ওই ভাঙ্গা মোবাইলডা আমারে দিবেন কাকা, কিন্যা নিমু।

টেবিলের এক কোনে পড়ে থাকা অচল মোবাইলটি দেখিয়ে জানতে চায় জমিলা।

এ কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জবাব দেয় নিতাই পাল,

মোবাইলডা তো ভাঙ্গা। ব্যাডারিও নাই, চলব না।

আমি মেকারের থনে সাইর‌্যা নিমু। শ তিনেক ট্যাকা দিমু, বেইচ্যা দেন কাকা। পোলার লাইগ্যা নিমু।

কী কছ? ওই পুচকা ছ্যারা মোবাইল পাইলে ফাতরা হইয়া যাইব।

পোলায় কেলাস করব। স্কুল বন্ধ। অহন মোবাইলে কেলাস করব কাকা।

এতক্ষণে গার্মেন্টস ম্যানেজার নিতাই পালের কাছে ব্যাপারটা পরিস্কার হয়। তিনি বলতে গেলে খুশিই হন। ছেলের ক্লাস করার জন্য মোবাইলটা দিয়ে দেন। ছেলের ক্লাসের কথা শুনে টাকা তো নিলেনই না, বরং মোবাইল সারার জন্য পাঁচশ টাকা জমিলার হাতে তুলে দেন।

২.

জমিলার স্বামী টাঙ্গাইল শহরে রিকশা চালাত। ভাড়াচালিত রিকশা। এই ভাড়াচালিত রিকশায় তেমন একটা কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। তার চেয়ে নিজে একটা অটোরিকশা কিনতে পারলে ভালো হতো। প্রতিদিনের মহাজনের হিসাব গুনতে হতো না। যতটুকুই রোজগার হতো সবই হাতে থাকত।

পুরোনো ধান্দাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ফজলের। যৌতুকের টাকার জন্য প্রায় প্রায়ই জমিলাকে মারধর শুরু করে দিল। শুধু কথায় চিড়ে ভেজে না। বলা নেই কওয়া নেই একদিন শাদি করে নতুন বউ ঘরে নিয়ে এল। বউয়ের গায়ের রং ভীষণ ময়লা। তা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য শ্বশুরের কাছ থেকে চলে এল আনকোরা একখান নতুন অটোরিকশা।

টিনের চালা ও দরমার বেড়া দেওয়া একটাই মাত্র ঘর ফজলের। একটা মাত্র চকি, তার ওপর কাঁথা পেড়ে স্বামী সন্তান নিয়ে এতদিন শুত জমিলা। নতুন বউ এসে সেই চকি দখল করে নিল। বাপের বাড়ি থেকে আনা নতুন তোশক ও চাদর পেতে ফজলসহ সে চকিতে জায়গা করে নিল। জমিলার স্থান হলো মাটিতে। ছালা বিছিয়ে ছেলেসহ দু'দিন থাকল। এক ঘরে কি দুই বউ রাখা যায়! শরমের ব্যাপার। তিন দিনের দিন জমিলাকে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিল ফজল। এখন যায় কই জমিলা। মাথার ওপর একমাত্র ছাউনিটা ভেঙে গেল।

৩.

এরপর বহু কষ্টে ধারদেনা করে গাজীপুর চলে আসে জমিলা। এখানে একটা পোশাক কারখানায় চাকরি জুটে যায়। বেতন মন্দ না। অল্প টাকায় একটা ঘর ভাড়া নেয়। পোশাক শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি রুম।

ছেলেকে এখানে আবারও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। জমিলার অনেক শখ ছেলে লেখাপড়া শিখে অনেক বড় অফিসার হবে। কিন্তু মাস তিনেক না যেতেই করোনার জন্য দেশের বেবাক স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে বসে থেকে থেকে পড়ায় আর মন বসে না। অনলাইন ক্লাস চালু হলেও সে কি আর স্কুলের মতো হয়।

দু'দিন থেকে জমিলার ভীষণ মন খারাপ। নতুন মাস পড়েছে। হিসাব মতো পুরো মাসের বেতন পাওয়ার কথা। কিন্তু অর্ধেক মাসের বেতন হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। কারখানাটার নাকি পথে বসার অবস্থা। বিদেশ থেকে সময়মতো কাঁচামাল, সুতা আমদানি করতে পারেনি। উৎপাদন খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছে না। যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি ছিল তারা নাকি অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে। আর্থিক সংকটে পড়েছে কারখানাটি। ব্যয়ভার বহন করতে পারছে না। তাই এই চলতি মাস থেকেই বন্ধ হয়ে গেল কারখানাটি।

৪.

খাটের তল থেকে মাটির শূন্য কলসিটা বের করে জমিলা। পাশেই একটা হাঁড়িতে খানিকটা খুদ পড়ে আছে।

দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। খুলে দিতেই দেখে বাড়িওয়ালা। কণ্ঠে তার ক্ষোভ,

ভাড়ার ট্যাকাডা নিতে আইলাম।

আমতা আমতা করে জমিলা,

বেতন পাইলেই-

গেল মাসের আগের মাসের ভাড়াও বাকি আছে। অহন বেবাক ভাড়া শোধ না দিলে ঘর ছাড়ন লাগব কইলাম।

মহা বিপাকে পড়ে জমিলা। কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এ কথা নিশ্চয় তার কানে গেছে।

দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে আবারও আশ্বাস দেয় জমিলা,

মায়নাডি হাতে পাইলেই একলগে দিয়া দিমুনে।

মনে মনে ভাবে সে,

ইহ্‌, ঘরভাড়া! প্যাডের খোরাকই জোডে না আবার ঘর ভাড়া!

ঘরের মেঝেতে বসে মোবাইল নিয়ে অনলাইনে ক্লাস করছে দুলাল। ওর খাতা ফুরিয়ে গেছে। সেদিন কাজে যাওয়ার সময় খাতা আর কলম কিনে আনার কথা বলেছিল, কিন্তু কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথায় মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল জমিলার। ফেরার সময় খাতা আর কলম কেনার কথা মনে থাকেনি।

এ কয়দিন থেকে হন্যে হয়ে কাজ খুঁজেছে জমিলা। এ কারখানা থেকে সে কারখানা, হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোসকা পড়ার অবস্থা, কোথাও কাজ মেলেনি।

হঠাৎ রাহেলার কথা মনে পড়ে। তার চাচাতো বোন রাহেলা আশুলিয়ায় একটা সোয়েটার কারখানায় কাজ করে। অনেক বড় নামকরা গার্মেন্ট। প্রচুর লোক সেখানে কাজ করে। একবার সেখানে চেষ্টা করেই দেখা যাক না যদি সে বলেকয়ে ধরাধরি করে একটা চাকরি জুটিয়ে দিতে পারে।

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে জমিলা। গাজীপুর থেকে আশুলিয়ায় হেঁটে যেতে অনেকটা সময় লাগে। পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ বেলা হয়ে যায়।

বিশাল বড় কারখানা। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ঢুকতে পথেই লোহার গেটে আটকে দেয় দারোয়ান। গেট পাস ও আইডি কার্ড ছাড়া ঢোকা নিষেধ। অনেক অনুনয় বিনয় করে বোনের কথা বলেও কাজ হয় না।

বেশ খানিকটা এগোলেই বড় একটা ছয়তলা বিল্ডিং। সেখানেই রাহেলা ভাড়া থাকে। এখন গেলে দেখা পাওয়া যাবে না। এর চেয়ে কারখানা ছুটি হলে রাতে আসাই ভালো।

সন্ধ্যা হওয়ার অনেক আগেই দুলালকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয় জমিলা। কিন্তু এ বিল্ডিংয়ে এসে হতাশ হতে হয়। করোনার থাবা এ কারখানাতেও আঘাত হেনেছে। তবে বন্ধ হয়ে যায়নি ফ্যাক্টরিটি। এতগুলো শ্রমিকের ব্যয়ভার কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। ফলে কয়েকশ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে কারখানা থেকে। রাহেলাও এর মধ্যে পড়ে। চাকরি চলে যাওয়ায় সে আর এখানে থাকে না, দেশের বাড়ি চলে গেছে।

৫.

বিকেল থেকে আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে। যে কোনো সময় ঝামড়ে বৃষ্টি নামবে। বিছানা, কাঁথার পুঁটলি, হাঁড়িকুড়ি নিয়ে বিল্ডিংয়ের বাইরে বারান্দার এক কোনে জবুথবু বসে আছে জমিলা। সঙ্গে তার ছেলে দুলাল। ভাড়ার টাকা দিতে না পারায় ঘর থেকে বের করে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। বালিশ বিছানা ছুড়ে ফেলে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে। শুধু মোবাইলটা আটকে রেখেছে। মোবাইলের জন্য খুন খুন করে কাঁদছে দুলাল।

রাস্তার দু'পাশে খোলা ফুটপাত। পাশেই সার সার দোকান। রাত গাঢ় হয়ে এলে দোকানগুলোতে শাটার পড়ে যায়। বৃষ্টি নামতেই দোকানের শেডের নিচে আশ্রয় নেয় ওরা। শোনা যাচ্ছে কাল সকাল থেকে নাকি লকডাউন।

অদূরে একটা মুদি দোকানে টিম টিম করে আলো জ্বলছে। বৈদ্যুতিক আলো চলে গেছে। একটু পড়েই ঝাপ ফেলবে দোকানটি। আঁচলের খুঁটে বাঁধা মাইনের শেষ সম্বল। লকডাউনে দোকান বন্ধ থাকলে খাবে কী? এক দৌড়ে গিয়ে দোকানটি থেকে একটা পাউরুটি আর মুড়ির প্যাকেট কিনে নিয়ে আসে জমিলা।

রাত নিশুতি হয়ে এলে ফুটপাত ঘেঁষে দোকানের শেডের নিচে ঘুমায়। লাইটপোস্টের নিচে অসংখ্য দেয়ালি পোকার বাদামি পাখা পড়ে থাকে।

ভোরের দিকে ঘুমটা যেন বেশি গাঢ় হয়ে এসেছিল। আচমকা একটা লাঠির আঘাত কোমরে এসে লাগে। ঘুম ভেঙে যায় জমিলার। আজ সকাল থেকে লকডাউন শুরু। ফুটপাতে কাউকে থাকতে দেবে না। পুলিশ হুইসেল দিয়ে লাঠি মেরে ফুটপাত থেকে সবাইকে তুলে দিচ্ছে। দুলাল মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। পুলিশের লাঠির বাড়িটা তার মাথায় লেগেছে। ফুলে গেছে জায়গাটা।

জমিলার বুকের ভেতরটা পোড়ে, কাছে টেনে নেয় ছেলেকে,

আয় বাপ আমার, ফুলা জায়গাডায় ছ্যাপ দিয়া ডইল্যা দেই, বিষ করব না আর।

ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে দু'জন। কোথায় যাবে ওরা, এতবড় দুনিয়ায় যাওয়ার জায়গা নেই।

স্টেশনে রেললাইনের ধার ঘেঁষে ছোট ছোট ঝুপড়ি, কাপড় টাঙিয়ে থাকার ব্যবস্থা। একেকটা কালভার্ট রিঙে পুরো সংসার পেতেছে কেউ। রেললাইনের এধার থেকে ওধার পর্যন্ত পুরো জায়গাটা চক্কর দিয়ে বেড়ায়। যদি একটা ফাঁকা কালভার্ট রিং মিলে যায়। স্টেশনের একেবারে শেষ মাথায় রেললাইনের পাশে নর্দমার ধার ঘেঁষে একটা রিং ফাঁকা পড়ে আছে। মা-বেটার মাথা গোঁজার জন্য আপাতত এই যথেষ্ট।

ভেতরে ঢুকেই পুঁটলি থেকে পাউরুটি বের করে দুলাল। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে তার।

রাত গভীর হলে একটা বজ্রকণ্ঠের চিৎকার শোনা যায়। কেউ যেন লাঠি দিয়ে রিংয়ের গায়ে জোরে জোরে আঘাত করছে আর চোপা ঝাড়ছে।

ক্যাডায় রিংয়ের ভিতরে হান্দাইছে। কোন মাগি চুৎমারানির পুত হান্দাইয়া আছে। বাইর হ কইলাম। দখলদারি নিতে মালপানি ঝাড়তে অইব।

ছেলেসহ বের হয়ে আসে জমিলা। সামনে দাঁড়িয়ে এলাকার কালু মাস্তান। পান খাওয়া দাঁত বের করে খিস্তি ঝাড়ে।

মাথার ওপর ঘন কালো মেঘের শামিয়ানা। খানিক বাদেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। জমিলার কাঁথা বালিশ ভিজে যায়। নর্দমার ধারে বড় বড় কচু গাছ। মাথার ওপর দুটো বড় পাতা ছাতার মতো আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু'জনে ভিজতে থাকে।

৬.

আজ সকাল থেকে দুলালের কোনো খোঁজ নেই। সারাদিন পেটে কোনো দানাপানি পড়ে নাই পোলাডার। লকডাউনে স্টেশনের ধারের হোটেলগুলো সব বন্ধ। খোলা থাকলে বাসন মেজে দু'জনের জন্য দুটো রুটি ডাল ঠিকই জুটে যেত। অভুক্ত থাকতে হতো না। আজকাল করোনার জন্য বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজে কেউ নেয় না। এখানে সকলেরই অভাব, কে কাকে খেতে দেয়।

ভীষণ চিন্তা লাগে জমিলার, অচেনা জায়গায় কোনহানে গেল পোলাডা।

ঠিক সন্ধ্যার মুখে মুখে ফিরে আসে দুলাল। হাতে তার কেজিখানেক চাল আর আলু।

অবাক চোখে তাকিয়ে জানতে চায় জমিলা,

হারাদিন কোনহানে আছিলি, এডি কই পাইছস?

দুলালের কণ্ঠে দ্বিধা। থেমে থেমে সভয়ে উচ্চারণ করে সে, আগের বাইত থনে- মোবাইলডা বেইচ্চা দিছি মা। হারাদিন কাঁচাবাজারে আছিলাম- সবজি ব্যাচলাম।

খানিকক্ষণ থামে সে, কোনো কথা বলতে পারে না। তারপর খানিকটা দম নিয়ে সে বলে, ট্যাকাডা ধরো মা।

জমিলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ফিসফিস কণ্ঠে উচ্চারণ করে, হ্যাষম্যাষ ফোনডা বেইচ্চা দিলি বাপ? অহন পড়বি ক্যামনে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেয় দুলাল, আগে প্যাট। প্যাটে বাঁচলে ফোন, কেলাস, পড়া, বই হগলডা এমনিতেই বাঁচব মা।

ভরা আষাঢ়। এতক্ষণের টিপটিপানি বৃষ্টিটা এবার ঝামড়ে নেমে এলো। ভিজে যাচ্ছে ওরা। সামনেই একটা সদ্য ভাড়া খালি হওয়া ঝুপড়ি ঘর।

তাড়া দেয় দুলাল, লও যাই মা। ওই ঝুপড়িডার ভিতরে গিয়া আগে মাথা বাঁচাই।

মন্তব্য করুন