খোয়াবনামা বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি বিখ্যাত উপন্যাস। এটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশনী থেকে। একই বছরের এপ্রিলে বইটি বেরোয় পশ্চিমবঙ্গের নয়া উদ্যোগ প্রকাশনী থেকে।

দুটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন এই নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনাসম্ভার। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ণ কৌতুকবোধ তার রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা। তাকে সমাজবাস্তবতার অনন্যসাধারণ রূপকার বলা হয়েছে। তিনি জীবনকালেই বাংলা সাহিত্যে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। জীবনোপলব্ধির সততা, সমাজ বাস্তবতা ও মৃত্তিকালগ্ন জীবনচেতনায় সমৃদ্ধ ঔপন্যাসিক ইলিয়াস কথাসাহিত্যেই বিচরণ করেছেন আমৃত্যু।

খোয়াবনামা উপন্যাসের কাহিনির পটভূমি তমিজের পাঁচ পুরুষ আগের। তমিজের পাঁচ পুরুষের আগের প্রজন্ম ঘন জঙ্গল সাফ করে মাটি ফেলা ভিটায় বাস করে বাঘার মাঝি। কাৎলাহার বিলের সাফ করা জঙ্গলে সোভন ধুমা চাষাবাদ শুরু করে বাঘের ঘাড়ে লাঙল চাপিয়ে। কোনো এক বিকেলবেলা মজনুশাহের অগণিত ফকিরের সঙ্গে মহাস্থানগড়ের দিকে যাওয়ার সময় করতোয়ার বাঁদিকে মুনশি বয়তুল্লাহ শাহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেপাই টেলরের গুলিতে মারা যায়। কাৎলাহার বিলের দু-ধারের মানুষের বিশ্বাস, বিলের উত্তরে পাকুড়গাছে আসন নিয়ে রাতভর বিল শাসন করে মুনশি। অন্ধবিশ্বাসে বিলের দু-ধারের মানুষ জানে দিনের বেলা সেই অশরীরী মুনশি রোদের মধ্যে রোদ হয়ে ছড়িয়ে থাকে আর রাতভর পাকুড়গাছের মাথায় বসে বিল শাসন করে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাকুড়গাছটাও কাটা পড়ে, ইটখোলা প্রতিষ্ঠিত হয়, বনজঙ্গল পরিস্কার করে মানুষ জনবসতি গড়ে তোলে। একসময় কাৎলাহার বিল শুকিয়ে যায়। শুকনো জমিতে মানুষ চাষাবাদ করে, আবাদি জমির ধার ঘেঁষে মানুষ বাড়িঘর তোলে। বিলের মালিকানা জমিদারের হাতে চলে যাওয়ার পর জেলেপাড়ার ৫/৬ ভাগ মানুষই চাষা হয়ে যায়। অয়েল মিল স্থাপিত হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ কলুরা চলে যায় পুবদিকে যমুনার তীরে, নিজ পেশা বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিয়ে হয়ে যায় চাষা। বিলের মালিকানা জমিদারের হাতে চলে গেলে চাষি জমি হারিয়ে মাঝিরা বিলের মাছ ধরা থেকে বঞ্চিত হয়ে কামলা খাটে। আকালে একশ্রেণির মানুষের কৌশলী কারসাজিতে কামারদের জমির মালিকানা হস্তান্তর হয়। সামন্ত প্রভুদের যোগসাজশে গ্রামে শরাফত মণ্ডল প্রভূত জমাজমির মালিক হয়ে যায়। গিরিরডাঙ্গা, গোলাবাড়ির হাটের মানুষেরা মহাজনি সুদের টাকা গুনতেই জীবন শেষ করেছে। জমি বর্গা নিতে তাদের অনেক কৌশল করতে হয়। আবদুল কাদের পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে কাজ করতে হিন্দুদের বিপক্ষে জনগণকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে এবং মুসলিম লীগের পতাকাতলে গ্রামের মানুষকে জমায়েত হতে বলে। সে বিশ্বাস করে হিন্দু জমিদার আর হিন্দু মহাজনের হাত থেকে বাঁচার জন্যই মুসলিম লীগের পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ। কাদেরের ধারণার মধ্যে পাকিস্তানপন্থিদের মতামত বোঝা যায়- 'হিন্দু মুসলমান চাষার রক্ত চুষে শেষ করে ফেলল। হিন্দু জমিদার ফুটানি মারে মুসলমান প্রজার রক্ত চুষে। পাকিস্তান না হলে মুসলমানের জানমাল-ইজ্জত সব বিপন্ন।' পাকিস্তানের স্বার্থেই আবদুল কাদের মাঝি আর কৃষকদের মধ্যে পার্থক্য তুলে দিতে চায়। 

জিন্নাহ টুপি মাথায় দিয়ে কাদের ও তার লোকজন হিন্দু নায়েবের সমীহ আদায় করতে চায়। তেভাগা আন্দোলন ঠেকাতে জোতদাররা পুলিশের সঙ্গে আপস করে চলে। এর কাহিনি বিস্তৃতিলাভ করেছে বগুড়া জেলার একটি ক্ষুদ্রাকার ও প্রত্যন্ত জনপদে। অঞ্চলটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিল, যার নাম কাৎলাহার; এবং কাৎলাহার ঘিরে গড়ে উঠেছে গিরিরডাঙা, নিজগিরির ডাঙা, গোলাবাড়ি হাট ইত্যাদি পল্লিগুলো। এসব জনপদে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বিষয়ক বিভিণ্ণ শ্রুতি বা লোককথা, জোতদারি সমাজব্যবস্থা, তেভাগা আন্দোলন, দেশভাগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও সংকট প্রবৃত্তি এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। কাহিনির প্রয়োজনে এতে আরও যুক্ত হয় সাধারণ গ্রাম্য মানুষের অসহায়ত্ত, কাম, ক্ষোভ, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ, এমনকি অজাচার। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসে মিথের সফল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে মিথ দিয়ে। প্রথম পরিচ্ছেদে আমরা পাচ্ছি অতীত ইতিহাসের নানা ঘটনা ও লোকবিশ্বাস। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ সাহিত্যে লোকবিশ্বাস ও মিথের ব্যবহার এসেছে, কিন্তু ইলিয়াসের মতো মিথের ব্যবহার বাংলা সাহিত্যে বিরল।

প্রশ্ন

১. খোয়াবনামা উপন্যাসটির জন্য লেখক কয়টি পুরস্কার পেয়েছিলেন?
 ২. আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কর্মজীবন শুরু হয় কীভাবে?
 ৩. খোয়াবনামা উপন্যাসটি মূলত কোন সময়কাল নিয়ে রচিত?\হ\হকুইজ ১৭-এর উত্তর

১. ১৮৭৮ সালে

২. সংবাদ প্রভাকর

৩. দুর্গেশনন্দিনী

কুইজ ১৭-এর জয়ী

গোলাম মাওলা
জয়দেবপুর,গাজীপুর।

মোঃ ইলল্গীন জামান
৫৭১ ঘোপ সেন্ট্রাল রোড, যশোর সদর, যশোর।

বায়তুল রাব্বি শুভ
নুরালাপুর, হোমনা, কুমিল্লা

নিয়ম

পাঠক কুইজে অংশ নিতে আপনার উত্তর পাঠিয়ে দিন ১৩ জুলাই মঙ্গলবারের মধ্যে কালের খেয়ার ঠিকানায়। পরবর্তী কুইজে প্রথম তিন বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে। বিজয়ীর ঠিকানায় পৌঁছে যাবে পুরস্কার।

মন্তব্য করুন