সেই কবিতারই দুটি চরণ- 'যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি'- মধ্যযুগের কবি, কবি আব্দুল হাকিম তিনশত বছরেরও বেশি সময় আগে বাংলা ভাষাবিরোধীদের নিয়ে রচিত কবিতা 'বঙ্গবাণী'তে এমনই মনোভাব পোষণ করেছিলেন। বাংলা ভাষা ও বাংলা ভূখণ্ডের প্রতি বিদ্বেষ ঐতিহাসিকভাবেই বিদ্যমান ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই যা দৃষ্টিগোচর হয়। যার পথ ধরে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, এই দুই আন্দোলনের মেলবন্ধনেই সৃষ্টি আমাদের বাংলাদেশ।

বাঙালির সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৮ সাল থেকে সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবে অঙ্কুরিত হয়ে ১৯৫২ সালে একটা গণআন্দোলন ক্রমান্বয়ে গণজাগরণে রূপ নেয় এবং পরিণামে অবরুদ্ধ জাতীয় চৈতন্যের আত্মসন্ধান, সত্তাসন্ধান ও জাতিসত্তা-সন্ধানের রক্তিম প্রতীকে পরিণত হয়। বাঙালির স্বাধীনতাকামী ও সংগ্রামশীল অস্তিত্বের এ আত্মপ্রকাশ বিগত সময়-পরম্পরায় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রাম, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বক্ষত আন্দোলন প্রভৃতি ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে চেতনার রূপ ও রূপান্তরের দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছে। বাঙালির জাতীয় জীবনে ভাষা আন্দোলনের গতি ও শক্তিকে একমাত্র রেনেসাঁসের সঙ্গেই তুলনা করা যায়।

ভাষা আন্দোলন কেবল সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন ছিল না- বাঙালি জাতির আত্মসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের প্রক্রিয়ায় তা একসময় হয়ে ওঠে স্বাধীন জাতিসত্তায় উত্তরণের প্রেরণামন্ত্র। ১৯৫২ সালের ২১ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত প্রায় বিশ বছর ভাষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। বাঙালি যে একটি ঐতিহ্যবাহী জাতি, এ জাতির যে একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে সে কথা একুশ থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম। আর সে জন্যই '৫২-র একুশের রক্ত '৬২, '৬৬, '৬৯ এবং '৭১-এর সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বাঙালিকে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি না হলে '৭১-র মুক্তিযুদ্ধ হতো কিনা- এই সন্দেহ পোষণ করেন অনেক জ্ঞানী-গুণী। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি যদি উত্থাপিত না হতো, যদি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করত বাংলার সূর্য সন্তানরা, তাহলে উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতো। পূর্ববাংলা এমনিতে পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। অবিভক্ত ভারতে বিভিন্ন ভাষাভাষী মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাকিস্তানেও আমরা ছিলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ পাকিস্তানের প্রথম পঁচিশ বছরের ইতিহাসে সেই বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দিতে এমন কোনো কূটকৌশল ছিল না যে তারা প্রয়োগ করেনি। কিন্তু ১৯৫২-এর একুশের চেতনায় উজ্জীবিত বাঙালি একের পর এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২১ থেকে '৭১-এর মধ্যে তার ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকারকে রক্ষা করে গেছে। সে জন্যই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পূর্ব বাংলায় বাঙালি 'অ্যাথনিক ক্লিনজিং' বা গণহত্যা শুরু করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে নির্মূল করা, বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করা। আর সে জন্যই বাঙালিকে '৭১-এ হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হয়েছিল। অন্যথায় বাঙালি জাতির নাম-নিশানা মুছে যেত।

বাঙালির ললাটে দুটি বিজয়ের গৌরবতিলক অঙ্কিত হয়ে আছে। প্রথম বিজয়তিলক অঙ্কিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যখন আমাদের মায়ের ভাষা তথা আমাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্তের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকদের হাত থেকে। সেদিন বীর বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল শাসকচক্রের বিরুদ্ধে এবং রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার গৌরব দান করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলা আজ পৃথিবীর চতুর্থ প্রধান ভাষা এবং সমগ্র বিশ্বে বাঙালিদের অধিবাস, যারা কথা বলে ও স্বপ্ন দেখে বাংলা ভাষাতেই। আমাদের ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনই বীজ বপন করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের; নয় মাসের যে রক্তক্ষয়ী জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অঙ্কিত হলো একটি নতুন দেশ, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ভাষার রাজনৈতিক চরিত্র কত প্রবল, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার প্রমাণ। ব্যক্তি ও সমষ্টির আত্মসন্ধান ও আত্ম-আবিস্কার কীভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানবধর্মী গণতান্ত্রিক চেতনায় পরিণত হয়, ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস তার প্রমাণ।

মন্তব্য করুন