'মোর নাম হিকমত ইসলাম। সক্কলে মোক মাস্টার করি ডাকে। এই গেরাম ছাড়িয়াও বাইরের গেরামতও মোর নামডাক আছে আল্লার রহমতে। মুই কেনে এই জীবন ছাড়ি অন্য জীবনত যাম বাহে? কেউ কি যাবার চাহিবে মাস্টারি ছাড়ি দিয়া বেসরকারি এনজিওত কাজ করিবা?'

জোব্বারের প্রস্তাবে আগপাছ কিছু না ভেবেই এই উত্তর দেয় হিকমত। তবে গড়গড় করে বলে ফেলার পর সূক্ষ্ণচিন্তার সুচ বিঁধতে থাকে মনে। বারংবার খটকা দিতে থাকলে কখনো কখনো মনে চিন্তার সুতো দীর্ঘতর হয়। প্রায় তিনগুণ বেতনের চাকরিটি বৃদ্ধ বাবা-মাকেসহ তার মেদবহুল শরীরের স্ত্রীকে এবং ছোট্ট কন্যা মুন্নীকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে পারবে ঠিকই, কিন্তু বুকের গহিনে সুখ নামক কোনো বিশেষণ থাকবে কিনা ভাবতেই আবার পূর্বমতে ফিরে যায়। আগের মতে ফিরে আসতে পেরে প্রশান্তিই অনুভব করে। তখন আবার বিকল্প চিন্তাটি করলে মন খচ খচ করে। হৃদয় আবার তাকে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে আনে। হাবভাব পরিবর্তন হচ্ছে না দেখে জোব্বার আবার তাগাদা দেয়-

'শোনেন বাহে হিকমত; মাস্টারি করি কি-ইবা আর করিবেন এই অজপাড়া গেরামত! তার চেয়ে কহেচু মোর বুদ্ধিটা মানো, কাজত দেবে। মোর শালার সাথে তো কথা হইছে মোর। ওর অফিসত পোস্ট খালি হইছে কইছে মোক গত পরশু। বেতন তো মেলায়। মোক কহেছিল চাকরিখান করিবার তাহানে; কিন্তু এত জমিজমা ছাড়ি মুই কেমন করি যাও কহেন! তোমহা বাহে মাস্টারি করি দুয়েক আনা রোজগার করি সংসার চালান। জমিজমাও তেমন নাই যে, দেখাশোনা করিবেন। তার চাইতে শহরের চাকরিটা করিলে মেলা বেতন পাইবেন বাহে। তোমহা তো আবার বিএ পাস!'

জোব্বারের বোঝানোর প্রচেষ্টা হিকমতের মনে সাড়া ফেলে কিনা বোঝা যায় না। সে কেবল নীরস মুখে আকাশের পানে তাকিয়ে থাকে। এবং ভেসে যাওয়া শুভ্র মেঘের মতোই চিন্তার সুতো একটি অন্যটির সাথে প্যাঁচ খেয়ে গিঁট বেঁধে যায়। সেই গিঁটের তাড়নায়ই হয়তো অতিষ্ঠ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় মনে মনে। তবে জোব্বারকে পরে বলবে বলে ঠিক করে। সহসাই জানানো সিদ্ধান্তে গোপনে লুকোনো লোভটুকু কিংবা তাগিদ প্রকাশ পেয়ে যায় কিনা এই সংকোচে হিকমত বলে,

'তোমহা তো মোর ভালোই চাহিবেন বাহে। কোনোদিন কি হামার খারাপ চাহিছেন নাকি? তোমহার এই প্রস্তাবের তাহানে তোমহাক ধন্যবাদ অনেক। মোর পরিবারের কথা চিন্তা করিছেন। এই জামানায় কেউ তো আর কাউকো দেখবার পারে না! তয় মুই দেখু মুন্নীর মার সাইথে কথা কহি। কাইল তোমহাক জানাম।'

কিছুক্ষণ থেমে থেকে কী যেন চিন্তা করে বলে, 'তয় ধরি নিবা পারেন মুই একশোভাগ রাজি। খালি ওর মা কইলেই মাস্টারির চাকরিটা ইস্তফা দিয়া শহরত চলি যামো।'

একটু থেমে কী যেন ভেবে আবার বলে-

'ঠিকই কইছেন বাহে। সবার আগে পেট। পেট না চলিলে সম্মান বেঁচি ভাত খাওয়া যাইবে না।'

আগ বাড়িয়ে জানিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের সেতুতে একা একা টলে হিকমত। যেন দড়ির ওপর লাঠি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। একদিকে নিশ্চিত পড়বে। ডানদিকে পড়লে সুবিধা বেশি, কারণ সেদিকে আছে তার শুভাকাঙ্ক্ষ জোব্বারকে নিজের শুভাকাঙ্ক্ষীই ভেবে নিয়ে হয়তো অজান্তেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে! বাসায় এসে দোনামোনা করে মুন্নীর মার কাছে কথাটা পাড়লে নিত্য নিরামিষ ভোজনে অতিষ্ঠ মুন্নীর মাও জোব্বারের কথাকে প্রাধান্য দিয়ে সমর্থন জানায়। তাদের জন্য না হলেও মুন্নী যে বাপের পাঠানো টাকায় মাঝে মাঝে আমিষেরও স্বাদ পাবে, তা হিকমতের যাবার তাগিদকে আরো কিছুটা বাড়িয়ে দেয়।

স্কুলের হেডস্যার থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে নিজের বাবা-মা, স্ত্রী এবং সবশেষে এই যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য ছোট্ট মুন্নীর কাছ থেকে বিদায় নেবার পর হঠাৎ যেন পরিচিত গাছ কেটে ফেলার পর শূন্যতার অসহায়ত্বে ভুগতে থাকে হিকমত। তবে এর স্থায়িত্ব কয়েকদিন থেকে দীর্ঘদিনের হতে থাকে। শহরে এসে জোব্বারের শ্যালকের ঠিক করে দেয়া মেসে থাকাসহ নিয়মিত অফিস করা এবং মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা যে কারো মনে সুখ জাগাতে পারলেও তার মনে সুখ জাগায় না। অফিসের কঠোর বসের কাছ থেকে ছুটি চাওয়ার পরেও তার করুণ ঘ্যানঘ্যান বসের কানে ঢোকে না বলে আর ছুটি পাওয়া হয়ে ওঠে না। এদিকে তার অনুপস্থিতিতে নির্জন পড়ে থাকা গ্রামের নির্জনতা ক্রমেই জেঁকে বসে বুকে। অথচ প্রকৃতই কি তাকে ছাড়া নির্বোধ নিস্তেজ হয়ে আছে তার গ্রাম, পরিবার আর মঙ্গলকামী পরিজন? নাকি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই দিন কাটাচ্ছে! মুন্নী আর তার মা তার পাঠানো টাকায় আয়েশ করে খেতে খেতে তার কথাই ভুলে যাচ্ছে কিনা এই ধারণা তার মনে বীজ পোঁতে। তবে সেখান থেকে আর চারা গজায় না কিংবা গজাতে দেয় না হিকমত। তার আদরের মুন্নী কিংবা মেদবহুল শরীরের স্ত্রী তার কথা নিশ্চয়ই প্রতিনিয়ত স্মরণ করে! নিজেকে সান্ত্বনা দেয় হিকমত।

'এই যে সাহেব। কী খবর আপনার? মিঞা ভাইয়ের কাছ থেকে তো আপনার ভালোই প্রশংসা শুনেছি। একজন আদর্শ হাইস্কুল টিচার আশা করি তার নতুন অফিসেও সততা আর আদর্শের সাথে কাজ করে যাচ্ছে! ইফ আই নট রং!'

জোব্বারের শ্যালক সাব্বিরের অকস্মাৎ আগমন হিকমতকে অপ্রস্তুত করে। দরজা খোলা রেখে এভাবে শুয়ে থাকা তার ঠিক হয়নি। দিন-দুনিয়া যে আজকাল ভালো না তা শহরে এসে বুঝতে পেরেছে। কখন কে এসে পড়ে! তারপর অস্ত্র দেখিয়ে বলে, যা আছে দিয়ে দে খানকির পোলা। তখন তার জমানো টাকাগুলো দিয়ে দেওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। যাইহোক, নিজের অসচেতনতাকে শুধরে নেবে ভবিষ্যতে ভেবে বর্তমান অতিথিকে আহ্বানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

-'আরে ছোটভাই! তোমহা কোনবেলা আলেন! মুই তো তোমহার কথাই এতক্ষণ চিন্তা করছিনু। (যদিও মিথ্যা! স্বার্থের তাগিদে এরকম ছোটখাটো মিথ্যা সবাইকেই বলতে হয়।)'

-'তাই নাকি! হোয়াট অ্যা কো-ইনসিডেন্স! আমার সৌভাগ্য যে, আপনার মতো একজন আদর্শ মানুষ আমার কথা চিন্তা করছিল। তো কি চিন্তা করছিলেন জানতে পারি কি?'

-'তোমহা খাড়াই কেনে আছেন বাহে! বসেন বসেন। এই নেন চেয়ার। ...তো কি তাহানে আসিলেন সেইটা কহেন আগত। তারপর মুই কহেচু।'

-'স্যার আমাকে বলল সামনের একটা প্রজেক্টে আপনাকে আমার সহযোগী হয়ে কাজ করতে। এতদিন তো অন্য ক্লায়েন্টের হয়ে কাজ করেছেন। আগামী এক মাস আমার সাথে কাজ করবেন। প্রজেক্টটা যদি সাকসেস হতে পারে তাহলে কিছু বোনাসও পাবেন।'

-'তোমহার সাথে কাজ কইরতে তো ভালোই লাগিবে ভাইসাহেব। মুই রাজি আছো।'

-'গুড। এবার তাহলে আপনার কথাটা শোনা যাক! কী ভাবছিলেন আপনি আমাকে নিয়ে?'

কিছুটা সংকোচ করে, এদিক সেদিক তাকিয়ে কী বলবে বুঝতে না পেরে অতঃপর হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে পেয়েছে এমন ভঙ্গি চেহারায় ইনিয়ে-বিনিয়ে নিজের ছুটি প্রত্যাশার কথাটা পাড়ে হিকমত। সাব্বির কী বলবে ধারণা করতে পারে না তবে শেষ পর্যন্ত কিছুটা আশা দিয়ে বিদায় হয়। তার ভাষ্যমতে বসের সাথে সে কথা বলবে হিকমতের কয়েক দিনের ছুটির জন্য। অজানা এবং অনিশ্চিত এক ভরসায় টলমল করতে থাকে হিকমতের মন।

মুন্নীর মায়ের সাথে তার শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্কটা কেমন তা মুন্নীর মায়ের রোজ ভোরে উঠে দুজন মুরব্বিকে ওজুর গরম পানি করে দেয়াসহ সারাদিনের দেখভাল করা এবং হিকমতের অনুপস্থিতিতে বড় মাছের ড্যাবকা মাথাটা শ্বশুরের থালায় তুলে দেয়ার মধ্যেই প্রকাশ পায়। দুজন মুরব্বির কাছে মুন্নীর মা সচরাচরই ভালো মনের মেয়ে হিসেবে সাব্যস্ত হলেও ইদানীং বাড়ির বাইরে ঘন ঘন যাওয়াটা শাশুড়ির নজর এড়ায় না। সন্দেহের খানিক আভা তার মনে জাগলেও বউমা নতুন সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যাচ্ছে এবং সেখানেই নিয়ত সময় দিচ্ছে ভেবে নিয়ে সরল বুড়ি ক্ষান্ত হন। মুন্নী বাপের স্কুলে পড়াশোনা করতে গেলে বাপের তরুণ কলিগ ইসমাইল তাকে কীসব আউলা-ঝাউলা ইঙ্গিত দেয়, মুন্নী তার কিছুই বোঝে না। ধারণা করতে পারে যে, বাপ শহরে বলে ইসমাইল মাস্টার তার দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু সেটা অতিরিক্ত এবং কথায় কথায় মুন্নীর পিঠে হাত বুলানোর মতো বলে ছোট্ট মুন্নীর বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হয় না। বাড়িতে এসে মাকে নাকি দাদিকে কথাটা বলবে সিদ্ধান্ত নিতে নিতে অবশেষে মাকেই বলবে ধরে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরলে দেখে মা নেই। বুড়ি দাদি পান চিবোতে চিবোতে তাকে ভাত খেয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিলে বুঝে আজও মা সেলাইয়ের কাজে গঞ্জে গেছে।

'কি হে মুন্নীর মা? আর কি চাওয়ার আছে তোমহার? কহি ফেলান! তোমহার ভাতারক তো শহরত পাঠাই দিনুই মুই। আর তো কোনো চিন্তা নাই। কী কহেন! হাহাহাহা।' ঝাড়ুর কাঠি দিয়ে দাঁত খিলানরত জোব্বারের হাসি বেখাপ্পা শোনায়। তার বুকের ওপর মুখ গুঁজে থাকা মুন্নীর মায়ের ঠোঁটে লজ্জার দুষ্টু হাসি খেলে যায়।

'মোর তো এইটাই চাওয়ার ছিল। আর কি চাউ মুই একটুকুন সুখ ছাড়া? তোমহার কাছত আসিই তো মোর অন্ধকার পৃথিবীত আলো জ্বলি উঠে।'

বলে জোব্বারের লোমের জঙ্গলে ভরা বুকে চুক শব্দে চুমু খায় মুন্নীর মা।

'তোমহা যে প্রত্যেকদিন মোর কাছত আইসেন, তোমহার শ্বশুর-শাশুড়ি কিছু কহে না? জানবার চায় না তোমহা কুনঠে যাছেন?'

'মোক কি তোমহা বোকা পাইছেন নাকি? ওই বুড়া-বুড়িক লাইনত আনিছু মুই। এত সেবা করু যে, ওমরা টেরই পায় না কিছু। যেন মুই সোনায় সোহাগা একখান বউ। সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিবার কথা কই ফাঁকি মারি তোমহার কাছত আইসো। মুন্নীর বাপ থাকতি তো মাসে একবারও আসিবার পারেছিনু না!'

'বুদ্ধি আছে বটেই তোমহার। মাইয়া মানুষ হইয়াও একখান পুরুষক বেচি খাইতেছেন। হাহাহাহা।'

জোব্বারের আহদ্মাদি হাসি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। মুন্নীর মা বেলা পড়ে গেছে দেখে বাড়ি যাবার তাড়নায় শাড়ি ঠিক করতে প্রস্তুত হয়। জোব্বার খপ করে হাত ধরে আবার পাশে বসিয়ে দেয় মুন্নীর মাকে। কিছুটা জোরাজোরি, দু'পক্ষের অনীহা এবং অবশেষে জোব্বারকে নিজের বিপদের কথা বোঝানোর পর সন্ধ্যের দিকে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয় সে।

হিকমতের ঝিম ধরা শরীরটা দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তায় হঠাৎই একটু খারাপ হয়ে গেলে তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর হয় তার। সেই ছুটিতে বাড়িতে এসে ঘুরে যায় একদিন। শহর থেকে যেতে-আসতে দুই দিন লেগে যায়। যেই একদিন বাড়িতে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, সেদিন রাতে শরীরটা মনে হয় আরো দুর্বল হয়ে যায় হিকমতের। মুন্নী বাপের কোল ঘেঁষে বসে তার আবদারের জিনিসগুলো কেন আনেনি অভিযোগ করায় হিকমত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষান্ত হয়। মুন্নীর মা স্বামীর সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে সেই সেবার গহিনে যে করুণ স্বার্থ লুকিয়ে আছে, তা ধরতে পারে না হিকমত। স্ত্রীকে কাছে টেনে তার মায়ার আঁধার লক্ষ্মী গালটাতে চুমু দিতে চাইলে কেউ দেখে ফেলবে বাহানায় সরে পড়ে মুন্নীর মা। হিকমতের দিন দিন ঘা হয়ে ওঠা পুঁজে ভরা মুখটার চুমু কখনোই পেতে চায় না সে, মনে মনে ভাবে। অসুস্থতা বাড়তে থাকলে পরদিন আর শহরে যাওয়া হয়ে ওঠে না হিকমতের। যাওয়া হয় না তার পরের দিনও। এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেলে সাব্বিরের ফোন আসে। যাওয়ার তাগাদা দেয়। হিকমত যেতে চাইলেও অসুস্থতা তাকে যেতে দেয় না। তার চেয়েও বড় অসুস্থতা মনের জোর। জোর থাকলে ঠিকই এতদিনে শহরে চলে যেত। এখন অন্তত দিনে পাঁচবার আফসোস হয় যে, গ্রামের মাস্টারি টাই ভালো ছিল! তবে চাকরির স্থায়ী ইস্তফা দেওয়াতে ও তার পোস্টে নতুন একজন আসাতে বিদ্যালয়ে ফেরার আর সুযোগ হয় না হিকমতের। সে সুযোগটাও জোব্বারই বন্ধ করেছে। মুন্নীর মারও তাতে সায় ছিল। হিকমত অসুস্থ থাকাতে জোব্বার তাকে দেখতে আসে একদিন।

-'কি বাহে হিকমত? কেমন আছেন তে? চাকরি কি বাদ দিয়া চলি আসিলেন নাকি? কয়েকদিন ধরি বাড়িতেই আছেন যে!'

-'কি আর কহিমো বাহে! শরীরটা ভালা না। ওঠেনা মনও বসেনা মোর। যত টাকাই হোক। সুখ তো পাও না! এখন মোর খুব আফসোস হয়।'

-'এইলা কি কহচেন বাহে? হাতের লক্ষ্মী কেউ পাও দিয়া মাড়ায় নাকি? আস্তে-ধীরে সব ঠিক হই যাবে। পরথম পরথম এনা খারাপ নাগবেই।'

হিকমত কি বলবে খুঁজে না পেয়ে মুন্নীর মাকে জোব্বারকে বসতে দিতে বলে। জোব্বারকে বসতে দিতে গিয়ে দুজনের চোখাচোখি হলে চোখের ইশারায় দুজনে মিটিমিটি হাসে। সেই হাসির গূঢ়ার্থ হিকমতের চোখে ধরে না। তার চোখে কেবলই এক সাগর আফসোসের পানি থইথই করতে থাকে। সে যেন সেই সাগরের সাঁতার না জানা নিঃসহায় এক ব্যক্তি!

কয়েকদিন পরেই সুস্থ হলে হিকমত শহরে চলে যায়। শহরে সাব্বিরের বারবার অনুরোধে আর না করতে পারে না হিকমত। উপায়ান্তর যেহেতু নেই, এনজিও কর্মী হয়ে বাকি জীবনটা কাটাতেই রাজি হয় তখন সে। তাছাড়াও জোব্বারের শালার ব্যবহার হিকমতের বেশ ভালো লাগে। ছাত্রের মতো অনুগত থাকা তার সহকর্মী সাব্বির পদক্রমে তার চাইতে ঊর্ধ্বে হলেও তার আনুগত্যে তা প্রকাশ পায় না। ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে হিকমত। সারাদিন পরিশ্রমের পর রাতে আর অনুশোচনার সুযোগটুকু থাকে না তার।



দিন আবার আগের মতো হয়ে যায়। মুন্নীর মা যায় জোব্বারের কাছে। মুন্নী কি এক ভয়ে, শঙ্কায়, আশ্চর্যে, অবুঝ মনে যায় স্কুলে। তবে স্কুলের বিষয়টা মাকে বলতে সাহস পায় না। শুধু পাণ্ডুর মুখে দুই বেণি করে স্কুলে যায়। ইসমাইল মাস্টার অন্যচোখে মুন্নীর দিকে তাকাতে থাকলে অন্য চিন্তা বাদ দিয়ে বাবার নির্দেশেই মাস্টার এত সোহাগ করছেন ভেবে নেয় অবুঝ মুন্নী। বৃদ্ধ বুড়ো-বুড়ি ঘরে বসে পরকালের গল্প করে এবং তাদের ইহজীবনের সব পাপের ফলস্বরূপ যে করুণ পরিণতির শিকার হতে হবে, সেই চিন্তায় দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে। বৌমার ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন বললেও ভুল হবে। শাশুড়ি আঁচ করেছে বিষয়টা অনেক আগে। আগের চেয়ে সন্দেহের চারা সময়ের সাথে বাড়তে থাকে। জোব্বার বাড়িতে এলেই কেমন খাতির যত্নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার বউমা, এটা বুড়ির নজরে পড়েছে। তাছাড়াও হিকমত থাকাকালীন হাতের সেলাইয়ের কাজটা তেমন করতে না গেলেও সে চলে যাবার পর থেকে সেটা যে খুব বেড়ে গিয়েছে এবং বউমা সন্ধ্যে নাগাদ ফিরছে, এ বিষয়ে সন্দেহের বীজ ফসলে পরিণত হতে থাকে বুড়ির মনে। আজও সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নামক মিথ্যে অনুযোগ শেষে, জোব্বারের সাথে পাশের গ্রামের মেলায় ঘুরে আসার পর, খুব হাসিখুশি হয়েই বাড়ি ফেরে মুন্নীর মা। বুড়ি লক্ষ্য করে, হাতে তার রঙিন চুড়ি, গলায় সিটি গোল্ডের নতুন চেইন, পায়ে রুপোলি নূপুর।

-'কি খবর বউমা? কোনঠে আছিলেন তোমহা এতক্ষণ? তোমহার শ্বশুর তো ভোকে মরেছে। এশার ওয়াক্ত যে হই গেলো! ভাত কখন বসাইবেন?'

-'এইতো আম্মা এলাহাই বসাম নে। আইজকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-ত শহরের গার্মেন্টস থিকা বড় সাহেব আইছিলেন। উমহাক সব কাজ গুলান দেখাবার হইল। এই তাহানে দেরি হইল আম্মা।'

-'ও...। তো তোমহা এত সাজিছেন কেনে তে? এইলা তো তোমহার জিনিস না। কে দিলি এইলা তোমহাক?'

-'আম্মা আর কইয়েন না। বড় সাহেব সব্বার কাজ দেখি কেতে মোর কাজগুলার অনেক প্রশংসা কইরলেন। আর এই নূপুর, চেইন, চুড়ি গুলান উপহার দিলেন। সামনের মাস থিকা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কিছু টাকাও দিবেন কহিছে।'

টাকার কথা শুনে এবং বুদ্ধিমতী মুন্নীর মার সহাস্য, নির্ভয় এমন সঠিক জবাব শুনে বুড়ির কিছুটা গজিয়ে ওঠা সন্দেহের ফসল আবার নিড়ানির তলায় পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। স্বার্থপর এবং সারাদিন মেয়ের খোঁজ-খবর না নেয়া মা মেয়েকে তাগাদা দিতে থাকে রান্নায় তাকে সাহায্য করার জন্য। আর নির্জলা মনের আবেগে বহুল প্রতীক্ষিত, বহুকষ্টে অর্জিত প্রেমের দোলায় দুলতে থাকে তার মন।

মন্তব্য করুন