বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব শিল্পী কামরুল হাসান। বাংলার রূপময় প্রাণবৈচিত্র্য ছিল যার শিল্পকলার প্রধান বিষয়।কামরুল হাসান তার প্রতিদিনের দিনলিপি একটি খাতায় শৈল্পিকভাবে লিখে গিয়েছেন, যার নাম দিয়েছেন খেরো খাতা। ২ ফেব্রুয়ারি শিল্পীর মৃত্যুদিনে তার জীবন ও খেরো খাতা নিয়ে রচনা...

আমৃত্যু জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক কামরুল হাসান ছিলেন দেশাত্মবোধে পুরোপুরিভাবে উদ্বুদ্ধ একজন শিল্পী। কামরুল হাসানের শিল্পচর্চা ও চেতনার শিকড় আবর্তিত হয়েছিল আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির অনুভবকে ঘিরেই। যে কারণে তার নির্মাণ আর সৃষ্টিতে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বাঙালি জীবনের রূপায়ণ; কখনও এ রূপায়ণ শিল্পিত, মনোজ আর সুষমামণ্ডিত, কখনও প্রতিবাদী। এই প্রতিবাদ বিশেষভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তার ড্রইংয়ে।

বাঙালির প্রগতিশীল সব সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষ থেকে ধর্মান্ধতা ও স্বৈরতন্ত্রে তিনি তার অতুলনীয় ড্রইং নিয়ে সর্বদাই উপস্থিত থেকেছেন নন্দনে ও প্রতিবাদে। কামরুল হাসান তার ড্রইংয়ে দক্ষতা অর্জন করে বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়িয়েছিলেন। এমনকি তাকে সবাই শিল্পী বললেও তিনি নিজে 'পটুয়া' নামেই পরিচিত হতে পছন্দ করতেন। চিত্রকর্ম ও ড্রইংয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দিনপঞ্জির মতো করে এক ধরনের খাতা লিপিবদ্ধ করতেন। রেখাচিত্র, নানারকম বক্তব্য, কথা- এমনকি দৈনন্দিন জীবনের নানা তথ্য ও তাৎক্ষণিক চিন্তাও স্থান পেত সেই খাতাতে। পটুয়া কামরুল হাসান তার এই ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ডায়েরির নাম দিয়েছিলেন 'খেরো খাতা'। দিনপঞ্জি হলেও ধীরে ধীরে এই খেরো খাতা তার শিল্পচর্চায় একটি বিশেষ জায়গা লাভ করে।

১৯৭৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীতে তিনি কোনো এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে ময়মনসিংহে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই একটা খেরো খাতা কেনেন। এ রকম খাতা সাধারণত বাঙালি ব্যবসায়ীরা হিসাব লেখার কাজে ব্যবহার করতেন। লালসালুর মলাটবদ্ধ এক তারা লম্বাটে কাগজে তৈরি এই খেরো খাতা। ময়মনসিংহে কেনার পর থেকেই তিনি লিখতে শুরু করেন তার দৈনন্দিন বিভিন্ন বিষয় দিনলিপি, তার মনের বিভিন্ন চিন্তা, চেতনা, কখনও পারিপার্শ্বিক কখনও রাজনৈতিক কখনও সামাজিক আবার একান্তই পারিবারিক ঘটনা। নানাবিধ বিষয় আর তার পাশাপাশি চলে ওই খেরো খাতার ওপরই লেখার ফাঁকে ফাঁকে তার শিল্পচর্চা। অসাধারণ সব শিল্প সৃষ্টি। কখনও অক্ষরগুলোকে শিল্পে পরিণত করা আবার লিখতে লিখতে আঁকিবুঁকি, এই নিয়ে তার খেরো খাতা।

খেরো খাতার প্রতিটি পৃষ্ঠাই যেন এক একটা চিত্রকর্ম। লেখায় রেখায় এক-একটা কোলাজ। কোথাও কালো, কোথাওবা বর্ণিল। কামরুল হাসানের এই খেরো খাতা তার সময়ে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনেক কর্মকাণ্ডের দুর্লভ দলিল। এখানে তিনি তার প্রায় প্রতিদিনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবনা, অভিজ্ঞতার কথা শুধু লিখতেন না, সেই সঙ্গে তার গুণীজন বন্ধুজনকে উৎসর্গ করেও আঁকতেন ও তাদের নিয়ে লিখতেন।

মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তার অনুভূতি লিখে গেছেন এই খেরো খাতায়। মোট খাতার সংখ্যা ৪৩ তবে ৪২ নং খাতাটি তিনি কী কারণে দুটো করেছিলেন তা জানা যায় না। কামরুল হাসানের এই বিখ্যাত খেরো খাতাগুলো ৪ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন