বহুকাল আগে এক দ্বীপে ছিল ডোডো নামের একরকমের পাখি। তাদের শিকার করার মতো কেউই সেখানে থাকত না, তাই পাখিগুলো জীবনে ভয় পেতে শেখেনি। তারপর একদিন যখন বাইরে থেকে কেউ এসে তাদের আক্রমণ করল, ডোডো উৎসাহী হয়ে মজা দেখার জন্য এগিয়ে গেল। ব্যস, আর যায় কোথায়, অত্যাচারে ডোডো পাখির বংশ চিরকালের জন্য বিলুপ্ত হয়ে গেল। সবাই জানে, মানুষ বাঘ-ভালুককে ভয় পায় বলে দৌড়ে পালায়। কিন্তু কী হতো যদি ভয় না পেয়ে হাবাগোবার মতো একখানে দাঁড়িয়ে থাকত? উপর্যুপরি আক্রমণে মানুষ ধীরে ধীরে ডোডো পাখির মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। তাই আদিকাল থেকে এটাই বাস্তব যে, প্রতিপক্ষ চেনা জরুরি। অন্যদিকে, পরিস্থিতি কেমন যখন প্রত্যেকেই প্রতিপক্ষ?\হপ্রতিপক্ষ বলতেই আসে প্রতিযোগিতার কথা। প্রতিযোগিতা উত্তেজনাকর বা মজার; যে জেতে তার কাছে আরো বেশি মজার। কিন্তু একজন যখন জেতে তখন প্রতিপক্ষকে হারতে হয়। আয়োজন করা প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষ থাকে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট, যেমন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় থাকে পক্ষ আর বিপক্ষ। ওদিকে, কুস্তিতে মুখোমুখি দাঁড়ায় দুজন শক্তিধর মানুষ। আয়োজিত প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে হারাতে হয় কখনো যুক্তিতে বা কৌশলে, কখনো আবার কেবল পেশিশক্তির জোরে। তবে যেভাবেই হোক, বিশেষ সময়ে নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে যাওয়া প্রেরণাদায়ক। বিজয়ী হলে আরো বেশি প্রেরণাদায়ক। কিন্তু সমাজে যখন সবখানে প্রতিপক্ষ ছড়িয়ে থাকে তখন তা গোলমেলে। এ অবশ্য নতুন নয়, পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাণী জন্মের আগেই প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। জন্মের আগে বলতে, লক্ষ লক্ষ প্রতিপক্ষ শুক্রাণুকে পিছনে ফেলে প্রতিটি প্রাণীর জন্মের জন্য দায়ী একটি বিজয়ী শুক্রাণুকে জন্মানোর উপযুক্ত হয়ে উঠতে হয়। যা হোক, সাধারণত চারপাশে বিদ্যমান প্রতিপক্ষ ছায়ার মতো মিশে থাকে, অনেক সময় তাদের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে ঠাওর করা যায় না। ঠিক যেমন, হলুদ, সবুজ, লাল- প্রতিটি ভিন্ন রং, কোনটা কতটুকু নেয়া হবে, এরকম পছন্দে তারা প্রত্যেকে প্রতিদ্বন্দ্বী, একে অন্যের প্রতিপক্ষ, সেক্ষেত্রে সবুজাভ হলুদ কিন্তু আমরা দেখতে পাই, দেখতে পাই না লালচে সবুজ। কিছু প্রতিপক্ষ প্রচ্ছন্ন।\হসত্যি কথা বলতে কী, কে কার প্রতিপক্ষ নয়? ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষকে গোল দেয়ার লক্ষ্য থাকলেও প্রত্যেক খেলোয়াড় নিজ পায়ের ধাক্কাতেই গোলটা দিতে চায়। তাই নিজের দলের প্রত্যেকেও তার প্রতিপক্ষ। ভানুর কৌতুকের কথা অনেকের মনে থাকতে পারে, 'বাইশজন লোকে একটা বল লইয়া লাইত্থা লাইত্থি করতে আছে, বাইশজনরে বাইশটা বল দিয়া দিলেই হইয়া যায়।' তবে তা দিলেও প্রত্যেকে নিজ নিজ বলই গোলপোস্টে ঢোকাতে চাইবে। বস্তুত মানুষ এমন প্রাণী যাদের সাধারণ শত্রু না থাকলে দলবদ্ধ বা আদর্শের দিক দিয়ে একীভূত হতে পারে না। সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ উপলব্ধি করে যে, পৃথিবীতে খাদ্য, আশ্রয়, যৌনসঙ্গী- সমস্ত কিছুই সীমিত। তাই তখন থেকেই প্রতিযোগিতা চলে, আর এভাবে একে অন্যের প্রতিপক্ষ হওয়াটা তাদের কেবল সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং অনেকটা জৈবিক হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি শুধু খাদ্য-বাসস্থান বা অর্থের জন্য নয়, আত্মসম্মান, ভালোবাসা বা অনুপ্রেরণা পেতেও মানুষ একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।\হআর এভাবেই ধীরে ধীরে প্রত্যেককে প্রতিপক্ষ ভাবা জৈবিক থেকে মানুষের স্বভাবজাত হয়ে ওঠে। মানুষ প্রতিপক্ষকে হারিয়ে অর্থ উপার্জন করে, প্রতিপক্ষকে ধসিয়ে দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে, তাকে ডিঙিয়ে উপরের ধাপে ওঠে, তাকে হারিয়ে জয়লাভ করে- কি কথায় কি কাজে কি ভঙ্গিতে। পুঁজিবাদী সমাজ মানুষের এই ব্যক্তিগত স্বভাবকে এতটাই উৎসাহ দেয়, যেন আগুনে ঘি। আরো বেশি সম্পদ সংগ্রহ করা, অর্থনৈতিকভাবে আরো ভালো থাকা- এই একমাত্র লক্ষ্য। আজকের দিনে অন্যায়ভাবে প্রতিপক্ষকে ল্যাং মেরে ক্রমাগত উপরে ওঠাতে মানুষের বিরাম নেই। অন্যায় তো নয়ই, এর মধ্যে যেন দৃষ্টিকটু বলেও কোনো ব্যাপার থাকছে না। ঠিক যেন ভালোবাসা আর যুদ্ধে সবকিছু ন্যায়। এই প্রতিযোগিতা এতটই দ্রুত ও অসংগতিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, এতে কোনো নিয়ম বা আদর্শ নেই। প্রতিপক্ষকে মাড়িয়ে উঠবার জন্য যার কাছে যা যৌক্তিক মনে হয় সে তা-ই করে। আর এভাবে ক্রমশ আদর্শ-বহির্ভূত সমাজের সৃষ্টি হয়।\হদ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা আদিকাল থেকে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। প্রতিযোগিতা থাকলে প্রতিপক্ষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন রেষারেষি থাকবেই। নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা বা স্বভাবজাত হিংসা কিংবা বিজয়ী হবার আকাঙ্ক্ষা তাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে, এটাই স্বাভাবিক। এ যে কেবল দুজন প্রতিযোগীর কথা, তা নয়। জগতের প্রতিটি সম্পর্ক রাজনৈতিক। তাই বন্ধুত্বে হোক অথবা প্রেমে, দুজন ভিন্ন মানুষ বস্তুত একে অন্যের প্রতিপক্ষ। ভালোবাসায় নিমজ্জিত দুজন মানুষও একে অন্যকে কথায় হারাতে চায়, বরাবর সঙ্গীর চেয়ে নিজেকে প্রজ্ঞাবান প্রমাণ করতে চায়। তাই প্রতিপক্ষকে দাবিয়ে নিজে উপরে ওঠার রাজনৈতিক নীতি মানুষ প্রয়োগ করে না, এহেন কোনো সম্পর্ক নেই। সে কারণেই বলা যায় প্রতিপক্ষে থাকার মনোভাব মানুষের স্বভাবগত। প্রত্যেক পক্ষ ক্রমাগত জিততে চায়। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র, থ্রি ইডিয়টস-এর একটি দৃশ্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, বন্ধু যখন পরীক্ষায় বন্ধুর প্রথম স্থান অধিকার করাকে উপলক্ষ্য করে বিমর্ষ কণ্ঠস্বরে বলে যে, 'বন্ধু ফলাফল খারাপ করলে খারাপ লাগে। কিন্তু বন্ধু প্রথম হয়ে বসলে খুবই খারাপ লাগে।'

মানুষের স্বভাবজাত হলেও প্রত্যেককে প্রতিপক্ষ ভাবা কখনো বিপজ্জনক। মানুষ যখন যে কোনো উপায়ে প্রতিপক্ষের সামনে নিজেকে জাহির করে, যে কোনো উপায়ে শুধু বিজয়ী হতে চায়, পরাজয় বরণ করতে পারে না, পরাজয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করে কিংবা পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে- এরকম সময়ে যে কাউকে প্রতিপক্ষ ভাবা বিপজ্জনক। প্রতিপক্ষের বিজয়ে কিংবা সুখপ্রাপ্তিতে মানুষ কখনো অভিযোগ উত্থাপনে মুখর হয়, কখনো-বা চুপচাপ নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়, একাকিত্ব বরণ থেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত হয় তার পরিণতি। এরকমটা ঘটে কেবল তখনই যখন সে বিজয়ের নেশার ঘোরে ভোগে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও নিজেকে কিছুতে পরাজিতের স্থানে দেখতে পারে না। এরকম মানুষের কাছে প্রতিপক্ষের বিজয় অশনিসংকেতের মতো। বাস্তব জীবনে তো আছেই, ভার্চুয়াল জগৎও প্রচুর প্রতিপক্ষ তৈরি করে যাদের সুখপ্রাপ্তি কারো কারো কাছে নিজের পরাজয়ের মতো লাগে। ভার্চুয়াল জগতে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেককে একসময় সে প্রতিপক্ষ ধরে নেয়। যেন তারা সুখ পেয়েছে বলেই সে পায়নি। নিজেকে জাহির করার জন্য এরকম পরিস্থিতিতে কেউ দিনরাত নিজের সাজানো সুখ আর তৃপ্তির বার্তা প্রচার করতে থাকে। নিজেকে নানান রূপে সাজিয়ে, সামাজিক অবস্থান ও জ্ঞানের মাত্রার বিভিন্ন প্রকাশে স্বস্তি পেতে চেষ্টা করে। ক্রমাগত একই ধরনের কাজ করতে করতে একদিন এটা করাই তার স্বভাবে পরিণত হয়। একসময় এমনও হয় যে, ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে সে বিস্মৃত হয় কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে বিরতিহীন মোকাবিলা করার যে স্বভাব সে অর্জন করেছে, সেই পথেই হাঁটতে থাকে। এভাবে প্রতিপক্ষের ভূমিকায় সে দক্ষ হয়ে ওঠে।\হঅন্যদিকে, জগতে প্রতিপক্ষের কি প্রয়োজন নেই? প্রতিপক্ষ ছাড়া এ জগতে বাঁচা কঠিন। প্রতিপক্ষকে ডিঙিয়ে উপরে উঠে যাওয়ার ঘটনা এ জগতে মানুষের বেঁচে থাকার এক প্রেরণা বটে। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের মালিকানাসহ একমাত্র জীবিত মানুষ হিসেবে নিজেকে কল্পনা করলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ভাবা যায়, কী হবে যেদিন কোনো প্রতিপক্ষ থাকবে না? কল্পনা করা যায়, একজন প্রথম হবে কিন্তু কেউ দ্বিতীয় হবে না? সেদিন মানুষ প্রথম স্থান অধিকার করে যে পরাজয় বরণের চেয়েও অশান্তিতে ভুগবে তাতে সন্দেহ নেই। এ কথা কেবল ব্যক্তিগত মানুষের ক্ষেত্রে কেন, এক দল মানুষ কিংবা একটা বড়োসড়ো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দ্বিতীয় হওয়া মানুষটি বা দ্বিতীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা দলটির উপস্থিতির বড়ো প্রয়োজন। তা হয়ত হাড়ে হাড়ে টের পায় নির্বাচনে যে কোনো উপায়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করা কোনো দল। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবার মতো কেউ যখন সামনে থাকে না তখন তাকে বিরোধী দল বা প্রতিপক্ষ কল্পনা করে নিতে হয়। সংসদে নেই তবু তাকে বিরোধী দল হিসেবে ধরে নিতে হয়, ওই নামেই ডাকতে হয়, কল্পনায় জরুরি প্রতিপক্ষের মূর্তি গড়ে নিতে হয়। তারপর সামনে ছায়া বিরোধী দল বসিয়ে নানান মতবাদ প্রচার করতে হয়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও তাই, প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতিতে সে প্রতিপক্ষ কল্পনা করে। কিন্তু ভাবা যায়, একজন মানুষ সপাং সপাং তলোয়ার চালাচ্ছেন যার সামনে লক্ষ্যবস্তু নেই যে তলোয়ারের খেলায় যোগ দেবে? এরকম খেলা একজন কতক্ষণ চালিয়ে নিতে পারবে! তবু দেখা যায়, জলের উপরে তলোয়ার চালানোর মতো করে খেলতে থাকে কেউ। বাতাসের গায়ে ঝড় তোলে। প্রতিপক্ষের অভাবে যার শক্তি বা সামর্থ্যের কোনো দাগ বাতাসের গায়ে লেগে থাকে না, জলের শরীরে পড়ে না। বস্তুত যাকে প্রতিপক্ষ ভাবা হয়, অনেক ক্ষেত্রে সে ঘুণাক্ষরেও অন্যের গোপন যুদ্ধের কথা জানতে পারে না। এদিকে কল্পনায় প্রতিপক্ষের মূর্তি প্রতিষ্ঠাকারী প্রতিপক্ষ ক্রমাগত লড়ে যায়, মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে, কল্পনায় পরাজিত হবার মুহূর্তে প্রতিনিয়ত ডুবে থাকে।

মানুষের আবেগ-অনুভূতির মধ্যেও প্রতিপক্ষ আছে। ভয়ের প্রতিপক্ষ স্বস্তি, আনন্দের প্রতিপক্ষ দুঃখ-ব্যথা, ঘুমের প্রতিপক্ষ জাগরণ, আবার বিষণ্ণতার প্রতিপক্ষ পরিতৃপ্তি। কিন্তু মানুষ বড়ো অদ্ভুত প্রাণী, তার প্রতিপক্ষ অনুভূতিগুলো প্রায় মাথার ভিতরে সহাবস্থানে অভ্যস্ত। নিশ্ছিদ্র পরিতৃপ্তির মাঝখানে বসে তীব্র বিষণ্ণতা তাকে ঘায়েল করতে পারে। অপূর্ব কিছু চোখের সামনে দেখে এমন কোনো প্রিয়জনের না থাকার বেদনা সে অনুভব করতে পারে যার সঙ্গে সে দেখার সুখ ভাগাভাগি করতে চায়। প্রচণ্ড সাফল্যের খবরের উত্তেজনার মাঝে সমান্তরালভাবে কোনো ব্যর্থতার ব্যথা তার বুক চিরে ফেলতে পারে। অন্তত স্বস্তির ব্যাপার এই যে, প্রতিপক্ষ আবেগ-অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তৃপ্তির আলোয় অতৃপ্তির অন্ধকার বেশিরভাগ সময়ে উবে যায়। আবার, মানুষের আবেগী সম্পর্কও হতে পারে প্রতিপক্ষ অনুভূতির সংমিশ্রণে। অনেক সম্পর্কে তীব্র ভালোবাসা আর ভয়ানক ঘৃণা এক সুতায় অবস্থান করে। সামাজিকভাবে মানুষ যাকে বলে লাভ অ্যান্ড হেইট রিলেশনশিপ। তাকে না বুকে জড়িয়ে ধরা যায়, না দেয়া যায় সরিয়ে।\হযা হোক, সাধারণ প্রতিযোগিতার বিষয়টি অনেক সময় কেবল খেলায় বা যুক্তি দিয়ে কাউকে পরাভূত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিচিত্র জ্ঞানের পরিভাষায় প্রতিযোগিতাকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়, আর তাই সেখানে প্রতিপক্ষও ভিন্ন। যেমন- অর্থনীতিতে দক্ষ ও দ্রুত উৎপাদনশীল বাজার ব্যবস্থা পেতে চাইলে প্রতিযোগিতাই সেখানে মূলমন্ত্র। পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক মানুষ বা দল সেখানে একে অন্যের প্রতিপক্ষ। প্রতিপক্ষের উপস্থিতি অর্থনীতির জন্যে সার্বিকভাবে অত্যন্ত ভয়ংকর। কারণ প্রতিপক্ষের অভাবে সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্যের বাজার, অর্থাৎ, মনোপলি মার্কেট সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক যা ক্রেতার জন্য দুঃসংবাদ। অন্যদিকে, জাতীয় পর্যায়ে যে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এবং প্রতিপক্ষই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিপক্ষের কাজই হলো প্রশ্ন উত্থাপন করা। পৃথিবীময় যে কোনো সংগঠন কিংবা রাষ্ট্র যখন কিছু বিধিনিষেধ সংবলিত নিয়মকানুন বা আইন তৈরি করে, জনগণ ও গণমাধ্যম একত্রিত হয়ে তখন সিভিল সোসাইটি তথা প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করে। সিভিল সোসাইটির কাজ হলো সমালোচনার মাধ্যমে সাংগঠনিক বা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের উন্নতি ঘটানো। বস্তুত একটি সরকার যখন নির্বাচন কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ক্ষমতায় আসতে চায় তখন জনগণকে আকর্ষণ করার জন্য কিছু পরিকল্পনা প্রকাশ করে, যা তার মেনিফেস্টো। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পরপরই ক্ষমতাসীন সরকার তার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ঘোষিত প্রতিজ্ঞা থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যেতে থাকে। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দেশে এই সমস্যা দেখা গেছে। সাধারণত গণমাধ্যম তখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করে। তাই জনগণসমেত দ্রুত কিংবা দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানে প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে যেতে পারে। বস্তুত প্রতিপক্ষের কাজই হলো সংগঠনের বা রাষ্ট্রের অমানবিক, ভুল, অকল্যাণকর কিংবা দুর্বল সিদ্ধান্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সমাজের অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত ও জ্ঞানী বুদ্ধিজীবী তথা সিভিল সোসাইটি যখন প্রতিপক্ষের ভূমিকায় তাদের যথাযথ কর্মক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হয় তখন সেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত হয়। ওদিকে, রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীরা যখন সুযোগ বুঝে কোনো সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত প্রতিপক্ষের দায়িত্ব পালনে অপারগতা দেখায়, তখন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম ঘটে। অন্যদিকে, আপাত দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক সরকারটি প্রতিপক্ষহীন ব্যবসার মতো মনোপোলি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং প্রকাশ্যে স্বৈরাচারের চর্চা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মূলত তখন তারা গুন্ডার মতো প্রতিবাদী জনগণের উপরে লেলিয়ে দেয়। নূ্যনতম প্রতিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে বা স্বার্থে সামান্যতম আঘাত লাগলে গুম কিংবা বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ড যখন নিপীড়নের ভাষা হয়, তখন বলা যায় জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাষ্ট্র প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায়। দুই দলের মধ্যে এখানে সেখানে সংঘর্ষ বাধে, কারণ ক্ষমতা ও ক্ষমতার সমালোচনার বৃত্তে দাঁড়ানো এই দুটি পক্ষ তখন সত্যিকারের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের ধারণাটি কাজেকর্মে প্রতিষ্ঠানে মালিক পক্ষের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়। কর্মচারীদের মধ্যে প্রকাশ্য গোপনে অন্তত দুটো প্রতিপক্ষ তৈরি করে রাখতে তারা স্বস্তি বোধ করেন, যেন বড়ো কোনো প্রতিবাদ গড়ে উঠতে না পারে। ভিন্ন দল হয়ে বিরাজ করলে সহজে কর্মচারীদের বাগে আনা যায়। এক পক্ষকে দিয়ে আরেক পক্ষকে শায়েস্তা করা যায়, যাকে বলে ডিভাইড অ্যান্ড রুল। প্রতিপক্ষের এই ধারণার সফল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তো বটেই ঔপনিবেশিক সরকার দীর্ঘদিন ধরে অবিভক্ত ভারতবর্ষ শাসন করতেও সক্ষম হয়েছিল। ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব ভারতবর্ষকে টুকরো করেও ফেলেছিল।\হপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র তো বটেই, পরিবারেও আপন লোকদের মাঝখানে থাকে কত প্রতিপক্ষ- গোপনে গোপনে। কিশোরপুত্র বা কন্যাটি হয়তো বলতে পারে না তার বাবা-মায়ের অসৎ উপার্জনের কথা, কিন্তু জানে, পারিবারিক আয়ের তুলনায় তার নামডাকওয়ালা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের বেতন বেশি। ছেলেটি বেশ বেড়ে ওঠে কিন্তু সরল কৈশোরেই অভিভাবকের প্রতি ঘৃণা লালন করতে শেখে। এরকম কোনো পরিস্থিতি থেকেই হয়ত 'ঐশী' নামের মেয়েটির মতো মানুষ তৈরি হয়- পিতামাতাকে হত্যা করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলতে যার বাধে না। সংসারের ভিতরে এসব নগণ্য প্রতিপক্ষ সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে ওঠে। সম্পদ সংগ্রহের ইঁদুর দৌড়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা একে একে ঐশীর মতোই কোনো পরিণতিতে পৌঁছাক, এমনটা কে চায়!

পুনশ্চ, কতটা কাম্য ও সুন্দর হতো এই সমাজ যদি নারী এবং পুরুষ পরস্পর প্রতিপক্ষ না হতো? যদি নারীকে শিশুকাল থেকে শুরু করে বার্ধক্যে পৌঁছানো অব্দি ধর্ষণের শিকার হওয়ার আতঙ্ক শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো লালন করতে না হতো, যদি পুরুষ প্রতিপক্ষ সুযোগ পেলেই তার উপরে ক্ষমতার চর্চা করতে না চাইত, যদি একই সমান কাজ করিয়ে তাকে কম অর্থ প্রদানের ভাবনা পুরুষ প্রতিপক্ষের চিন্তাকে কলুষিত না করত? দুঃখজনক হলেও সত্যি, নারীকে এই সমাজে এমনভাবে বাঁচতে হয় যেন ঘরে-বাইরে, দিনে-রাতে পদে পদে প্রতিপক্ষের ভয়। নারীর এই যুদ্ধাবস্থাময় সতর্কতা থেকে প্রতিপক্ষ তাকে ছাড় দেয় না। পৃথিবী অর্থনৈতিকভাবে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে কত সফল হলো, কতরকম সভ্যতার বিকাশ ঘটল, অথচ নারী যেন সেই আদিম যুগের গুহামানব, জঙ্গলে জঙ্গলে যার পদচারণা- যেখানে হায়েনার থাবার ভয় আছে, শিয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবার ভয় আছে। কিছু মানুষকে আবার প্রাকৃতিক বা মানুষের সৃষ্ট যুদ্ধবিগ্রহের কারণেও ঝড়ের রাতের আশ্রয়বিহীন কুকুরের মতো ঝাপটা সামলে পৃথিবীময় নিজের ছোট্ট শরীরটা গুঁজে রাখার স্থান খুঁজতে হয়। হয়তো তারাও কারো ছায়া-প্রতিপক্ষ। নিজ এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া, আবাসস্থল পুড়িয়ে দেয়া উদ্বাস্তু মানুষ যখন খোলা ছাদের নিচে রাত কাটায় তখন চার দেয়াল আর ছাদের ঘেরাটোপে নরম বিছানায় শরীর ওম করা কাউকে কি প্রতিপক্ষ ভাবে?

আর তারপর বাস্তব-অবাস্তবের কত কত প্রতিপক্ষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায় করোনাকালে মাত্র এক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার আশায়। সে মৃত্যু নিয়ে আসে, সে ধনী-দরিদ্র, গৃহহীন আর গৃহীকে পৃথক করতে পারে না। এত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, তাবৎ মানবজাতিকে পক্ষ-বিপক্ষ ভুলিয়ে এক দলে নাম লেখাতে বাধ্য করে। সে এক প্রতিপক্ষই বটে! া

মন্তব্য করুন