গত বছর শীত শেষে ফাল্কগ্দুনের বাতাসের সঙ্গে পৃথিবীতে আগমন 'করোনা' নামক এক অজানা ভাইরাসের। আতঙ্কের শুরুটা চীন হয়ে ইউরোপে পৌঁছাল। বাংলাদেশেও অজানা ভাইরাস আতঙ্ক শুরু হয়ে গেল মার্চ থেকেই। সবাইকে নিরাপদ রাখতে লকডাউন, অতঃপর জীবিকা বন্ধ। এমন সময়েই দুই বন্ধুর ভাবনা থেকে 'পাশে আছি' সংগঠনের যাত্রা শুরু। 'যতই ভাব মারো মুখে মাস্ক না পরলে রক্ষা নাই' কিংবা 'মাস্ক না পরলে করোনার ভেলকি লাগবে, বোঝো নাই ব্যাপারটা'- এরকম বৈচিত্র্যময় কথা রিকশা পেইন্টের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে সংগঠনটি। মজার মজার লেখার সঙ্গে বাংলা ছবি বা নাটকের জনপ্রিয় চরিত্রগুলো রিকশা পেইন্টের শৈল্পিক উপস্থাপনা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। 'আমরা ভাবছিলাম প্রথম থেকেই একটু আলাদাভাবে কী কাজ করা যায়। সেই ভাবনা থেকে রিকশা পেইন্টের আইডিয়া'-

বলছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তাহমিদ হাসান। কেমন সাড়া পেলেন- এ প্রশ্নের উত্তরে তাহমিদ জানান, 'আমরা প্রথমে রিকশা চালকদের বুঝিয়েছি। তারা সানন্দে রাজি হন তাদের রিকশায় পেইন্ট করাতে। কাজ শেষে আমরা ধীরে ধীরে এর সাড়া পেয়েছি। যাত্রীরা এই আর্ট দেখে কেউ ছবি তুলতেন, কেউ ভালো লাগার কথা জানাতেন রিকশাচালকদের কাছে।' সচেতন করতে কেন এই ভাবনা- তাহমিদের উত্তর, রিকশা পেইন্ট আমাদের একটি ঐতিহ্য; যা দিয়ে সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি তথ্যের আদান-প্রদান করা যায়।' শুধু কি করোনা নিয়ে পেইন্ট! রয়েছে সামাজিক আরও অনেক ইস্যু নিয়ে 'পাশে আছি'র শৈল্পিক উপস্থাপনা। 'কন্যা জায়া, জননী চায় ধর্ষক মুক্ত ধরণী', 'ধর্ষণের জন্য পোশাক নয়, ধর্ষক দায়'- এরকম শত শত ভাবনার শৈল্পিক রূপ পেয়েছে রিকশা পেইন্টে; যা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের ভাবনার জগতে একটু একটু করে দোলা যাচ্ছে। শুধুই সচেতনতা নয়, চমৎকার এই রিকশা আর্টের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতেও এই ভাবনা জানালেন তাহমিদ।

'পাশে আছি' সংগঠনটির আর্টিস্ট হানিফ পাপ্পু নিজের আর্ট নিয়ে বলেন, 'ধর্ষণ নিয়ে আর্ট করতে গেলে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। এরকম ঘৃণ্য অপরাধ নিয়ে কেন আর্ট করা লাগবে একটা দেশে ভাই। মানুষের তো নূ্যনতম বিকার থাকলেও ধর্ষণের মতো অপরাধ করার কথা নয়। আমার ক্ষমতা নেই বেশি কিছু করার, তাই এই আর্টের মাধ্যমেই আমি প্রতিবাদ করব। ধর্ষকের বিচার চাইব।'

তাহমিদ ছাড়াও সংগঠনটির আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেন রাফিউল মাহমুদ চৌধুরী। রিকশা পেইন্টের এ আইডিয়া ছাড়াও করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্রদের মাঝে খাবার দেওয়ার কাজ ছিল নিয়মিতই। 'গ্রন্থমঙ্গল' নামে একটি প্রজেক্ট চালু করেছেন নীলক্ষেতের বই দোকানদারদের করোনায় আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচাতে। তাহমিদ বলেন, 'আমরা কারুশিল্পীদের নিয়েও কাজ করার চেষ্টা করেছি। করোনার সময় মেলা না হওয়ায় অনেকেই বানিয়ে রাখা জিনিস বিক্রি করতে পারেননি। আমরা তাদের কাজগুলো আমাদের পেইজের মাধ্যমে তুলে ধরে বিক্রি করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।'

তরুণদের গড়া সংগঠনটি নিজ ক্যাম্পাস নিয়ে কাজ করেছে। মানুষের ফেলে আসা পল্গাস্টিকের কাপ, প্যাকেট আর পলিথিন ব্যাগের স্তূপ জমেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায়। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তা পরিস্কার করার কেউ নেই। তাই নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্কারের জন্য মাঠে নেমে পড়েছিল নিজেরাই।

সিরাজগঞ্জের প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক সুশান্ত। ছোট্ট মেয়েকে চুড়ি কিনে দিতে পারেননি অভাবের কারণে। এই কথা শুনে পাশে এসে দাঁড়ায় 'পাশে আছি'। সবার সহায়তায় তারা সুশান্তকে করে দেয় চা-মুদির দোকান।

মন্তব্য করুন