যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে বলা হচ্ছে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বৈচিত্র্যময় প্রশাসন। বিভিন্ন জাতি বংশোদ্ভূত-বর্ণ-পেশার মানুষের সমাহার ঘটিয়েছেন তার আগামী চার বছরের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার দলে। সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে রয়েছেন তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানও।  তাদের নিয়ে লিখেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন

বৈচিত্র্যের আলোকচ্ছটা

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে মার্কিন ইতিহাসের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে সদ্য শপথ নিয়েছেন ডেমোক্রেটিক নেতা জো বাইডেন। এই খবর পুরোনো হয়ে গেলেও নতুন করে সংবাদের শিরোনাম লেখা হচ্ছে তার 'মোস্ট ডাইভার্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' তথা বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রশাসনের জন্য। বাইডেনের রানিং মেট কমলা হ্যারিস একজন আধা ভারতীয়, আধা কৃষ্ণাঙ্গ। পেন্টাগনের প্রধান হয়েছেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি চিফ করা হয়েছে একজন ল্যাটিনকে, কেবিনেট সেক্রেটারি একজন নেটিভ আমেরিকান এবং একজন সমকামী পেয়েছেন ট্রান্সপোর্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব। এ ছাড়া কাশ্মীরি, ফিলিস্তিনি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান এবং বাংলাদেশিরাও আছেন বাইডেনের প্রশাসনে; যা বাইডেনের ভাষায় 'লুকস লাইক আমেরিকা'র প্রতিফলন।

আমেরিকার নবগঠিত প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দায়িত্ব পেয়েছেন তিন বাঙালি। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফের সিনিয়র অ্যাডভাইজার পদে আছেন জাইন সিদ্দিক, আমেরিকার কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লি উন্নয়ন সচিবালয়ের আন্ডার সেক্রেটারির চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ফারাহ আহমেদ এবং বাইডেনের ট্রানজিশন টিমের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন আরেক বাংলাদেশি-আমেরিকান রুমানা আহমেদ।

হোয়াইট হাউসে জাইন সিদ্দিক

জো বাইডেনের হোয়াইট হাউস প্রশাসনে প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন জাইন সিদ্দিক। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফের সিনিয়র অ্যাডভাইজার পদে ঘোষণা করা হয়েছে তার নাম। বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই হোয়াইট হাউসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ঘোষিত হয় জাইনের নামও।

৩০ বছর বয়সী তরুণ জাইন ময়মনসিংহের নান্দাইলের শেরপুর ইউনিয়নের মাদারীনগর গ্রামের চিকিৎসক দম্পতি মোস্তাক আহম্মেদ সিদ্দিকী ও কামরুন আবেদীন হেলেনা সিদ্দিকীর একমাত্র সন্তান। আশির দশকে আমেরিকার নিউইয়র্কে পাড়ি জমান জাইনের মা-বাবা। সেখানেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও লেখাপড়া। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি ও ইয়েল ল' স্কুল থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া জাইনের কর্মজীবন শুরু হয় আমেরিকান সুপ্রিম কোর্টের জজ এলেনা কাগান এবং ইউএস কোর্ট অব আপিলের জজ ডেভিড ট্যাটেলের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেছেন খ্যাতনামা ল' ফার্ম ওরিক হেরিংটন অ্যান্ড সাটক্লিফ এলএলপিতে।

গত বছর কমলা হ্যারিসের ভাইস প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের প্রস্তুতি টিমের সদস্য ছিলেন তিনি। তার আগে বেটো ও' রোরকের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচার দলের ডেপুটি পলিসি ডিরেক্টর ছিলেন। তার সিনেট ক্যাম্পেইন টিমেরও সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার ছিলেন জাইন। বাইডেন-কমলা ট্রানজিশন টিমে অভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক টিমের চিফ অব স্টাফ হিসেবেও কাজ করেন জাইন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ে ফারাহ আহমেদ

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফারাহ আহমেদ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ইউএসডিএ বা ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার তথা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লি উন্নয়ন সচিবালয়ের আন্ডার সেক্রেটারির চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বাংলাদেশের নরসিংদীর শিক্ষক দম্পতি ড. মাতলুব আহমেদ এবং ড. ফেরদৌস আহমেদের কন্যা ফারাহ। তার দাদা বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল বাতেন খান। ড. মাতলুব ও ড. ফেরদৌস ওয়াইওর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিযুক্ত। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও নিউজার্সির প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া ফারাহ ইউএসডিএতে যুক্ত হওয়ার আগে কনজুমার এডুকেশনের সিনিয়র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর এবং কনজুমার ফাইন্যান্সিয়াল প্রটেকশন ব্যুরোর চিফ অপারেটিং অফিসারের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি বর্তমান মন্ত্রণালয়েরই কমিউনিটি অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট টিম ইন দ্য রুরাল বিজনেস কো-অপারেটিভ সার্ভিসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া আমেরিকা প্রোগ্রেসের সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম শাখায় রুমানা

ট্রাম্পের আগমনে মুসলিম হওয়ার দায়ে এবং হিজাব পরার কারণে বঞ্চনার শিকার হয়ে ২০১৭ সালে হোয়াইট হাউস ছেড়ে আলোচনার জন্ম দেওয়া বাংলাদেশি-আমেরিকান রুমানা আহমেদ জায়গা পেয়েছেন বাইডেনের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দলে। ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়ার (ইউএসএজিম) রিভিউ প্যানেলের সাত সদস্যের অংশ হয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন তিনি। বারাক ওবামার প্রস্থানের পর হিজাব পরায় ট্রাম্পের প্রশাসনের লোকদের দ্বারা অপদস্থ হয়ে পদত্যাগের নেপথ্য কারণ বর্ণনা করে দ্য আটলান্টিকে একটি কলাম লেখেন রুমানা। কলামে রুমানা লেখেন মুসলিম হওয়ার কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বারা কীভাবে তিনি মানসিকভাবে অত্যাচারিত হন। এরপর আলোচনায় আসেন তিনি এবং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

তার বাবা ১৯৭৮ সালে লেখাপড়ার উদ্দেশে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় আসেন। এখানে এসে তার মা একটি দোকানে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করেন। বাবা ব্যাংক অব আমেরিকায় লেটনাইট কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পরে একটি শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রমোশন পান। ১৯৯৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু ঘটে। রুমানা জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বারাক ওবামার প্রশাসনে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে যোগ দেন এবং ওবামা ক্ষমতা ছাড়ার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই তাকে চাকরি ছাড়তে হয়।

মন্তব্য করুন