'শুধু পাক-ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি সারা দুনিয়ার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা।... জাতিগত অত্যাচারের বিরুদ্ধে, জনতার গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য দুনিয়াজোড়া মানুষের যুগ যুগব্যাপী যে সংগ্রাম একুশে ফেব্রুয়ারি তাকে এক নতুন চেতনায় উন্নীত করেছে।'

এ কথাগুলো দিয়েই শুরু হয়েছিল অমর একুশের প্রথম সংকলন 'একুশে ফেব্রুয়ারী'। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতীক 'ভাষা আন্দোলন' পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল 'একুশে ফেব্রুয়ারী' নামের এই ঐতিহাসিক সংকলনটি; যা বাংলাদেশ তথা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অসামান্য দলিল।

ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে যেমন আলোড়িত করেছিল, তেমনি তৎকালীন লেখক, কবি, শিল্পীদের মনেও তা তীব্রভাবে দাগ কেটে গিয়েছিল। সেই কবি-লেখকদের বেদনার্ত শব্দাবলি আর শিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়েই পাকিস্তান সরকারের শত ভয়ভীতি উপেক্ষা করে প্রকাশিত হয়েছিল একুশের এই প্রথম সংকলনটি।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী রচিত একুশের সেই কালজয়ী গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'- এ সংকলনেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। একুশের এ ঐতিহাসিক প্রথম সংকলনে কবিতা লিখেছিলেন- কবি শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গনি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, আনিস চৌধুরী, আতাউর রহমান, জামালুদ্দিন।

কথাসাহিত্যিকরাও পিছিয়ে ছিলেন না; শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম এবং আতোয়ার রহমানের লেখা পাঁচটি গল্পে নানাভাবে একুশের তাৎপর্য বিচ্ছুরিত হয়েছে এ সংকলনে।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে এ সংকলনে একুশের গান লিখেছিলেন তোফাজ্জল হোসেন। 'রক্ত শপথে আরা অজিকে তোমারে স্মরণ করি, একুশে ফেব্রুয়ারি'- তোফাজ্জল হোসেনের এ গানটিও একুশের এক উল্লেখযোগ্য ভাষণ হিসেবে জেগে আছে।

'একুশের নকশা' নামে দুটি বিশেষ রচনাও স্থান পেয়েছিল এ সংকলনে। সেখানে মুর্তজা বশীর লিখেছিলেন, 'ফুঁসে ওঠা অজগরের মত বিরাট মিছিলটা কেঁপে কেঁপে আসছে। কালো কালো মাথাগুলো রোদে চকচক করছে ওর শরীরের আঁশের মত। সামনে গতকালের শহীদদের রক্তাক্ত কাপড় নিশানের মত ওড়ানো। আরেকজনের কাঁধে একটা টুকরি। অনেকগুলো খালি টিয়ার গ্যাসের খোল দিয়ে তা ভরতি..।' একুশের নকশার দ্বিতীয় লেখাটি লিখেছিলেন, সালেহ আহ্‌মদ- 'বন্ধুগণ, একশ চুয়াল্লিশকে ভেঙে আমরা এগোতে চাই না। কিন্তু তাই বলে মনে করো না আমাদের সংগ্রাম-আমাদের জীবন এখানটাতেই থেমে গেছে।'

শিল্পী মূর্তজা বশীর এ সংকলনের জন্য একটি ছাপচিত্র এঁকেছিলেন; যা দিয়েই শুরু হয়েছিল একুশের এ সংকলন। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আর সব শেষে একুশের ইতিহাস লিখেছিলেন কবিরউদ্দিন আহমদ।

সব মিলিয়ে এ এক অসামান্য আয়োজন। যে আয়োজন বাংলাভাষার ইতিহাসের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। যার জন্য এ সংকলনের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজুর রহমানকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে অনেক। কারণ ১৯৫৩ সালে একুশের সংকলন প্রকাশ করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। এ শুধু রাষ্ট্রীয় বিরোধিতা বা ঝুঁকির দিক দিয়ে নয়, আর্থিক দিক দিয়েও। এই সংকলন প্রকাশের খরচ মেটানোর জন্য হাসান হাফিজুর রহমান তার পৈতৃক জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

মন্তব্য করুন