'ভালোবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়'- কথাটা আমার নয়, প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজের। প্রশ্ন হচ্ছে ভালোবাসা একজন মানুষকে কীভাবে খায় কিংবা কতটুকুই বা খায়! যুগ যুগ ধরে প্রেমের জন্য প্রেমিক কিংবা প্রেমিকাদের পাগলামির ইতিহাসে চোখ রাখলে সেটা দিনের আলোর মতোই পরিস্কার হয়ে যাবে।

জার্মান সুরস্রষ্টা বেথোভেনকে ধরা হয় সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুরকারদের একজন। 'অমর প্রিয়তমা'র উদ্দেশে তার লেখা অনবদ্য চিঠিতে যদি চোখ রাখি, তবে প্রেমের নিবেদনের গভীরতা দেখতে পাই। ১৮১২ সালের জুলাই মাসে বেথোভেন 'ইম্‌মরটাল বিলাভেড' সম্বোধনে নামহীন একজনকে প্রেমপত্র লিখেন। ধারণা করা হয়, এই 'অমর প্রিয়তমা' হলেন তৎকালীন এক কূটনীতিকের মেয়ে। বেথোভেনের মৃত্যুর পর চিঠিটি উদ্ধার করা হয়। চিঠিতে বেথোভেন লিখেন-

'হে অমর প্রিয়তমা আমার, তোমাকে নিয়ে আমার যত ভাবনা, আমার হৃদয়ের আকুলতা, সব আনন্দ এবং সব মনোবেদনা, আমি সেই সৌভাগ্যের অপেক্ষায় আছি যে কিনা আমাদের কথা শুনবে। আমাকে হয়তো তোমার সঙ্গে কিংবা একাই বাঁচতে হবে কিংবা এর কোনোটাই নয়। হ্যাঁ, আমি শুধু তোমার কথা ভেবেই ওই দূর-দূরান্তে একাকী ঘুরে বেড়িয়েছি, যতক্ষণ না আমি তোমার বাহুডোরে আশ্রয় পাচ্ছি, ঘরের শান্তি পাচ্ছি। আমার অনুশোচনা হচ্ছে। হ্যাঁ, আমার সেটা হওয়াই উচিত, আমি কেন আমার আত্মাকে খামবন্দি করে তোমার কাছে, যেখানে প্রাণের রাজত্ব, সেখানে পাঠাতে পারছি না। আমার হৃদয় তোমার প্রতি অনুগত... তুমি ছাড়া আর কেউ কখনোই আমার হৃদয়ে স্থান পাবে না, কখনোই না, কখনোই না। হে ঈশ্বর, কেউ যখন কাউকে এত ভালোবাসে, সে তখন কীভাবে তার কাছ থেকে এত দূরে থাকতে পারে! ...হে আমার পরী, প্রতিদিন ডাকবাক্স খোলা হয়, আবার বন্ধ হয়- আমার চিঠিটি তুমি যে কোনো সময় পেয়ে যাবে, আমাকে ভালোবেসো আজ-গতকাল। তোমার জন্যই আমার চোখের অশ্রু- তুমি, শুধুই তুমি।'

বিখ্যাত ইংরেজ রোমান্টিক কবি জন কিটস প্রেমে পড়েছিলেন ফেনি ব্রুনের। তাদের মধ্যে প্রেম হয়েছিল, কিন্তু বিয়ে পর্যন্ত সেই প্রেম গড়াতে পারেনি। সূত্রমতে, কিটসের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা-পয়সা ছিল না। তার বন্ধুরাও এই বিয়েতে রাজি হয়নি। তবে ১৮২১-এ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কিটস ভালোবেসেছিলেন ফেনি ব্রনকে। এ সময় নিয়ম করে তিনি ফেনিকে প্রেমপত্র লিখতেন। কিটসের একটি চিঠির অংশ পাঠে তার প্রেমের অন্ধত্ব বোঝা যায়- 'আমার ভালোবাসা স্বার্থপর বানিয়েছে আমাকে। তোমাকে ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্ব দেখতে পাই না আমি। তোমাকে বারবার দেখার জন্য আমি সব ভুলে যেতে প্রস্তুত। জীবন থমকে আছে এখানে, লুটে নিয়েছ তুমি আমার সব... ধর্মের জন্য আমি শহীদ হতে পারি, ভালোবাসাই আমার ধর্ম, ভালোবাসার জন্য মরতে প্রস্তুত আমি, তোমার জন্য মরে যেতে পারি...।'

গ্রিক পুরাণেও দেখা পাই, ভালোবাসার জন্য পাগলপ্রায় দেব-দেবীরা। অরফিয়াসের কথাই যদি বলি, অরফিয়াস ছিলেন অ্যাপোলোর সন্তান, যিনি ছিলেন একাধারে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী, কবি এবং ধর্মগুরু। অরফিয়াস সাগর, বন, পর্বতের উপদেবী ইউরিডাইসের প্রেমে পড়েন। একপর্যায়ে বিয়ে হয় দু'জনের। আনন্দেই কাটছিল দু'জনের জীবন। কিন্তু ভূমি এবং কৃষির দেবতা পরিস্টিয়াসের নজর পড়ে ইউরিডাইসের ওপর। ইউরিডাইস পরিস্টিয়াসের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালাতে গিয়ে এক সাপের গর্তে পড়ে যায়, সাপ তার পায়ে বিষাক্ত ছোবল মারে। স্ত্রীকে উদ্ধারে দেবতাদের পরামর্শে অরফিয়াস পাতালপুরীতে প্রবেশ করেন। পাতালপুরীতে তার গান শুনে হেডসের মন গলে। হেডস ইউরিডাইসকে অরফিয়াসদের সঙ্গে পৃথিবীতে পাঠাতে রাজি হন। কিন্তু সে জন্য একটা শর্ত দেন। অরফিয়াসকে ইউরিডাইসের সামনে থেকে হেঁটে যেতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পৃথিবীতে না পৌঁছাবে, ততক্ষণ অরফিয়াস পেছনে ফিরতে পারবে না। কিন্তু আতঙ্কিত অরফিয়াস হেডসের কথা ভুলে ইউরিডাইসকে দেখতে পেছনে ফেরে। তখন অরফিয়াসের জীবন থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে যায় প্রিয়তমা ইউরিডাইস।

প্রেমে পাগল সাধারণ মানুষের কিছু কর্মকাণ্ডও যে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে, এবার দেব তেমন কিছু ঘটনার বর্ণনা।

প্রেমিকার মৃতদেহ সাত বছর ঘরে মমির মতো পুতুল বানিয়ে রেখে আলোড়ন তুলেছিলেন জার্মানির কার্ল টেঞ্জলার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার ফ্লোরিডাতে পাড়ি জমানো টেঞ্জলারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে মারিয়া অ্যালেনা মিলাগ্রো ডি হোয়োস নামের কিউবান বংশোদ্ভূত এক আমেরিকান মহিলার সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই অ্যালেনার প্রেমে পড়ে যান টেঞ্জলার। একে অপরের প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলেন তারা; কিন্তু এই ভালোবাসার সলিল সমাধি ঘটে অল্পদিনের মধ্যেই। ১৯৩১ সালে যক্ষ্ণায় ভুগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন অ্যালেনা। অ্যালেনার মৃত্যুর পর টেঞ্জলার প্রায় দু'বছর প্রতিদিন তার সমাধিতে যেতেন। কিন্তু এরপর তার চাকরি চলে যাওয়ার কারণে সমাধিতে যাওয়া বন্ধ করে দেন টেঞ্জলার। তার এই পরিবর্তনে সবাই বিস্মিত হলেও আসল কারণ ছিল সবার কল্পনার বাইরে। ১৯৩৩ সালের এপ্রিল মাসে টেঞ্জলার অ্যালেনার দেহটি কবর থেকে বের করে নিজের বাড়িতে এনে রাখেন। প্রেমিকার মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য পুরোনো একটা অ্যারোপ্লেনের মধ্যে ল্যাবরেটরি গড়ে তোলেন। অ্যালেনার ক্ষয়িষ্ণু শরীর অক্ষত রাখতে টেঞ্জলার বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। হোয়োসে শরীরে কোট পরাতেন, কাচের চোখ দিয়ে চোখ বানাতেন, ছোট ছোট কাপড় গুঁজে মাথা এবং শরীরের আকৃতি ঠিক রাখার চেষ্টা করতেন। নকল চুল লাগিয়ে মাথা ঢেকে রাখতেন। নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিজের কাছে রাখার এই আপ্রাণ চেষ্টা তার সফল হয়নি যদিও, ১৯৪০ সালে প্রায় সাত বছর পর টেঞ্জলার ধরা পড়ে যান। আইন-আদালত শেষে তিনি মুক্তি পেলেও বাকি জীবন একাকী কাটিয়ে দিয়ে ১৯৫৩ সালে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ভারতের বিহারের গেহলৌর গ্রামের দশরথ মাঝির কথা কমবেশি সবারই জানা। গেহলৌর পাহাড় থেকে পড়ে তার স্ত্রী ফাল্কগ্দুনী দেবী আহত হলে তাকে কাছের শহরে নিয়ে যেতে পারেননি চিকিৎসার জন্য। কারণ ওই পাহাড়টি, এই পাহাড়ের কারণে ঘুরোপথে যেতে হতো অনেক দূর। বিনা চিকিৎসায় স্ত্রীর মৃত্যু ঘটলে দশরথ মাঝি পণ করেন, পাহাড় কেটে রাস্তা বের করবেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ২২ বছরের সাধনায় একাই প্রায় ৪০০ ফুট দীর্ঘ পাহাড় কেটে ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা বের করেন দশরথ। রাস্তাটি গয়া জেলার আতরি ও ওয়াজিরগঞ্জের মধ্যকার ৫৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমে ১৫ কিলোমিটারে চলে আসে।

চাদিল ডেফি আর সারিনয়া কামসুকের প্রেমের গল্প আবেগে ভাসাবে আমাদের। কথা ছিল ডেফি তার লেখাপড়া শেষ করেই বিয়ে করবে সারিনয়াকে; কিন্তু এই স্বপ্নে বাদ সাধে একটি দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটে সারিনয়ার। মনের মানুষকে বিয়ে করে সংসার সাজানো হলো না আর ডেফির। তাই সারিনয়ার পরিবারের সম্মতি নিয়ে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানেই মৃত প্রেমিকাকে বিয়ে করেন ডেফি।

প্রেমিক-প্রেমিকারা আবেগের বশেই হয়তো বলে, বাঁচব একসঙ্গে- মরব একসঙ্গে। সিনেমার মতো এই গল্প বাস্তব জীবনেও ঘটেছিল। হেলেন ও লেস জন্মগ্রহণ করেন একই দিনে, ১৯১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তারা স্কুলের একই ক্লাসে ভর্তি হন, ধীরে ধীরে একে অপরের প্রেমে পড়েন এবং বিয়েও করেন। ৭৫ বছর একসঙ্গে কাটানোর পর ৯৪ বছর বয়সে ২০১২ সালের ১৬ জুলাই হেলেন মৃত্যুবরণ করেন, তার পরের দিন মারা যান লেস। হেলেন ভুগছিলেন পাকস্থলীর ক্যান্সারে আর লেসের ছিল পারকিনসন রোগ।

মোগল সম্রাট শাহজাহান তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতি অমর করে রাখার জন্য তৈরি করেছিলেন পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের একটি তাজমহল। এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি আর ঘটেনি। কিন্তু ভারতেরই আরেক পাগল প্রেমিক ফাইজুল হাসান কাদেরি তার নিঃসন্তান স্ত্রীর স্মৃতি ধরে রাখতে বানিয়েছেন আরেকটি তাজমহল। 'মিনি তাজমহল' নামে পরিচিতি কাদেরির এই কাজ মনের মানুষের প্রতি ভালোবাসারই এক অনন্য নিদর্শন।

ভালোবাসার জন্য এমন পাগলামি বলি আর একরোখা কাণ্ডের ফিরিস্তি দিতে গেলে দিন পার হয়ে যাবে। ভালোবাসাহীন বর্তমান সময়ে এই প্রেমের গল্পগুলো আমাদের মনে সত্যিকারের ভালোবাসা জাগিয়ে তুলুক। শুরু করেছিলাম হেলাল হাফিজের কথা দিয়ে; শেষটাও করছি তারই কবিতার কয়েকটি চরণ স্মরণ করে- 'ভালোবাসাবাসিহীন এই দিন সব নয়- শেষ নয়/ আরো দিন আছে,/ততো বেশি দূরে নয়/বারান্দার মতো ঠিক দরোজার কাছে'- লাবণ্যের লতা।

মন্তব্য করুন