সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছিন্নমূল পথশিশু ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের নৈতিক ও অক্ষর জ্ঞান প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করে এই চার চাকার স্কুল

চাকার স্কুল- নামটা শুনে কৌতূহলী হচ্ছেন নিশ্চয়ই! চাকায় ভর করে আস্ত একটি স্কুল ছুটে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর কাছে। কী নেই সেই স্কুলে- মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, পাঠ্যপুস্তক, বিনোদনের নানা উপকরণ। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে এমনই ব্যতিক্রমী স্কুল তৈরি করেছেন একদল স্বপ্নবাজ তরুণ।

শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালে সৈয়দপুর থানায়। পরে সৈয়দপুরে দুটি, রাজধানীর টঙ্গীতে দুটি এবং সিলেটে দুটিসহ সর্বমোট সাতটি স্কুলে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের শিক্ষা ও সঠিক বিকাশের লক্ষ্যে স্কুলের উদ্যোগ নেয় ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন। দারিদ্র্য আর দূরত্বের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো স্কুলে আসতে পারে না। সমস্যার সমাধানে হয় ছয় চাকায় ভর করা 'চাকার স্কুল'। স্কুলটি নির্মাণের কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয় এবং ২০২০ সালের জুলাই মাসে কার্যক্রম শুরু হয়।

করোনা মহামারিতে সম্প্রতি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুবই সীমিত পরিসরে শুরু করে স্কুলটি। দূর থেকে একটি বাস চোখে পড়লেও চাকার স্কুলে ঢুকে শিক্ষার ব্যতিক্রমী নান্দনিক পরিবেশ যে কারোরই নজর কাড়বে।

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছিন্নমূল পথশিশু ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের নৈতিক ও অক্ষর জ্ঞান প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করে এই স্কুল। সপ্তাহে তিনদিন চলে এই স্কুল। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে মানা হয় কঠোর স্বাস্থ্যবিধি। সবার মুখে মাস্ক ও ফেস শিল্ড। বাসের ভেতর ঢুকতেই সামনে একটি বড় টেলিভিশন। মীনা কার্টুনের পাশাপাশি নানা রকম শিক্ষামূলক ভিডিও দেখানো হয় শিশুদের। বইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে ট্যাবলেট। যেখানে তারা নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে পড়তে পারছে। আধুনিক সব উপকরণে সমৃদ্ধ সাজানো চার চাকার বাসের ভেতর শ্রেণিকক্ষের আদলে দেওয়া হয় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা।

সাধারণ শ্রেণিকক্ষের মতো সেখানে আছে হোয়াইট বোর্ড, ডাস্টার, হাজিরা খাতা। দুই পাশের দেয়ালে ছবি মিলিয়ে সাঁটানো স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজি বর্ণ। বাসের সামনের অংশে রয়েছে শিশুদের জন্য জুতা রাখার বক্স, ওয়াটার ফিল্টার ইত্যাদি। পেছনের অংশে একটি লাইব্রেরি। শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য আছে বিভিন্ন রঙের বল, ব্লকগেম, ফ্ল্যাস কার্ড ও লেগোসহ হরেক জিনিস। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রয়েছে ফার্স্ট এইড বক্স ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সিসি ক্যামেরা ও ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম, সঙ্গে আছে ইন্টারনেট সংযোগ।

ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আদনান হোসাইন বলেন, পথশিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এ উদ্যোগ। করোনার কারণে সীমিত পরিসরে মিরপুর-১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজধানীর চারটি জোন এবং দেশের বিভিন্ন শহরের পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় কাজ করে যাচ্ছে চাকার স্কুল। চাকার স্কুলের প্রকল্প পরিচালক মিস নূর-ই-ফয়জুন নাহার জানান, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে চাকার স্কুল পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায়ে এনে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।'

মন্তব্য করুন