করোনাকালে ছাদে, ব্যালকনিতে জমিয়ে বাগান করেছেন- এমন লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে বাগান করতে গেলে পোকামাকড়সহ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যার বিনামূল্যে সমাধান দেন শফিকুর রহমান বিপ্লব। শফিক বিপ্লব নামে যার ব্যাপক পরিচিতি। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছায় এই কাজ করছেন তিনি। ফেসবুকে ইনবক্স কিংবা গ্রুপ যেখানেই হোক, সাহায্য চাইলেই তিনি এগিয়ে আসেন। মাঝবয়সী এই তরুণ হরিণাকুণ্ডু উপজেলার পৌর ব্লকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।

পেশাগত জীবনের বাইরে তিনি পাখিপালক এবং বাগান ও বন্য পাখি সুরক্ষায় তৎপর। একজন কৃষি পরামর্শক হিসেবে ফেসবুক গ্রুপ চঊঘঈ (গাছ অদলবদল ও পরিচর্যা) বাগান বিষয়ে পরামর্শ দেন। এ গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লাখ। হাজার হাজার বাগানপ্রেমীর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। রীনা নামে একজনের গোলাপ গাছ মরে যাচ্ছিল। ফেসবুকে পোস্ট দিতেই এগিয়ে আসেন শফিক বিপ্লব। রীনা বলছিলেন, শফিক বিপ্লব পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী কাজ করায় গাছ বেঁচে উঠেছে। তিনি শুধু পরামর্শ দিয়ে থেমে থাকেননি, পরে খোঁজখবরও রেখেছেন। প্রতিদিন অসংখ্য কৃষককে সরাসরি ও ফোনালাপের মাধ্যমে কৃষিসেবা দেন। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে বহু বেকার তরুণ-তরুণী স্বনির্ভর হয়েছেন। কেউ কেউ জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন বলে শফিক বিপ্লব জানান।

ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হুদা রাধানগর গ্রামে তার বাড়ি। নিজ বাড়িতে তিনি শত শত ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। প্রতিদিন অসংখ্য রংবেরঙের ফুল ফোটে। সচরাচর দেখা যায় না এমন ফুলের মধ্যে আছে- নীলমণি, স্বর্ণচাপা, কাঞ্চন ও বকুল। এ ছাড়া আছে শিউলি, দোলনচাপা, অর্কিড, ক্যাকটাস, হয়া, লিলি, বনসাই, বটপাকুড়, হাসনাহেনা, অপরাজিতা, পদ্ম শাপলা, ওয়াটার লিলি প্রভৃতি। পাশাপাশি অ্যাকুয়ারিয়াম, ভেষজ গাছ, সবজি ও ফলের গাছ রয়েছে। তিনি অ্যাকুয়ারিয়ামে নানা প্রজাতির মাছ ব্রিড (বাচ্চা) করাতে সফল হয়েছেন। গবেষণাধর্মী কাজ তার পছন্দ। নিজেই প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। অন্যদের জন্য সহজ পথ বের করে দেন। শফিক বিপ্লবের পোষা পাখির খামারে অস্ট্রেলিয়ান লুটিনো কাকাটেল, বাজরিগার, লাভ বার্ড রয়েছে। তিনি জানান, এসব পাখির বছরে প্রায় ২০০ বাচ্চা বিক্রি করে আয় করেছেন দুই লাখ টাকার বেশি।

দেশি বনের পাখি রক্ষার জন্য বন্যপাখি সুরক্ষা ক্লাব গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন গ্রামের প্রায় দুই হাজারের বেশি তরুণকে স্বেচ্ছাশ্রমে সচেতন করেছেন। নিজ খরচে ২৫টির মতো গ্রামে পাখির মুক্তাঙ্গন, সাইনবোর্ড, লিফলেট দিয়েছেন। যেসব ফুল-ফলের গাছ পাখির জন্য সহায়ক, সে ধরনের গাছও তিনি লাগিয়ে আসছেন অনেকদিন ধরে। এলাকায় দুই যুগ ধরে পড়ে থাকা পুকুরে মাছ চাষের ব্যবস্থা করেছেন। ৬৫টি পরিবার গত সাত বছর ধরে বড় মাছ খেতে পারছে বলে তিনি জানান।

শফিক বিপ্লব দেশসেরা কৃষি পরামর্শক হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত, ডান পায়ে কিছুটা অস্বাভাবিকতা আছে। তবুও তিনি দমে যাওয়ার লোক নন। মাঝবয়সী উদ্যমী, পরিশ্রমী এই তরুণ দিনরাত গাছপ্রেমী ও কৃষকদের সহায়তা করছেন। সাহায্য চাইলেই তিনি তৎক্ষণাৎ সাড়া দেন। এ জন্য অনেকেই তাকে গাছপ্রেমীদের বন্ধু বলেন। কারও কারও কাছে তিনি গাছের ডাক্তার। কৃষকদের কাছে তিনি অতি আপন বন্ধু। কৃষি নিয়ে যারা কাজ করতে চান তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হলেন শফিক বিপ্লব।

মন্তব্য করুন