সাহিত্যের জন্য এ বছর নোবেল পুরস্কার পেলেন তাঞ্জানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তার নোবেল প্রাপ্তি অপ্রত্যাশিত। পুরস্কার ঘোষণার আগের সপ্তাহে যে কুড়ি-পঁচিশ জন সম্ভাব্য নোবেল প্রাপক সাহিত্যিককে নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল তাতে কোথাও তার নামোল্লেখ ছিল না। তবে যুক্তিসঙ্গত কারণে সবার ধারণা হয়েছিল যে, এ বছর নোবেল কমিটি ইয়োরোপ-আমেরিকার বাইরে এশিয়া বা আফ্রিকা থেকে কাউকে সাহিত্যে নোবেলের জন্য নির্বাচন করবে। আরও একটি অনুমান ছিল যে বব ডিলান, স্বেতলানা আলেক্সিয়েভিচ, পিটার হানৎকা প্রমুখকে পুরস্কার দিয়ে গত কয়েক বৎসরে যে সমালোচনার শিকার হয়েছে সুইডিশ একাডেমি, এবার সেরকম সমালোচনা উস্কে দেয়ার মতো কাউকে মনোনীত করা হবে না। এই অনুমান মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি।

১৯৮৭ সালে প্রথম উপন্যাস প্রকাশ থেকে শুরু ক'রে আফ্রিকী সাহিত্যে আবদুলরাজাক গুরনাহ'র ধারাবাহিক অবদান ক্রমশ স্বীকৃতি লাভ করেছে। আফ্রিকা'র, বিশেষ ক'রে পূর্ব আফ্রিকা'র মানুষ ও সমাজের স্বরূপ তার উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে অনন্যসাধারণভাবে প্রকটিত হয়েছে। ১৯৯৪ সালে চতুর্থ উপন্যাস 'প্যারাডাইজ' ('স্বর্গ') বুকার পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হলে বিশ্বব্যাপী তার সম্বন্ধে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এরপর একদিকে যেমন তার উপন্যাসের বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে তাকে নিয়ে ইউনিভার্সিটিগুলোয় ব্যাপক গবেষণা ও লেখালিখি সম্পাদিত হয়েছে।

আবদুলরাজ্জাক গুরনাহ'র জন্ম পূর্ব আফ্রিকার উপকূলবর্তী জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জে, ১৯৪৮ সালে। ১৯৬৪ সালে জাঞ্জিবারে আরব তথা মুসলমানবিরোধী রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছু পরে তিনি তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডে চলে এসেছিলেন। তখন তার বয়স সতেরো-আঠারো, কিছুদিন আগে মাধ্যমিকের পড়ালেখা শেষ করেছেন মাত্র। তার এক চাচাতো ভাই তখন কেন্ট-এ থেকে পড়াশোনা করছিলেন। এই চাচাতো ভাই তাদের ইংল্যান্ডে বসবাস করতে সাহায্য করে। এখানেই লেখাপড়া করেন গুরনাহ। ১৯৮২ সালে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেন শিক্ষকতাকে। কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়েই ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু ক'রে ২০১৭ সালে অবসরগ্রহণ অবধি এক নাগাড়ে অধ্যাপনা করেছেন। এখনও সংযুক্ত রয়েছেন এমিরিতুস অধ্যাপক হিসেবে।

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক হিসেবে আবদুলরাজাক গুরনাহ জীবনের শুরু থেকেই সাহিত্যের কারবারি। যখন তিনি তার প্রথম উপন্যাস 'প্রস্থানের স্মৃতি' লিখতে শুরু করেন, তখন তার বয়স সাঁইত্রিশ পার হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে তিনি জীবনে সুস্থিত, বাস করছেন নিশ্চিত এক পরিবেশে, জাগতিক সকল সুবিধা তার দোরগোড়ায় উপস্থিত। অন্যদিকে নাইজেরিয়ার বেয়ারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর অধ্যাপনার সূত্রে শৈশবে হূত আফ্রিকার স্মৃতি তরতাজা ক'রে সবে ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করেছেন।

বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গেও ঘটেছে নিবিড় পরিচয়। আফ্রিকী সাহিত্য পড়েছেন, চিন্তাভাবনা করেছেন ও লিখেছেন। ওলে সোয়িঙ্কা, চিনুয়া আচেবে, ন্যাডেইন গর্ডিমা, জন ম্যাক্সওয়েল কুৎজিয়া, নুরুদ্দিন ফারাহ, বেন ওকরি, সবার গল্প-উপন্যাস পড়ে আফ্রিকী সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অর্জন করেছেন সম্যক ধারণা। বলা যায় একধরনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়েই আবদুলরাজাক গুরনাহ উপন্যাসের জগতে প্রবেশ করেছেন।

২.

আবদুলরাজাক গুরনাহ'র প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে, নাম 'মেমোরি অফ ডিপারচার' ('প্রস্থানের স্মৃতি')। তার সাম্প্রতিকতম উপন্যাস 'আফটারলাইভস্‌' (উত্তরজীবন) প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। এ যাবৎ তার দশটি উপন্যাস একে একে প্রকাশিত হয়েছে।

'মেমোরি অফ ডিপারচার' কিশোর হাসানের কাহিনী। তার জন্ম দরিদ্র পরিবারে। তাদের বসবাস জাঞ্জিবারের সমুদ্র উপকূলবর্তী এমন এলাকায়, যা পাড়ার মাস্তানদের হট্টগোল, মাতালদের চেঁচামেচি, গণিকালয়ের শোরগোল, ঠগ-জোচ্চোরদের উৎপাত, সাধারণ মানুষের নিঃসংকোচ খিস্তিখেউড়িতে উন্মাতাল।

হাসানের বাবা গুন্ডাটাইপের মানুষ। তিনি জ্যেষ্ঠপুত্রকে পিটিয়ে শয্যাশায়ী ক'রে ফেলতে ইতঃস্তত করেন না। প্রায়ই সন্ধ্যা হলে বেরিয়ে পড়েন গলিঘুপচিতে সস্তা গণিকার সন্ধানে। হাসানের বোন জাকিয়া নির্দি্বধায় ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে যায় খদ্দেরের সন্ধানে। স্কুলের বড় ভাইরা ছোট ক্লাসের ছেলেদের অকাতরে বলাৎকার করে। ঠগ, জোচ্চর, বাটপার আর লম্পটদের স্বর্গ এই এলাকা। হাসান এই নরক থেকে পরিত্রাণ চায়।

মা তাকে কেনিয়ায় ব্যবসায়ী মামার কাছে পাঠান অর্থ-সাহায্যের আশায়। এই টাকা দিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করবে। কিন্তু তার আশা পূরণ হয় না। মামাতো বোনের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করার অপবাদ দিয়ে তাকে বের ক'রে দেয়া হয় বাসা থেকে। রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হয়। শূন্যহাতে সে জাঞ্জিবারে প্রত্যাবর্তন করে। তারপর একদিন এক জাহাজে চাকরি নিয়ে পালায়।

'পিলগ্রিম'স ওয়ে' ১৯৮৮ তে প্রকাশিত গুরনাহ'র দ্বিতীয় উপন্যাস। এ উপন্যাস কৃষ্ণাঙ্গ দাউদ-এর কাহিনী। সে আফ্রিকা থেকে লন্ডনে এসেছে ভাগ্যের অন্বেষণে। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে কাজ করে সে। বলা যায় ক্লিনার, নামে যদিও অর্ডারলি। এমনকি অপারেশনের আগে রোগীর যৌনকেশও কখনও কখনও তাকে পরিস্কার করতে হয়। পদে পদে সে জাতিভেদের গঞ্জনা অনুভব করে। কখনও নিঃশব্দ, কখনও উচ্চকিত অপমান তাকে প্রতিনিয়ত ধাওয়া করে। শ্বেতাঙ্গ শহরে সে একজন অগ্রহণযোগ্য কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু সে সব সহ্য করে নেয়। সে তাঞ্জানিয়ায় প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবে না- প্রতিকূলতার মধ্যেই লন্ডনে টিকে থাকতে চায়। এর মধ্যেও সে শ্বেতাঙ্গ নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে সক্ষম হয়। তারপর তার জীবনে ক্যাথেরিনা আসে। ক্যাথেরিনা দাউদকে আত্মকরুণার ফাঁদ থেকে উদ্ধার করতে চায়। কিন্তু গুরনাহ'র উদ্দেশ্য এই দেখানো নয় যে প্রণয় মানুষে-মানুষে জাতিভেদ দূর ক'রে দেয়। বরং তিনি প্রকটিত করে দেখিয়েছেন যে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কও বৈষম্য আর পূর্বসংস্কার ঘুচিয়ে দিতে পারে না। উপন্যাসটির অবয়ব নির্মিত হয়েছে দাউদের এবং পরে ক্যাথেরিনার জীবনের অসংখ্য গল্পের সমবায়ে।

২০১৭ সালে গুরনাহ'র নবম উপন্যাস 'গ্রাভেল হার্ট' ('পাথর হৃদয়') প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসের পটভূমি সত্তর দশকের জাঞ্জিবার। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সালিম-এর বয়স যখন সবেমাত্র ৭, তখন তার বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তার মা বলেন, বাবা কয়েক দিনের জন্য অন্যত্র গিয়েছে এবং অচিরেই ফিরে আসবেন। প্রকৃতপক্ষে সালিমের বাবা শহরের অন্যপ্রান্তে ঘর ভাড়া নিয়ে পৃথক জীবন শুরু করেন। তাদের সুখী পরিবারটা কেন ভেঙে গেল তা সালিম বুঝে উঠতে পারে না। সে অনুমান করে মায়ের জীবনাচরণে কিছু সমস্যা রয়েছে, কিন্তু বিচ্ছেদের প্রকৃত কারণ তার কাছে অধরা থেকে যায়।

তার আমীর মামা তাকে লন্ডনে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দিলেন। জাঞ্জিবার থেকে লন্ডনে এসে সে কেমন যেন ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। লন্ডন তার কাছে ভিনদেশ, সে এখানে ভিনদেশি আগন্তুক। সালিম ঠাহর করে উঠতে পারে না কী ক'রে খাপ খাইয়ে নেবে। লেখাপড়া শেষ ক'রে সে চাকরি পেয়ে যায়। লন্ডনে তার বন্ধু-বান্ধবের অভাব নেই; কিন্তু সে নিজেই যেন মানিয়ে নিতে পারে না। তার দুটি দেশ: জাঞ্জিবার ও ইংল্যান্ড। কিন্তু তার কোনো 'বাড়ি' নেই। সে উন্মূল, উদ্বাস্তু, বিদেশি।

বাবা-মা'র আকস্মিক বিচ্ছেদের অজানা রহস্য তার চেতনার অন্তঃস্থলে অক্ষত থাকে। উপন্যাসের সর্বশেষ অধ্যায়ে এই রহস্য উন্মোচন করেন গুরনাহ। শেষ অধ্যায়ের কথা বাদ দিলে বিচ্ছেদের কারণটিকে উহ্য রেখেই তিনি নানা ঘটনায় উপন্যাসের আখ্যানভাগ গঠন করেন। ক্ষমতার বৈষম্য, শ্রেণিবিভেদ, লিঙ্গ ও ভালোবাসার অসামঞ্জস্য ইত্যাদি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কে যে নৈয়ায়িক ভূমিকা রাখে, তা গুরনাহ ধীরগতিতে ফুটিয়ে তুলেছেন অজস্র ঘটনার মধ্য দিয়ে।

'আফটারলাইভস' ('উত্তরজীবন') আবদুলরাজাক গুরনাহ'র দশম উপন্যাস। এটিকে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায়; কারণ এর কালিক পটভূমি বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ।

প্রধানত যে দুটি দেশের ঔপনিবেশিক শাসনে কবলিত ছিল আফ্রিকার অধিকাংশ ভূভাগ সে দুটি দেশ হলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স। আর পাঁচটি দেশের মধ্যে জার্মানি অন্যতম। নামিবিয়া, ক্যামেরুন, টোগো, কেনিয়া এবং তাঞ্জানিয়ার কিছু অংশকে উপনিবেশ হিসেবে দখল ক'রে রেখেছিল জার্মানি। জার্মানির উপনিবেশ তাঞ্জানিকা (পরে তাঞ্জানিয়া) এ উপন্যাসের পটভূমি।

জার্মানদের নিষ্ঠুর শাসনে আফ্রিকার মাটি রক্তরঞ্জিত হয়ে গেছে, নিপীড়িত মানুষের চিৎকারে আকাশবাতাস পরিকীর্ণ, চারদিকে ছড়ানো মানুষের মাথার খুলি আর হাড়গোড়। এ রকম একটা সময়ে ব্যবসায়ী আমুর বিয়াশারার সঙ্গে খলিফার পরিচয় হলো। তখন তার বয়স ছাব্বিশ বৎসর। কিছু কাল পরে খলিফা যখন বিয়াশারার ভাগ্নী আশার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলো সেটা ১৯০৭। অন্যদিকে ইলিয়াসকে চুরি ক'রে জার্মানি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের রণনিনাদ বেজে উঠলে ইলিয়াস সাগ্রহে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। যুবক ইলিয়াস এক সময় তাঞ্জানিকায় ফিরে আসে। খলিফাদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। আড্ডায় ইলিয়াস জার্মানদের পক্ষ নিয়ে কথা বললে সবাই চুপ ক'রে যায়। একজন শুধু মুখ খুলে বলে, 'দোস্ত, ওরা তোর মাথাটা খেয়ে ফেলেছে।'

তারপর ইলিয়াসের বোন আফিয়ার গল্প আমরা শুনতে পাই। সে লেখাপড়ায় খারাপ বলে বাসায় তাকে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। সে ইলিয়াসের বন্ধু খলিফার শরণাপন্ন হয়। সে ওদের পরিবারেই থাকতে থাকে। এর মধ্যে শুরু হয় হামজার কাহিনি। হামজাকে শৈশবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। শৈশবের শহরে ফিরে এসে সে শুধু চায় কোনোরকম বেঁচে থাকার মতো একটি জীবিকা আর সুন্দরী আফিয়াকে। হামজা জন্মগতভাবে কোমলস্বভাবী মানুষ হলেও সে জার্মান যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। তাকে নিয়োগ করা হয়েছিল এক জার্মান সেনাকর্মকর্তার ব্যক্তিগত চাকর হিসেবে। এই অফিসার বিশ্বাস করত আফ্রিকী মানুষদের মধ্যে ত্রাস সঞ্চার করতে পারলেই তাদের ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হামজা তাঞ্জানিকায় ফিরে এলে হামজা ও আফিয়ার মধ্যে প্রণয় শুরু হয়।

মানুষ কীভাবে তার মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তা নানাভাবে চিত্রিত হয়েছে গুরনাহের লেখনীতে। মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কিন্তু মূলের কথা কখনও সে ভুলে যায় না। অন্যদিকে ভিনদেশে গিয়ে বসতি স্থাপনকারী মানুষের বৈদেশিকতা কখনও ঘুচে যায় না। বস্তুত অভিবাসী মানুষ মৃত্যু অবধি নিরাশ্রয় থেকে যায়। গুরনাহ দেখিয়েছেন দারিদ্র্য, শত্রুতা, প্রতিকূলতার দুর্দশা থেকে পরিত্রাণের কোনো চাবিকাঠি অভিবাসন নয়।

৩.

সাহিত্য ইতিহাস নয়, কিন্তু আবদুলরাজাক গুরনাহের রচনায় পরিলক্ষিত হয় গভীর সত্যানুসন্ধিৎসা। তিনি অসহায়, উন্মূল, উদ্বাস্তু মানুষের জীবনসংগ্রামের অনুপুঙ্খ গাথা রচনায় উন্মুখ। তার রচনায় প্রত্যক্ষ হয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পরিব্যাপ্ত চিহ্ন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অবলম্বন করলেও তার কোনো উপন্যাস আত্মজৈবনিক কাহিনি নয়।

স্মৃতি হচ্ছে তা মানুষ ভুলে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে। এক সাক্ষাৎকারে গুরনাহ বলেছেন তার আফ্রিকার স্মৃতি জীবন্ত। গুরনাহ সেই স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন তথ্য ও কল্পনার সুষম সংযোজনে। সম্ভবত অন্যদের অভিজ্ঞতাও সংযোজিত হয়েছে যথাস্থানে। তার উপন্যাসের অবয়ব কার্যত অসংখ্য টুকরো গল্পের ঘন বুনোট। তার উপন্যাসগুলোর আখ্যানভাগ বিকশিত হয় প্রোটাগনিস্টদের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে। এটি গুরনাহ'র একটি বিশিষ্ট রচনাশৈলী।

মানুষের স্মৃতি ও স্মৃতিচারণ অতীত ইতিহাস পুনর্গঠনে মৌলিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

বলা যেতে পারে : মানুষের স্মৃতিও ইতিহাস, ইতিহাসও একরূপ স্মৃতিচারণ। কিন্তু স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে রক্তমাংস মানুষের অস্তিত্বের আনন্দ ও উল্লাস, আর্তনাদ ও হাহাকার যেভাবে চিত্রায়িত হয় ইতিহাস তা ধারণ করতে পারে না। ইতিহাসের এমতরূপ সীমাবদ্ধতা স্মৃতিচারণভিত্তিক গল্প বয়নের মধ্য দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেছেন আবদুলরাজাক গুরনাহ।

৪.

তার সব রচনার মধ্যে- 'প্রস্থানের স্মৃতি' (১৯৮৭) থেকে 'উত্তরজীবন'(২০২০) পর্যন্ত- একটি সাধারণ সূত্র পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব আর তা হচ্ছে সমাজের স্তরে স্তরে ক্ষমতার অস্তিত্ব ও তদোদ্ভূত নিপীড়ন। মানুষ মানুষকে নিপীড়ন করে, নির্যাতন করে, এর জন্য প্রয়োজন হয় ক্ষমতার। এই ক্ষমতা কেবল সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ক্ষমতা নয় বা কেবল নয় রাষ্ট্রের শক্তি। এই ক্ষমতা সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিলক্ষ্য করেন গুরনাহ। তিনি দেখিয়েছেন একজন দরিদ্র মানুষ তার চেয়েও হতদরিদ্রের ওপর চোটপাট করে। তিনি দেখিয়েছেন দুর্বলতম মানুষ তার চেয়েও দুর্বল কাউকে পেলে তার ওপর চড়াও হয়। এই নিপীড়ন কখনও আর্থিক শোষণ, কখনও নিষ্ঠুর দৈহিক আক্রমণ, কখনও তীব্র গালিবর্ষণ।

গুরনাহ লক্ষ্য করেছেন, এখানে শারীরিক সামর্থ্যের একটি ভূমিকা রয়েছে। শারীরিক সামর্থ্যের কারণেই একজন পিতা পেটাতে পেটাতে নিজের জ্যেষ্ঠ সন্তানকে মাটিতে শুইয়ে ফেলতে পারে। শারীরিক সামর্থ্যের কারণেই একজন স্বামী তার অসুস্থ ছেলেকে পাশ ঠেলে স্ত্রীর কাঙ্গা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে সঙ্গমে নিরত হতে পারে। শারীরিক সামর্থ্যের বলেই স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্র নিচু ক্লাসের অসহায় ছাত্রের প্যান্ট খুলে নিতম্বের রল্প্রেব্দ প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে নুড়িপাথর।

৫.

আবদুলরাজাক গুরনাহ উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপক; কিন্তু তাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক ঔপন্যাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে তিনি এই অভিধা অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে উত্তর-ঔপনেবিশক লেখক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে নারাজ।

এ কথা এক অর্থে ঠিক যে, লেখক হিসেবে তার আবির্ভাব উত্তর-ঔপনেবিশক কালে হলেও যে অর্থে সাহিত্যের ক্ষেত্রে উত্তর-ঔপনেবিশক তকমাটি সেঁটে দেয়া হয় তিনি সে পথে হাঁটেন না। তার বিভিন্ন উপন্যাসের আখ্যানে পাঠক প্রত্যক্ষ করেন যে মানুষের দুরবস্থার জন্য তিনি দীর্ঘকালের ঔপনিবেশিক শাসনকে দায়ী না করে জীবনের অমোঘ ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে প্রকটিত করেছেন। তার প্রথম উপন্যাস 'মেমোরি অব ডিপারচারের' প্রোটাগনিস্ট কিশোর হাসানের বাবা ওমরের কথা যদি বিবেচনা করা যায়, তবে এ ক্ষেত্রে আর যাই হোক ঔপনিবেশিক প্রভাবকে দায়ী করার অবকাশ নেই। হাসানের যে দুর্দশা ও পরিণতি তা যতটা অবশ্যম্ভাবী, যতটা সমাজ ও সংস্কৃতি নির্ধারিত বলে মনে হয়, তার সঙ্গে আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনের কোনো যোগসূত্র নির্ণয় করা কঠিন।

ওলে সোয়িঙ্কা, চিনুয়া আচেবে এবং গুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর উপন্যাসে উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার যে বয়ান আমরা দেখি, আবদুলরাজাক গুরনাহ তাতে নিজেকে সংযুক্ত করেননি। তার পূর্বসূরিরা মুক্ত আফ্রিকায় জনমানুষের সুখ ও শান্তি নিয়ে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন- সে রকম কোনো আশাবাদ উচ্চারণ করেন না গুরনাহ। সমাজের গহন বুনোটে যে পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্র, জাতিভেদ ও ক্ষমতালিপ্সার গভীর শেকড় প্রসারিত হয়ে বিদ্যমান সে বিষয়ে আমাদের সচেতন করেছেন গুরনাহ।

চিনুয়া আচেবে থেকে শুরু করে গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো অবধি প্রায় সকল আফ্রিকী লেখক ঔপনিবেশিকতার জাতীয়তাবাদী উপাখ্যান উপস্থাপন করেছেন। আবদুলরাজাক গুরনাহের অভিমুখ এর বিপ্রতীপে, যেখানে তিনি ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। কথাসাহিত্যিক হিসাবে গুরনাহ'র দায় বিদেশি শাসকদের হাতে বিকৃত ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করা নয়। স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে অতীতাশ্রিত বাস্তবকে পুনর্গঠন করার প্রয়াস নিয়েছেন।

আধুনিকতাবাদী একজন লেখক শুচিতাসন্ধানী ও কল্যাণকামী। প্রত্যক্ষ হয়, গুরনাহ'র রচনার অভিমুখে এই ধরনের কোনো শুভনৈতিক প্রণোদনা নেই। তার দৃষ্টিকোণ নির্মোহ। তার বয়ানে জগৎ-সংসারের যে উলঙ্গ-রূপ ফুটে ওঠে তার পাঠোদ্ধারের ভার তিনি পাঠকের কাঁধে ন্যস্ত করে রেখেছেন।

মন্তব্য করুন