সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার সুপ্রাচীন ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দির। ৪৩৮ বছরেরও বেশি সময় আগে রাজা বিক্রমাদিত্যর নির্মিত মন্দিরটি এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্তৃপক্ষের অমনোযোগের অভাবে ঐতিহাসিক মন্দিরটি ধ্বংসের পথে। ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দির ঘুরে এসে লিখেছেন এলিজা বিনতে এলাহী


বুড়ন দ্বীপ। এই দ্বীপ কি আমাদের বাংলাদেশে! হ্যাঁ, আমাদের দেশেরই এক সমৃদ্ধ অঞ্চল। সাতক্ষীরা জেলার প্রাচীন নাম বুড়ন দ্বীপ। সম্প্রতি ঘুরে এলাম সাতক্ষীরা দ্বিতীয়বারের মতো। এবার সাতক্ষীরা যেন নতুন রূপে ধরা দিল আমার কাছে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে।

নবরত্ন মন্দির ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাঠকদের জানানোর আগে সাতক্ষীরা জেলার সমৃদ্ধ অতীত নিয়ে একটু কথা বলতে লোভ হচ্ছে। রামায়ণ-মহাভারতের তথ্য অনুসারে, এ অঞ্চলে মানুষের বসতি শুরু হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে থেকে। এর থেকে গর্বের বিষয়, বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দাদের জন্য আর কী হতে পারে।

আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে। তার ভারত আক্রমণের সময় গঙ্গার মোহনায় গঙ্গারিডি নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমান সাতক্ষীরা জেলা ছিল এ রাষ্ট্রের অধীন। আলেকজান্ডারের পর মৌর্য ও গুপ্ত যুগে বুড়ন দ্বীপ পরিচিত ছিল খাড়িমণ্ডল নামে। চন্দ্র বর্মণ খাড়ি অঞ্চল দখল করেন চতুর্থ শতকে। অষ্টম থেকে একাদশ পর্যন্ত পাল ও বর্মণ রাজারা শাসন করেন এই বুড়ন দ্বীপ। তারপর এই অঞ্চলে আসেন সেন রাজারা। বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয় থেকে শুরু হয় মুসলিম রাজত্ব। এরপর আসেন বারোভূঁইয়ারা।

যুগে যুগে আবির্ভূত হতে থাকে ব্রাহ্মণরাজা, মোগল ও ইংরেজরা। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ এ অঞ্চল মহকুমার মর্যাদা পায়। তারপর ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয় সাতক্ষীরা।

মন্দিরের ভগ্নদশা

দীর্ঘ শাসনের এই পরিক্রমা সাতক্ষীরা জেলাকে সমৃদ্ধ করেছে। রয়েছে পুরোনো অনেক স্থাপনা। যদিও বর্তমানে এর খুব অল্পই টিকে রয়েছে। ২০১৮ সালে আবিস্কৃত হয়েছে দেড় হাজার বছরের পুরোনো একটি মন্দির। মোগল স্থাপনা হিসেবে মসজিদ ছাড়াও আছে দুটি হাম্মামখানা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হিসাব অনুসারে সাতক্ষীরা জেলায় প্রত্নস্থান আছে ১৪টি। এ ছাড়া ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শন, জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে পুরো সাতক্ষীরা অঞ্চলজুড়ে।

দু'বারের ভ্রমণে মন ভরে দেখেছি সাতক্ষীরা। তাহলে লেখার জন্য কেন ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দির বেছে নিলাম। কারণ দুটি- প্রথমটি এটির নির্মাণকাল, দ্বিতীয়টি মন্দিরের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান।

ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দির সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায়। সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কালীগঞ্জ উপজেলা। জেলা শহর থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে, আছে মাহেন্দ্র ও অটোরিকশা। তবে বাসে করেই যাওয়া নিরাপদ, সময়ও কম লাগবে। বাসে করে গিয়ে নেমেছি কালীগঞ্জ শহরের মূল বাস টার্মিনালে। কালীগঞ্জের প্রত্নস্থলগুলো দেখার জন্য আমার কাছে সব থেকে সহজ মনে হয়েছে সেখানকার বাইক সার্ভিসের সহায়তা নেওয়া। কারণ ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দির দেখার জন্য বাইকই একমাত্র বাহন মন্দিরের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য।

কালীগঞ্জের মোস্তফাপুর গ্রামে এই মন্দিরের অবস্থান। মোস্তফাপুর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একটি গ্রাম। বাইকচালক বলছিলেন, 'আপা, ওই যে দেখুন ভারত দেখা যাচ্ছে'। গ্রামে লোকবসতি বেশ কম মনে হলো। মন্দিরের কাছাকাছি যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত বাইক রেখে তারপর প্রায় ২ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে যেতে হবে, সেটিও আবার চিংড়িঘেরের আল ধরে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটি দ্বীপের মধ্যে একটি স্থাপনা দণ্ডায়মান। ২০২০ সালে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে এটি যখন নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান কেমন ছিল! এ রকম চিন্তা করতে করতে এগোচ্ছিলাম মন্দির দর্শনে।

গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তার বইতে উল্লেখ করেছেন, নব্বইয়ের দশকে তিনি হাঁটু অবধি পানি, কাদা পেরিয়ে মন্দিরের দেখা পেয়েছেন। ড. মিজানুর রহমান ২০০০ সালে প্রায় একই রকম অবস্থা পেয়েছেন। এই মন্দির নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা কথা, উপকথা। তবে গবেষকদের তথ্যগুলো আগে বলি তারপর বলছি সেখানকার স্থানীয়দের কথা।

চারদিকে নোনা পানির ঘেরের মাঝে এক টুকরো জায়গায় মন্দিরটির সামনে লেখক

জানা যায়, রাজা বিক্রমাদিত্য নয়জন গুণী ব্যক্তি নিয়ে একটি দল গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিতেন। নয়জন সভাসদ নিয়ে এ মন্দিরে মিলিত হতেন বলে এটির নাম নবরত্ন মন্দির হয়েছে। এ বিষয়ে গবেষক সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেছেন, 'এখানে বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভা বসিত, সমাজের মিলন হইত, তাহাতে সামাজিক বিধিনিষেধ লিপিবদ্ধ হয়ে থাকিত।' ড. মিজানুর রহমান তার বর্ণনায় একটি সরকারি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে এই মন্দিরকে কোনো ধর্মীয় মন্দির বলা হয়নি। এই মন্দিরকে বলা হয়েছে সামাজিক মন্দির।

সামাজিক মন্দিরের বিষয়টি গবেষকরা নাকচ করে দিয়েছেন এই মন্দিরের আকার-আকৃতি দেখে। বইতে পড়েছি, মন্দিরের পশ্চিম দিকের দেয়ালে ইষ্টকলিপিতে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল আর যিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটি লেখা ছিল। সেই দেয়ালে, খুব খেয়াল করলে আজও সেই ইষ্টকলিপি চোখে পড়ে। তবে তা এতটাই ম্রিয়মাণ যে, ক্যামেরায় ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ইতিহাসবিদরা ইষ্টকলিপির পাঠ উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছেন। সেখান থেকেই জানা যায় এর নির্মাণকাল ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দ আর নির্মাণ করেছেন রাজা বিক্রমাদিত্য।

চিংড়িঘের ধরে যেতে যেতে পেছন থেকে এক নারী কণ্ঠ বলে উঠলেন, 'ও দিদি, কই গেছিলা?' আমি মন্দির দর্শনের কথা বললাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, 'এই মন্দির এক রাতে হয়েছে। এই অঞ্চলের কোনো কোনো তরুণ এই মন্দিরের ওপরে উঠেছিল, সবাই পাগল হয়ে গেছে। তাই আমরা এই মন্দিরের কাছাকাছি যাই না। তিনি আরও বললেন, আরও ৪-৫টি মন্দির ছিল। সব ভেঙে গেছে।' সেই নারীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাইকের কাছে এলাম। আর কয়েক বছর পর নবরত্ন মন্দিরের কতটুকু অংশ অক্ষত থাকবে বলা মুশকিল। প্রাচীন এই মন্দিরটি সংরক্ষণ করা খুবই জরুরী। চারদিকে চিংড়িঘেরের লবণ পানি মন্দিরের ক্ষতি করছে। কিছুদিন পর হয়তো সেখানে যাওয়ার পথটুকুও থাকবে না। তখন এলে দুই কিলোমিটার দূর থেকে নবরত্ন মন্দির দর্শন করে ফিরে যেতে হবে।

এই অঞ্চলটি একসময় ধামরাইল পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল, সে জন্যই এই মন্দিরকে ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দির বলা হয়। ধামরাইল কালক্রমে অপভ্রংশ হয়ে ড্যামরাইল হয়েছে।

মন্তব্য করুন