কয়েক দিন পরেই পঁচাত্তরে পা রাখছেন বাংলা ভাষার অন্যতম কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া সেলিনা হোসেনের লেখালেখির শুরু ১৯৬৪ সাল থেকে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা প্রতিটি ক্ষেত্রে তার লেখা পাঠকের কাছে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। ১৯৬৯ সালে প্রকাশ পায় সেলিনা হোসেনের প্রথম গল্পগ্রন্থ 'উৎস থেকে নিরন্তর' এবং প্রথম উপন্যাস 'জলোচ্ছ্বাস' প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭২ সালে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস 'গায়ত্রী সন্ধ্যা'র মধ্য দিয়ে সেলিনা হোসেন পাঠক হৃদয়ে হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেন। মুক্তিযুদ্ধ তার লেখার অন্যতম ক্ষেত্র। হাঙর নদী গ্রেনেড, যুদ্ধ, গেরিলা ও বীরাঙ্গনা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অন্যতম উপন্যাস। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন আগস্টের এক রাত ও সাতই মার্চের বিকেল। প্রায় অর্ধশত উপন্যাস ১৫টি গল্পগ্রন্থ ও ১৫টি প্রবন্ধের বই তিনি রচনা করেছেন। পেয়েছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। জন্মদিনকে সামনে রেখে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম আবেদ

- আর মাত্র কয়েকদিন পরেই ৭৫-এ পা রাখছেন। লেখক হিসেবেও কেটে গেছে ৫৭ বছর। আপনার লেখনী বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। এই যে লেখক হয়ে ওঠা এর প্রস্তুতি পর্বটা জানতে চাই।

-- প্রস্তুতি পর্ব বলতে, আমি লেখক হওয়ার জন্য এতো-এতো লেখাপড়া করে লিখতে শুরু করেছি- বিষয়টা তেমন না। বরং বলতে পারি আমার একটা অসাধারণ শৈশব-কৈশোর কেটেছে করতোয়া নদীর পাড়ে। চাকরি সূত্রে আমরা তখন বগুড়ায় থাকতাম। সেখানে অসাধারণ প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়েছি, নদী, মাঠ, গাছ, আম পাড়া, জাম পাড়া ইত্যাদি। আমরা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কগুলো দেখেছি। তাদের অনেক কথা, ঘটনা, নীতি, নৈকিতা ও মূল্যবোধের অনেক স্মৃতি আমার মধ্যে সঞ্চিত ছিল। সেই স্মৃতি থেকেই এক সময় লেখার তাড়না অনুভব করতে শুরু করলাম। শুরু করলাম লেখা।

- যদি ভুল না করি, আপনার লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে। সেখান থেকে কথা সাহিত্যিক হয়ে উঠলেন কীভাবে?

-- হ্যাঁ এটা ঠিক আমার লেখালেখি শুরু কবিতা দিয়ে। সেটা মেট্রিক পরীক্ষার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। অসংখ্য কবিতা লিখে লিখে ডায়েরিটা বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখতাম। কাউকে দেখাতাম না। পরে ১৯৬৫ সালে আমি যখন রাজশাহী মহিলা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি তখন বিভাগীয় কমিশনার পুরো বিভাগের সব কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একটা গল্প লেখা প্রতিযোগিতা করেছিলেন। সেখানে আমি অংশ নিই এবং আমার লেখা গল্পটা প্রথম হয়। এরপর ১৯৬৫ সালে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন থেকে আমি পুরো মাত্রায় লেখক হয়ে উঠলাম এবং লিখতে গিয়ে দেখলাম আমার যে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতির সঞ্চয় কবিতাতে তার যথাযথ প্রকাশ ঘটাতে পারব না। আমার গদ্য দরকার। ক্যানভাসটা একটু বড় দরকার তাই কবিতা থেকে গল্প লেখা শুরু করি। পরবর্তী সময়ে পরিসর আরও বড় করে উপন্যাসে চলে যাই।

-মূলত বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আপনার লেখালেখি শুরু। সেই সময়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গেও বেশ ভালোভাবেই যুক্ত ছিলেন। সেটা কি আপনার লেখায় সহায়ক হয়েছিল?

--বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ছাত্র রাজনীতিতে ও যুক্ত হয়ে পড়ি। ছাত্র ইউনিয়ন তখন দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে মেনন গ্রুপ, অন্যটি মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে মতিয়া গ্রুপ। আমি মতিয়া গ্রুপের সঙ্গে ছিলাম। এই যুক্তটা আমার লেখক সত্তায় কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি বরং সহায়ক হয়েছে। ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়ে আমার পরিচয় ঘটে মার্কস-অ্যাঙ্গেলসের সঙ্গে। তাদের লেখা পড়ে সমাজটাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে শিখি। বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সময় পথের ধারে আশ্রয় নেওয়া শিশুসহ মা আমার ভাবনায় নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করে। আমি সমাজের বঞ্চনা, শোষণ, নির্যাতন আরও গভীর থেকে বিশ্নেষণ করতে শিখি। আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো ভিন্নমাত্রা নিয়ে প্রকাশ পেতে থাকে। আমার গল্প ও উপন্যাসে। সাম্যবাদ আমাকে আকৃষ্ট করে। সমাজের নিপীড়িত নির্যাতিতদের পক্ষে আমার লেখা দাঁড়িয়ে যায় এবং অনিবার্যভাবে পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেও অবহেলিত নারী নেতৃত্ব, সংগ্রাম আমার লেখায় উঠে এসেছে।

-একজন লেখক হিসেবে আমদের সমাজ বা রাষ্ট্রের গভীর পর্যবেক্ষকও আপনি। সেই জায়গা থেকে নারী স্বাধীনতা, নারীর অবদান, ক্ষমতায়ন, নেতৃত্ব প্রভৃতি আপনার লেখায় তুলে ধরার প্রয়াস সব সময়ই লক্ষ্য করা যায়। আপনার কি কখনও মনে হয়েছে এদেশে ষাট, সত্তর বা আশির দশকের নারী আর বর্তমান সময়ের নারীর মধ্যে ভাবনাগত পরিবর্তন এসেছে?

--পরিবর্তন তো নিশ্চয় এসেছে। সেই সময়ের খুব কম নারীই নিজের গণ্ডির বাইরে কিছু ভাবতে পেরেছে। এখন সেটা ভাবছে এবং করে দেখাচ্ছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। তারা এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখছে। তবে, এর বাইরে ভিন্ন একটা স্রোতও লক্ষণীয়। ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যে আধুনিক ভাবনার নারীকে দেখেছি এই একবিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে এসে তারা যেন ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের মধ্যে হিজাবের প্রচলন দেখতে পাই। অনেকে এটাকে ফ্যাশন বলে উড়িয়ে দিতে চান; কিন্তু এর গভীরে আমাদের সংস্কৃতির বাইরের ভিন্ন একটা স্রোত যে বইছে সেটা স্পষ্টতই ধরা পড়ে। এটা খুব সুখকর নয়।

-আপনি বলেছেন আপনার স্মৃতি থেকে অভিজ্ঞতা থেকেই গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। আপনার লেখা এমন কোনো গল্প বা উপন্যাস আছে যেখানে আপনি নিজেই উপস্থিত?

--ঠিক সেভাবে লেখা হয়নি, যেখানে আমি নিজে উপস্থিত। তবে, অভিজ্ঞতা থেকে যখন লেখি তখন কিছু কিছু বিষয় তো এসেই যায়। যেমন, আমার ছোটবেলায় করতোয়া নদীর খেয়াঘাটে বাড়ূয়া মাঝিকে যেভাবে দেখেছি; আমরা যে বলতাম- কাকু আমাদের পার করে দেন তো। তখন তিনি বড়দের বাদ দিয়ে আমাদের পার করে দিতেন। তখন বড়রা তাকে বকাবকি করত, হ্যাঁ, ওরা তোকে পয়সা দেবে না তবু ওদেরকেই আগে পার করবি। তখন কাকু বলত, ওরা তো আমার ভবিষ্যৎ ওদের জন্য তো করবোই। ওদেরকে আমি গাছ চেনাবো, ফুল চেনাবো, মাটি চেনাবো। তখন তো এসব ভাবিনি, এখন দেখি তিনি তো একজন শিক্ষকের মতো কাজ করেছেন। তিনিতো মহান একজন শিক্ষক। একবার তাদের বাড়িতে আগুন লাগলে আমরা গিয়ে দেখি, তার ছোটখাটো বউটি আগুন লাগা ঘরের এক কোণ থেকে চালের এটা বস্তা টেনে বের করছেন। আমরা যে নারীশক্তির কথা বলি, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, এটাই সেটা। সে সাহস করে আগুনের মধ্যে থেকে চালের বস্তাটা নিয়ে চলে এসেছেন।

-আপনার লেখার অন্যতম অনুষঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ। অনেক উপন্যাস-গল্পে সে ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও কাজ করার পরিকল্পনা আছে কি?

--মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়। এ যুদ্ধ আমাদের অস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে এবং অনেক মূল্যবোধের দ্রুত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ আমার কাছে শুধুই চেতন-অবচেতনের ব্যাপার নয়। এটি একটি প্রত্যক্ষ সত্য। তাই মুক্তিযুদ্ধে প্রাধান্য আমার কাছে যুক্তি এবং আবেগের- এখানে দ্বিমতের অবকাশ নেই।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার লেখাগুলোর মধ্যে 'হাঙর নদী গ্রেনেড' সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে উপন্যাসটি। সিনেমাও নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে অনেকের মধ্যেই উপন্যাসটি পৌঁছেছে। তবে, 'যুদ্ধ' কম আলোচিত হলেও আমি মনে করি এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধের ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে। উপন্যাসে তারামন বিবির জীবনের কাহিনি ও মুক্তিযুদ্ধ, তার তালাক প্রাপ্তি, স্বামী থেকে বিচ্ছেদ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রতীকী কাহিনি। তালাকের পরে পিতার সঙ্গে কাপড় উড়িয়ে উৎফুল্ল হয়ে তার রৌমারী যাবার দৃশ্যটিতে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথাই তুলে ধরেছি। এ উপন্যাসে কেবল হানাদার পাকিস্তানিদের ট্রেন কিলিংয়ের নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতার চিত্রই তুলে ধরা হয়নি, বাঙালির প্রতিরোধ ও সংগ্রামের চিত্রও আছে। উপন্যাসের একটি ব্যতিক্রমী চরিত্র 'লোকটি' এমনভাবে তৈরি করেছি যে সমস্ত দেশে ঘুরে বেড়ায়। সব জায়গায় তার বিচরণ। সে সব কিছুই দেখছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, তাদের সাহস জোগাচ্ছে, দেশের মধ্যে বিচরণ করে স্বাধীনতার স্বপ্ন নির্মাণ করছে সে। তবে উপন্যাসের শেষে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মাখনকে উদ্দেশ করে পাকিস্তানিদের দ্বারা ধর্ষিত ও গর্ভবতী বেনুর উচ্চারণই আমার মুখ্য প্রতিপাদ- ভালো কইরে দেখো হামাক। তুমিই দিছো পা। হামি দিছি জরায়ু। তোমার পায়ের ঘা শুকায়ে গেছে। কয়দিন পর হামারও জরায়ুর ঘাও শুকায়ে যাবে। আমি ভালো হয়ে যাবো।

খুব বড় নয়, ছোট পরিসরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ২০১৪ সালে একটি উপন্যাস লিখি 'গেরিলা ও বীরাঙ্গনা'। বীরাঙ্গনা নারীর অবহেলিত, বঞ্চিত জীবনের কথা আছে এখানে। গেরিলাদের নারীরা কীভাবে সহযোগিতা দিয়েছিল আছে তার কথাও।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করার অবকাশ এখনও আছে। মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক বিষয় পাওয়া যায় এমন উপন্যাস এখনও লেখা হয়নি। আমাদের আগামী প্রজন্ম নিশ্চয় সেই শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটি লিখবে।

-এখন কী লিখছেন?

--এই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা ছোট গল্পের বইয়ে হাত দিয়েছি। ১৫টি গল্প লিখে ফেলেছি। এই গল্পগুলোর মধ্যে তিনি জেলখানায় কী করতেন, টুঙ্গিপাড়ায় কী করতেন- এসব বিষয় উঠে এসেছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্পগুলো লিখছি। আরও কয়েকটা লেখার পরিকল্পনা আছে। বইটার নাম দিব 'গল্পের ছায়ায় বঙ্গবন্ধু'। এছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের নিয়ে আরেকটা কাজ করছি। শরণার্থীরা কীভাবে ভারতে যাচ্ছে এবং ওখানে কীভাবে দিন যাপন করছে- এসব বিষয় আসবে। যাওয়ার পথ হিসেবে আমি যশোর রোডটাকেই বেছে নিয়েছি। তাছাড়া, আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কী কী হয়েছিল সেসব বিষয়ও আসবে। বইটার নাম আপাতত ভেবেছি, 'শরনার্থীর সুবর্ণরেখা'। তবে, শেষ পর্যন্ত থাকবে কিনা ঠিক নেই।

- আপনাকে পঁচাত্তরতম জন্মদিনের অগ্রিম শুভেচ্ছা।

--তোমাকেও শুভেচ্ছা, ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন