- ব্যক্তিগত জীবনে কোন বিশেষ ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

--পিতার অকালমৃত্যু, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। পিতাকে ভালো করে জানার সুযোগও পাইনি। তিনি পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, সেইসঙ্গে নাটক-সংগীত-সংস্কৃতিচর্চা খেলাধুলা ইত্যাদি নানামুখী কাজে ভূমিকা পালন করেছেন। ক্রমে পরতে পরতে আমি সেসব জানছি আর শিহরিত হচ্ছি। পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকায় যখন কাঠের গ্যালারির বদলে স্থায়ী স্টেডিয়াম নির্মাণ শুরু হলো, তখন তিনি ছিলেন স্পোর্টস ফেডারেশনের নির্বাচিত মহাসচিব। ড্রামা সার্কেলের মুশফিকুস সালেহীন ও কাফি খানের সঙ্গে ছিল তাঁর সখ্য। ভাষা আন্দোলনের পর সলিমুল্লাহ হলে পুলিশি অভিযানে তিনি শরিক ছিলেন, তবে জব্দকৃত কাগজপত্র থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন মাহবুবুল আলম চৌধুরীর লেখা কবিতা, 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি'। তাঁর কল্যাণেই এই কবিতা রক্ষা পায়।

একেবারে যৌবনে সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল নোয়াখালীতে শান্তি পদযাত্রায় মহাত্মা গান্ধীর নিরাপত্তা প্রদান। গান্ধীজির গ্রাম পরিক্রমণে তিনি ছিলেন সাথি। আমার জন্মের আগের এসব ঘটনা আবার আমাকে আলোড়িত করল যখন আমি নিজে, পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে, নোয়াখালীতে জয়াগ গান্ধী আশ্রমে যাই, আশ্রমিক ঝর্ণাধারা চৌধুরীর স্নেহ লাভ করি, তখন মনে হলো পিতার পদচ্ছাপ ধরে আমি চলেছি।

- আত্মপ্রকাশ লগ্নে কোনো প্রতিবন্ধকতার কথা মনে পড়ে?

-- মূল প্রতিবন্ধকতা আমার নিজের কাছ থেকে। বাংলা-ইংরেজি সাহিত্যপাঠ থেকে মানসম্পন্ন চিন্তাশীল গদ্য সম্পর্কে ধারণা আমার রয়েছে। তাই নিজের লেখালেখির মূল্য সম্পর্কে আমি এখনও দ্বিধান্বিত, ফলে বই প্রকাশ নিয়ে কুণ্ঠিত রই। প্রথম বই প্রকাশ পায় ১৯৮৫ সালে, 'মনোজগতে উপনিবেশ : তথ্য সাম্রাজ্যবাদের ইতিবৃত্ত'। বইটি সমাদৃত হয়েছিল। সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপকারী বিবেচিত হয়েছিল, দুই বছরে নতুন সংস্করণ বের হয়। অনেক খেটেখুটে তথ্য-সংগ্রহ করে লিখেছিলাম। তারপর চাহিদা থাকে সত্ত্বেও পুনর্মুদ্রণ করতে আগ্রহী হইনি, পুনর্মাজন করার মতো সময় পাইনি কিংবা হতে পারে আমার আলস্য অথবা অনাগ্রহ এজন্য দায়ী।

পরের বই প্রকাশ পায় ২০০৩ সালে, কাইয়ুম চৌধুরী বিষয়ে দ্বিভাষিক এই গ্রন্থ রচনার দায়িত্ব দিয়েছিল শিল্পকলা একাডেমি।

- কোন বই বার বার পড়েন? কেন?

-- কিছু বই আছে সবসময়ে পড়া যায়, যখন খুশি যে কোনো পাতা খুলে পড়া যায়, সেই পড়ার মধ্য দিয়ে অনেক কিছু পাওয়া যায়। তেমন দুই প্রিয় বই হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের 'কথা সামান্যই', অন্যটি হাস্যরসাত্মক কিন্তু চিন্তা উদ্রেককারী 'ডেভিলস ডিকশনারি', অ্যামব্রোস বিয়ের্সের এই বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৬ সালে।

-এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

--খই ভাজছি এবং নানারকম ধামায় নানা স্বাদের খই তুলে দিচ্ছি, যদি কারও দেহমনের ক্ষুধা মেটে।

-ব্যক্তিজীবনের এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি যা আপনাকে কষ্ট দেয়?

-- সব মানুষই তো সীমাবদ্ধ, তবে যখন বর্ষা রাতে শুনি গান, 'দেহের সীমা দিল ঘুচায়ে', তখন মন আনচান করে ওঠে, মনে হয় 'হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোনোখানে'। সীমানা পেরোবার এই তাগিদ আর পেরোতে না পারার কষ্ট আর আনন্দ নিয়েই তো জীবন।

-আপনার চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

--আমার মানুষি দুর্বলতা, যা আমি বুঝি।

- নিজের সম্পর্কে বেশি শোনা অভিযোগ কোনটি?

-- অপরেই ভালো বলতে পারবেন। আমি অভিযোগ শুনতে আগ্রহী, নিজেকে শোধরাবার জন্য, তবে যত অভিযোগ থাকুক, আমার অনেক কিছু সংশোধনের অযোগ্য।

- নিজের সম্পর্কে প্রিয়জনের কাছ থেকে বেশি শোনা প্রশংসাবাক্য কোনটি?

-- আমি যা নই, আমাকে তা বানিয়ে তোলা। এসব বুঝি বলেই খুব গা করি না।

- কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?

-- বিশেষ কিছু হতে চাইনি, চেয়েছিলাম শিক্ষকতা করতে এবং মধ্যবর্তী থাকতে, মিছিলের আগে নেতৃভূমিকায় নয়, আবার পিছিয়ে পড়ার দলেও নয়। প্রথমটি হয়ে ওঠেনি, দ্বিতীয়টি পালন থেকে বিরত হইনি। সচেতন ও সফলভাবে এই কাজ করতে পেরেছি বলে মনে হয়, যদিও ক্রমে আমাদের দশা হচ্ছে- নাই দেশে ভেরেন্ডা বৃক্ষের মতো।

- আপনার প্রিয় উদ্ৃব্দতি কোনটি?

-- কার্ল মার্কস বিষয়ক পাণ্ডিত্য আমার নেই, সেই দাবিদারদের কাছ থেকে দূরত্ব রাখতে চেষ্টা করি। আমার মনে দাগ কেটেছে মার্কসের প্রিয় এক উদ্ৃব্দতি : 'সবকিছু সন্দেহ দিয়ে পরখ করা।' কথাটা মার্কসবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

- জীবনকে কেমন মনে হয়?

-- আমার ক্ষেত্রে মধুময় এই পৃথিবীর ধূলি, কেননা যা আমার প্রাপ্য নয়, জীবন আমাকে তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছে।

মন্তব্য করুন