শৈশবে শুনতাম, আরব দেশে এক সময় আইয়ামে জাহেলিয়াত ছিল। আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। এটা আমার শিশুমনে খুব প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল যে, কোনো বাবা-মা বা পরিবার কন্যাসন্তানকে কীভাবে পুঁতে ফেলতে পারত? আমার কাছে এটা একটা প্রশ্ন ছিল।

পরে অবশ্য জেনেছি যে, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকার যুগে কন্যাসন্তানকে পুঁতে ফেলা একটি অস্বাভাবিক ঘটনাই ছিল। যেমন এখন আমরা কখনও কখনও শুনতে পাই পিতা কর্তৃক সন্তান হত্যার ঘটনা, নির্যাতনের ঘটনা বা নারী সন্তানকে হত্যা করা হচ্ছে। এ রকমটা পৃথিবীতে আমরা শুনতে পাই কিন্তু এগুলো সমাজের ব্যতিক্রমী ঘটনা।

ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা কেন ঘটে? নানা কারণে ঘটতে পারে। এর মধ্যে একটি কারণ মনস্তাত্ত্বিক, যারা কন্যাসন্তানকে নির্যাতন বা হত্যা করে কিংবা করার কথা ভাবে তারা মূলত অ্যাবনরমাল, মানসিকভাবে স্বাভাবিক প্রকৃতির নয়। তবে এই মনস্তাত্ত্বিক বিকলন শুধু কন্যাশিশুর ক্ষেত্রেই হচ্ছে এমন নয়, কন্যাদের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। কীভাবে হচ্ছে তার একটি উদাহরণ দিই- ঢাকা শহরে গৃহপরিচারিকা নামে যেসব বাচ্চা কাজ করে, আপনি দেখবেন প্রতিটা পরিবারে একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের নির্যাতন করা। হয়তোবা ১০০ পরিবারের পাঁচটা পরিবারে কাজের মেয়েরা মানুষের মর্যাদা নিয়ে থাকে কিন্তু বাকি ৯৫ ভাগ পরিবারে যারা কাজ করে, তারা আসবাবপত্রের মতো হয়ে যায়। অনেকে বলবেন, না, আমরা তো ভালো ব্যবহার করি। ভালো ব্যবহার করা আর মর্যাদা দান করা এক জিনিস নয়। তাকে নিয়ে আপনি একই ডাইনিং টেবিলে বসে খাবেন না, অতিথি এলে পরিচয় করিয়ে দেবেন না, ডেকে নিয়ে একসঙ্গে টিভি দেখবেন না, সে কর্নারে বসে চুপিচুপি দেখছে একটা অনুষ্ঠান। মানে তাকে আপনি সন্তানের মতো মূল্য দিতে রাজি না। এটি ৯৫ ভাগ পরিবারে ঘটে।

গার্মেন্ট কারখানায় কন্যাশিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে, এখন অবশ্য ১৮ বছরের কম শিশুদের চাকরি দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু ১৮ হয়ে গেলেই কি কন্যাশিশু কন্যার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? অবশ্যই হবে না। সেখানে কিন্তু নানারকম শোষণ চলছে, অন্যায় চলছে। তারা যে পরিমাণ কাজ করছে, সেই পরিমাণ পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। পেলেও মূল্যায়ন পাচ্ছে না। একটা শ্রমজীবী স্বাধীন মানুষের যে মূল্যায়ন, সেটা কিন্তু তাদের দেওয়া হচ্ছে না। আপনি এখন আসেন পরিবারের মাঝে নারীর অবস্থান নিয়ে। কারণ, কন্যাসন্তানরা তো কিছুকাল পরেই নারীতে পরিণত হবে এবং তারা কোনো কোনো পরিবারে গৃহবধূ হিসেবে যায়। তারা কি ওই পরিবারে গৃহীত হয়? আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু তিক্ত।

কারণ, যে নারী বধূটি আসে আরেকটি বাড়ি থেকে, সে কিন্তু ওই পরিবারে গৃহীত হয় না। তাকে নিয়ে ননদরা দেখা যায় দল পাকিয়ে ফেলে। এই যে গৃহবধূ, সে একা হয়ে ওঠে। অনেক সময় স্বামীও তার পক্ষে থাকে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই পরিবারের ননদরা যখন আরেকটি পরিবারে বধূ হয়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রে কিন্তু একই বাস্তবতা অপেক্ষা করে। যে কারণে একটি জোক আছে, যে আমার মেয়ের জামাইটা খুবই ভালো। আমার মেয়ের কথায় উঠেবসে কিন্তু আমার ছেলেটা খুবই বদমাশ, সে তার বউয়ের কথা ছাড়া কিছু করে না, কোথাও যায় না। এই বৈপরীত্যটুকু, আমাদের সমাজে এটি কিন্তু আছে।

প্রশ্নটা হচ্ছে- কেন এই বৈষম্য, কেন এই নির্যাতন? এর আসল কারণটা কী? একবাক্যে যদি বলতে হয় সেটি হচ্ছে সচেতনতার অভাব। কনশাসনেস। আমি সচেতনতা কথাটি অন্য অর্থে ব্যবহার করছি। চেতন মানে কী? চেতন মানে হচ্ছে মানুষ হিসেবে যে আমি একজন মানুষ, এই বোধটুকুকে বলা হয় সচেতনতা যে আমি একজন মানুষ। আমার চেতনা আছে, দুঃখ-বেদনা আছে, আমার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আছে। যখন আমি এটা ফিল করি, তখন আপনার আছে- সেটাকে আমি মেনে নিই। আমি পুরুষ হিসেবে আমার আছে, নারী হিসেবে নারীরও একই রকম অনুভূতি আছে। মানবিক চাহিদা, তৃষ্ণা, বেদনা দুঃখ-বিরহ এগুলো নারীর আছে। এটা আমি তখনই ফিল করতে পারি, যদি আমার অনুভূতিগুলো আমি অনুধাবন করতে পারি, অনুভব করতে পারি, শনাক্ত করতে পারি। আমাদের প্রধান সমস্যাটা হচ্ছে, পুরুষরাই তাদের চাওয়া-পাওয়া, আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারে না। তারা সচেতন না। তারা যখন সচেতন না, তখন নারীর প্রতি যে সচেতন আচরণ দেখানো, তারা সেটা থেকে ব্যর্থ হয়। অতএব, নারীবাদীরা যেভাবে সমস্যাটা দেখে, আমি একটু আলাদা জায়গা থেকে দেখার চেষ্টা করছি যে পুরুষ যতদিন সচেতন না হবে, আত্মসচেতন না হবে, নিজেকে বুঝতে না পারবে, নিজের আনন্দ অনুভূতি বুঝতে না পারবে, ততদিন সে নারীকে বুঝতে পারবে না, বুঝে উঠতে পারবেন না।

অতএব, সমস্যাটা আমার নারী-পুরুষের সমস্যা বলে মনে হয় না, মনে হয় এটা মানব সম্প্র্রদায়ের সমস্যা। যে মানব সম্প্রদায় নিজেকে বুঝতে পারছে না।

যখন আপনি আপনার তৃষ্ণা বুঝতে পারবেন, তখন আপনি অন্যের তৃষ্ণাও বুঝতে পারবেন। আপনাকে যদি একটা চড় মেরে দিই, গালে আপনি যতটুকু ব্যথা পাবেন, শরীরে তার চেয়ে বেশি দুঃখ পাবেন মনে যে আমাকে অপমান করল। এই বোধগুলো যখন পুরুষের আসবে তখন তারা নারীকে বুঝতে পারবে।

পৃথিবীতে আজকে ভয়ংকরভাবে সচেতনতার অভাব। আর এই সচেতনতা শব্দটি আমরা নষ্ট করে ফেলেছি। এর মানে আর কিছু না। এর মানে হচ্ছে, নিজের সত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। আমাদের পুরুষ সারা পৃথিবীতে সত্তার অনুসন্ধান নেই। সত্য তখনই পাওয়া যায় যখন সত্তা থাকে, যখন পুরুষ সত্তাকে অনুভব করতে পারে। অতএব আমরা প্রথম কথাটা বলতে পারি যে নারীর যে অবমূল্যায়ন, কন্যাশিশুর প্রতি যে বৈষম্য, যে অত্যাচার এবং যে অসহনীয় প্রকাশ আমরা লক্ষ্য করছি তার প্রধান কারণ হচ্ছে সত্তাগত অসচেতনতা মানুষের।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গ বলি, আমার দুটি কন্যা আছে। আমি সৌভাগ্যবান যে আমার দুটি কন্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

আমি যখন রাতের বেলা বাসায় যাই, আমার কন্যারা যদি বাইরে থাকে বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে, তখন আমার পৃথিবীটা একরকম। আর যখন বাসায় কন্যারা থাকে, তখন আমার পৃথিবী আরেক রকম।

কন্যারা হয়তো তাদের ঘরে পড়ছে বা বসে আছে, আমার সঙ্গে হয়তো হাই বাবা বলে একটা শব্দ উচ্চারণ করছে আর কোনো শব্দ নেই। কিন্তু আমি জানি এ বাসাটাতে আমার দুটো কন্যা আছে। তাদের অস্তিত্ব আমার কাছে ফুলের ঘ্রাণের মতো কাজ করে। ফুলের ঘ্রাণ যেমন আমরা দেখতে পাই না, অনুভব করতে পারি, কন্যাদের উপস্থিতি আমাকে সেরকমভাবে পুলকিত করে, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

হুমায়ুন আজাদের একটি গল্প আমাকে বলেছিলেন ফরহাদ খান যে হুমায়ুন আজাদ একদিন বাংলা একাডেমিতে ফরহাদ খানের রুমে হন্তদন্ত হয়ে এলেন। হুমায়ুনের চোখে তখন আনন্দ আর আনন্দ। ফরহাদ খান হুমায়ুন আজাদের মাঝে এমন আনন্দ কখনও দেখেননি। তো ফরহাদ খান বলছেন, হুমায়ুন বলেন তো সমস্যাটা কী? আপনি এত আনন্দিত কেন আজকে? হুমায়ুন আজাদ বললেন, ফরহাদ, আমার মেয়ে হয়েছে। পরের বাক্য হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, কন্যা না হলে পিতৃত্ব সম্পূর্ণ হয় না।

আমার দুই কন্যার কারণে আমি বুঝতে পারি যে কথাটা একদম ১০০ ভাগ সত্য। আমার মেয়েদের আমি বলি তোমরা আমার অ্যাডভাইজার। তারা আমাকে নানান ধরনের পরামর্শ দেয় এবং আমি সাদরে তা গ্রহণ করি। কেননা তারা নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখছে। আমার জন্ম স্বাধীনতার আগে। ওদের অনেক বছর পরে। ওদের জন্ম হয়েই ওরা কম্পিউটার ল্যাপটপ সব দেখেছে। আমার জন্মে আমি হারিকেন, সাইকেল দেখেছি। ফলে জেনারেশনের গ্যাপ বলে যে কথাটা সেটা কিন্তু আছে। সুতরাং তাদের থেকে শেখার আমার কোনো কমতি নেই। আমি তাদের কাছে সবসময় শিখি এবং আমি দেখি, আমার কন্যারা আমার জীবনবোধকে কীভাবে দেখে। সেটা আমি খুব কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ্য করি এবং তাদের কাছে জানতে চাই। আমি আমার কন্যাদের কখনও উপদেশ দিতে চাই না। কারণ আমি যে জীবনযাপন করি, তাদের চোখের সামনে সেটা ঘটছে। ফলে আমার কাছ থেকে কিন্তু যা গ্রহণ করার তারা তা গ্রহণ করছে এবং আমি তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করছি। আমি দাবি করতে পারি যে আমার কন্যাদের সঙ্গে আমার অত্যন্ত আনন্দের সম্পর্ক, বন্ধুর মতো সম্পর্ক। এবং ওরা আমার ভালোবাসা, আমি গল্প করি। যখন বেড়াতে যাই, তখন জিজ্ঞেস করি কেমন লাগল রে? বলে বাবা, একেবারে তুমি আমাদের ফ্রেন্ডের মতো। তুমি আমাদের সঙ্গে দুষ্টুমি করো, তোমার সঙ্গ আমাদের খুবই ভালো লাগে। এটা হচ্ছে একটা সেরা বাক্য।

জেতা পুরস্কারের চেয়ে আমার কাছে ভালো লাগে যে আমার কন্যাদের কাছে আমাকে ভালো লাগে। কেন এটা হলো? কারণ আমি কন্যাসন্তানদের কখনোই মনে করি না ব্যক্তিত্বহীন। আমরা শিশুদের কিন্তু ব্যক্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করি না। শিশুরা ব্যক্তিত্ববান। কারণ তাদের মধ্যে নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখার বিষয়টি আছে। আমি দার্শনিক নির্শের একটি বই পড়ছিলাম। তিনি বলছেন, শিশুদের সঙ্গ পছন্দ করেন। কারণ শিশুরা নতুন চোখে পৃথিবী দেখে। আমরা কিন্তু ভরা কলসি অথচ নেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই। অথচ শিশুরা হচ্ছে শূন্য কাপ। তারা শুধু গ্রহণ করে। সবকিছু তারা গ্রহণ করে। প্রশ্ন দিয়ে তাদের জীবন শুরু হয়। শিশুরা প্রগতিশীল। এবং শিশুরা অসাম্প্রদায়িক। আপনি দেখবেন একটি শিশু কখনও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিবেচনা করে না। সে যখন বড় হতে থাকে, আমরা তার মধ্যে আমাদের চিন্তার আবর্জনাগুলো চাপিয়ে দিই। আমরা বলি সাম্প্রদায়িকতার কথা, ধর্মান্ধতার কথা বলে তাকে নষ্ট করে দিই।

এই শিশুদের মধ্যে নারী শিশুটিও কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয় এবং তাকে একসময় আমরা ভুলিয়ে দিই যে সে মানুষ। তাকে ভবিষ্যতে বিয়ে দিতে হবে এবং অন্য ঘরে চলে যাবে। এই আতঙ্ক থেকে আমরা নারী শিশুটিকে ব্যক্তিত্ব হতে দিই না। ধর্মাচারণের নানারকম কুসংস্কার তার ওপর চাপিয়ে দিই। মা-বাবা হিসেবে আমরা তাকে বলি তুমি নারী। তোমার ভাইদের থেকে তুমি কিছু অধিকার কম পাবে।

সে বাইরে খেলতে যাবে, সে ভালো খাবার খাবে, ভালো একটা জামা কিনে দেব কিন্তু তুমি তো মেয়ে, নারী। এভাবে শিশুটির যে সত্তার বিকাশ, তাকে রুদ্ধ করে দিই। এটি আমরা আতঙ্কের কারণে করি, যে আমার শিশুটি যদি বিদ্রোহী হয়ে উঠে তাহলে সে এই সমাজে টিকতে পারবে না, তার বিয়েই হবে না।

মা-বাবারা শিশুর ভালো করতে গিয়ে খারাপ করে এভাবে যে, দৃষ্টিভঙ্গির একটি আবর্জনা তার ওপরে চাপিয়ে দেয়। আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি যে আমি এবং আমার স্ত্রী শাহনাজ মুন্নী, দু'জনেই আমার শিশুদের ব্যক্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছি। তো ছোটবেলায় মনে পড়ে যে, ওদের যখন ৮-৯ বছর বয়স, খাবার টেবিলে ওদের নিয়ে কথা বলতাম আমরা যে, আমরা কোথায় বেড়াতে যাব বা কী করব, সবকিছুতে তাদের মতামত জানতে চাইতাম। তারা হয়তো চেয়ারে বসতেই পারছে না, কিন্তু গম্ভীর হয়ে আমাদের বক্তব্য শুনছে এবং আমাদের মতামত দিচ্ছে। এই পারিবারিক আলাপ-আলোচনাটা আমার পরিবারে এখনও চলছে। আমরা এখনও যে কোনো ছোট-বড় সিদ্ধান্ত খাবার টেবিলের পারিবারিক আড্ডায় নিয়ে থাকি।

তাদের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পরিবারে আমাদের দুই কন্যা, আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা সবসময় গণতান্ত্রিক নীতিতে আমাদের পরিবার চালাই। মতবিরোধ হয়, সমঝোতা হয়, মিনি পার্লামেন্টের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যার ফলে হয়েছে কী, বাচ্চারা আমাকে ভয় পায় না। ওরা নিঃসংকোচে আমাকে ওদের মনের কথা বলতে পারে। যেমন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে শুধু এর আগে সবকিছু ওরা নিজেরাই করেছে। বড় মেয়ে বলেছে আমি ইংরেজিতে পড়ব, ছোট মেয়ে বলেছে আমি আইআর পড়ব। আমরা কিন্তু একবারও বলিনি তোমাদের এটা পড়তে হবে, ওটা পড়তে হবে। এবং আমরা আমাদের দুই কন্যাকে বলে দিয়েছি যে তোমার জীবনসাথি সংগ্রহের দায়িত্ব তোমাদের, এটা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তোমরা সংগ্রহ করে যদি আমাদের জানাও, আমরা একটা আনুষ্ঠানিকতা করে তোমাদের বিয়ে দিয়ে দেব। তোমাদের জন্য বর খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। বর খুঁজে বের করতে না পারলে অবিবাহিত থেকে যাবে। কারণ পৃথিবীতে বিয়ে একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না কোনো নারীর। কারণ আমি মনে করি, মানুষের জীবনের অসংখ্য লক্ষ্য থাকে। লক্ষ্যহীন লক্ষ্য। আমি তার ওপর বিয়ে চাপিয়ে দিতে পারি না যে তুমি বিয়ে করো, সুখী হয়ে যাবে। সুখটা আলাদা রকমের। প্রতিটা মানুষ তার নিজের মতো করে সুখী হবে। আপনি চা খেতে চান তো চা-ই খাবেন, আমি তো আপনাকে কফি চাপিয়ে দিতে পারি না। এই যে নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতা- এটি আমাদের সমাজে থাকা দরকার। নারীর ক্ষেত্রে কোনো চয়েস করতে দেওয়া হয় না। বিভিন্ন প্রকারের চিন্তার আবর্জনা আমরা নারীর ওপরে চাপিয়ে দিই।

একটা দৃষ্টান্ত দিই আপনাকে, আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে, কপালে টিপ দেওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের নানান বক্তব্য, লিপস্টিকের বিরুদ্ধে বক্তব্য শুনেছেন কখনও? না। এর কারণটা কী? লিপস্টিক নিয়ে তো কোনো ফতোয়াবাজি আসে না। টিপ নিয়ে কেন? কারণ এর মাঝে একটা হিডেন সাম্প্রদায়িকতা আছে।

কারণ অন্য একটি জাতির বিরুদ্ধে হিংসাত্মক মনোভাব আমরা পোষণ করি যেটা অন্যায়ভাবে ইন্ডিরেক্টলি আমরা চাপিয়ে দিতে চাই। ঠোঁটে লিপস্টিক নিয়ে কথা বলি না তাই।

হিডেন ঘৃণা যখন থাকে, তখন তা প্রতিফলিত হয় আমাদের মুখ থেকে। এজন্য টিপ নিয়ে আমাদের সমস্যা, লিপস্টিক নিয়ে নয়। বা পায়ের নখে আলতা লাগানো নিয়ে আমরা খুব বেশি হইচই করি না।

এজন্য, মানুষের সত্তার যাতে বিকাশ না ঘটে তাই একটা সামাজিক চক্র আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ থেকে কন্যাসন্তানদের নিরাপত্তা তৈরি করতে হলে কী করা দরকার?

আইন করে আপনি পারবেন না। কারণ আইন তো করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি রায় থেকে আমরা দেখতে পাই, নারীরা পর্যন্ত নারীর বিরুদ্ধে কথা বলছে। সামগ্রিকভাবে এটি হচ্ছে মানবমুক্তির প্রশ্ন। মানুষ যদি নিজের মুক্তি নিজে বুঝতে না পারে, আইন করে তাকে মুক্তি দেওয়া যাবে না। মানুষকে সাজা দেওয়া যাবে এবং এটা সত্য যে ধর্ষণের বহু শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ধর্ষণ কমেনি। ধর্ষণের তাহলে প্রতিষেধক কী? আমি বলি প্রেমের কবিতা। যেদিন তরুণরা প্রেমের কবিতা পড়বে, ফিল করবে, গোলাপ ফুলের সৌন্দর্য অনুভব করবে, যেদিন তরুণরা ক্লাসিক্যাল নিউজিক শুনবে, পাখির ডাক শুনবে, নদীর ঢেঊ দেখবে, সমুদ্রে যাবে, এসব তরুণ কখনোই ধর্ষণ করতে পারে না। কারণ প্রেমের কবিতা শুনিয়ে তো সে নারীকে পাচ্ছে। আরও গভীরভাবে পাচ্ছে। নারী তো সর্বস্ব নিয়ে বসে আছে পুরুষকে দেওয়ার জন্য। জোর করতে হবে কেন?

এক নম্বর কথা হচ্ছে, সমাজে প্রেমের কবিতার বিকাশ চাই, প্রেমের পরিবেশ চাই। তাহলে ধর্ষণ কমবে।

দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে, জবরদস্তিবাদী চেতনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সমাজকে। একটা ছেলে যদি মনে করে মস্তানি করলে আমি সবকিছু পেয়ে যাই, মস্তানি করলে আমি ছাত্রনেতা হতে পারি, কন্ট্রাক্টর হতে পারি, সমাজের মধ্যে একজন সম্মানজনক ক্যাডার হতে পারি, সবাই আমাকে সালাম দেয়, স্বাভাবিকভাবেই সে ভাববে মস্তানি করে আমি যৌনতা নেব না কেন? নারী তো নারী না, যৌনতা। তো যৌনতাটা আমরা মস্তানি করেই নেই? অতএব, জবরদস্তিবাদী যে প্রবণতা, এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নাহলে ধর্ষণও কমবে না, নারীর মর্যাদাও আসবে না।

আমি এ কথাই বলতে চাই, আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সারা বিশ্ব জবরদস্তিবাদে চলছে। এর থেকে নিজ সত্তার কাছে ফেরত আসতে হবে। নিজের কাছে ফিরে আসতে হবে, নিজের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা যেমন প্রতিদিন সকাল বেলা অন্তত চার-পাঁচবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, মানুষকে অন্তত এক বেলা, নিজের সত্তার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। এ কথাটা আজকে চিৎকার করে বলা দরকার যে নিজেকে চেনো, নিজের সত্তার আয়নায় নিজেকে দেখার চেষ্টা করো। আমরা এ চেষ্টা করলে গণতন্ত্র সফল হবে, সমাজতন্ত্র সফল হতে পারে। আর যদি আমরা সত্তাগত এই প্রবণতাকে অমীমাংসিত রেখে গণতন্ত্র চর্চা করি, সেই গণতন্ত্র কখনোই চর্চা করা হবে না। সত্তাগত প্রশ্নকে অমীমাংসিত রেখে নারীবাদ চর্চা করলে নারীর মুক্তি আসবে না, পৃথিবীতে শান্তি কামনা করলে সেই শান্তি আসবে না। এটাই আমার বিনীত ধারণা।

মন্তব্য করুন