ছুটির দিনে এ রকম একটা উদ্ভট ফোন আর উদ্ভট দায়িত্ব পেয়ে মেজাজটাই বিগড়ে গেল। শুক্রবার সকাল, তাই দেরি করে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম, ছুটির দিনের সবচেয়ে বড়ো মজাও হয়তো এটাই, কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ পারলাম না, এর মধ্যেই রান্নাঘর থেকে পরোটা আর গরুর গোশতের ভুর ভুর করে ঘ্রাণ আসা শুরু হলো। স্ত্রীর ওপর কিছুটা বিরক্তই হলাম, জীবনে শান্তিতে একটু ঘুমানোও সম্ভব না, এত সকাল সকাল কী দরকার ছিল। পরক্ষণেই মনে পড়ল আগের রাতে আমিই তাকে বলেছিলাম সকালে উঠেই পরোটা আর গরুর গোশতের ভুনা করতে, খেয়ে ছেলেকে পড়া দেখাতে বসব, আমার ব্যস্ততার কারণে তার পড়াশোনা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। যাহ্‌, তাহলে রাগটাও করতে পারলাম না নিজের ইচ্ছামতো! রাগ করতে না পারার সব রাগ ক্রমাগত ফুলে উঠতে লাগল আমার ভেতর। এখন সেটা ফেলব কোথায়? কোথায় ফেলব সেটা ভাবতে ভাবতেই অফিস থেকে ফোনটা এলো। এক উদ্ভট লোক ধরা পড়েছে কাল রাতে পুলিশের হাত্তেমাথা খারাপ কিংবা পাগল কিংবা কোনো গোপন চক্রান্তকারী। যেটাই হোক না কেন, সে কোনো সাধারণ ক্রিমিনাল নয় আর শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য বেশ হুমকিস্বরূপ। মিডিয়াকে জানানো হয়নি এখনও, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও না। পুলিশ নিজেও বুঝতে পারছে না কী করবে, তাই এই অঞ্চলের প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে আমাকেই গিয়ে ব্যাপারটা দেখে ভালোমতো বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফোন রেখে খুব বাজে একটা গালি দিয়ে কম্বল ছুড়ে মেরে বিছানা থেকে উঠলাম। উঠে কম্বলের ওপর আরেকটা লাথি দিয়ে আরেকবার গালিটা দিলাম। বাথরুমে যেতে যেতে আরেকবার, বাথরুমের দরজা লাগিয়ে আরও একবার দিলাম সেই গালিটা।

জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে পরোটা দিয়ে ভুনা গোশত খেতে খেতে মাথাটা কিছুটা ঠান্ডা হলো। বা ঠান্ডা হতে বাধ্য হলো। কারণ আর কোথাও জায়গা না পেয়ে রাগটা ততক্ষণে আমি নিজের ওপরেই ফেলেছি। আমিই তো নিজেকে এতকিছুর সাথে জড়িয়ে নিয়েছি। আর এতকিছুকেও জড়াতে দিয়েছি নিজের সাথে। মানুষের সেবা করব, দেশের সেবা করব, সন্তানকেও নিজের আদর্শে গড়ে তুলব। তা এতকিছু করতে গেলে তো এমনই হব্তেস্ত্রীসঙ্গম মাঝপথে রেখে মাঝরাতে দৌড়াতে হবে বনে-বাদাড়ে। তাই শান্তভাবেই সব মেনে নিলাম। নাশতা শেষে স্ত্রীকে গরুর গোশতটা দারুণ হয়েছে বলে গাল টিপে দিয়ে বের হয়ে এলাম।\হসেই উদ্ভট আসামি থানা হেফাজতেই আছে। তাই সেখানেই চললাম। গিয়ে যেটা শুনলাম তাতে আমারও চক্ষু চড়কগাছ। আসামি নাকি নিজেকে মনে করেন এক মহান আদর্শের সৈনিক, এক মহান সামাজিক বিপ্লবের কর্ণধার, পৃথিবীর ইতিহাসে যুগান্তকারী এক অধ্যায়ের সূচনাকারী এবং মানবতার মুক্তির কাণ্ডারি ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং এই সবকিছুই করছেন তিনি এক মহান সংঘ প্রতিষ্ঠা করে যে সংঘের নাম 'আত্মহত্যা সংঘ'! মানুষকে আত্মহত্যায় সহায়তা করাই তার সংঘের কাজ!

একটা বড়ো ঘরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে এই মহান বিপ্লবী সমাজসেবককে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আমি তার সামনে রাখা খালি চেয়ারটায় বসলাম। পুলিশ বিভাগের কর্তাও আমার পাশে আরেকটা খালি চেয়ারে বসলেন। তিনি আমাকে বললেন তার গোয়েন্দা দল বেশ কিছুদিন ধরেই গোপন সংবাদ পেয়ে এর ওপর নজর রাখছিল। অবশেষে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামি নিজেই সবকিছু স্বীকার করেছে এবং পুলিশ জানে না এমন অনেক কিছুও সে নিজে থেকেই বলেছে। তার ভাষ্যমতে তার সংঘের সদস্যসংখ্যা ইতিমধ্যেই একশ পেরিয়েছে। তাদের সবার মধ্যেই আত্মহত্যার ইচ্ছা মৃদু বা প্রবলভাবে বিদ্যমান। হয়তো এতদিন তাদের আত্মঘাতী ভাবনাগুলো কারও সাথে বিনিময় করতে না পেরে কিংবা উপযুক্ত পরামর্শদাতার অভাবে তারা ঠিক উৎসাহ পাচ্ছিল না; সঠিক পরিচর্যা কিংবা অভিভাবকত্ব পেলে তারা হয়তো অচিরেই জীবননাশের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। এ রকম মানুষদের খুঁজে বের করা এবং তাদের নিয়মিত সহায়তা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে আত্মহননের পথে এগিয়ে দেওয়া্তএই সবকিছুই তার সংঘের কাজ। তার সংঘের সদস্যরা গোপনে নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যায়। কারও সাথে কথা বলে তার জীবন নিয়ে গভীর হতাশাবোধ আছে এবং জীবননাশের কথা সে ভাবছে এমন সামান্যতম ইঙ্গিত পেলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে দলে ভেড়ানোর জন্য। এরপর দলে ভেড়াতে পারলে তার আত্মহত্যার মৃদু, মাঝারি বা জোরালো চিন্তাকে তিলে তিলে বাড়িয়ে সেটাকে বিস্টেম্ফারণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তারা। আর সদস্যদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছড়ানো হয়েছে যে, তারা যত বেশি সদস্য সংগ্রহ করতে পারবে এবং যত বেশি সদস্যকে আত্মহত্যায় অনুপ্রাণিত করতে পারবে তাদের নিজেদের জীবন ও আত্মহত্যাও ততই অর্থপূর্ণ ও মহৎ হবে। ইতিমধ্যেই আত্মহত্যা সংঘের উদ্যোগে এর আটজন সদস্য আত্মহননের পথে বেছে নিয়েছেন এবং আরও বেশ কজন খুব শীঘ্রই সে পথে যাবেন। বাকিদেরও যথাযথ পরিচর্যা চলছে।

আমি যখন অবিশ্বাস নিয়ে এসব শুনে যাচ্ছিলাম তখন আমার সামনে বসা আত্মহত্যা সংঘের কর্ণধার মুখে মৃদু হাসি নিয়ে আমাদের কথোপকথন শুনে যাচ্ছিলেন। তার ভেতর কোনো প্রতিবাদ কিংবা বিকার দেখলাম না। বরং তিনি খুব মন দিয়ে শুনে বোঝার চেষ্টা করছিলেন তার মহান কীর্তি বিবৃত করতে পুলিশের কর্তা কোনো ভুল করছেন কি না। চল্লিশের মতো হবে তার বয়স, মাঝারি উচ্চতা, ফর্সা মুখ, মাথার চুল খুব ছোটো করে ছাঁটা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাসি হাসি বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা- তাকে প্রথম দেখায় কোনোভাবেই এমন বিকৃত একজন মানুষ মনে হবে না বরং তাকে যথেষ্ট আন্তরিক, সদালাপী একজন ভালো মানুষ মনে হবে যে কারও। আমি তার দিকে তীব্র দৃষ্টি রেখে বললাম, 'উনি যা যা বললেন তা কি সত্য?'

'সত্য, তবে উনি অনেক সংক্ষেপে বলেছেন। বিষয়টা আরও তাৎপর্যপূর্ণ...'

'আপনি তাহলে মানুষকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করছেন?'

'দেখুন, আপনি যেভাবে বলছেন তাতে মনে হবে আত্মহত্যা খুব খারাপ কিছু। কিন্তু আত্মহত্যা খারাপ কেন হবে সেটা আপনিই বলুন।'

আমি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম উল্টো তার এই বেয়াড়া প্রশ্নে। আরও অবাক হলাম আমি আবার এই অর্থহীন প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করছি দেখে। 'খারাপ কেন মানে, একটা মানুষ বাঁচবে না? বেঁচে থাকবে না?'

'অবশ্যই থাকবে। যে বেঁচে থাকতে চায়, সে তো থাকবেই। কিন্তু যে মরে যেতে চায় তাকে কেন বেঁচে থাকতে হবে? দেখুন, আত্মহত্যার ইচ্ছা নেই, নিজের জীবন নিয়ে সুখী এমন কাউকেই আমরা আমাদের সংঘে নিই না। কিন্তু জীবনের ওপর বিতৃষ্ণা আছে এবং আত্মহত্যার কথা মাথায় এসেছে এমন মানুষদের নিয়েই আমাদের কাজ।'

'এতকিছু থাকতে এই কাজ বেছে নিলেন কেন?'

'দেখুন, মানুষকে সেবা করার এটাও অনেক বড়ো একটা উপায়, যদিও এটার স্বীকৃতি নেই। যে বাঁচতে চায় তাকে বাঁচতে সহায়তা করা যেমন মহৎ কাজ, তেমনি যে মরতে চায় তাকে মরতে সহায়তা করাটাও একইভাবে মহৎ।'

'কিন্তু এটা কি গুরুতর অপরাধ নয় যে আপনি কাউকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছেন?' 'দেখুন, আমি মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছি না। যে নিজেই যেতে চায় তাকে শুধুমাত্র সাহায্য করছি গন্তব্যে পৌঁছাতে। আর বেঁচে থাকার অধিকার যেমন সবার আছে তেমনি মরে যাওয়ার অধিকারও সবার থাকা উচিত।' 'কেন? ঠিক কী কারণে?'

'এই যেমন ধরুন আপনি। আপনি কি নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে এসেছেন? আসেননি। এসেছেন অন্য কারও ইচ্ছায়। বা হয়তো তাদেরও ইচ্ছায় নয়, ভিন্ন কারও ইচ্ছায়, কিংবা সমাজের বহু বছরের রীতি মেনে আপনাকে আনা হয়েছে। তো এসে দেখলেন যে কারণেই হোক, আপনার ভেতরে এখানে থাকার আর কোনো ইচ্ছা কাজ করছে না। জীবনকে একটা বন্দিশালা মনে হচ্ছে যেখান থেকে আপনি মুক্তি চান। আর আপনার এই দুরবস্থার জন্য যেহেতু আপনি দায়ী নন, আপনাকে অন্য কেউ জোর করে টেনে এনে এর মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তাই আপনি তো চাইতেই পারেন এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। অন্য কেউ আপনাকে টেনে এনেছে বলে আপনাকে এখন এই দুর্দশা সয়ে জীবনকে টেনে নিয়ে যেতে হবে? অন্য কারও কৃতকর্মের দায় আপনাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে তিলে তিলে ক্ষয়ে গিয়ে? তবে হ্যাঁ, আপনি যদি এটা মেনে নেন, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু আপনি যদি না চান এই দায়ভার টানতে?'

আমি পুলিশের কর্তার কাছ থেকে নিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম, 'কিন্তু সে তো ভুল কারণে নিজেকে দুর্দশাগ্রস্ত ভাবতে পারে। তার চিন্তায় ভুল থাকতে পারে, তার চিন্তা অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে আপনার কাজ কি জীবনের প্রতি তাকে উৎসাহিত করা নয়? জীবনের প্রতি তার হারানো আকর্ষণকে ফিরিয়ে আনা নয়?'

'হারানো আকর্ষণ!', তার মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠতে দেখলাম। পুলিশকর্তাও অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন কিছুটা। 'কিন্তু সেটা কি আপনার ব্যাখ্যা নয়? জীবন নিয়ে আপনার ব্যাখ্যা তো আপনি তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। হয়তো তার চিন্তায় নয়, আপনার চিন্তায়ই ভুল, বা যার যার জায়গা থেকে তার তারটা ঠিক। কিন্তু, সে তো তারটা আপনার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না, চুপচাপ নিজে চলে যাচ্ছে পৃথিবী ছেড়ে। তাহলে আপনি কেন নিজেরটা তার ওপরে জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইছেন? একে তো তাকে এভাবে টেনে আনা হয়েছে যেখানে তার কোনো হাত নেই, তার ওপর পৃথিবীতে আসার পর থেকেই শুরু হয় তার ওপর সবকিছু চাপিয়ে দেওয়া। বেশির ভাগ মানুষই কষ্ট করে হলেও সেগুলো মেনে নিয়ে জীবন পার করে দিচ্ছে, কিন্তু অল্পকিছু মানুষ যদি না চায় এভাবে জীবনকে টেনে নিয়ে বেড়াতে, তাহলে কি তার মুক্তির কোনো উপায়ই থাকবে না? নিজের এই সামান্যতম স্বাধীনতাটুকুও কি মানুষের প্রাপ্য নয়্তজীবনের না হোক, অন্তত মৃত্যুর স্বাধীনতা?'

আমি পুলিশকর্তার কাছ থেকে আরেকটা সিগারেট নিয়ে তাকে সাধলাম। সে আপত্তি করল না। প্রহরীকে ইশারা করলাম তার হাতের বাঁধন খুলে দিতে। পুলিশকর্তার মুখের অসহিষ্ণু ভাব আরও কিছুটা বাড়ল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম, 'বুঝলাম, কিন্তু কেউ যদি এই পথে যেতেও চায়, তাকে নিজের মতো করে যেতে দিন না। আপনাকে কেন তার প্রয়োজন হবে?'

'দেখুন, কেউ যদি চায়ও সে এত সহজে আত্মহননের পথে যেতে পারবে না। জন্মের পর থেকেই সে এত বেশি বিভ্রান্ত হয়েছে আপনাদের কথায় আর কাজে যে সেই বিভ্রান্তির জাল ভেদ করে কারও পক্ষেই সহজ নয় এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়া। সেই বিভ্রান্তির সীমা এতই সুদূরবিস্তৃত যে, সেটা ভেদ করে কেউ সহজে মুক্ত হতে পারবে না। তার ওপর সমাজ তো নিজের স্বার্থে কিছু অর্থহীন সম্পর্কের বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে যেগুলো আসলে শিকল ছাড়া আর কিছুই নয়। এই এতকিছু ভেদ করে তাই অনেকে চাইলেও আর বের হতে পারে না। জীবনের সব জঞ্জাল থেকে মুক্ত হতে চেয়েও জঞ্জাল বয়ে নিয়ে বেড়ায় আজীবন। এ কারণেই আমার সহায়তার দরকার হয় তাদের। আমি তাদের সাহায্য করি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে। স্বাধীনভাবে নিজের জীবনের ভাগ্যনিয়ন্তা হতে।'

আমি বেশ কৌতুক অনুভব করি তার কথায়। এই নিরানন্দ চাকরিজীবনে এমন বিনোদনের খোরাক খুব বেশি জোটে না। ঘুরেফিরে সব তো সেই একই ব্যাপার চারদিকে। কিন্তু যতটুকু কৌতুক অনুভব করছি তার চেয়েও বেশি কৌতুকভাব মুখে ফুটিয়ে তুললাম পুলিশকর্তার ক্রমবর্ধিষ্ণু অসহিষ্ণুতা টের পেয়ে। তাকে যেন অনেকটা আশ্বস্ত করলাম আমি নিছক কৌতুক বোধ হওয়াতেই এই কথোপকথন দীর্ঘায়িত করছি। আরেকগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললাম, 'আপনার কথা থেকেই পরিস্কার আপনার সমাজের ওপর বিশ্বাস নেই, সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার ওপর বিশ্বাস নেই। তাহলে কীসের ওপর বিশ্বাস আপনার?'

এবার মহান বিপ্লবী মানুষটাও একগাল ধোঁয়া ছাড়লেন। আসন্ন বিপদ নিয়ে তার হয়তো কোনো ধারণাই নেই কিংবা থাকলেও দুর্ভাবনা নেই তা নিয়ে। ধোঁয়ার ফাঁক গলে তার কথাগুলো চলে আসল্ত'সমাজ? সমাজ কি সবচেয়ে ধূর্ত, সবচেয়ে সুযোগসন্ধানী প্রতিষ্ঠান নয়? সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে কি আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না এই সমাজই? বা সমাজেরই নানা দল, গোষ্ঠী? কিংবা আরও বৃহদার্থে বললে রাষ্ট্র? দল, গোষ্ঠী, সমাজ, রাষ্ট্র্তএরাই কি সর্ববৃহৎ আত্মহত্যা সংঘ নয়?'

এবার আমাকে একটু নড়েচড়ে বসতে হয় রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ আসায়। পুলিশকর্তাও মাত্র একটা সিগারেট রেখেছিলেন তার অসহিষ্ণু ঠোঁটের ফাঁকে, তিনি সিগারেটে আগুন ধরাতেই ভুলে গেলেন। ধোঁয়ার ফাঁকে মহান বিপ্লবী মনীষীর কণ্ঠস্বর আবার শুনতে পাই যেন কোনো উত্তাল জনসমুদ্রে তিনি ভাষণ দিচ্ছেন্ত'এই যে যুগে যুগে, কালে কালে নানা দল, গোষ্ঠী, সমাজ তাদের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে, তাদের পথকে সুগম করতে কিংবা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কত অগুনতি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল বিপ্লবের নামে, যুদ্ধের নামে, আদর্শের লড়াইয়ের নাম্তেএভাবে কি তাদের আত্মহননের পথেই ঠেলে পাঠানো হলো না? আজ যদি আপনার রাষ্ট্র অন্যায়ভাবেও অন্য কোনো রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে বসে আপনারা তৎক্ষণাৎ সকল সৈন্যসামন্তকে সমরাদেশ দিয়ে পাঠাবেন সেই নিশ্চিত মৃত্যুক্ষেত্রে। এমনকি দেশের আপামর জনতাকেও বলবেন সেই সমরে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এটা কি তাদের নিশ্চিত আত্মাহুতির পথে ঠেলে দেয়াই নয়? তাদের বলা হবে দেশের তরে প্রাণ উৎসর্গ করাই শ্রেষ্ঠতম মৃত্যু। অথচ তারা হয়তো জানবেও না এই অকারণ আক্রমণ আর অহেতুক মৃত্যুর আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা। সিদ্ধান্তটা নিয়েছে হয়তো শীর্ষবিন্দুতে বসে তিন-চারজন। অথবা একজন। অথচ মানুষ মরবে হাজারে হাজারে, লাখে।'

এবার আমিও অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি কিছুটা। 'আপনি কীসের সাথে কীসের তুলনা দিচ্ছেন? দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা, মানবতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা তো সবচেয়ে মহৎ কাজ। তারা তো সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের, তাদের সাথে আপনি তুলনা দিচ্ছেন নিতান্ত মামুলি কারণে হেলাফেলা করে যারা নিজেদের জীবন নষ্ট করে তাদের?' এবার আমিও নিজের ভেতর প্রচণ্ড রাগ অনুভব করি। সকালে আরামে ঘুমাতে না পারার রাগ আবার ফিরে আসে আমার মাঝে।

'তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই যে, আত্মহত্যার পেছনের কারণটা যদি হয় কোনো দল, সমাজ বা রাষ্ট্রের অনুমোদিত বা তাদের দ্বারা নির্ধারিত তাহলে সেই আত্মহত্যা বৈধ? শুধু বৈধই না, মহৎও? অথচ এই আত্মহত্যা সেই দল, সমাজ বা রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিয়েছে নিজেদের স্বার্থে আর মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে মহত্ত্বের মিথ্যে রুমালে তাদের চোখ ঢেকে। এটা তো আরও নিকৃষ্ট কারণ এই আত্মহনন তারা নিজেরা বেছে নেয়নি, তারা বাঁচতেই চায়, কিন্তু আপনারাই তাদের বোঝাবেন যে এই মৃত্যু মহৎ মৃত্যু। আপনারাই তাদের বিভ্রান্ত করবেন কারণ তাদের মৃত্যুতে আপনারা বেঁচে থাকবেন, আপনাদেরই লাভ। আর তাদের মৃতদেহ মহত্ত্বের মায়াবী চাদরে ঢেকে তাদের বীরের আখ্যা দেবেন যাতে যাতে সেই বীরত্বের মোহে, মহত্ত্বের মোহে তাদের মতো আরও অনেকেই এই আরোপিত আত্মহননের পথ বেছে নেয়।'

কিছুক্ষণের জন্য থামল এই বদ্ধ উন্মাদ। আমাদের তিনজনের সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে বেড়াতে থাকে ঘরময়। খানিক বিরতির পর আবার তার মোলায়েম কণ্ঠ শুনতে পাই্ত'কিন্তু আমি কাজ করি তাদের নিয়ে যারা নিজেরাই মৃত্যুর পথে যেতে চায়। কেউ তাদের কোনো মিথ্যে প্রলোভন বা আশ্বাস দিয়ে ঠেলে পাঠায়নি। তাদের শেষ সময়টায় আমি তাদের পাশে থাকি যাতে তারা সব মোহ, সংশয় আর বিভ্রান্তির ঊর্ধ্বে উঠে এক গভীর প্রশান্তি আর তৃপ্তি নিয়ে তাদের অর্থহীন জীবনের ইতি টানতে পারে। আর আপনাদের ইশারায় যারা আত্মাহুতি দেয় তারা বেশিরভাগ সময় জানতেই পারে না কী কারণে, কার ইশারায় আর কোন স্বার্থে তারা জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে? এক চরম প্রতারণার মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতে তারা জীবনকে জলাঞ্জলি দেয়। আপনিই বলুন কোনটা মর্মান্তিক? কোনটা নিকৃষ্ট?'

ততক্ষণে আমার সিগারেট প্রায় শেষ। হাত থেকে সেটা ছুড়ে ফেলে প্রহরীকে ইশারা করলাম আবার আসামির হাত বেঁধে দিতে। চেয়ার থেকে উঠতেই পুলিশের কর্তাও সিগারেট ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। আমার সাথে হেঁটে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এই ঘর থেকে বেরোলেন। বাইরে গিয়ে মুক্ত বাতাসে দম নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেউ জানে কি না এই গ্রেপ্তারের খবর। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে, পুরোপুরিই গোপন রাখা হয়েছে ব্যাপারটা। আমি অতি সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় তাকে বুঝিয়ে দিলাম কী করতে হবে। অতি নিঃশব্দে একে নিকাশ করে ফেলতে হবে। এরপর আত্মহত্যা সংঘের বাকি সদস্যদের। এ ক্ষেত্রে চরম পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমি অবহিত করব। এসব অসুস্থ, আক্রান্ত নর্দমার কীটদের কারণে সহস্র বছরের সাধনায় তিল তিল করে গড়া মানব সভ্যতা বিকৃত হবে সেটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। আর এটা এমন বিশেষ কিছুও না এই জন্য যে তারা নিজেরাই তো একে অপরকে নিয়ে অচিরেই আত্মহননের পথ বেছে নিত। সেটাই তো তাদের লক্ষ্য। আমরা তো তাদের কাজটাকেই আরও ত্বরান্বিত করছি। তাদের কাঙ্ক্ষিত পথেই তাদের এগিয়ে দিচ্ছি। সেদিক থেকে দেখলে আমরাও আত্মহত্যা সংঘের হয়েই কাজ করছি। এটা বলে আমি আর পুলিশকর্তা দুজনেই হো হো করে কিছুক্ষণ হাসলাম। তারপর তাকে বিদায় জানিয়ে আমার দাপ্তরিক গাড়িতে উঠে বাড়ির পথ ধরলাম। ছুটির দিনটা এখনও অনেকটা বাকি। বাড়ি ফিরে খানিকক্ষণ না ঘুমিয়ে নিলেই না। 

মন্তব্য করুন