আমার কেন এমন মনে হয়, বাংলাদেশে এখন কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াটাই পাপ। যে পিতামাতা কন্যাসন্তান জন্ম দেবেন, তাদের দেশের মালবাহী ট্রাকের পেট্রোল ট্যাঙ্কে যেমন লেখা থাকে 'জন্ম দিয়ে জ্বলছি', তেমনি কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা আতঙ্কে সারাক্ষণ জ্বলতে হয়। যে দেশে মাত্র তিন বছরের শিশুকন্যাও ধর্ষণের শিকার হয়, সেখানে নিরাপত্তার কারণে আতঙ্কিত থাকাটাই স্বাভাবিক। আবার দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই আতঙ্ক অন্যদের সঙ্গে আলাপও করা যায় না। এমনকি নিজের মাসুম কন্যাসন্তানকেও এই চাপা আতঙ্কের তাপ বুঝতে দিতে চান না। মুখ ফুটে জোরে বলতে পারেন না- তুমি মা এই ভয়ংকর মনুষ্য জঙ্গলে কতটা অনিরাপদ! ভয় আছে বললে প্রিয় সন্তানের যদি মানসিক ভারসাম্যের কোনো ক্ষতি হয়! তাহলে সে পড়াশোনায় যদি অমনোযোগী হয়ে পড়ে। এমনও হতে পারে কালক্রমে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।

দেশ যদি উন্নয়নের জোয়ারে পাঁচ গুণ এগোয়, ধর্ষকের কার্যক্রম এগোয় পঁচিশ গুণ। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও মাঝেমধ্যে নারী ধর্ষিত হন, তবে খুন হন না। বাংলাদেশে ধর্ষণের পর নারীকে খুন করা যেন রেওয়াজ হয়ে গেছে। আমার ধারণা, শতকরা আশি ভাগ বাংলাদেশি নারী ধর্ষক খুন করে ফেলাটাই নিরাপদ মনে করেন। তাতে আলামত, বিচার-টিচারের ঝামেলা কম। কন্যাসন্তানরা তাহলে ধর্ষণের পর বেঁচে যাওয়ার গ্যারান্টিও হারিয়েছে! কেমন এক ভয়াবহ নির্মম সময়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কন্যাসন্তানদের জনকেরা।

দেশের প্রধান নারী, শিক্ষাপ্রধান নারী, সংসদ নেত্রী নারী; সচিবালয়ে, কোর্টে, সুপ্রিম কোর্টে, শিক্ষাঙ্গনে, ক্রীড়াঙ্গনে, সরকারি আর বেসরকারি চাকরিতে, অভিনয় জগতে, শিল্প-সাহিত্যজগতে- সব জায়গায় নারীরা এক শক্তিশালী জায়গায় থেকেও উটপাখির মতো নিজের মাথা বালিতে ডুবিয়ে রেখেছেন। তারা সম্মিলিতভাবে যদি আইনে পরিণত করতে পারতেন, নারী ধর্ষণের পনেরো দিনের মধ্যে ধর্ষককে আইন প্রমাণিত করে ফাঁসি দেবে। নিষ্পাপ কিশোরী বা নারীর মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারলে দশ দিনের মধ্যে দোষীর দুই হাত দুই কোপে কেটে শরীর থেকে বাদ দেওয়া আইনি আদেশ কার্যকর করতে হবে। যদি এমনটা আইন করা যেত, বন্দুক ধরেও বাঙালিদের দ্বারা অন্তত নারী ধর্ষণ করানো যেত না। প্রমাণস্বরূপ সৌদি আরবের চুরির শাস্তি হাত কাটার কথা বলা যায়। সেখানে হাত কাটার ঘটনাই ঘটে না। যেহেতু হাত হারানোর ভয়ে কেউ চুরিটাই করে না। বাংলাদেশে আইন কেন বারবার ধর্ষকদের পক্ষে যায়! এর উদাহরণ তো সদ্য দিলেন নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের মাননীয় নারী বিচারক কামরুন্নাহার। আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার সম্মানিত দিলদার আহম্মদের সুপুত্র সাফাত আহম্মদ চারজন দোস্ত নিয়ে বনানীর এক হোটেলে দুই পরিচিত ছাত্রীকে জন্মদিনের পার্টি বলে আমন্ত্রণ করে ধর্ষণ করে। সেই কেসে মাননীয় এই বিচারক পাঁচ ধর্ষককেই সসম্মানে রেহাই দেন। শুধু তাই নয়, তিনি পুলিশকে বলেন- কোনো নারী ধর্ষিত হওয়ার ৭২ ঘণ্টা পার করে থানায় এলে কেস না নেওয়ার জন্য। যেহেতু ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ধর্ষণের আলামত থাকে। এরপর এলে সুবোধ পুরুষ ধর্ষকদের ওপর মিথ্যে মামলার ঝোঁক থাকে। মাননীয় বিচারক একজন নারী হয়ে কীভাবে নারী রক্ষা, নারী সম্মানের বিরুদ্ধে এমন আদেশ পুলিশকে দিলেন। আপনি কি শুনেছেন, কোনো ধর্ষিতার অন্তর্কান্না? দেখেছেন কোনো নারীর ধর্ষণের পর সমাজে দুর্বিষহ জীবন? তাদের অদৃশ্য হাত শুধু দুই দিকে এগিয়ে যেতে আঙুল তোলে আত্মগোপন ও আত্মহত্যা! সমাজ তো দূরের ব্যাপার, নিজের পরিবারে আপনজনদের কাছে ঘটনার পর বদলে যায়, বিব্রতকর হয়ে ওঠে সব।

এ রকম মানসিক ট্রমাতে একজন নারী বিচারক বলছেন, তোমার হাতে আছে সময় মাত্র ৭২ ঘণ্টা। পাঁচ কিংবা ছয়জন পূর্ণবয়স্ক বলশালী পুরুষ একজন কিশোরীকে ধর্ষণের পর ব্যথায় যাতনায় স্বজ্ঞানে ফিরতে, নিজের পায়ে দাঁড়াতেই তো ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে যাবে।

একজন সম্মানিত বিচারক এক তো ধর্ষকদের সসম্মানে ছেড়ে দিলেন; তার ওপর পুলিশ ভাইদের উৎসাহিত করলেন তাজা মাছের মতো তাজা ধর্ষিতার মুখে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে বীভৎস সেই বিবরণ বারবার শোনার। এমন অবস্থায় কি কমবে নিজের কন্যাসন্তান নিয়ে পিতামাতার আত্মঘাতী আতঙ্ক!

আমিও এক সন্তানের পিতা এবং সন্তানটি কন্যা। আমার স্ত্রী যখন আমাদের কন্যাসন্তানকে জন্ম দেন তখন তিনি ঢাকায় ডেনমার্ক দূতাবাসে কাজ করতেন। ডেনমার্ক যে বিশ্বের সভ্য দেশের মধ্যে অন্যতম, তা বুঝেছিলাম তখন। রাষ্ট্রদূত থেকে ফার্স্ট সেক্রেটারি, সেকেন্ড সেক্রেটারি আর ড্রাইভার- সবাই সব কাজ থামিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল যখন গর্ভবতী অবস্থায় অফিসে এক দুপুরে মাথা ঘুরে ফ্লোরে বসে পড়েছিলেন আমার স্ত্রী। আমাকে বিটপীতে ফোন করে রাতের ঘুমের পোশাক আর টুথব্রাশ নিয়ে আসতে বলা হলো দূতাবাস থেকে। দুই আর একের মাঝে গুলশানে মডার্ন ক্লিনিক হাসপাতালে আমেরিকান মহিলা ডাক্তার সিস্টারের আন্ডারে ততক্ষণে কেবিনে ভর্তি করা হয়ে গেছে দূতাবাসের পক্ষ থেকে। পনেরো দিন সেখানে থাকার পর যেদিন সন্তান জন্ম নেবে, সেদিন সকাল থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে এলেন দু'জন প্রসব স্পেশালিস্ট ডেনিশ নার্স। তারা কোনো সেমিনার ও কর্মশালায় সপ্তাহখানেকের জন্য ঢাকা এসেছিলেন। ডেনিশ রাষ্ট্রদূতের অনুরোধে তারা প্রসবে সাহায্য করতে ডাক্তার শ্নিটারের সঙ্গে সকাল থেকে ছিলেন। দুই ঘণ্টা পেটে ও পিঠে এক অপূর্ব ম্যাসাজ করে সিজারিয়ান করার সব ব্যবস্থার মাঝে তারা স্বাভাবিকভাবে আমার কন্যাসন্তানকে পৃথিবীতে আনেন। আমাকে ওটি রুমে থাকতে বলেছিলেন ডাক্তার শ্নিটার, ভয়ে আমি পালিয়েছিলাম। পরে জেনেছি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় সেটাই নিয়ম। আমার অতটা সাহস নেই, আমি স্ট্রেসে গুলশান রাস্তার এপার-ওপার দৌড়াচ্ছিলাম, বারবার। একবার কড়া ব্রেক কষে মিনিবাস আমাকে হিট করা থেকে বাঁচায়। আসলে আমি অগোছালো মানুষ। ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম- আমার কন্যাসন্তানের প্রতিরক্ষা এ দেশে পিতা হিসেবে করতে পারব কিনা ভেবে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম।

একটু মোটাসোটা দয়ালু মুখের আমেরিকান ডাক্তার শ্নিটার লোক পাঠিয়ে আমাকে ধরে এনে কোলে দেন আমার কন্যাসন্তান। মুখে ইংরেজিতে বললেন- তুমি এঞ্জেল কন্যা পেয়েছ। আমি হা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে অল্পসল্প শেখা বাংলায় বললেন- পরী! পরী!

আমি আরও ঘাবড়ে গেলাম। আঁতকে উঠি। আমার কন্যা একজন পরী! আমি ফালতু একটা মানুষ! পরী সন্তানকে রক্ষণাবেক্ষণ করা, লালনপালনে শক্তি-সাহস কি নিজের মধ্যে পাব। নিজের ওপর আস্থা রাখা আমার স্বভাব নয়। তাই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম নিজের একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্য।

কন্যা আমার যতই বড় হয় আতঙ্ক বাড়ে, ভয় বাড়ে। যারা আমার কন্যা অগ্নিলাকে জানেন-চেনেন, তারা অস্বীকার করবেন না যে সে শান্ত সৌম্য সুন্দর নিষ্পাপ পরীর মতোই ছিল। আমার স্ত্রী ডেনমার্ক দূতাবাস ছেড়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে কাজ শুরু করেছেন। আমিও বিটপী অ্যাডভার্টাইজিং কোম্পানির সিনিয়র আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে দেশি-বিদেশি পণ্যের অ্যাড ক্যাম্পেইনের পর ক্যাম্পেইন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে নিজের ছবি আঁকা বা গল্প-উপন্যাস লেখারই সময় বের করতে পারি না। এর মধ্যে কন্যা আমার বাড়ছে, বড় হচ্ছে। মোহাম্মদপুরে বিখ্যাত স্কুল গ্রিনহেরাল্ডে ভর্তি করিয়ে ছিলেন স্ত্রী। সেভেন পেরিয়ে এইটে উঠেছে। তার সেই ছোটবেলা থেকে সপ্তাহে পাঁচদিন যত রাতেই ঘুমাইনা কেন, সকালে উঠে নিজের টয়োটা পাবলিকায় মেয়েকে স্কুলে ড্রপ না করলে শান্তি হতো না। দুপুরে ছুটির পর আমাদের প্রিয় জমিলা বুয়া রিকশায় তাকে বাসায় নিয়ে আসত। এক দিন এক বেয়াদব বেবিট্যাক্সি (সিএনজি) রিকশার পেছনে হাল্ক্কা গুঁতো দিল। তাতেই রিকশা উল্টে দু'জনের হাঁটু কনুই ছিঁড়ে-থেঁতলে গেল। এই আতঙ্কে এরপর থেকে যতই কাজে ব্যস্ততা থাক, কজ দেখিয়ে গাড়ি নিয়ে ছুটতাম কন্যার স্কুলে। ছুটির পর তুলে নিয়ে বাসায় দিয়ে, আবার ফিরতাম বিটপী অফিসে। কখনও গিয়ে দেখি কন্যা আমার তার তখনকার বেস্ট ফ্রেন্ড তিশমা (পরে পপ-রক গান গেয়ে নাম করেছিল) স্কুল গ্রাউন্ডের স্পোর্টস ট্রেকে দু'জন হরিণের মতো ছুটে প্র্যাকটিস করছে। তারা দু'জনেই প্রায় প্রথম-দ্বিতীয় হতো। আবার কখনও দেখতাম বিশাল স্কুলের পিয়ানো বাজাচ্ছেন মিউজিক টিচার কণ্ঠশিল্পী তিমির নন্দী, তাকে ঘিরে ইংরেজিতে কয়ের আর বাংলায় রবীন্দ্র্রসংগীত করছে দলবদ্ধ ছাত্রছাত্রী, সঙ্গে আমার কন্যা। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম স্কটিস নান সিস্টার কার্মেলের পরিচালনায় কন্যাকে শেকসপিয়ারের মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে স্কুল মঞ্চে উচ্চকণ্ঠে লম্বা সব ডায়ালগ বলে অভিনয় করতে দেখে। ঘরে সারাক্ষণ চুপচাপ থাকা কন্যার সে কী দীপ্ত জোরালো কণ্ঠ! বুঝলাম সিস্টার কার্মেল এ এক নতুন অগ্নিলা তৈরি করেছেন। বুঝলাম আমার কন্যা বড় হচ্ছে ওর নিজস্বতা প্রকাশ পাচ্ছে। ঢাকায় যারা মোহাম্মদপুর টাউন হলের পোস্ট অফিসের আশেপাশে থাকতেন তারা জানেন গ্রিনহেরাল্ড স্কুল শুরুর আগে আর ছুটির পরে কী ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হয় রাস্তায়। প্রায় দামি মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, টয়োটা মার্ক টুর মাঝে আমার টয়োটা পাবলিকা হতদরিদ্র হোক, তবু গাড়ি তো! জ্যামে আটকালে মুশকিল মেয়েকে বাসায় দিয়ে অফিসে ফেরা দেরি হয়ে যাবে। তাই দূরে পার্ক করে স্কুলের বড় গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতাম। এত্তবড় স্কুল, তার গেটের সামনে এসে আমার অপেক্ষা করার কথা। না দেখলে ভেতরে ধাক্কা লাগত, কোথয় আমার মেয়ে! বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমির সঙ্গে প্রায় দেখা হতো। তিনি তার পুত্র রাজীবকে নিতে আসতেন। আমার মেয়ের একই ক্লাসের বন্ধু রাজীব।

এক দিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- নিতে এসে চোখের সামনে ছেলেকে না দেখলে কেমন যেন ভেতরটা কেঁপে ওঠে না আপনার?

সিমিন হাসতে হাসতে বলেছিলেন- ও তো ছেলে মানুষ, ওকে নিয়ে ভয়ের কী!

আমি ভেতরে-ভেতরে আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠলাম। আমার কন্যা মেয়েমানুষ। তাই তাকে নিয়ে ভয়ে থাকাটা জায়েজ। পুত্র থাকলে ভয় প্রযোজ্য নয়। শুধু কন্যাসন্তান হলে এই ভয় অজগর সাপের মতো পেঁচিয়ে পিষে মারতে চায়।

স্কুলগেট থেকে বেরোলেই ঝাঁকে ঝাঁকে ঝালমুড়িওয়ালা, আইসক্রিমওয়ালা, আমড়া, ফুচকা আর আচারওয়ালার ভিড়। বেচাবিক্রিতে মহাব্যস্ত হাত চললেও চোখ ঘুরছে সার্চলাইটের মতো এসব ছাত্রী-কিশোরীর মুখের দিকে, বুকের দিকে। দেখলে কন্যাসন্তানের পিতা হিসেবে অন্তরাত্মা থেকে মাথার চান্দিতে উঠে আসত রাগ! অথচ কন্যাসন্তানের পিতা বলেই কিচ্ছুই করতে পারি না। ইচ্ছে করে হিন্দি সিনেমার রাগী নায়কের মতো গিয়ে তাদের কলার চেপে ধরে বলি- শুয়োরের বাচ্চারা, এই মাসুম কিশোরী মেয়েদের এমন করে কী দেখিস!

ইচ্ছে হলেও তা করা যাবে না। একজন কন্যাসন্তানের জনক হিসেবে এ রকম মাস্তানি করতে গেলে ম্যানেজমেন্টই লজ্জা পেয়ে পরদিন মেয়েকে স্কুল থেকে বের করে দেবে।

আমার গ্রিন রোডে চারতলায় বাসা। আমার বলতে আসলে বাড়িটি সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আজাদ রহমানের, আমরা দীর্ঘ বছর থাকি আর কি। পাশের ফ্ল্যাটে এসে উঠলেন আজকের স্বনামধন্য সিনেমা-নাটক পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম। তখন সবে জীবন তিনি শুরু করেছেন। নাটকের চিত্রনাট্য লিখে নাম করলেও পরিচালনা শুরু করেননি। ছোট্ট ছেলে আর বউ নিয়ে জীবন সবে শুরু করেছেন। ইচ্ছে আছে নিজে পরিচালনা করার।

সুযোগ দ্রুতই চলে এলো। এক এনজিও ফান্ড দেবে কৈশোর সময়ের সন্ধিক্ষণে ভালোমন্দ নিয়ে একপাল কিশোর-কিশোরী নিয়ে নতুন ধারার গল্প দাঁড় করালেন। সেই সময় হইচই ফেলে দেওয়া বিটিভির বাইরে বিবিসির প্রাক্তন সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের তত্ত্বাবধানে ইটিভি বা একুশে টিভিতে ধারাবাহিক হিসেবে দেখানো হবে, নাম 'বিপ্রতীপ'। আমরা যখন অফিসে কাজে ব্যস্ত থাকি, সেই সময় দুপুরে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পর আমার কন্যা বারান্দায় টবে ঝুলন্ত ঝাঁকড়া মাথার গাছের সঙ্গে কথা বলত। আবার তার ইম্যাজিনারি বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলত। গিয়াসউদ্দিন সেলিম লাগোয়া ব্যালকনি থেকে সব লক্ষ্য করতেন। অগ্নিলার সময়যাপন দেখেই কিছুটা গল্প দাঁড় করানো। তাই স্বাভাবিকভাবে মূল চরিত্রে তিনি আমার কন্যাকেই অভিনয় করতে বললেন। আমি ব্যাপারটি জানার আগেই আমার স্ত্রীর সঙ্গে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের কথা হয়ে গেছে। অগ্নিলাকে নিয়েই গিয়াসের পরিচালনার প্রথম ধারাবাহিক 'বিপ্রতীপ'। সেই প্রথম ধানমন্ডি রবীন্দ্র সদনের চত্বরে কিশোরী মেয়েদের ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরে সাইকেল চালানো নাটকে সেলিম আনলেন। কিশোর জীবনেও শূন্যতা পেয়ে বসে, মা-বাবা নিজের সন্তানদের বুঝতে না পেরে এক আজব দূরত্ব তৈরি করেন। এসব নাটকে আসায় 'বিপ্রতীপ' শুধু তরুণদেরই নয়, বয়স্কদেরও খুব ভালো লাগে। রাস্তাঘাটে মেয়েকে সবাই চিনতে শুরু করে। আমার তখনও কেউ অটোগ্রাফ নেয়নি অথচ আমারই কন্যার অটোগ্রাফ নিতে এগিয়ে আসে তারই বয়সী ছেলেমেয়েরা। ইটিভি তখন ভীষণ জনপ্রিয়। বিপ্রতীপের কয়েক এপিসোড দেখানো হলেই অগ্নিলা অল্পবয়সী স্টার হয়ে উঠল। কন্যার এই পরিচিতি দেখে আমারও গর্ববোধ হতে লাগল। এই পরিচিতির সঙ্গে নেগেটিভ বিষবাষ্পও এসে ঢুকল। কারা যেন ফোন করে গুলশান সবে খোলা উইম্পি বার্গারের দোকানে আসতে বলে বারবার তাকে। প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম আমি এক সুন্দরী কন্যাসন্তানের পিতা! কন্যা আবার জনপ্রিয়তা পেয়েছে নিজ প্রতিভায়। তা মনে করিয়ে দিল এক ঘটনা।

এক সন্ধ্যায় ছুটির পর বেরুচ্ছি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের গ্যালারিতে একটা ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধনীতে যাব। বাসা থেকে জমিলা বুয়ার ফোন এলো- ইত্তেফাক থেকে দু'জন সাংবাদিক কন্যার ইন্টারভিউ নিতে এসেছেন, আমার নাম বলায় দরজা খুলে বসিয়েছে। আমি তো এই ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না। ইত্তেফাকে রাহাত ভাইকে (রাহাত খান) ফোন করলাম। তিনি বিনোদন বিভাগে খবর নিয়ে জানালেন যে কাউকে পাঠানো হয়নি। আমি আতঙ্কে কাঁপছি, বুঝতে পারছি একটা গণ্ডগোল হতে যাচ্ছে। পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে কিংবা প্রায় উড়ে বাসায় চলে এলাম। গুন্ডা প্রকৃতির দুই বিশালদেহী আমাকে দেখেই এক ধাক্কা দিয়ে মেঝে ফেলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে নেমে পালিয়ে গেল। ওদের পেছন গিয়েও ধরা সম্ভব হলো না। আতঙ্কের মাত্রা আমাদের মাথা ছাড়িয়ে গেল। আমার স্ত্রী মধ্যরাতে মাঝে মাঝে চিৎকার দিয়ে জেগে ওঠেন- কে? কে আমার মেয়েকে ধরতে আসছে?

কে? এমনি করে সময় পার হয়। ও লেভেল পাস করে লালমাটিয়াতে একটি প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ লেভেলের ক্লাস শুরু করে আমার কন্যা। যতটা পারি আমি গাড়িতে দিয়ে আসি, আবার শেষ হলে নিয়ে আসি। মাঝেমধ্যে কাজে আটকে গেলে জমিলা বুয়া কিংবা আমার স্ত্রী বেবিট্যাক্সি করে বাসায় নিয়ে আসেন। আমি বা জমিলা বুয়া আনতে গেলে মেয়ে নিয়ে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত স্ত্রীর দম বুক থেকে লাফিয়ে গলায় উঠে আটকে থাকে। এরপর শুরু হয়েছিল ঘরে ফোন করে বলা আজ কী পরে এ লেভেল ক্লাসে গিয়েছিল? কী রঙের শার্ট পরেছিল? কী রঙের প্যান্ট? হুবহু সব ঠিকই বলত। কারা তারাম জানা মুশকিল। তার মানে প্রতিদিন কেউ বা কারা দেখছে, হয়তো ফলো করছে। কোনোদিন দ্রুত গাড়ি চালিয়ে এসে দরজা খুলে টান দিয়ে যদি মেয়েকে নিয়ে যায়! এ রকমভাবে প্রতিদিন ভয়ে-ভয়ে কি বাঁচা যায়!

পুলিশের কাছে যাব! কিছু হবে গেলে? বন্ধুবান্ধব আর মুরুব্বি সাংবাদিকদের কাছে গেলে কিছু হবে? রাজনৈতিক পরিচিত নেতৃবৃন্দের ব্যাপারটা জানালে কিছু হবে? কে জানে কী হবে? নাকি কিছু হওয়ার আগেই কন্যার সর্বনাশ হয়ে যাবে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে! এ কেমন আতঙ্কসহ বসবাস। শুধু সন্তান কন্যা বলেই কি কোনো গ্যারান্টি নেই, যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো কিছু হতে পারে। কারও কোনো দায়দায়িত্ব নেই। কত আর এই ধর্ষণের পর নির্মমভাবে কন্যাদের খুন করা হয়েছে- তাদের লম্বা লিস্টের কথা বলব! যাদের বিচার বা ধর্ষক ও খুনিকে প্রমাণিত করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে দূরে থাক, বছরে একবার সেই সব ফাইল কেউ খুলেও দেখে না। যার আদরের কন্যাসন্তান চলে গেছে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে সেসব পিতামাতাই আজীবন শুধু ধুঁকে ধুকে কাঁদেন, এ ছাড়া তাদের আর কিইবা করার আছে!

আজ কানাডার যে কোনো শহরে স্কুল ছুটির পর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশের ছাত্রীদের মতো এখানে ছেলেরা মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছে দেখি আর ছাত্রীরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে লল্ফম্ফঝল্ফম্ফ করে নিজের মহিমায় হেসেকুঁদে যাচ্ছে চোখে পড়ে। তাদের মাথায় ওই চিপস ঢোকানোই হয়নি যে তুমি কন্যা তুমি নারী তুমি অবলা, যে কোনো সময় ধর্ষিত হতে পার, কেউ খুন করতে পারে। ৭২ ঘণ্টায় বয়ান দিতে থানায় যেতে হতে পারে। আমার কন্যার এখন পুঁচকি দু'জন কন্যা হয়েছে। তারা বড় হবে মেয়ে বা ছেলের চেয়ে একজন দক্ষ মানুষ হিসেবে। আজ হোক কাল হোক, বাংলাদেশের মেয়েরাও পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান মাটিতে দাঁড়াবে। তবে পরিবর্তনটা দেশে নতুন প্রজন্মের কন্যাদেরই আনতে হবে। অন্যরা কেউ এনে তাদের হাতে ধরিয়ে দেবে না।

মন্তব্য করুন