির্বাচনী অনুষ্ঠিত হয়। এই পৃথক নির্বাচনী মানে হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে যে যেই এলাকার সংখ্যালঘু, তাদের কিছু আসন বিশেষভাবে দেওয়া হবে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মিলিতভাবেই এ ব্যবস্থাটা ঠিক করলেও- সে সময় থেকে জিন্নাহর মনোভাব খারাপ হতে শুরু করে। জিন্নাহ বারবার করে মহাত্মা গান্ধী এবং নেহরুকে- বিশেষ করে গান্ধীকে বলেছেন, এমনভাবে ভাগ করুন যাতে দ্বন্দ্বটা না থাকে। কিন্তু গান্ধী তাতে তেমন একটা পাত্তা দেননি। গান্ধী ভেবেছেন, যেহেতু হিন্দু মেজরিটি, ক্ষমতাটা মেজরিটির হাতেই থাকবে। গান্ধী রাজনীতির দুর্বলতাটা তখন অস্বীকার করার চেষ্টা করলেন।

এরপর জিন্নাহ আবার বিলেতে চলে গিয়েছিলেন। বিলেত থেকে তিনি ফেরত আসেন ১৯৩৬ সালে। তাকে লিয়াকত আলী খান নিয়ে আসেন। ইতোমধ্যেই নেহরু এবং কংগ্রেসের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব খারাপ হয়ে গেছে। দ্বন্দ্বটা যত না রাজনীতির, তার চাইতে বেশি ব্যক্তিগত। ওপরতলার এই ব্যক্তি দ্বন্দ্ব কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সাথে যোগ হয়েছে। সেই সাথে উত্তর ভারতের সমাজ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক বাস্তবতা তো আছেই।

যাই হোক, সাতচল্লিশের পর নেহরু তো আমাদের ইতিহাস থেকে চলে গেছে। অতএব এখন তাকে নিয়ে কথা বলার থেকে জিন্নাহকে নিয়ে কথা বলাই বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করছি। বাংলাদেশের তিনজন রাজনীতিবিদের সঙ্গে তার সংযোগের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে জিন্নাহ ভীষণ অপছন্দ করতেন। তার চিঠিপত্র থেকে বিষয়টা বোঝা যায়। ফজলুল হক নিজের অবস্থান সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই সচেতন ছিলেন সবসময়। মুসলিম লীগ করেন বলে জিন্নাহকে সে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন বা সুবিধা দেবেন- এমন ভাবনা তার ছিল না কখনও। বঙ্গীয় মুসলিম লীগ আর অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের মধ্যে জিন্নাহর প্রভাব ছিল দ্বিতীয়টির ওপরে। কিন্তু ফজলুল হকের পুরো প্রভাবটা হচ্ছে পূর্ববঙ্গে। নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা সমিতি থেকে ফজলুল হক যখন বের হয়ে আসে- তখন তার সঙ্গে যারা বের হয়ে আসেন, তাদের সবাই ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। এবং ১৯৩৬ সালে যখন কৃষক প্রজা পার্টি গঠিত হয়, এর সবাই ছিলেন পূর্ববঙ্গের মানুষ। মুসলিম লীগের ক্ষেত্রে তখন নানাভাবেই পূর্ববঙ্গের রাজনীতিটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই যখন নির্বাচন হচ্ছে, তখন সোহরাওয়ার্দী, যিনি কিনা জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ লোক- তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব হলো। ফজলুল হক এবং জিন্নাহর মধ্যে সে সময় যে আলোচনা হচ্ছে, তাতে ফজলুল হকের চারটি প্রস্তাবের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল- একটা হচ্ছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে; দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। দুটি প্রস্তাবই জনগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জিন্নাহ এগুলো মানলেন না। জিন্নাহ বললেন, বিনা ক্ষতিপূরণে কীভাবে জমিদারি প্রথা বন্ধ করা যায়! এটা সম্ভব না, এটা বেআইনি, অমানবিক ইত্যাদি। এই মতানৈক্যের চেয়ে তখন যে জিনিসটি বেশি উন্মোচিত হয়ে গেল, তা হলো দু'জনের মধ্যেও বৈরী সম্পর্ক। জিন্নাহ তার চিঠিতে এক জায়গায় লিখেছে, 'আমি যতই গুছিয়ে আনতে থাকি, এই লোকটা [শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক] বারবার সবকিছু ভণ্ডুল করে দেয়।'

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেল মুসলিম লীগ, তার পরের অবস্থানে কৃষক প্রজা পার্টি। ফজলুল হক তখন কংগ্রেসের কাছে গেল যে, মুসলিম লীগকে বাইরে রেখে এক সাথে আমরা সরকার করব। কিন্তু নেহরুর চোখ তো সর্বভারতীয় চোখ। বঙ্গে একটা আলাদা সমাধান তিনি মেনে নিতে পারলেন না। ক্ষমতার জন্য ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গেই হাত মেলাল। কংগ্রেস এরপরে এখানে আর কোনোদিন ওপরে উঠতে পারেনি। সেই ঐতিহাসিক সুযোগটা নেহরুর জন্য ধ্বংস হয়ে গেল। এরপরে ফজলুল হক কংগ্রেসে জয়েন করলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু সুযোগ সন্ধানী মানুষ ছিলেন- ১৯৪৩ সালে তিনি বের হয়ে চলে গেলেন। ফজলুল হক তারপর আর মূলধারার রাজনীতিতে বড় কোনো কাজ করতে পারেননি।

জওহরলাল নেহরু ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ


১৯৪০ সালে দেখা যাচ্ছে, সব জায়গায় মুসলিম লীগ মার খেয়েছে- কেবল বঙ্গে ছাড়া। ১৯৪০ সালের ভিত্তিটাই প্রথম পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক সাফল্য। এ জায়গায়ও দেখা যাচ্ছে, যে রাজনীতি থেকে পাকিস্তান আন্দোলনটা তৈরি হচ্ছে, সেই রাজনীতির সাথে বাংলাদেশের মানুষের কোনো সম্পর্ক ছিল না। রহমত আলীর PAKISTAN কথাটার মধ্যেও কোথাও বাংলাদেশ নেই। এবং পাকিস্তান নিয়ে অন্য যতগুলো প্রস্তাব ছিল লাহোরের একাধিক প্রস্তাবসহ- একটাতেও বাংলাদেশ ছিল না। বাংলাদেশ এই রাজনীতির সাথে কোনোদিনই জড়িত ছিল না। এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে জিন্নাহর মনোভাব ছিল- এটাকে কেবল ব্যবহার করে সে ওপরে উঠতে চেয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক যে বিষয়টি তা হলো, বাংলাকে তার প্রয়োজন, কিন্তু বাংলার মানুষকে কোনোরকম ছাড় দিতে সে রাজি না।

দ্বিতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সোহরাওয়ার্দী জিন্নাহ ঘনিষ্ঠ মানুষ হলেও তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন, তিনি পশ্চিমা। আমাদের তখনকার রাজনীতিকে বোঝার জন্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক যে, তাদের বেশিরভাগ মানুষই ছিল পশ্চিমা ভাবনাচিন্তার। যেটা নেহরুর ছিল, জিন্নাহরও ছিল, একইভাবে সোহরাওয়ার্দীরও ছিল। সোহরাওয়ার্দী একাধিকবার জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু জিন্নাহ তাকে পাত্তা দেননি। নেহরুও দেয়নি। যখন যৌথবাংলার প্রস্তাব হয়েছিল- কংগ্রেসের মধ্যে যে অবিশ্বাসটা ছিল, তার কারণ হচ্ছে সোহরাওয়ার্দীকে তারা বিশ্বাস করতেন না। সোহরাওয়ার্দী এমন একজন লোক ছিলেন, যাকে সম্ভবত শেখ মুজিব ছাড়া আর কেউই তেমন পছন্দ করতেন না। আবুল হাশিমের বইতেও আছে যে, মহাত্মা গান্ধী বলছেন- সোহরাওয়ার্দীকে তো কেউ বিশ্বাস করে না।

১৯৪৬ সালে যার মাধ্যমে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রস্তাবটাকে নাকচ করলেন জিন্নাহ- সেই প্রস্তাবের উত্থাপক ছিলেন সোহরাওয়ার্দী নিজে। সোহরাওয়ার্দীর কিছু পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু যখন প্রস্তাবটা পাল্টে গেল সোহরাওয়ার্দীকে তখন আর জিন্নাহ দেননি কিছুই। সেই বেদনায় তিনি এসে যুক্ত বাংলা আন্দোলনে আবুল হাশিমের সাথে হাত মেলান। অতএব ঐতিহাসিকভাবে সোহরওয়ার্দীর ওপর নির্ভর করাটা একটু অসুবিধাজনক। ফজলুল হকও ঠিক একইভাবে নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।

তৃতীয় ব্যক্তিটার নাম মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। মাওলানা ভাসানী সিলেট অঞ্চলের একেবারে বিত্তহীন মানুষদের জন্য রাজনীতি করতেন। মাওলানা ভাসানী একবার জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সেখানে জিন্নাহর কাছে বাঙালি শ্রমিকদের দুর্দশার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। ভাসানী চলে যাওয়ার পর জিন্নাহ বলছিলেন, আমি এইসব লোককে একদমই পছন্দ করি না। এত ইমোশনাল! কথায় কথায় কেঁদে দেয়!

অর্থাৎ, এমন নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটা পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে জিন্নাহর কখনোই কোনো সম্পর্ক ছিল না। মানুষের রাজনীতির প্রতি সে কারণে তার কোনো মমতাও ছিল না। মমতা ছিল না মানুষের প্রতি এক অর্থে।

[ক্রমশ]

মন্তব্য করুন