মুক্তিযুদ্ধের পরে যখন আমরা হিসাব করতে বসেছি- সব সময় যে সীমান্ত পার হয়ে গেছে তাকেই নায়ক ভেবেছি। আর যে সীমান্ত পার হয়নি, ভেবেছি তার কোনো ভূমিকা নাই। অর্থাৎ সীমান্ত পার হয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে যারা বা মুজিবনগর সরকারের কাছাকাছি থেকেছে, তাদেরকেই কিন্তু আমরা নায়ক হিসেবে দেখতে পাই।

পাকিস্তানের ওপর আমার যে বইটি- সেখানে আমরা শরণার্থীদের ভূমিকাকে দেখিয়েছি ঠিক নারীর মতো। সাধারণভাবে একাত্তরের শরণার্থীদের আমরা দেখি যে, তারা কত কষ্ট পেয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে। কিন্তু শরণার্থীদের কারণেই যে মূলত গোটা দুনিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গেছে, সে বিষয়টি আমরা ভাবি না বা উল্লেখ করি না। এমনকি গণহত্যা-সংক্রান্ত যেসব তথ্য- এগুলোর বেশিরভাগই এসেছে শরণার্থীদের কাছ থেকে।

তাহলে কলকাতায় যে লোকটা থেকেছে, এই শরণার্থীদের সাথে তার তফাতটা কোথায়? তফাতটা নিশ্চয় শ্রেণির বা গোষ্ঠীর। এলিট শ্রেণি আর এলিট শ্রেণি নয়। তার মানে এলিট শ্রেণি সীমান্ত পার হলে হিরো হয়ে যায়, আর নন-এলিট যখন সীমান্ত পার হচ্ছে, সে কিন্তু হিরো হচ্ছে না। সে পরিণত হচ্ছে অসহায়, দুর্দশাগ্রস্তে। এ এক আশ্চর্য সমীকরণ। নন-এলিটদের রাষ্ট্র স্বীকার করে না। কারণ রাষ্ট্র তো বড়লোকদের।

শরণার্থীকে কেউ কখনও রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করবে না যে, অমুক একজন শরণার্থী বা সে শরণার্থীর ভূমিকাটা পালন করেছে। কিন্তু যদি শরণার্থী না যেত- একেবারে নারীর মতোই- তাহলে সারা পৃথিবী জানত কী করে যে, ৮০-৯০ লাখ লোক ভারতে গেছে? এরা কি এমনি এমনি গেছে? এমনি এমনি কেউ যায় নাকি? তবে এমন নয় যে, মানুষগুলো শরণার্থীর ভূমিকাটি পালন করতেই ভারতে গেছে, তারা বিপদে পড়েই গেছে। ঠিক যেমন একাত্তরে নারী জীবন ধারণ করেছে, সংসার চালিয়েছে। বেঁচে থাকাটাই তখন সবার সবচেয়ে বড় ভূমিকা। নারীর সেখানে জীবন বাঁচানোর সাথে সাথে ইজ্জত বাঁচানোর আতঙ্ক নিয়ে জীবন ধারণ করতে হয়েছে। তাকে তার পরিবারকে রক্ষা করতে হয়েছে। একাত্তরের ইতিহাসে আমরা সমস্ত কিছুকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই দেখে আসছি। কিন্তু এই পরিবারগুলো তো অপ্রাতিষ্ঠানিক। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের ভূমিকা নিয়ে কিছুতেই আলোচনা হয় না, হবেও না। মুক্তিযুদ্ধে পরিবারগুলো কী ভূমিকা পালন করেছিল তা নিয়ে যদি আলোচনা হতো, তাহলে তো এইটা সম্পূর্ণ বিষয় হয়ে যেত। কিন্তু আমরা তো জায়গাই দিতে চাই না পরিবারকে। যেভাবে নারীকে তার সমগ্রতা নিয়ে আমরা ইতিহাসে স্থান দিই না। দিই কেবল ধর্ষিতা হিসেবে। নির্যাতিতা হিসেবে।


কিন্তু আমাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে অর্থাৎ গ্রামে বা গ্রামীণ সমাজে নারীকে ইজ্জতটা দেওয়া হয়েছে একাত্তরে তার সাংসারিক ভূমিকার জন্য। যেসব জায়গায় নারীরা ভূমিকা রেখেছে, সেসব জায়গায় নারীরা অনেক বেশি সবল হয়েছে। এবং স্বাধীনতার পরে যে বাংলাদেশের নারীরা নতুন একটা সাবল্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে নারী কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল না, অর্থাৎ তার অবস্থানের তেমন কোনো স্বীকৃতি ছিল না। স্বাধীনতার পরেই মূলত নারী সামনে আসতে পেরেছে। এবং আজকের দিনে এসে পৃথিবীতে আমাদের দেশের যে এত জেন্ডার পার্টিসিপেশন- তার কারণ হচ্ছে আমাদের নারীরা একাত্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে এনজিওগুলো '৭২ সালেই নারীদের সঙ্গে গিয়ে যোগাযোগটা করেছে। কেন করেছে? কারণ স্বাভাবিকভাবেই তখন একটা গ্রামে নারীরা মুক্ত হচ্ছে, পাকিস্তানের হাত থেকে দেশ যেভাবে মুক্ত হয়েছে ঠিক সেভাবেই। নারী মুক্ত হচ্ছে মানে সে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে এমনটা না, তার করার যে ক্ষমতা আছে সেটা সে প্রমাণ করে দিচ্ছে। সরকার পৌঁছাবার আগেই এনজিওরা পৌঁছেছে নারীদের কাছে। কারণ এনজিওরা বেশিরভাগই এসেছে গ্রামের মানুষের সাথে সম্পর্ক আছে, এমন মানুষদের মাধ্যমে। তারা গিয়ে বুঝতে পেরেছে যে, তাদেরকে তখন এটা করতে হবে এবং এই গ্রামের মানুষদের ব্যবহার করতে পারলে তাদের নিজেদেরও লাভ হবে। তারা জানত যে নারী হচ্ছে বিশাল শক্তি। নারীর এই বিশাল শক্তির মাধ্যমেই নারীকে মুক্ত করেছে একাত্তর। তাকে খুব ক্ষুদ্র করে দেখা হয়েছে বহুদিন। কিন্তু একাত্তরে সে তার শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, সে নিজেকে বাঁচিয়েছে, অন্যকেও বাঁচিয়েছে, সে সংসারকে টিকিয়ে রেখেছে। একটা বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার- যে নারীটা ধর্ষিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে, সে কিন্তু কেবল নিজেকে বাঁচাচ্ছে না, গোটা পরিবারকেই বাঁচাচ্ছে। নারী সচেতনভাবেই এই জিনিসটা করেছে। সে জানে ধর্ষিত নারীর সংসারে জায়গা নাও হতে পারে। তাই সে নিজেকে বাঁচিয়ে সমাজকে বাঁচাচ্ছে। অনেক জায়গায় পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে নারীকে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সেইসব নারী কিন্তু নিজের পরিবার ও গ্রামের অন্য মানুষকে বাঁচাবার জন্য নিজেকে বলি দিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর খুব কম জায়গাই পাওয়া যাবে, যেখানে নারীকে ধরে বা তার বিনিময়ে পরিবার ও গ্রাম রক্ষা পেয়েছে। এ রকম ঘটনা আমিই অন্তত পাঁচ-সাতটা জানি। ইতিহাসে আমরা তাদেরকে স্বীকারই করিনি।


হালিমা পারভিন নামে এক মুক্তিযোদ্ধার কথা জানি; যাকে সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান আর্মি যুদ্ধ থেকে তুলে নিয়ে গেছে। তার ওপর সব ধরনের নির্যাতন পাকিস্তান আর্মি করেছে। সেই মেয়েটা যুদ্ধের পর যখন যশোর জেল থেকে ছাড়া পেল, ওর বাবা দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল ঠিকই কিন্তু বাবা বলছে যে, তোকে যদি অত্যাচার করে থাকে তাহলে কাউকে বলিস না।

একটা মেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াচ্ছিল, সেই অপরাধে শাস্তি হিসেবে তাকে ধর্ষণ করেছে পাকিস্তানিরা। মেয়েরা যে যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীকে খাওয়াত, আশ্রয় দিত, সেটা আমরা বড়জোর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উল্লেখ করি আর কি। এই ঢাকা শহরেও এমন বহু আশ্রয়দাতা ছিলেন। আমি একটা পরিবার পেয়েছি, যেখানে চল্লিশজন মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় পেয়েছে। সে জন্য আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যে, মা যদি রাজি না হয় বাবার ক্ষমতা নাই ওখানে এই ছেলেদের আশ্রয় দেয়। কিন্তু নারীকে ইতিহাস থেকে একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছি কারণ এসব কাজকে আমরা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি না। অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ করতে দিলে দেখা যেত কেমন লাগে।


যত ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে তাদের মায়েরা কী অবস্থায় ছিল? তাদের বোনেরা কী অবস্থায় ছিল? তাদের স্ত্রীরা কী অবস্থায় ছিল? আমরা এ বিষয়টাকে মনেই করি না যে এটা কোনো ভূমিকা। অথচ এখানে এমন না যে মুজিবনগর সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার বা রেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল- খাবার তো নিজেদের ক্ষমতায়, নিজেদের সাধ্যমতো খাইয়েছে দেশের ভেতরে থাকা মানুষেরা। তার স্বীকৃতি নাই কেন? আমরা শুধু গোলাগুলির স্বীকৃতি দিই, আমরা জনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সকল মানুষের ভূমিকার স্বীকৃতি দিই না। বিলেত-আমেরিকায় বসে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক হিসেবে আইনের বলে মুক্তিযোদ্ধা হতে পেরেছে অনেকেই- কিন্তু আমার বাংলাদেশে যে মা মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়ে, আশ্রয় দিয়ে নিজের পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে, নিজেকে বিপদে ফেলেছে, তার জন্য আমাদের কোনো পদকের ব্যবস্থা নেই। কারণ ওটা আমাদের চোখে পড়ে না। আমাদের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা- তাতে নারী তো বীর হতে পারে না। নারী যদি বীর হয়, তাহলে তো সে আর নারীই থাকে না। কাজেই আমরা তাকে স্বীকৃতি পাবার সুযোগ দিই এর চেয়ে নরমসরম কোনো জায়গায়। নির্যাতিতা হিসেবে, ধর্ষিতা হিসেবে। এখানে যত সংখ্যক ইচ্ছা নারী আসতে পারে; কোনো অসুবিধা নেই। দরজা খোলা আছে। আপনি আসুন, ভেতরে প্রবেশ করুন, ধর্ষিতার তালিকা বৃদ্ধি করুন। আমাদের পুরো রাষ্ট্রকাঠামোটাই এমন। এটা পুরুষতান্ত্রিক বিষয় নয়, এটা হলো রাষ্ট্রে কারা ক্ষমতাবান হবে আর কারা হবে না; তার একটা নিরিখ। একটা তালিকাকরণ। একজন যদি রাজনীতিবিদ না হয়, যদি সেনাবাহিনীর সদস্য না হয়ে থাকে, সে যদি সশস্ত্র না হয়- আমরা তাকে আমাদের ইতিহাসের বয়ানে কোনো জায়গা দিতে চাই না। কারণ আমাদের রাষ্ট্রে কেবল এরাই ক্ষমতাবান হয়, অন্যরা নয়। এই কারণে আমাদের ইতিহাসে নারী একেবারেই বাদ পড়ে গেছে। একটা দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের কোনো ইতিহাস নেই। এটা খুব অদ্ভুত না?


কিন্তু আমরা তাদেরকে ইতিহাসে স্থান দিলে আমাদের যারা পণ্ডিত ব্যক্তি- তারা পশ্চিমের ইতিহাস দেখান যে, ওই দেশেও তো নাই। আমি বলছি, অবশ্যই ওই দেশে নাই, ভারতেও তো নাই। আমাদের যুদ্ধ তো ভারত বা পাকিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো না। আমাদের যুদ্ধ ইংল্যান্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধ না। আমাদের যুদ্ধ মৌলিকভাবে আলাদা। এটা সবার যুদ্ধ। কিন্তু যদিও এটা সবার যুদ্ধ- ক্ষমতাটা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে স্বল্পকিছু মানুষের হাতে। ইতিহাসটাও সেই ধারায় এগিয়েছে। তারাই নির্ধারণ করেছে আমাদের ইতিহাসটা কেমন হবে। সেই নির্ধারণে নারীর কোনো ভূমিকা তাদের পক্ষে গ্রহণ করা, দেখা, ধারণ করা, বলা সম্ভব নয়। একমাত্র একটা অংশ আছে যারা বলে- তারা হচ্ছে নারীবাদীরা। কিন্তু সেই নারীবাদীরাও বলে পশ্চিমা ধারণা থেকেই। তারা তো আর গ্রামে গিয়ে নারীকে জিজ্ঞেস করে না যে সে কী করেছিল। আমি মনে করি, ষাট হাজার হোক বা আশি হাজার- এই মুক্তিযোদ্ধারা কোনো না কোনো জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল, সহায়তা পেয়েছিল; মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহায়তাদানকারী এই প্রত্যেকটা মানুষকে যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিদান করা উচিত। তা না হলে আমরা বুঝতে পারব না জনযুদ্ধটা কী?

আমরা এখন যে ইতিহাসটা তৈরি করেছি- সেখানে আমরা মূলত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বাংলাদেশি মডেল খুঁজছি। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কোনো মডেল না। এটা বাংলাদেশেরই ১৯৭১ মডেল। যতদিন পর্যন্ত সেটা আমরা চিহ্নিত করতে না পারব ততদিন পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা লেখা হবে না। আর নারীও একাত্তরে তার সমগ্র বাস্তবতা নিয়ে স্থান পাবে না।

[এ প্রসঙ্গ সমাপ্ত]

মন্তব্য করুন