পর্ব ::৮৭

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

আর সকল ধারাই- রাউলস্‌ের যুক্তি অনুসারে ;Freestanding' -দেশ-কাল-শ্রেণি-জাতি-গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত: its content is set out independently of the comprehensive doctrines that citizens affirm.

তার মানে কি আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমাদের বাহাত্তরের সংবিধান জন রাউলস্‌ের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ? এটা ঠিক যে, জন রাউলস বিশ শতকের সেরা রাজনৈতিক দার্শনিক (পলিটিক্যাল ফিলোসফার) - এ কথা অমর্ত্য সেন বহু আগেই স্বীকার করে গেছেন। তার 'আইডিয়া অব জাস্টিস' বইটি রাউলস্‌কেই উৎসর্গ করা। রাউলস্‌ের ক্লাসিক গ্রন্থ 'এ থিওরি অব জাস্টিস' এর শিরোনামের সঙ্গে সেনের বইটির নামকরণে সাদৃশ্যও লক্ষণীয়। রাউলস্‌ের বইটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭১ সালে, আমাদের সংবিধান প্রণয়নের ঠিক আগের বছরে। সরাসরিভাবে জন রাউলস্‌ের রাজনৈতিক দর্শন-পলিটিক্যাল লিবেরালিজম-সংবিধানকে প্রভাবিত করেছিল এমন কোনো প্রমাণ আমি পাইনি এবং সেই দাবিও আমি তুলছি না এখানে। আমি শুধু বলতে চাইছি যে, বাহাত্তরের সংবিধানের কাঠামো, তার ধারা-উপধারার নির্মাণ, তার সমতাবাদী স্বাধীন ন্যায়ানুগ সমাজের ধারণা জন রাউলস্‌ের পলিটিক্যাল ফিলোসফির সঙ্গে খুব বেশি সংগতিপূর্ণ। এই মৌলিক দিকটি দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। রাউলস্‌ যে লিবারেল মতবাদের কথা ব্যক্ত করেছিলেন, তা ভারতসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সংবিধানেরই তলদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে। সেসব অভিজ্ঞতাকে রাউলস্‌ কেবল আরও যুক্তিনিষ্ঠ, সমন্বিত ও প্রসারিত করে ব্যক্ত করেছিলেন তার লেখায়। এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সেকালের লিগ্যাল জুরিস্টদের ওপরে গভীর প্রভাব ফেলে থাকবে। যেমন, রাউলস্‌ 'স্বাধীনতার' ওপরে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন যে, সকল নাগরিকেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা, পেশা বাছাইয়ের স্বাধীনতা থাকবে। বাহাত্তরের সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ ধারাসমূহে যথাক্রমে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য রোধ, সরকারি নিয়োগ লাভে সমতা, আইনের আশ্রয়লাভের সমতা, জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার-রক্ষণ, জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধকরণ, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা, পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এদের প্রায় প্রতিটিতেই 'আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ' আরোপিত করা হয়েছে বটে, কিন্তু তাকে পড়তে হচ্ছে রাউলস্‌ের 'যুক্তিসংগত বহুত্ববাদের' আলোকেই। স্বাধীনতা মানে অবাধ স্বাধীনতা নয়- যুক্তিসংগত স্বাধীনতা। যাতে স্বাধীনতার সীমা চরমপন্থার দিকে না গড়ায়। এটি স্পষ্টতই রাউলস্‌-ধারার লিবারেল রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাবসঞ্জাত। বস্তুত, বাহাত্তরের সংবিধানের তৃতীয় ভাগের 'মৌলিক অধিকার' অধ্যায়ের (২৬ থেকে ৪৭ ধারা পর্যন্ত) মোট ২১টি ধারার ৫টি বাদে ( অর্থাৎ ৪, ২৯, ৩০, ৪২ ও ৪৭ ধারা বাদে) ১৬টি ধারাই সিভিল ও পলিটিক্যাল লিবার্টির সঙ্গে সরাসরিভাবে সংযুক্ত। এটাও সংবিধানের চরিত্রের 'লিবারেল' দিকটির প্রতি নির্দেশ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান কেবল রাউলসের পলিটিক্যাল লিবারেলিজমের সাথে তুলনীয় করে দেখলে চলবে না, এর অর্থনৈতিক-সামাজিক কমিটমেন্ট আরও বেশি গভীর। সেটা আমরা ইতোপূর্বেই ১০নং ধারার 'জাস্ট অ্যান্ড ইগালিটারিয়ান সোসাইটির আলোচনায় প্রত্যক্ষ করেছি। এ ছাড়া ১৫নং ধারার নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার 'মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা' প্রতিশ্রুতির মধ্যে বিবৃত হতে দেখেছি। তার মধ্যে বিশেষভাবে আলাদা করে উল্লেখিত হয়েছে, সাধারণ মানুষের 'পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনের কথা, যা রাষ্ট্রের 'অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য' হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে ১৮নং ধারায়। সেই সঙ্গে 'সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার' (১৫নং ধারা); 'সুযোগের সমতা এবং 'সম্পদের বণ্টন' (১৯নং ধারা) প্রভৃতি দিকের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছি। এই চিন্তাগুলো যেমন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার তলদেশ থেকে উঠে এসেছে, তেমনি এদের পূর্ব চিহ্নসমূহ পলিটিক্যাল লিবারেলিজমের আদি উচ্চারণেও পাওয়া যায়। এক অর্থে মার্কসের চিন্তা ও পরবর্তীকালের রাউলসের মতন উদারনৈতিক দার্শনিকদের চিন্তাধারার মধ্যে মৌলিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্নে একটি বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। জন রাউলস বা আজকের যুগের মাইকেল স্যান্ডেল যেসব কথা বলছেন বৈষম্যের প্রশ্নে এসে, তাতে মার্কসবাদীদের অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। যেমন- রাউলস তার লেখায় পরিস্কার করে 'সুযোগের সমতার' কথা বলেছেন, 'সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের' দাবি তুলেছেন; বিশেষ করে সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের কথা বলেছেন। এবং এটা করতে গিয়ে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিতদের। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে গরিব অগ্রাধিকার পাবে, সেটা রাউলসের সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কিত চিন্তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ১৯৭১ সালের 'এ থিওরি অব জাস্টিস' বইটিতে এবং পরবর্তীতে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে তার 'জাস্টিস অ্যাজ ফেয়ারনেস' বইয়ে তিনি তার সোশ্যাল জাস্টিস তত্ত্বের 'দুই নীতিমালা' ব্যক্ত করেন। এই দুটি প্রিন্সিপালের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে সকলের জন্য 'সমান মৌলিক স্বাধীনতা' আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে 'সকলের জন্য সুযোগে ন্যায্য সমতাবিধান', অর্থাৎ 'ফেয়ার ইকুয়ালিটি অব অপরচুনিটি' নিশ্চিত করা এবং 'সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত অংশের কাছে সবচেয়ে বেশি সুবিধে পৌঁছে দেওয়া।' ইংরেজিতে দাঁড়ায় নিম্নরূপ :

‘First Principle’: Each person has the same indeasible claim to a fully adequate scheme of equal basic liberties, which scheme is compatible with the same scheme of liberties for all Ges
Second Principle : Social and economic inequalities are to satisfy two conditions:
a. They are to be attached to offices and positions open to all under conditions of fair equality of opportunity;
b. They are to be to the greatest benefit of the least-advantaged members of society (the difference principle)’

প্রথম ও দ্বিতীয় নীতিমালার মধ্যে সংঘর্ষ লাগলে প্রথম নীতিমালাটি অগ্রাধিকার পাবে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক-সামাজিক অধিকার রক্ষা করার কথা বলে রাজনৈতিক মৌলিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। এটা পলিটিক্যাল লিবারেলিজমের ধারার একটি মৌলিক দাবি- যেটি বাংলাদেশের সংবিধানেও 'মৌলিক অধিকার' অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই। সেখানে বিধৃত মৌলিক অধিকারসমূহের অধিকাংশই সিভিল ও পলিটিক্যাল লিবার্টি সম্পর্কিত (অবশ্যই ইতোপূর্বে আলোচিত 'যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ' সাপেক্ষে)। অর্থনৈতিক অধিকারের তুলনায় রাজনৈতিক-নাগরিক অধিকারকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার এই ধারা অবশ্যই অনেক কট্টর মার্কসবাদীরা (লেনিনবাদীরা সমর্থন করবেন না। কোনো বিশেষ অবস্থার চাপে, একটা নির্দিষ্ট আপৎকালীন সময়ের জন্যে নাগরিকের অর্থনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে (যেমন- অতিমাত্রায় করারোপ করা হতে পারে, বা অতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধন করতে হতে পারে)। এ রকমটা দেখা গেছে শিল্পায়নের সময়ে ১৯২৫-১৯৩৬ কালপর্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নে, অথবা মহাযুদ্ধকালীন সময়ে পুঁজিবাদী ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে। বিশেষ অবস্থার চাপে পড়ে, যুদ্ধোত্তরকালে বা কোনো একটা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আপৎকালীন সময়ের জন্য নাগরিক মৌলিক স্বাধীনতার কোনো কোনো দিক থেকে সরে আসতে হতে পারে। ৯-১১ পরবর্তীকালে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' ও ইরাক-যুদ্ধ এসব পর্বে খোদ যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপে নাগরিকদের মৌলিক সিভিল পলিটিক্যাল লিবার্টিসমূহ সাধারণভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। নাগরিকদের পত্রালাপ, ফোনালাপ, ইন্টারনেট ব্যবহার, চলাফেরা ইত্যাদির ওপরে রাষ্ট্রীয় নজরদারি করা হয়েছে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই। পুঁজিবাদের এই নজরদারি প্রবণতাকে এখন এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। একে 'সারভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম' হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। কেউ কেউ এই প্রবণতার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অসুখের ছায়াপাত দেখছেন। দার্শনিক মিশেল ফুকো এসব ঘটার ৩০-৪০ বছর পূর্বেই তার 'ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ' বইতে 'আই অব পাওয়ার' বা চবহড়ঢ়ঃরপড়হ-এর সম্ভাব্যতা আধুনিক পুঁজিবাদের জেনেটিক কোডে আবিস্কার করেছিলেন। কিন্তু সেটা ঘটলেও- আকছার এ রকম ঘটছে বলেই- রাউলস মৌলিক স্বাধীনতার নীতিমালাকে অপরাপর নীতিমালার সঙ্গে এক কাতারে দেখার পক্ষপাতী নন। স্বাধীনতা বনাম উন্নয়ন প্রশ্নে কোনো বাস্তবিক ট্রেড অফ দেখতে নারাজ রাউলস (এবং অমর্ত্য সেনের মতো লিবারেল দার্শনিকেরা)। এর বিপরীতে হবস, মার্কস, লেনিন, ফুকো প্রমুখ দার্শনিকেরা স্বাধীনতাকে অতটা শীর্ষস্থানে তুলতে রাজি নন, যদি না অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো আগে প্রতিষ্ঠিত হয় বা করা যায়।

রাউলস অর্থনৈতিক সাম্যের আগে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাম্য নিশ্চিত করতে চান এবং এ দুইয়ের মাঝে কোনো ক্ষেত্রেই 'ট্রেড-অফ' করা যাবে না- এই হচ্ছে তার সুচিন্তিত মত। কিন্তু এর বিপরীতে মার্কস থেকে ফুকো অবধি দার্শনিকেরা ভিন্ন মত রেখেছেন। তাদের মোটা দাগের বক্তব্য হলো, সবার জন্য সমান মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আগে- হয়তো নিশ্চিত করার জন্যই-প্রয়োজন সবার জন্য সমান অর্থনৈতিক অধিকার। ভাত, কাপড়, জমি, কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রভৃতি অধিকারকে আগে প্রতিষ্ঠা করা। কবি নির্মলেন্দু গুণ যেমন বলেছিলেন, 'তার আগে চাই সমাজতন্ত্র।' 'এ আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়'- এই স্লোগান উঠেছিল দেশভাগের পরপরই। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের পটভূমিতে এই স্লোগান ওঠা তখন অস্বাভাবিক ছিল না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা আন্দোলনের একপর্যায়ে অর্থনৈতিক অধিকারের দাবিকে স্বয়ং শেখ মুজিব আন্দোলনের সম্মুখভাগে নিয়ে এসেছিলেন। 'দুই অর্থনীতি' শীর্ষক ন্যারেটিভ ছয় দফার প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধীনতার মৌলিক যুক্তিভিত্তি জুগিয়েছিল। সেদিনের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হয়েছিল অর্থনৈতিক দাবি রক্ষার মোড়কেই। ব্যাপারটা এমন নয় যে, আওয়ামী লীগ কেবল রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বা অটোনমির স্লোগান তুলেছিল; আর বামপন্থিরা কেবল অর্থনৈতিক অধিকারের কথায় সরব হয়েছিল। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি রাজনৈতিক স্বাধিকার-স্বাধীনতার পদক্ষেপই ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের যুক্তির জরিসুতো দিয়ে বোনা। এমনকি ছয় দফার দলিলটিরও শিরোনাম ছিল : 'ছয় দফা- আমাদের বাঁচার লড়াই', যেখানে দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বর্ণনা ছিল। আমি বলতে চাইছি, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে বিশেষত ষাটের উত্তাল দশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার উভয়ই দাপটের সঙ্গে উপস্থিত ছিল : এ দুইয়ের মধ্যে কোনো 'ট্রেড-অফ' করা হয়নি। এখানে মার্কসও ছিলেন, রাউলসও ছিলেন। এই দুটো ধারাকে ধারণ করেছিলেন মুজিব ও তার নিকটতম আদর্শিক সহকর্মীরা।

তবে একটি প্রশ্নে রাউলসের সাথে মার্কসের কোনো বিরোধ হতো না, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। রাউলস সমাজের সকল নাগরিকের মধ্যে সুযোগের ন্যায্য সমতা এবং সম্পদ বণ্টনে ন্যায্য সমতা চেয়েছিলেন। কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে তিনি এই ন্যায্য সমতা বাস্তবায়নের পথে সর্বাগ্রে অতিদরিদ্র এবং সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক দিকটি রাউলসের পূর্বে কথিত 'ডিফারেন্স প্রিন্সিপাল' (যাকে আজকের পরিভাষায় প্রায়োরিটি প্রিন্সিপাল বা টার্গেটিং প্রিন্সিপালও বলা যায়) থেকে স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। রাষ্ট্রের কাছে যদি সম্পদ কম থাকে, তবে সংকটের সময়ে কাকে সে সর্বাগ্রে সাহায্য করবে? এ প্রশ্নে রাউলসের উত্তরে কোনো অস্পষ্টতা নেই : দরিদ্রদের এবং অতিদরিদ্রদের প্রতি রাষ্ট্র সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়াবে। এজন্যেই এই রাষ্ট্র শুধু 'ইগালিটারিয়ান' নয়, এটি 'জাস্ট'ও- হতদরিদ্রদের স্বার্থে রাষ্ট্র ইনসাফের বা সামাজিক ন্যায়-নীতি পরিচালনা করবে। এর থেকেই জন্ম হয়েছে রাউলসের বিখ্যাত আপ্তবাক্য-‘Maximum benefits to the minimum advantaged’  (Maximin) প্রিন্সিপালও বলা হয় একে)।

[ক্রমশ]

মন্তব্য করুন