দক্ষিণ উপকূলের জেলের সন্তানদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে 'হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন'। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা, বিনামূল্যে রক্তদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে সংগঠনটির বিস্তর বিচরণ। হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন ২০১৮ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন জাতীয় শিশু দিবসের দিন যাত্রা শুরু করে। গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলেপল্লি শিশুদের উন্নয়নে কাজ করছে।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সজীব জানালেন সংগঠনের শুরুর গল্প, তার বাসা থেকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরে বলেশ্বর নদী। বন্ধুবান্ধব মিলে মাঝে মধ্যে সেখানে ঘুরতে যেতেন। এ রকমই একদিন তারা নদীর পাড়ে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ একটি জেলেশিশু তাদের কাছে আসে- গলায় টিনের বাক্স, তাতে নানা রকম খাবার। সেই শিশুটিকে সজীব প্রশ্ন করে, তুমি পড়াশোনা কর না? সে জানায়, 'বাবা মাছ ধরে যে টাকা আয় করে, তা দিয়ে আমাদের পড়াশোনা করাতে পারেন না।' এরকম অনেক জেলেশিশুই পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সজীবের ইচ্ছা জাগে, জেলেশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার।

বলেশ্বর তীরবর্তী কাছাকাছি স্কুল নেই বললেই চলে। প্রায় ৮০ শতাংশ জেলেশিশুই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এবং ৯০ শতাংশ শিশু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত। গ্রামের মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। জেলে পরিবারের শিশুদের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন এগিয়ে এসেছে তাদের সামান্যতম সুবিধা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার। অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে জেলে সম্প্রদায়ের শিশুদের যে সামাজিক ভেদাভেদ আছে, তা কমিয়ে আনতে তাদের নিয়ে বিভিন্ন খেলাধুলা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়।

জেলে সম্প্রদায়ের শিশুদের যথাসম্ভব আইসিটির আওতায় নিয়ে আসার জন্য ডিজিটাল ভিলেজ নামে একটি প্রজেক্ট চালু করা হয়। যার মধ্য দিয়ে তাদের কম্পিউটার চালানো, গেমিং, ব্রাউজিং ইত্যাদি শেখানো হয়। পাশাপাশি 'স্বপ্নপূরণ' নামে একটি প্রজেক্ট চালু করেন; যার মাধ্যমে তারা রঙিন ছাতা বিতরণ করেন। প্রায় দেড় শতাধিক শিশুকে রঙিন ছাতা বিতরণ করে সংগঠনটি। তাদের শিক্ষা উপকরণও দিয়ে থাকে। বাচ্চাদের স্কুলমুখী করতে চালু হয় 'শিক্ষাবার্তা'। এ প্রজেক্টের সদস্যরা পরিবারের মাঝে শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন এবং তাদের স্কুলমুখী করেন।

প্রজেক্ট হাতেখড়ি ফ্রাইডে স্কুল

ফাউন্ডেশনের সদস্য সংখ্যা ১০০-এর অধিক। সবাই বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। জেলে পরিবারের শিশুদের বিনামূল্যে পড়াশোনা করানোর জন্য হাতেখড়ি ফ্রাইডে স্কুল নামে একটি প্রজেক্ট চালু হয়। যার মাধ্যমে সদস্যরা প্রতি শুক্রবার একটি নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস করান। ৫০-এর অধিক শিশুকে এর আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছেন এবং পাঁচজনের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন সদস্যরা।

জেলেশিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান অর্জনের দিকে এগিয়ে যাবে- সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চায় সংগঠনটি। অনাগ্রসর শিশুদের শৈশব ও শিক্ষার উন্নয়ন সম্প্রসারণ নিয়েও কাজ করতে চান তারা। ২০২৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে লিঙ্গবৈষম্য দূর করে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে রোধেরও চেষ্টা রয়েছে সংগঠনের সদস্যদের। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিশুদের স্কুলমুখী করাও অন্যতম তাদের লক্ষ্য।

মন্তব্য করুন