স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। একদিকে বঙ্গবন্ধু যেমন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে পথনির্দেশ করেছেন, অন্যদিকে মানিক মিয়া দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, '৬২-এর ছাত্র ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, '৬৫-এর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, '৬৬-এর ছয় দফা ও স্বায়ত্তশাসন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে লেখনীর দ্বারা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি রাজনীতিবিদ না হলেও আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ। বঙ্গবন্ধু তাকে 'মানিক ভাই' বলে সম্বোধন করতেন। তার পরামর্শ বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত গুরুত্বসহ গ্রহণ করতেন। তার মত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সেই সম্পর্ক ছিল অটুট।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের পারস্পরিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে যথার্থ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তুলে এনেছেন ড. সুনীল কান্তি দে। ফেব্রুয়ারি ২০২১-এ প্রকাশিত তার 'বঙ্গবন্ধু-মানিক মিয়া সম্পর্ক' বইটিতে যেমন তাদের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে, তেমনি স্থান পেয়েছে তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস। বইটিতে স্থান পেয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামে বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়ার মধ্যকার রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা। বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়ার সম্পর্ককে বইটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে সরকারি গোপন দলিলপত্র, সাময়িক পত্রপত্রিকা, স্মৃতিকথা, কারাগারের ডায়েরি, প্রকাশিত নানা লেখা ও গ্রন্থ থেকে।

'১৯৪৩ সন। মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসভবনে কলকাতায় তাঁর সাথে আমার পরিচয়। একই নেতার দুই শিষ্য, যেন একটি পিতার দুই সন্তান। বিগত পঁচিশ বছরের মধ্যে কোনোদিনই আমরা বিচ্ছিন্ন হইনি, কোনো ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভেদ টানতে পারেনি... কোনো ষড়যন্ত্র, কান কথা, নিন্দাবাক্য সেখান থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিতে পারেনি। আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল আবেগ মিশ্রিত, হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির রসে সিক্ত। মানিক ভাইয়ের কথা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারব না।' মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর তার স্মরণে বঙ্গবন্ধুর লেখা এ কথাগুলো বাঙালি জাতীয়বাদের চেতনা বিকাশে অবতীর্ণ দুই অবিস্মরণীয় এই দুই ব্যক্তিত্বের গভীরতম সম্পর্কের সামান্য প্রকাশমাত্র। এমনই অজস্র উপাদান উঠে এসেছে ড. মিলন কান্তি দের আন্তরিক গবেষণায়।\হবাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও রাজনীতি ছাপিয়ে দু'জনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। স্বাধীনতার সংগ্রামে মানিক মিয়ার অবদান মূল্যায়ন করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, 'স্বাধীনতা সংগ্রামে মানিক ভাইয়ের অবদানের কাহিনি অনেকেরই অজানা। পক্ষান্তরে আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাইর প্রভাব যে কত গভীর তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়।'\হজেলে থাকাকালীনও বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়ার সঙ্গে পত্রযোগে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। যার প্রমাণ হিসেবে লেখক বইয়ে ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্ট থেকে পাওয়া মানিক মিয়াকে লেখা কয়েকটি চিঠি হুবহু তুলে ধরেছেন। যেখানে বঙ্গবন্ধু পারিবারিক, রাজনৈতিক সামাজিক বিষয়সহ একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে মানিক মিয়াকে অবহিত করেন। মানিক মিয়াও বিভিন্ন সময়ে পত্রযোগে তার খোঁজখবর ও পরামর্শ দিতেন।\হ১৯৫২ সালের ৩০ মে পূর্ব পকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ইংরেজিতে দেওয়া প্রেস কনফারেন্স হুবহু তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে- যাতে বাংলা ভাষা, কাশ্মীর সমস্যা ও সাধারণ নির্বাচনসহ অনেক বিষয়ের অবতারণা রয়েছে। মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর 'আমাদের মানিক ভাই' শিরোনামে মানিক মিয়াকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর লেখাটি সন্নিবেশিত হয়েছে। 'গভীর রাত। পিন্ডি থেকে টেলিফোনে খবর পেলাম, মানিক ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। মনে হলো চারদিকে যেন ভয়ানক ফিকা, শূন্য, একেবারেই অন্ধকার। দাউদাউ করে জ্বলছিল যেন এক মশাল, প্রজ্বলিত অগ্নিশিখায় চারপাশ ঝলমল, নাট্যশালার মহাসমারোহ; সব থেমে গেল। এ যেন মুহূর্তের অনুভূতি। একটি সংবাদ, একটি বার্তা, মাত্র একটি ঘটনা যে কত বড় হৃদয়বিদারক হতে পারে, কত বেশি মর্মান্তিক হতে পারে, তারই প্রমাণ।' লেখার শুরুও এ কয়েকটি বাক্য থেকেই অনুমেয় মানিক মিয়ার চলে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে কতটা বেদনা ও শূন্যতার তৈরি করেছিল। 'আমার মানিক ভাই' শিরোনামেও আরেকটি লেখা রয়েছে এতে। এছাড়া 'আমার মানিক ভাই' শিরোনামে আরেকটি লেখায় বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়ার সংগ্রামী জীবন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-ত্যাগসহ দেশের প্রতি তার ভালোবাসার বিষয়টি তুলে ধরেন।\হ১৯৬৮ সালের ১৯ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কিন্তু প্রায় এক মাস হাসপাতাল থেকে ফিরে ডাক্তারের পরামর্শে বাসায় বিশ্রামে থাকায় সশরীরে যোগ দিতে না পারলেও উদ্বোধনী ভাষণ লিখে পাঠান। যে ভাষণের পুরো অংশই যুক্ত করা হয়েছে বইটির পরিশিষ্ট-৫-এ। সচিত্র প্রতিবেদনের মতো বইয়ের শেষে সংযোজন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মানিক মিয়ার কিছু দুর্লভ ছবি। বইটি পড়ার পর এই ছবিগুলো দেখে পাঠকের চোখে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মানিক মিয়ার সম্পর্কের পুরো চিত্রই ফুটে উঠবে।

মন্তব্য করুন