১.

কম বয়সে আমার এক বন্ধু তার বাসায় জানাইয়ে দেয় যে, আমি কবিতা লেখি।\হতখন ফেসবুক ছিল না। জাগরনী ক্লাবের মহল্লাভিত্তিক দেয়াল পত্রিকা আর আবেগ নামের একটা সংগঠনের সাহিত্যপত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা হয়। প্রথমটা 'কামভাব' আর পরেরটা 'মৃত্যুসংক্রান্ত'।\হ২০০৪ সালে সারাদেশে ব্যাপক বন্যা হয়। গণফোরাম করতেন এমন এক বড়ভাই তার বাড়ির গ্যারেজে বসে ত্রাণের স্যালাইন বানাতে আমাদের কয়েকজনরে ডেকে নিয়ে যায়। তার কিছুদিন পর আমার একটা কবিতা গণফোরামমার্কা কোনো পত্রিকায় ছাপা হয়। সেই কবিতার মূল ভাবটা ছিল- 'ওই লাল সূর্য উঠছে'।\হতো যাই হোক, আমার সেই বন্ধু প্রমাণ হিসেবে উক্ত পত্রিকাগুলা তার বাসায় উপস্থাপন করে। পরদিন তার বাসায় দাওয়াত। খেতে বসছি আর আন্টি স্নেহমাখা কণ্ঠে বলতেছেন, 'বাবা তোমার কী হইছে? তুমি এগুলা লেখ কেন?'\হকবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর এইটা ছিল আমার জীবনে পাওয়া প্রথম রিঅ্যাকশন।\হমহল্লার মস্তান টাইপের এক বড় ভাই ডেকে নিয়ে বলছিল, 'এগুলা লেখার আগে বেশি করে উইড খেয়ে নিবি। আরো ভালো লেখতে পারবি।' এইটা সেকেন্ড রিঅ্যাকশন।\হআর থার্ড রিঅ্যাকশন ছিল ইরা আপুর, 'সত্যি কথা বলবি, এগুলা তুই আমারে নিয়ে লিখছিস? বল?'

একজন কবির প্রথম দিকের পাঠকরা সাধারণত তার বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের মধ্যেই থাকে। আমার ক্ষেত্রেও তাই ছিল, এবং আর সবার মতোই, কারো রেসপন্সই উৎসাহমূলক না। অনেকক্ষেত্রে টিটকারি, ক্ষেত্রবিশেষে সহানুভূতি ও করুণামূলক। কবিজন্মে এরা কবির প্রথম প্রতিপক্ষ।\হ

২.

তখনো কবিতা লেখা শুরু হয় নাই। নব্বইয়ের দশকে টিনএজারদের উপর একটা নতুন অত্যাচার শুরু হয়। তখন বিটিভিতে নিয়মিত একটা সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল নিম্নরূপ: 'আপনার সন্তান কি সারাক্ষণ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে? ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ করে রাখে? আসবাবপত্র, চেয়ার কিংবা টেবিলে ব্লেড ও ধারালো বস্তুর আঁচড়ের দাগ পাওয়া যায়? গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে এবং দিনের বেলায় ঘুমায়?\হমাদকদ্রব্য সেবন, সংরক্ষণ ও পরিবহন ভয়ংকর অপরাধ। তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এখুনি সচেতন হউন।\হসৌজন্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।'\হটিনএজ বয়সে আমি নির্জনতাপ্রিয় ছিলাম। তাছাড়া, বাসার বিটলা পোলাপানের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আমার ঘরের দরজা প্রায় সারাক্ষণই বন্ধ করে রাখার অভ্যাস হয়। তেমন সময় গ্রাম থেকে কিছু আত্মীয় বেড়াতে আসলেন।\হদুই-একদিন গভীর পর্যবেক্ষণের পর তারা চোখমুখ সরু করে ফ্যামিলির লোকেদের কাছে জানতে চান, ছেলে সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে কেন? মাদকদ্রব্য নাকি?\হআমার মা-বাপের টনক নড়লো। ঘরের মধ্যে চেক করে কিছু ব্লেড-ছুরির আঁচড়ও আবিস্কার করা হইলো। আর রাতজাগা তো আমার চিরকালের অভ্যাস! সকলেই চিন্তিত ও গম্ভীর মুখে আমার ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন।\হআমার মাসের হাতখরচ কমায়ে দেয়া হলো। টুকটাক কেনাকাটা কাজের লোকের দায়িত্বে চলে গেল। গ্রাম থেকে আসা আত্মীয় নিজ হাতে পল্গায়ার্স দিয়া টেনে আমার ঘরের দরজার ছিটকিনি খুলে ফেলে দিলেন। খাটের তলা ও ড্রয়ারে রাখা সমস্ত গোপন বস্তু নির্লজ্জের মতো সকলের সামনে প্রকাশ্য করে দেয়া হলো। ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল, সেইগুলা যেন খুলে পড়ে ফেলা হবে, এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাঁ করে কেন্দে দিলাম। এমন অসহায়ত্ব এর আগে কখনো ফিল করি নাই।\হইরা আপুর সাথে তখন আমার নতুন নতুন বন্ধুত্ব। সিনিয়র বান্ধবী, ভালো দাবা খেলে। আটানব্বইয়ের বন্যায় যখন ঘর থেকে বের হওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিলো, তখন আমি তার লগে আমার ঘরে বসে দাবা খেলতে খেলতে সময় কাটাতাম। পরে আর দাবা খেলা উছিলা ছাড়াই আমরা বিকালের দিকে নানান নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে গোপনে ফিসফিসানি করতাম। ছিটকিনি খুলে ফেলার কারণে সেই বন্ধুত্ব গল্প করা পর্যায়েই থেকে গেল, আর আগানোর কোনো সম্ভাবনা থাকলো না। অথচ মাদকদ্রব্য সম্পর্কে তখন পর্যন্ত আমার কোনো ধারণাই ছিল না!\হপ্রেমের জীবনে প্রতিপক্ষ বলতে যা বোঝায়, আমার জীবনে সেটা ছিল ওই গ্রামবাসী আত্মীয়রা।\হ

এরপর থেকে খেয়াল করছি, দুনিয়ার কোনখানে তরুণ ছেলেপুলেরা কিছু একটা ক্রাইম করলেই জগতের সকল টিনএজার ও ইয়ংদের প্রাইভেসির উপর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আক্রমণ শুরু হয়। এর একটা নমুনা দেখা গেল অনলাইনে ব্লু হোয়েল নামের একটা সুইসাইডাল গেম জনপ্রিয় হওয়ার পরে।\হসেই সময়ে ফেসবুকে সকলে মিলে একই পোস্ট শেয়ার করতে লাগলেন, যার ভাষাভঙ্গিমা ওই নব্বই দশকের মাদকদ্রব্য বিজ্ঞাপনের কাছাকাছি, 'আপনার সন্তান কি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে? ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে?'\হব্লেড কিংবা ছুরির জায়গায় স্মার্টফোন ইন্টারনেট ইত্যাদি শব্দমালা প্রতিস্থাপন করে সেই পোস্টে আহ্বান জানানো হইতেছে যে, এক্ষুনি সচেতন হউন। টিনএজারদের ঘুম হারাম। তাদের স্মার্টফোন কেড়ে নেয়া হয়, ওয়াই ফাই কানেকশন অফ করে দিয়ে লিমিটেড ডাটা প্যাকে কিনে দিয়ে বলা হচ্ছে, শুধু উইকিপিডিয়া দেখবা। কোভিড জমানায় ফোন কোম্পানি নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করছে, স্টুডেন্টস ডাটা। এই ডাটা দিয়ে অনলাইন ক্লাস আর দু-একটা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট ছাড়া কিছুই ব্রাউজ করা যাচ্ছে না। অভিভাবকরা নিজেদের সচেতনতার চর্চা হিসেবে সন্তানদের শুধু সেই প্যাকেজগুলো কিনে দিচ্ছে। স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করার মধ্য দিয়ে একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে।\হএখনকার তরুণদের আরেকটা প্রতিপক্ষ অনুমান করি এই কোভিড সিচুয়েশন। করোনাভাইরাস প্রত্যক্ষভাবে আক্রমণ করে তাদের যতটা ক্ষতি করতে না পারছে, এই কোভিড সিচুয়েশন তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি ক্ষতি করে দিচ্ছে আজকের তরুণদের।\হএইটা যে কোন লেভেলের আযাব, এই সময়ের তরুণদের বাইরে আর কেউ ফিল করতে পারবে না। একজন তরুণের লাইফস্টাইল, ব্যক্তিত্ব আর আত্মবিশ্বাসের সর্বনাশ করে দিতে পারে প্যারেন্টসের এই আজাইরা সচেতনতাপনা।\হএতকিছু লেখার আসল কারণটা হলো, সোহিনির সাথে নতুন নতুন বন্ধুত্ব হইছে, মিট করতে হবে; বয়সে সে লেট টিনএজার। কোভিড সিচুয়েশনে কলেজ ভার্সিটি বন্ধ। ফলে, সহজে বাসা থেকে বের হতে দেয়া হয় না। বের হতে চাইলে প্যারেন্টসরা সারাক্ষণ ঘরে বসে বসে গুগল করে উবার ড্রাইভারদের ইতরামির খোঁজখবর খুঁজে বের করে জোরে জোরে পড়ে শুনাচ্ছে। ক্রাইম প্যাট্রোল দেখে দেখে রেফারেন্স টেনে বলতেছে, দেখ বাইরে গেলেই এই অবস্থা হবে। তরুণদের আসলেই কেউ বুঝতে চায় না।\হফলে, এই লেখাটা লিখতে বসে সোহিনিকে ফোন করে প্রশ্ন করলাম, প্যারেন্টস না কোভিড, এই মুহূর্তে তোমার প্রধান প্রতিপক্ষ কে?\হসে নির্দি্বধায় রিপ্লাই করলো, তুমি।\হপ্রেমসম্ভাব্য নারীরা এভাবে প্রতিপক্ষ বানায়ে দিলে কবি এখন কার কাছে যাবে?\হ

৩.

লেখকের প্রতিপক্ষ প্রকাশক। বই বিক্রির হিসাব দিবে না, হিসাব দিলেও টাকা দিবে না, টাকা দিলেও তা নগণ্য। বইমেলায় যতগুলা প্রকাশক ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢোকেন, তার অর্ধেক লেখকও ব্যক্তিগত গাড়ি দূরে থাক উবারে যাতায়াত এফোর্ট করতে পারে না। অথচ প্রকাশকের প্রধান পুঁজি লেখক। প্রকাশন ধনী হয়ে উঠতেছে অথচ লেখকের পকেট কেন ফাঁকা এই হিসাবটা আমি আজকে পর্যন্ত বুঝে পাইলাম না।\হতবে আশার বিষয়, ক্ষুদ্র হইলেও সফটবুকের একটা পাঠকগোষ্ঠী আছে। সফটবুক করে লেখক সরাসরি পাঠকের কাছ থেকে টাকা উপার্জন করতে পারে। যদিও ব্যাপারটা এখনো এক্সপেরিমেন্টাল পর্যায়ে আছে।\হকাগজের বইগুলা পাঠকের সাহিত্য উপভোগ করার পাশাপাশি দাগানো, ঘ্রাণ নেয়া, হাতে নেয়া, শোপিস হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা সের দরে বেচার মতো নানাবিধ ফিজিক্যাল নিডস পূরণ করে থাকেন।\হএইসব কারণে কিছু লোকের হার্ডকপি ছাড়া চলেই না।\হসফটবুকের একটা সুবিধা কিংবা অসুবিধা হচ্ছে এইটা দিয়ে পাঠকেরা পড়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। ফলে, সফটবুকের পাঠকগোষ্ঠী একটু ভিন্ন ধরনের। এদের ভিন্ন পাঠরুচি থাকবে।\হএই পাঠকেরা লেখকেরে অটোগ্রাফ দেয়ার সংস্কৃতি থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়ে দেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে পড়ে। এরা রেসপন্স করার জন্য পড়ে।\হওয়েব সিরিজ জিনিসটা যেমন- সিনেমা হলে বসে দেখা যাবে না; আজকের দিনে লেখা সফটবুক জিনিসটাও তেমন কাগজে ছাপার অক্ষরে পড়ার জিনিস না। ওরা আপনার শারীরিক চাহিদা ভিন্নভাবে মেটানোর প্রস্তাব দেয়।\হমোট কথা, সফটবুক একটা ভিন্ন চরিত্র নিয়া পাঠক সমাজে হাজির হয়। এইটা একটা ডিজিটাল আর্ট। এইসব নিয়ে আজকের দুনিয়ায় নানামুখী এক্সপেরিমেন্ট চলতেছে।\হগত বছরের আন্তর্জাতিক বাজারের জরিপ অনুযায়ী কাগজের বইয়ের তুলনায় সফটবুকের বিক্রি অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গেছে। এ বছরের জরিপের ফলাফল এখনো আসে নাই, সন্দেহ করি তাতে করোনা প্রভাব বিস্তার করে থাকবে। সেইটা সফটবুকের পক্ষে কথা বলবে।\হসফটবুক নিয়া আমার ভাবনা আছে। অবস্থান আছে। অনেকের সাথে আলাপ-আলোচনা আছে। খুব দ্রুতই আমার লেখা প্রথম উপন্যাস সফটবুক ভার্সনে বাজারে আসতেছে। শাহবাগ মোড়ে একজন দাপুটে বুদ্ধিজীবী আমার লেখা সফটবুকটি নিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে প্রশ্ন রাখলেন, বলেন দেখি, সফটবুক লিখে কেউ আজ পর্যন্ত নোবেল পাইছে?\হআমি বলে আসছি, পাবে।

সামনের দিনগুলাতে সফটবুক নিঃসন্দেহে কাগজের বইয়ের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতেছে।\হ

৪.

মধ্যবিত্তের সন্তান হিসেবে স্টুডেন্ট লাইফে টিউশনি করতে হতো। টিউশনির অভিজ্ঞতা আমার সুবিধার না। মালিবাগে বাসা, ক্লাস সিক্সের বাচ্চা, প্রায় সব সাবজেক্টে নিয়মিত ফেল করে থাকে, বিটলার বিটলা।

টিউশনি শুরুর আগে স্টুডেন্টের মায়ের কাছে ইন্টারভিউ দিতে হয়। ইন্টারভিউ পর্ব শেষে বেতন বিষয়ক আলোচনা হওয়ার কথা। বাট স্টুডেন্টের মা কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়ে পরিস্কার জানায়ে দিলেন, সপ্তাহে ৬ দিন আসতে হবে, পড়ানোর সময় ১ ঘণ্টা। টিউশন টাইমে নাস্তা খেতে চাইলে বেতন ২৫০০ টাকা, নাস্তা না নিলে ৩০০০। নাস্তাবিহীন শর্তে সম্মত হয়ে গেলাম, আমার টাকার দরকার।\হতো যাই হোক, প্রথম দিন পড়াতে হবে বাংলা সেকেন্ড পেপার। বিপরীতার্থক শব্দ। বজ্জাত স্টুডেন্ট চিল্লায়ে পড়তেছে ভালো-খারাপ, ভদ্র-ইতর, পক্ষ-বিপক্ষ। তার বইতে পক্ষ শব্দটার বিপরীতে দুইটা অপশন ছিল বিপক্ষ/প্রতিপক্ষ।\হএই পর্যায়ে পড়া থামায়ে সে জানতে চায়- স্যার, পক্ষের বিপরীতে কোনটা শিখব? বিপক্ষ না প্রতিপক্ষ? আমি বললাম, দুইটাই শিখবা।\হএখন সে নতুন পদ্ধতিতে পড়া শুরু করলো। ভালো বলার সময় নিজের দিকে আঙুল নির্দেশ করে, আর তার বিপরীত খারাপ বলার সময় আঙুল নির্দেশ করে আমার দিকে। নিজের দিকে ভদ্র, আমার দিকে ইতর। নিজের দিকে পক্ষ- এই পর্যায়ে আমি আর মেজাজ ধরে রাখতে পারলাম না। দিলাম এক ধমক। বিটলা পোলাপানদের সর্বদা ধমকের উপর রাখা কর্তব্য।\হঘরের মাঝখানে পড়ার টেবিল, টেবিলের একপাশে ছাত্র, তার বিপরীত পাশে আমি, আমার মুখোমুখি ঘরের দরজার, দরজায় লাগানো পর্দা, সেই পর্দার আড়ালে ঘাপটি মেরে দাঁড়ায়ে ছিল স্টুডেন্টের মা। ধমক শুনে সে ওইখান থেকে বের হয়ে আসছে।\হ'টিচার তোমাকে ধমক দিতেছে কেন?'\হস্টুডেন্ট বেকুবের মতো চেহারা করে বললো, 'আমি ভালোগুলা আমাকে দেখায়ে পড়তেছি আর খারাপগুলা টিচারকে দেখায়ে, এইজন্য।'

স্টুডেন্টের মা এই পর্যায়ে ঠাস করে তার গালে একটা চড় বসায়ে দিল, 'তুমি খারাপগুলা টিচারকে দেখায়ে পড়ছ কেন? ভালোগুলা টিচারকে দেখায়ে পড়বা বলে দিলাম।'

এই পর্যায়ে আমি মোটামুটি পেজগি সিচুয়েশনে। টিউশনি যে আমারে দিয়ে হবে না সেইটা আমি মুহূর্তের মধ্যে বুঝে গেলাম। তার মা আবার আড়ালে গিয়ে পজিশন নিতেই সে আবার পড়া শুরু করছে, বাট একই ভঙ্গিমায়। চড় খেয়ে কোনো শিক্ষা হয় নাই। নিজের দিকে দেখায়ে বলতেছে পক্ষ, আমারে দেখায়ে বললো, বিপক্ষ। আর দরজার দিকে দেখায়ে- প্রতিপক্ষ।\হঅভিভাবকত্ব যে কত নির্দয় প্রতিপক্ষ, এইটা যদি তারা বুঝতো।\হ

৫.

অনেকদিন পর ক্রিকেট খেলতে গেছিলাম মহল্লার মাঠে। ক্রিকেট আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য একটা খেলার নাম। আমার কৈশোরের বেশিরভাগ সময় কাটছে খিলগাঁও গভমেন্ট স্কুলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে খেলতে।\হএ ছাড়া আমরা দুই একদিন ম্যাচ খেলতাম বেড়াভাঙ্গা স্কুলের মাঠে, আর শেষের দিকে সৃজনী ক্লাবের মাঠে। এমনকি বাড়ির গ্যারেজের ফাঁকা জায়গাতে; ইভেন, শুক্রবারসহ অন্যান্য ছুটির দিনে আর হরতালে বাসার সামনের রাস্তায় সকাল সকাল দুই ইটের চিপায় স্টাম্প গেড়ে ক্রিকেট খেলতে নামতাম আমরা। সেই আমলে হরতাল হতো খুব, তখন স্কুলে না গেলেও চলতো।\হআমাদের খিলগাঁও মাঠের দুই দুইজন খেলোয়াড় জাতীয় টিমের ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিলেন। মোহাম্মদ আশরাফুল আর হান্নান সরকার। অথচ সেই মাঠে কমপক্ষে ৩০/৩৫টা দল একসাথে ক্রিকেট খেলতো। বাউন্ডারির কোনো হিসাব নাই। মাঝে মাঝে ঠিক হতো যে, ছয় মারতে হলে গার্লস স্কুলের দোতালার বারান্দায় বল পাঠাতে হবে। আর নাইলে সব চার। সারা মাঠজুড়ে যার যেইখানে খুশি স্টাম্প পুঁতে খেলা শুরু করে দিতো।\হটেপ টেনিসে খেলা চলতো তখন। আর প্রফেশনাল ক্রিকেটাররা মাঠের এক কোনায় নেট ঝুলাইয়ে প্যাড পরে ক্রিকেট বলে দিনভর প্র্যাকটিস করতো। কারও কোনো সমস্যা হতো না।\হকিছুদিন আগে সাতক্ষীরায় গেছিলাম ন্যাশনাল টিমের বোলার মুস্তাফিজের বাড়িতে বেড়াতে। সেইখানে, সেই মফস্বলেও বড় বড় বেশ কয়েকটা মাঠ। প্রতিটা মাঠেই শ'খানেক কিশোর ব্যাট বল প্যাড হেলমেট নিয়া আছে।\হঅথচ আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, সেই কিশোরদের কেউ একজনও ক্রিকেট খেলতেছে না।\হতাদের জন্য কোচ আছেন এবং তাদের প্রত্যেকেই প্রফেশনাল ক্রিকেট প্র্যাকটিস করে যাচ্ছে। মফস্বলের সেই মাঠে মাকড়সার মতো জাল জড়ায়ে ব্যাট প্যাড আর ক্রিকেট বল নিয়ে জাতীয় টিমে ক্রিকেট খেলতে থাকে ওরা। মাশরাফি সাকিব মুস্তাফিজ ছাড়া আর কিছু হতে চায় না তারা। তাদের চোখভরা স্বপ্ন। কিন্তু খেলার আনন্দ তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র নাই।\হখেয়াল করলে দেখা যায়, জাতীয় টিমের বেশিরভাগ খেলোয়াড় আসতেছে খুলনা বিভাগীয় অঞ্চলের দিক থেকে। ফলে সহজেই অনুমান করা যায়, সেই অঞ্চলের আর কোনো মাঠ খেলার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা নয়! সবখানেই প্র্যাকটিস!\হআমাদের ঢাকার মাঠের অবস্থাও তার থেকে বেশি ভালো নাই। যেই অল্প কয়টা মাঠ আছে, সেইগুলা সব বাউন্ডারি দিয়ে দেয়া হইছে। 'খোলা মাঠ' বলতে কোনো কিছুর আর অস্তিত্ব নাই মনে হয় আর এই শহরে, সবগুলা মাঠের চারদিকে দেয়াল। সেই দেয়ালের পাশে সন্ধ্যার পরে যখন অন্ধকার হয়, তখন নেশাখোর লোকেরা এসে বসতো। তাদেরকে ঠেকাতে এখন গেট বানায়ে সন্ধ্যার পরে তালা মেরে রাখা হয় মাঠগুলা। আর দিনের বেলায় প্র্যাকটিস। খেলাধুলাতেও প্রফেশনাল হতে হবে।\হকিছু মাঠ আবার মহল্লার ডায়বেটিসগ্রস্ত লোকেরা সিনিয়রিটির প্রভাব খাটায়ে চারদিকে সিমেন্ট ঢালাই দিয়ে ওয়াকওয়ে বানায়ে নিছেন। সকালে সন্ধ্যায় 'ভোরের আলো' লেখা সাদা গেঞ্জি আর কেডস পরে তারা হাঁটে। সকলে গোল হয়ে দাঁড়ায়ে থুতনিতে চিবি দিয়ে হো হো করে হাসে। তাতে তাদের হার্টের উপকার হয়। সেইসব মাঠে আবার ক্রিকেট ফুটবল এইসব খেলাধুলার স্পেস রাখা হয় নাই। বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে, ওয়াকওয়েতে কুকুর, বিড়াল এবং গৃহভৃত্য নিয়া হাঁটা নিষেধ।\হমোটকথা, আনন্দের জন্য খেলার প্র্যাকটিসটাই উঠে গেছে। কমবয়সীদের খেলার জায়গা নষ্ট করে বুইড়া বয়সে ট্রাউজার পরে দৌড়ানোর দিকে যাইতেছে আমাদের সামাজিক জীবন। খেলার মাঠ বন্ধক নিয়ে মাঠভরে দৌড়াবে ডায়বেটিসগ্রস্ত বুইড়ারা, আর অভিযোগ করবে এখনকার ছেলেপেলেরা তো কম্পিউটার ইন্টারনেট ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝে না!\হবুইড়ারাও একদিন শিশু ছিল, আজকের শিশুরাও একদিন বুইড়া হয়ে যাবে। সারাটা জীবন কম্পিউটার ডেস্কের সামনে বসে বসে কাটায়ে দিয়ে শেষ বয়সে ব্যাকপেইন আর ব্লাডপ্রেশার আর ডায়াবেটিস আমদানি করে পরের জেনারেশনের খেলার মাঠ দখল করে থুতনিতে চিবি দিয়া হাহা হিহি করবে। মানুষের হাসিটাও এখন আর্টিফিশিয়াল। া

আমরা কি এখনো বুঝতে পারতেছি না, দিনে দিনে কীভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতেছি?

মন্তব্য করুন